পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

গুরুচাঁদ ঠাকুরের রাজনৈতিক দর্শন

  • 09 April, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 476 view(s)
  • লিখেছেন : বরুণ ভক্ত
আজ গুরুচাঁদ ঠাকু্রের জন্মদিন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ছুটি ঘোষণা করেছেন, কিন্তু আমরা কি জানি এই মানুষটিকে? বাঙালী মধ্যবিত্ত কি কখনো চেষ্টা করেছে তাঁকে জানতে? গুরুচাঁদ ঠাকু্রের রাজনৈতিক দর্শন আজ আমাদের দেশে কতখানি বাস্তবসম্মত, সময়োপযোগী ও হিতকর তা সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে ভাববার অনুরোধ জানাই। বর্তমানে গুরুচাঁদ ঠাকুরের রাজনৈতিক দর্শন বাস্তবায়িত করতে হলে যে আত্মশক্তি ও সংঘবদ্ধ শক্তির প্রয়োজন আমরা তা অর্জন করতে পেরেছি কি? যদি না পেরে থাকি, তাহলে সেই আত্মশক্তি ও সংঘবদ্ধ শক্তির জায়গা তৈরী না করে রাজা হবার স্বপ্ন দেখা শুধু হাস্যকর নয়, একখানি বড় প্রশ্ন চিহ্নেরও জন্ম দেয় বইকি। জয় গুরুচাঁদ। জয় মানবতাবাদ।

‘রাজর্ষি’ গুরুচাঁদ বলতেন, “রাজনীতি হ’ল জগতের শ্রেষ্ঠ নীতি—কার’ও ব্যক্তিগত বা কোনো দলীয় নীতি নয়। যে নীতির দ্বারা জাগতিক সব কিছুর উপর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মনুষ্যজাতি সুন্দর হতে সুন্দরতর হতে পারে তাই হ’ল ‘রাজনীতি’।” অর্থাৎ রাজনীতির একমাত্র উদ্দেশ্য মানবজাতি তথা জগতের কল্যাণ। রাজনীতি কোন ব্যক্তিস্বার্থ বা দলীয় স্বার্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ হতে পারে না। সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে সর্বাগ্রে ব্যক্তির আত্মশক্তির জাগরণ (শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও চরিত্র গঠনের দ্বারা) যেমন প্রয়োজন তেমনই সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রামের জন্য জাত-পাত নির্বিশেষে সংঘবদ্ধ শক্তি এবং সংগঠন দরকার। হরিচাঁদ ঠাকুরের আদর্শ ও কাঠামোর ঐক্যবদ্ধ শক্তি দিয়ে ঠাকুর গুরুচাঁদ অনুন্নত শ্রেণির রাজনীতির বনিয়াদ গড়ে তোলেন যা গৃহীর উন্নতির জন্য একান্ত অপরিহার্য। জাতির উদ্দেশ্যে তিনি বলতেন—

“শক্তি না দেখিলে কেহ ক’রে না সম্মান।

শক্তিমান হ’তে সবে হও যত্নবান।।”

এই শক্তি হ’ল আত্মশক্তি ও সংঘবদ্ধ শক্তি। ১৯২৩ খ্রীষ্টাব্দে বাংলাদেশের খুলনা শহরে যুগনায়ক গুরুচাঁদ ঠাকুরের সভাপতিত্বে নমঃশূদ্র জাতির একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে অনুন্নত শ্রেণীর মানুষ কোন পথে দেশের রাজনীতি ক্ষেত্রে অংশ গ্রহণ করবে তা নির্ধারিত হয়।

“এই সম্মেলন হ’তে নমঃশূদ্র কোনপথে

চালনা করিবে রাজনীতি।

যাহা বলে দয়াময় সভা মধ্যে পাঠ হয়

তা’তে সবে জানাল স্বীকৃতি।।”

এই সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯২৬ খ্রীষ্টাব্দে পশ্চিমবাংলার কাঁচড়াপাড়ায় এক সম্মেলনে “বেঙ্গল ডিপ্রেসড ক্লাসেস এ্যাসোসিয়েশন” নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। ১৯৩৭ খ্রীষ্টাব্দে বিধানসভার সাধারণ নির্বাচনে এই সংগঠনের পক্ষ হতে অনুন্নত সম্প্রদায়ের ২৫ জন সদস্য আইনসভায় নির্বাচিত হন। মানুষ তথা দেশের উন্নতির জন্য প্রতিটি মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতার উপর গুরুত্ব আরোপ করতেন তিনি। কারণ তিনি জানতেন ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের বিষবৃক্ষ ডাল-পালা বিস্তার করে কিভাবে সমাজের উপর চেপে বসেছে। এই বিষবৃক্ষকে সমূলে উৎখাত করতে ও মানুষের সার্বিক উন্নতির লক্ষ্য পূরণ করতে ‘ব্যক্তিস্বার্থহীন’ দল তৈরীর কথা তিনিই সর্বপ্রথম বলেন। তিনি বলতেন—“যে জাতির রাজা নাই, সে জাতি তাজা নয়”। জাতিকে জাগাতে রাজশক্তি অবশ্য প্রয়োজন। তিনি আত্মবলে বলিয়ান হয়ে রাজশক্তির অধিকারী হতে বলেছেন। অন্তঃসারশূন্য, স্বার্থান্বেষী, ক্ষমতালোভী কোনো রাজনৈতিক দলের দাসত্ব করতে বলেননি। তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার উপর দাঁড়িয়ে এইরকম একজন ‘রাজনৈতিক গুরু’ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। যেখানে ব্যক্তিস্বার্থ তো দূর, সার্বিক স্বার্থের কারণে দলীয় স্বার্থকেও তুচ্ছ করা হয়েছে! এই হল ঠাকুর গুরুচাঁদের রাজনৈতিক দর্শন!

