দেড় দশক আগে, মার্কিন দেশের রাজনৈতিক দল নিরপেক্ষ সাধারণ মানুষের গণ আন্দোলন, ‘অকুপাই ওয়াল ষ্ট্রীট’ বিশ্ব জুড়ে সাড়া ফেলেছিল তার আপন বৈশিষ্ট্যে। পৃথিবীর তাবড় ক্ষমতাধরদের রচিত ন্যারেটিভের বিরোধিতায় প্রতিবাদ, প্রতিরোধের অনন্য ভঙ্গিমায়। তার অন্যতম অংশগ্রহণকারী ছিল, নিউ ইয়র্ক সিটির একটি র্যাডিক্যাল কমিউনিটি ‘রেভারেন্ড বিলি অ্যান্ড দ্য চার্চ অফ স্টপ শপিং’ পারফরম্যান্স। স্টপ শপিং কয়্যারের সাথে থাকেন একজন কৌতুক অভিনেতা ধর্মপ্রচারক, ‘রেভারেন্ড বিলি’, যার চরিত্রে অভিনয় করেছেন অভিনেতা উইলিয়াম ট্যালেন। একটি অভিনয়ে, রেভারেন্ড বিলি বলছেন, ‘একবার যখন আমরা বুঝতে পারি যে আমরা আসলে ভাঁড়দের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছি, তখন আপনি নিজেও একজন ভাঁড় হয়ে উঠতে পারেন’।
বস্তুত, ২০২৪-২৫ সময়কাল জুড়ে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা অর্থাৎ ‘জেন জি’ (Gen Z)-রা আলোড়ন সৃষ্টিকারী আন্দোলনের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের স্বৈরাচারী একাধিক রাষ্ট্রপ্রধানকে ক্ষমতা ছাড়তে বা গণ বিরোধী পদক্ষেপ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করেছে। কখন মরক্কো, কখন মাদাগাস্কার, নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, কখন বা পেরু তার সাক্ষী থেকেছে। সদ্য, ছাত্রদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রবল গণ-আন্দোলনের ফলে গত ২৮ সেপ্টেম্বরে (২০২৬) সার্বিয়ার বর্তমান রাষ্ট্রপতি আলেকজান্দার ভুচিচ পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন।
বিগত কয়েক দশক ধরে, হিংসা দীর্ণ সারা পৃথিবী জুড়েই, কখনও আফ্রিকা, কখনও লাতিন আমেরিকা, পূর্ব ইউরোপ, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে স্বৈরাচারী শাসকের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে, রোজগারের দাবীতে, পরিবেশ রক্ষার দাবীতে ব্যাপক জন-অসন্তোষ, গণ-আন্দোলনগুলো, গণ-বয়কট, ধর্মঘট এবং সম্মিলিত অবস্থান কর্মসূচির মতো কৌশলের মাধ্যমে অহিংস প্রতিরোধের উপায়কে প্রয়োগ করেছে। সেসব আন্দোলনের ফলে, বহু ক্ষেত্রেই উৎখাত হয়েছে নিপীড়নকারী স্বৈর-ক্ষমতা চক্র। প্রকৃতপক্ষে, যে কৌশলের প্রবর্তক ছিলেন মহাত্মা গান্ধী এবং যিনি এর সফল প্রয়োগও ঘটিয়েছিলেন। চেকোস্লোভাকিয়ার ভেলভেট বিপ্লব, মার্কিন দেশের ‘অকুপাই’ (Occupy) আন্দোলন, ‘আরব বসন্ত’ (Arab Spring), হংকং-এর আমব্রেলা মুভমেন্ট, দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপতি পার্ক গিউন-হাই-এর ইম্পিচমেনট, ঈজিপ্টের তাহরির স্কোয়ার বিক্ষোভ, তুরস্কের তাকসিম স্কোয়ার বিক্ষোভ, সার্বিয়াতে স্বৈর-শাসক স্লোবোদান মিলোশেভিচের উৎখাতে ওতপোর (Otpor) আন্দোলন ইত্যাদির কেন্দ্রে ছিল অহিংস পদ্ধতি।
পরিবেশ রক্ষা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, শরণার্থী ও অভিবাসীদের অধিকার, এবং জাতিগত বৈষম্য ও সহিংসতার মতো বিভিন্ন ইস্যুতে সোচ্চার আন্দোলনকারীরা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শান্তিপূর্ণ এবং অহিংস প্রতিবাদের পথ বেছে নিচ্ছেন এবং সেগুলোকে পরিস্থিতির প্রয়োজনে অভিযোজিত করছেন। স্বৈরাচারী ক্ষমতাধরদের হিংস্রতার প্রতিরোধে হিংস্রতাকে বেছে না নিয়ে বরং অহিংস সংগ্রামের মাধ্যমে একনায়কদের ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা জুড়ে বিশ্বের বহু দেশে। সব ক্ষেত্রেই একনায়করা আঁকড়ে থাকতে চেয়েছিলেন তাঁদের সরকারী সশস্ত্র বাহিনীর নৃশংস দমন-পীড়নের মাধ্যমে। কিন্তু গণ-অহিংস গণ সংগ্রামের শক্তির কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা। সেসব দেশে, মহাত্মার অহিংস প্রতিরোধের রাজনৈতিক কৌশল ইদানীংকালের প্রায় প্রতিটি প্রবল আলোড়ন সৃষ্টিকারী গণ আন্দোলনগুলোকে অনুপ্রাণিত ও প্রভাবিত করে চলেছে। বিশ্বজুড়ে অহিংস আন্দোলনের এই নবজাগরণের বিষয়টি পর্যালোচনা করতে গিয়ে, মার্কিন সাংবাদিক ও লেখক জোনাথন শেল (Jonathan Schell) অহিংস নীতি গ্রহণকে একটি বিচক্ষণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের চেয়েও বেশি কিছু হিসেবে দেখেছেন। সহিংস রাজনীতির ইতিহাসে, অহিংস আন্দোলনের এই উত্থান ছিল ঘটা সমান্তরাল এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সাথে যুক্ত। আর তা হলো, রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে যুদ্ধের উপযোগিতা দীর্ঘমেয়াদে হ্রাস পাওয়া। রাজনৈতিক সংঘাতের মীমাংসায় সামরিক শক্তি আর নির্ভরযোগ্য রইল না বিংশ শতাব্দী ছিল চরম সহিংসতা এবং ব্যাপক গণতান্ত্রিক গণ-আন্দোলনের যুগ (The Unconquerable World, Jonathan Schell, 2003)।
নির্মমভাবে দমন-পীড়নকারী এমন সব একনায়ক কেন্দ্রিক বা নির্বাচনী স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্যই হলো যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা। এমন এক পরিস্থিতিতে অতি সাধারণ আয়ের, রোজগারের অনিশ্চয়তায় থাকা প্রান্তিক মানুষদের মোকাবিলা করতে হয় ভয়াবহ বৈষম্যমূলক আর্থ-সামাজিক অবস্থাকে। তাই উপযুক্ত রোজগারের দাবীতে, সংবেদনশীল প্রশানিক ব্যবস্থার দাবীতে, জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের সুরাহার দাবীতে তাঁরা বার বার পথের দখল নিয়েছেন। এইসব সমসাময়িক অত্যন্ত জটিল বিষয়গুলোতেও কীভাবে অহিংস প্রতিরোধের কৌশল রাজনৈতিক পরিবর্তন সাধন করতে পারে তাও দেখা যাচ্ছে। কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন দেশে, মতাদর্শভিত্তিক দলীয় কাঠামোর বাইরে, গণতন্ত্রপ্রেমী জন-আন্দোলনগুলো সংগঠিতভাবে তীব্র জন-অসন্তোষ প্রকাশ এবং স্বৈরাচারী সরকার পতনের লক্ষ্যে অহিংস রাজনীতিকেই অন্যতম পদ্ধতি হিসেবে বেছে নিয়েছে। বামপন্থী তাত্ত্বিক, ইরানী-আমেরিকান অধ্যাপক আসেফ বায়াত রাজনৈতিক দলহীন, অথচ সুসংগঠিত এই আন্দোলনকে অভিহিত করেছেন ‘সামাজিক অ-আন্দোলন’ (Social Non-movement) নামে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এই ‘অ-আন্দোলন’গুলো মূলত অতীব কষ্টসাধ্য দৈনন্দিন জীবনযাপনেরই ফসল, যার মাধ্যমে ‘অসংখ্য সাধারণ মানুষের বিচ্ছিন্ন অথচ সমধর্মী কর্মকাণ্ড ব্যাপক সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা ঘটায়, যদিও এই কর্মকাণ্ডগুলো খুব কম ক্ষেত্রেই কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ কিংবা স্বীকৃত নেতৃত্ব ও সংগঠনের দ্বারা পরিচালিত হয়’(Life as Politics: How Ordinary People Change the Middle East, Asef Bayat, 2010)।
