পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

তিনটি অণুগল্প বা ছোটগল্প

  • 15 November, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 170 view(s)
  • লিখেছেন : ব্রতী মুখোপাধ্যায়
অচ্ছুত, চিত্রার ছেলে এবং অনাথনামা-- সহমনের গল্প বিভাগে আজ থাকলো তিনটি অণুগল্প

 


অচ্ছুত  
##

রাধেশ্যাম এইমাত্র ঘরে ফিরেছে।     
##
পূর্ণিমা। চাঁদ আর নীল নীল হিম ছাড়া কেউ জেগে নেই। গাঁয়ের কেউ জেগে নেই, বাপ মা ভাইয়া   ভাবী পাশপড়োশি কাকপক্ষী কেউ না।
##
নিরালীই আলো জ্বেলে বসে। থালিতে ডাল চাপাটি সব্জি আচার যত্ন করে সাজানো। এক বোতল পানি।      
##
নিরালী সন্ধের আগেই দেওয়ালির শাড়িখানা ভেঙেছে। হাত ভরে প্লাস্টিকের লাল-নীল চুড়ি। বাঁ হাতে আয়না ধরে মেলায় কেনা নীল রঙের বিন্দিয়া ডানহাত দিয়ে আলতো করে পরতে পরতে লক্ষ করেছে তার হাসিটিতে পিকচারের শাবানা আজমি যেমন।     
##
রাধেশ্যাম খাকি উর্দি ছেড়ে এককোণে ছূঁড়ে ফেলে দিল। জানিয়ে দিল নাহাবে না, খাবে না, বিস্তারায় লেটে যাবে সে।       
##
সত্যিই সে বিছনায় শুয়ে পড়ল। হাতের ব্যথা যায়নি টের পেয়েছে উর্দি ছাড়ার সময়।  
##
টের পেল না নিরালী তার মুখখানা ভালভাবে পরখ করছে।
সে বলল, যা, লেট যা।    
গলার স্বর ভিন্ন, গলার স্বর কর্কশ।     
##
নিরালী মুখখানা আরও একবার ভালভাবে পরখ করল। সরু গোঁফ। গলার নিচে জরুল। কানের লতি একটু বেশি লম্বা। সবই ঠিক আছে। অন্য কেউ না।     
##
রাধেশ্যাম এসেছে সাত মাস বাদে। অন্যবার এসেই নিরালীকে বিছনায় পাওয়ার জন্যে ছটফট করে। একটা কথাও শুনতে চায় না। এইবার একেবারে আলাদা।       
##
রাধেশ্যামের ঘুম আসছে না। বাঁহাতেই গুলি। ডাক্তার গুলিটাকে কনুইএর ওপর থেকে বের করেছে ভালই, এখনও ব্যথা।     
##
নিরালী জিজ্ঞেস করল, কি হয়েছে তোমার? বুখার?        
##
অল্প পাওয়ারের বাল্ব। তার হলদে আলো ডানদিক দিয়ে নিরালীর নিমশ্যামল গালে, সেই আলো গালের   পাশ দিয়ে ঘন চুলের খোঁপায়।
##
একইরকম গাঁদাফুল নিরালীর খোঁপায়? কেমন করে?  
গালদুটোও একইরকম ফোলা? কেমন করে?
##
অপারেশনের পাহাড়ি গাঁয়ে ভয় পেয়ে হিরনিও তো কাঁপছিল, কাঁদছিল হিরানিও, একইরকম কাঁদছিল হিরনিও…         
##
রাধেশ্যাম চেঁচিয়ে উঠল, ভাগ যা! ভাগ সামনে সে। ম্যায় অচ্ছুত হুঁ।         