অপরপক্ষে, বর্তমান ভারতবর্ষের তথাকথিত রাজনৈতিক দলগুলি যে ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থের উর্ধ্বে নয় একথা তাদের কার্যকলাপের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেই বোঝা যায়। যাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হল ছলে-বলে-কৌশলে রাজনৈতিক ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থ চরিতার্থ করা। প্রয়োজনে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাতেও এঁনারা পিছপা হ’ন না। অর্থাৎ এদের রাজনীতি করার উদ্দেশ্য দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। হিন্দু-মুসলীম সম্প্রীতির লক্ষ্যে গুরুচাঁদ ঠাকুর তাই একসময় বলেছিলেন—

“বিশেষতঃ এক কথা কহি সকলেরে।

হিন্দু মুসলমান আছি দেশ ভরে।।

এক ভাষা এক আশা এক ব্যবসাতে।

কেন বা করিবে রণ তাহাদের সাথে।।

দুই ভাই এক ঠাঁই রহ মিলে মিশে।

ভাই মেরে বল কেন মর হিংসা বিষে?”

আমাদের দেশ ‘কৃষি প্রধান দেশ’। আজকে যারা কৃষিজীবি সাধারণ মানুষের ভোটে রাজশক্তির অধিকারী হয়ে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ ও ভোটব্যাংকের হিসাবের বাইরে কিছু দেখতে চান না তাঁরা আর যাইহোক সমাজের মঙ্গলকামী হতে পারেন না। এসব ‘মাটিতে চরণ না পড়া’ মানুষ সম্পর্কেও গুরুচাঁদ ঠাকুর বলেছিলেন—

“দেশের পরাণ বলি যদি কিছু রয়।

কৃষক দেশের প্রাণ জানিবে নিশ্চয়।।

“দেশ-বৃক্ষ-মূল” বলি কৃষকে জানিবে।

কৃষকের স্কন্ধে সুখে রহিয়াছে সবে।।

মূল দেয় রস বহি শাখা প্রশাখাতে।

‘সুখের কপোত’ সেজে সবে বাঁচে তাতে।।

এ হেন দুর্বৃত্ত দেখ এই সব শাখা।

মূল-মূলে জল দিতে কারও নাই দেখা।।

বিষময় ফল দেখ ফলিয়াছে আজ।

মেরুদন্ডহীন যত শোষক সমাজ।”

আমাদের সার্বিক সচেতনতাই একমাত্র পারে এর গতিরোধ করতে। জানা প্রয়োজন গৃহীর উন্নতি না হলে সমাজের উন্নতি হয় না। আর রাজনৈতিক সচেতনতা না থাকলে গৃহীর প্রকৃত উন্নতি সম্ভপর নয়। ‘রাজর্ষি’ গুরুচাঁদ সমাজের ক্ষয়িষ্ণুতা নির্মূল করতে চেয়েছিলেন একেবারে গোড়া হতে। তাঁর দূরদৃষ্টি উপলব্ধি করা যায় এই শাশ্বত বাণীটির মধ্য দিয়ে—

“ধনহীন বিদ্যাহীন যারা এই ভবে।

রাজনীতি ক্ষেত্রে তারা শান্তি নাহি পাবে।।

আত্মোন্নতি অগ্রভাগে প্রয়োজন তাই।

বিদ্যা চাই, ধন চাই, রাজকার্য চাই।।

দুর্বলে সবলে যদি করিবে মিলন।

সবলে বাড়িবে বলে দুর্বলে মরণ।।”

সুতরাং গুরুচাঁদ ঠাকু্রের রাজনৈতিক দর্শন আজ আমাদের দেশে কতখানি বাস্তবসম্মত, সময়োপযোগী ও হিতকর তা সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে ভাববার অনুরোধ জানাই। বর্তমানে গুরুচাঁদ ঠাকুরের রাজনৈতিক দর্শন বাস্তবায়িত করতে হলে যে আত্মশক্তি ও সংঘবদ্ধ শক্তির প্রয়োজন আমরা তা অর্জন করতে পেরেছি কি? যদি না পেরে থাকি, তাহলে সেই আত্মশক্তি ও সংঘবদ্ধ শক্তির জায়গা তৈরী না করে রাজা হবার স্বপ্ন দেখা শুধু হাস্যকর নয়, একখানি বড় প্রশ্ন চিহ্নেরও জন্ম দেয় বইকি।

জয় গুরুচাঁদ। জয় মানবতাবাদ।

0 Comments

Post Comment