বর্তমান সময়ে, এইসব গণ আন্দোলনগুলো গড়ে তোলায় মুখ্য ভূমিকা নিয়েছেন নবীন প্রজন্মের মানুষেরা। তাঁদের ভাবনা থেকে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, দমনের প্রতিরোধে রুখে দাঁড়ানো এক অনন্য ফর্মে পরিচালিত হয়েছে। নৈতিক ও কাঠামোগত বিষয়ে সমালোচনার ক্ষেত্রে তরুণরা সবসময়ই রসবোধকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে। প্রথাগত রাজনৈতিক পথ যখন রুদ্ধ হয়ে যেত, তখন আগের প্রজন্মের মানুষরা যেমন ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও কৌতুকের মাধ্যমে নিজেদের মতামত তুলে ধরত; ঠিক তেমনি ‘জেন জি’-র তরুণরাও ক্ষমতা কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সঙ্গীত, নৃত্য, মুখভঙ্গি ও অঙ্গভঙ্গির পাশাপাশি পুলিশ বা অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সাথে ঘটে যাওয়া মজার সব ঘটনার ছবি ব্যবহার করছে। যেগুলো অনেক সময়েই আগের প্রজন্মের মানুষদের সহনশীলতার মধ্যে থাকেনি। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সংকেত দেওয়ার প্রচেষ্টার সাথে মজাদার অঙ্গভঙ্গি, তামাশা, ব্যঙ্গ এই তরুণদের বিদ্রোহী সত্তাকেই প্রকাশ করে। নিয়ন্ত্রিত জনপরিসরে এগুলো অবাধ্যতা, ব্যঙ্গাত্মক এবং সেই সঙ্গে আনন্দেরও সঞ্চার করে। এমন সব মূল্যবোধকে স্বৈরাচারী সরকারগুলো প্রায়শই দমন করতে চায়, কারণ এগুলো তাদের কঠোর শাসনের সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করে তারা। এটা যথেষ্টই আশ্চর্যের, নিপীড়নের সামনে আন্দোলনকারীরা পালিয়ে না গিয়ে ঘুরে দাঁড়ান, সহিংসতার বিরুদ্ধে পাল্টা সহিংসতায় উত্তর দেওয়ার বদলে বিদ্রুপ করেন রাষ্ট্রের হিংস্রতাকে। তরুণদের এই অভূতপূর্ব, রাজনৈতিক দল নিরপেক্ষভাবে গণ-জাগরণের পাশাপাশি, এসব আন্দোলনকে একসূত্রে বেঁধেছে একটি সাধারণ বিষয় আর তা হলো উপহাস, কৌতুকের মাধ্যমে ক্ষমতাকে চ্যালঞ্জ করা আর একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হল, সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, অহিংস পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া।
গত বছর মরক্কোতে ‘জেন জি’-দের ‘২১২ আন্দোলন’-এর সময় একটি সাধারণ দৃশ্য ছিল গ্রেপ্তারের মুখেও তরুণদের এক ধরনের নীরব বা শান্ত অবাধ্যতা, যেমন আটক হওয়ার মুহূর্তে ক্যামেরার সামনে শান্তির প্রতীক (peace sign) দেখানো কিংবা হাসিমুখে পোজ দেওয়া। ‘মরক্কান ইয়ুথ ভয়েস’-এর মতো বিকেন্দ্রীভূত ও বেনামী গোষ্ঠীগুলোর আয়োজনে এই বিক্ষোভগুলো সংঘটিত হয়। এতে সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উল্লেখযোগ্য উন্নতির দাবি জানানো হয়েছিল। আবার, কর বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কেনিয়ায় ‘জেন জি’ আন্দোলনের সময় এমন কিছু ভিডিওতে দেখা যায় তরুণ কেনিয়ানরা সশস্ত্র দাঙ্গা-বিরোধী পুলিশের সামনে তাঁরা নাচছেন। অন্য একটি ভিডিওতে, রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা দুই পুলিশকর্মীর সামনে এক তরুণীকে নাচতে ও ‘টয়ার্ক’ (twerk) করতে দেখা দেখা গেছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে পরেছিলেন পরিস্থিতি সামাল দিতে। নাচ, হাসি এবং আনন্দ-ফুর্তি স্বৈরাচারী শাসনের আবরণকে কাঁপিয়ে দেয়; কারণ এর মাধ্যমে রাষ্ট্রনেতাদের ভুল অগ্রাধিকার এবং তাদের নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতাগুলো উন্মোচিত হয়। অনেক ক্ষেত্রেই, নাগরিক কর্মকাণ্ড ও হাস্যরসের এই মিথস্ক্রিয়াগুলো গণ-আন্দোলনের