পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

বিত্তবানের খিদে ও লুইস বুনুয়েলের একটি ফিল্ম

  • 14 November, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 249 view(s)
  • লিখেছেন : মানস ঘোষ
বুনুয়েলের প্রায় সব ছবিতেই তিনি চার্চ আর বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থাকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেন। তিনি একাধিকবার বলেছেন এই দুটো প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তর্ঘাত ঘটানোই তার ছবির উদ্দেশ্য। অতএব তার ছবির আখ্যানের মধ্যে দেখা যায় এই অন্তর্ঘাতের কৌশলগুলি। দ্য এক্সটারমিনেটিং এঞ্জেলও ব্যতিক্রম নয়।

লুইস বুনুয়েল বিখ্যাত স্প্যানিশ চলচ্চিত্রকার। ১৯৬২ সালে তিনি একটি ছবি করলেন এল এঞ্জেল এক্সটার্মিনাডোর  বা দ্য এক্সটারমিনেটিং এঞ্জেল *। অদ্ভুত এক ছবি। লোরকার বন্ধু সুরিয়ালিস্ট চলচ্চিত্রকার বুনুয়েল। তাঁর তখন ঠাঁই হয়নি ইউরোপে। স্বদেশের ফ্যাসিবাদী সরকার তাকে নির্বাসন দিয়েছে। প্রিয় প্যারিস শহরেও তিনি কর্তাব্যক্তিদের চক্ষুশূল। পাড়ি দিলেন আমেরিকায়, সেখানেও খুব সুবিধে হল না। তিনি চলে গেলেন মেক্সিকোয়। মেক্সিকোয় থাকাকালে তিনি একের পর এক অনেকগুলি ছবি তৈরি করলেন। এই ছবিগুলি বাস্তববাদ ও পরাবাস্তববাদের অসাধারণ মিশ্রণ।  

তার এইরকমই একটি ছবি দ্য এক্সটারমিনেটিং এঞ্জেল । ছবির গল্পটা তার চিন্তাজগতের মতোই অদ্ভুত। একদল উচ্চবিত্ত মানুষ একটি বাড়িতে মিলিত হয়েছেন সান্ধ্য পার্টিতে। চলছে খানাপিনা গল্প-গুজব। কিছুক্ষণ পরে একে একে অনেকেই  চাইলেন সারারাত চলুক পার্টি। কিন্তু পরদিন বিদায় নিতে গিয়ে তারা দেখলেন বাড়ি থেকে বের হবার রাস্তা বন্ধ। কোনো এক অজানা কারণে কেউই পারছেন না বাড়ির বাইরে আসতে। এক আশ্চর্য সমস্যা। দিন যায় রাত আসে, আবার সকাল হয়; এই লোক গুলো বন্দি হয়ে থাকে বাড়ির ভিতরে। বাড়ির বাইরে থেকে পথচারিরা অবাক বিস্ময়ে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকে। কর্পোরেশন এসে বাড়িটাকে ‘কোয়ারান্টাইন’ করে দেয়। কিন্তু কেন যে মানুষগুলো বাড়ি থেকে বেরোতে পারছে না তার কারণ না জানে ভিতরে বন্দী লোকগুলো, না জানে বাইরের পথচারীরা। এ এক অভূতপূর্ব সমস্যা।

বুনুয়েলের প্রায় সব ছবিতেই তিনি চার্চ আর বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থাকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেন। তিনি একাধিকবার বলেছেন এই দুটো  প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তর্ঘাত ঘটানোই তার ছবির উদ্দেশ্য। অতএব  তার ছবির আখ্যানের মধ্যে দেখা যায় এই অন্তর্ঘাতের কৌশলগুলি। দ্য এক্সটারমিনেটিং এঞ্জেলও ব্যতিক্রম নয়। এ ছবিতে দেখানো খাদ্য এবং খাদক সম্পর্কের মধ্যে শ্রেণী খুব গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ধারক হয়ে ওঠে।  আমরা দেখেছি বুনুয়েলের বিভিন্ন ছবি বুর্জোয়াদের খাদ্যগ্রহণ ও ভোজসভাকে কেন্দ্র করে ক্ষুরধার আক্রমণ সানায়। ফরাসি দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক  পিয়ের বোর্দু একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন খাদ্য ও খাদ্যগ্রহণের রাজনীতি অনেকাংশেই শ্রেণীচরিত্রনির্ভর। তিনি বলছেন বুর্জোয়াদের কাছে খাদ্য অনেক বেশি করে ‘কুইজিন’ আর শ্রমিক-কৃষকের কাছে তা অনেক বেশি করে ‘ফুড’। অর্থাৎ বুর্জোয়াদের কাছে খাদ্যগ্রহণ কেবল ক্ষুন্নিবৃত্তি নয় তা  মূলত ‘বাসনা’। পেট ভরানোর থেকে তাদের কাছে বাসনাপূরণ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।  