======================


চিত্রার ছেলে
##

চিত্রা ধরতে পারে ছেলের কিছু হয়েছে। কিছু একটা। খেতে পারছে না। ঘুমোতে পারছে না। কলেজে যাচ্ছে না। ছাত্র পড়াতেও বের হচ্ছে না।  
##
মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। সবসময় কিছু একটা চিন্তা করছে। চিত্রা ধরতে পারে ছেলে নিশ্চয় ভয় পেয়েছে।
##
একা হয়ে যাওয়ার পর ছেলেকে নিয়েই সংসার। পোস্টাপিস সদয় হয়ে কাজ একটা দিয়েছে। তাকে চাকরি বলা যাবে না।    
##
সাত্যকি কলেজ থেকে দু-তিনটে টিউশন সেরে ফেরে। ফিরতে দেরি হয়।    
##
ছেলে কথা বলছে না, মুখটাও আড়াল করতে চাইছে অথচ সে মার কাছে কখনও কিছু লুকোয়নি। চিত্রা ভেবে পায় না কী হয়েছে। নানারকম চিন্তা তার মাথায়।    
##
এরই ভেতর একদিন সকালবেলা শতরূপ। এসেই সে বলল, সাত্যকিকে এক্ষুনি একবার ডেকে দিন।
##
শতরূপদের সব্বাই সমঝে চলে। চিত্রার হাতপা কাঁপতে লাগল।    
##
সাত্যকি অঙ্ক নিয়ে পড়েছিল। অঙ্ক ব্যাপারটা তার কাছে দুর্গের মতো।
##
শতরূপ জিজ্ঞেস করল, সত্যি কথা বলবি। থানায় গেছিলি?
##
শোনামাত্র সাত্যকি ভেতর থেকে চমকে উঠেছে। আর তা বোঝাও গেল।  
সে খুব সংক্ষেপেই উত্তর দিল--- না।
##
--- সাবধানে থাকিস।
এইটুকু বলে শতরূপ চলে গেল।   
##
শতরূপ চলে গেল। চিত্রা কিন্তু ছেলেকে আজ কিছুতেই ছাড়ল না--- কিছু একটা হয়েছে তোর। বল আমাকে। শতরূপটা বাড়ি বয়ে থানা-পুলিশ বলে গেল কেন?
##
একটা মেয়ে খুন হয়েছে। লোকাল কাগজে খবরটা বেরিয়েছে।                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                    
##
সাত্যকি কথাটা বলতে পারল না। জড়িয়ে ধরল মাকে। মার কাঁধে মুখ রেখে এইটুকুই বলল--- যাবে যা্বে করেও তোমার ছেলে শেষ পর্যন্ত থানায় যেতে পারেনি, মা।     

অনাথনামা
##   

আধিয়ান সিং। এইসময় ছাদে। ইজিচেয়ারে। তার চোখ উত্তর-পূর্বে স্থির। সামনে এক বালক, পা ছড়িয়ে বসে।    
##
গত দুদিন আধিয়ান ছুটোছুটি করেছে। অমৃত অবাক হয়ে দেখেছে আশি বছর বয়েসেও তার বাবার অকল্পনীয় সাহস, অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতা।      
##
গুন্ডারা লাঠি তলোয়ার পিস্তল হাতে দাপিয়েছে। যে পেরেছে পালিয়েছে। যে পারেনি খুন হয়ে পড়ে রয়েছে রাস্তায়। রাস্তার পাশে ওষুধের দোকানগুলোও আগুনে পুড়ে ছাই। গলির ভেতর গরিব মহল্লায় দাউ দাউ আগুন। আর তখনই আধিয়ান ছেলেকে নিয়ে আগুনের ভেতর লাফিয়ে পড়েছে, আর্তনাদের ভেতর থেকে এক এক করে বের করে এনেছে দগ্ধ, অর্ধদগ্ধ মানুষ, বাচ্চা বুড়ো ছেলে মেয়ে। বাইকে বসিয়ে তারপরই ছুট। সে জানত কোনখানে শেল্টার দেয়া সম্ভব।   
##
জয় শ্রীরামরা আজকেও রাস্তায়। আল্লা হো আকবারও রাস্তায়। গুলি ছুঁড়ছে পুলিশ। পাথর ছুঁড়ছে পুলিশ।     
##
আধিয়ান আজ আর বের হয়নি। অমৃতের মা বের হতে দেয়নি। অচেনা লোক ফোন করে শাসিয়েছে। জান খাতরে মে।  
##
বালকটি তার দিকে চেয়ে রয়েছে। আধিয়ান তাকে গতকাল সন্ধের পর আগুনের ভেতর থেকে জোর করে তুলে এনেছে। নাহলে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যেত। বালকটির আসার ইচ্ছা ছিল না।  
##
আধিয়ান তাকে শেল্টারে দিয়ে আসেনি। ঘরে নিয়ে এসেছে।      
##
বালকটি ছবির মতো বসে। চোয়াল শক্ত। কাল রাত থেকে তাকে জল ছাড়া আর কিছু খাওয়ানো যায়নি।
##
আধিয়ানকেও খাওয়ানো যায়নি।  
##
বালকটি বলল--- আব্বু? আম্মি?  
##
এইসময় অমৃতের মা। ইচ্ছে বালকটিকে নিচে নিয়ে যাবে। খাওয়াবে কিছু।  
##
বালকটি আবার একবার বলল--- আব্বু? আম্মি?
##
আধিয়ান তার দিকে তাকাল। আশ্চর্য! বালকটির চোখে জল নেই। সে একবারও কাঁদেনি।   
##
অমৃতের মা বালকটির পাশে এসে বসল। মাথায় হাত দিল। সে জানত আধিয়ানও মা-বাবাকে সঙ্গে আনতে পারেনি, সত্তর বছর আগে লাহোর ছেড়ে হিন্দুস্থানে পালিয়ে আসার সময়।
##
কাঁদছে আর কেঁদেই চলেছে আধিয়ান।
=========================

0 Comments

Post Comment