তিনি আরো বলছেন খাদ্যগ্রহণ এই শ্রেনীর মানুষের কাছে একটা যেন রিচুয়াল। সেখানে ভদ্র সমাজের রীতি-নীতি, টেবিল ম্যানার্স আর কোন খাবারের পর কী খেতে হয় সেই ক্রমবিন্যাস খিদের থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আসলে এই মানুষগুলোর খিদে তো নেই যা আছে তা হল সুখাদ্য ভক্ষণের ইচ্ছা অর্থাৎ পেটের খিদে নয়, বলা যেতে পারে চোখের খিদে। যেভাবে তারা থরে থরে সাজানো বিলাস সামগ্রীর দিকে লোলুপ চোখে তাকায় ঠিক সেভাবেই তারা বিবিধ সুখাদ্যের দিকেও লোভাতুর দৃষ্টি দেয়। পিয়ের বোর্দু দেখাচ্ছেন খিদের জৈবরাজনীতি ও সাংস্কৃতিক রাজনীতি আসলে শ্রেণিনির্ভর।

লোকগুলো কেন যে আটকে পড়ে ওই বাড়ির ভেতরে তার কোনো বাস্তবসম্মত উত্তর আখ্যানে দেওয়া নেই। বুনুয়েল বলতে চান এই মানুষগুলো আসলে চিন্তায় ও ব্যবহারে বন্দি থাকে কিছু সামাজিক আচার-আচরণ, প্রথা, রীতিনীতি, আর তথাকথিত সভ্যতার বেঁধে দেওয়া গন্ডির ভিতরে। এরা যেন শ্রেণীগতভাবে অজান্তে তাদের বন্দিত্ব কে অভ্যাস ও পুনরোভ্যাস করে চলে। তা থেকে এদের মুক্তি নেই।  এদের খাদ্যাভ্যাস ও খাদ্যগ্রহণ যেন এদের এই বন্দীত্বের মেটোনিমি। ফিল্মে দেখানো এদের এই ভোজসভার একখানা চিত্র দেওয়া হল। লক্ষ্য করুন এদের ভোজসভার মধ্যে রীতিনীতি আছে, আছে বৈভব। কিন্তু তা যেন একপ্রকার প্রাণহীন জৌলুস, যেমনটা আমরা দেখতে পাই শপিংমলে উজ্জ্বল আলোয় সাজানো বহুমূল্য বস্তুসামগ্রীর মধ্যে। জৈব প্রয়োজনের থেকে মনোবাসনাই এখানে প্রধান। একপ্রকার উদগ্র কমোডিটি ফেটিশ আর অপ্রতিরোধ্য গোপন লালসা।

দৃশ্যটি দেখুন। তীব্র আলোয় ঝলমল করছে কতকগুলো মূর্তি, তাদের হেয়ার স্টাইল, জেল করা চুল, নেকলেসের জেল্লা, মেক আপ করা মুখ, পোষাকের ডিজাইন, আর ঘরের চারপাশে রাখা বহুমূল্য শিল্পসামগ্রী।   

এবার একটা অন্য দৃশ্যে চলে যাই। ভিনসেন্ট ভ্যানগগের বিখ্যাত চিত্র দ্য পোট্যাটো  ইটার্স । ১৮৮৫ সালে করা একটি তৈলচিত্র। সেও এক সান্ধ্যভোজের ছবি। তবে দিনাবসানে একান্তই নিম্নবিত্ত একটি খেটে খাওয়া পরিবারের রাতের খাওয়া নুন ও আলু সেদ্ধমাত্র, সঙ্গে কফি।

লক্ষ্য করুন কি মমতাময় এক নরম আলো ছড়িয়ে আছে ছবি জুড়ে, অথচ জৌলুস নেই লেসমাত্র। আর সে আলোয় কি জীবন্ত মনে হচ্ছে মানুষগুলোকে। তাদের অতি সাধারণ পোষাকের ভাঁজ, চোখের দৃষ্টি, মুখের ভাব ফুটে উঠেছে ছবিতে। কি যত্নে জাঁকজমকহীন সাধারণত্বকে ভ্যানগগ প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। ক্ষুধার্ত পেটগুলো ভরবে, কফিতে তৃষ্ণা মিটবে। বর্ণহীনতা ও অপ্রাচূর্য আছে, কিন্তু সবকিছুকে ঢেকে দিয়েছে অপূর্ব এক প্রানবন্ত আলো আর মানুষী উপস্থিতি।

ভ্যানগগ জানতেন দীনতা অন্তিম গুণ…।

ছবিটি দেখুন --- https://www.youtube.com/watch?v=arwcSaMnHLY

 

0 Comments

Post Comment