আগে বা তার পাশাপাশি দেখা যায়। পেরু ও ফিলিপিন্সে দুর্নীতিবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের সময়, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা রাষ্ট্রপ্রধান ও তাঁদের ঘনিষ্ঠ মহলের দামি গয়না, বিলাসবহুল গাড়ি ও অঢেল সম্পত্তির ছবি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। প্রায়শই এই ছবিগুলোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চরম দুরবস্থা ও দারিদ্র্যের ছবি তুলে ধরা হতো, যেমন ফিলিপিন্সে সাধারণ মানুষের ভয়াবহ বন্যার সাথে লড়াইয়ের দৃশ্য, যা মোকাবিলায় দেশটির নেতারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যর্থ হয়েছেন। ‘জেন জি’ বা বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা এই ধরনের অসামঞ্জস্য বা অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরতে রসবোধকে হাতিয়ার করেন। আলবেনিয়ার সরকার, সংরক্ষিত প্রাকৃতিক এলাকায় (Zvernec, Vjosa-Narta) ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে ১.৪ বিলিয়ন ডলারের একটি বিলাসবহুল রিসর্ট তৈরির জন্য চুক্তি করেছে। বিশাল আয়তনের এই প্রকল্পটির জন্য পরিবেশের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটার আশঙ্কা রয়েছে, যা ইউরোপের বন্য নদী-বদ্বীপের হাজার হাজার প্রজাতির প্রাণ ও প্রকৃতিকে বিপন্ন করে তুলবে; এর বিরোধিতায় সে দেশের হাজার হাজার মানুষ, ব্যাপক শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সমাবেশ করে চলেছেন নিয়মিত, যেটি ‘ফ্লেমিঙ্গো বিপ্লব’ বলে পরিচিত হয়েছে। গত বছর নভেম্বরে, মেক্সিকোতে ‘জেন জি’-র নেতৃত্বে আয়োজিত বিক্ষোভের আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত বিভিন্ন বিষয়বস্তুতে তরুণরা তাঁদের নিজেদের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে আগের প্রজন্মের পরিস্থিতির ব্যঙ্গাত্মক তুলনা করেছিলেন; তারা নিজেদের জীবনের অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদী চাকরির সুযোগের অভাবকে উপহাসের ছলে তুলে ধরেছিলেন। এই ধরনের ভিডিওগুলো প্রগতি, উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনের সেই আদর্শগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে, যে আদর্শগুলোর দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর ধরে কর্পোরেট মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে শ্রমজীবী মানুষকে নিংড়ে নেওয়া হয়েছে। মেক্সিকান সংস্কৃতিতে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মাধ্যম হিসেবে রসবোধকে কাজে লাগানোর যে দীর্ঘদিনের রীতি রয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করেই তারা পুঁজিবাদী আদর্শের সাথে তরুণদের বাস্তব অভিজ্ঞতার এই বৈপরীত্যকে তুলে ধরে। নেপালে ‘জেন জি’-র আন্দোলনের সময়কার একটি টিকটক ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা আন্তর্জালের মাধ্যমে Uno খেলার জন্য বিরতি নিচ্ছেন এবং তাঁদের চারপাশে থাকা জনতা হাসছে ও উল্লাস করছে। অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, নেপালি তরুণ বিক্ষোভকারীরা সরকারি ভবনের সামনে নাচছেন, ট্রাক্টর চালাচ্ছেন কিংবা বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছেন আর তার পটভূমিতে বাজছে টেইলর সুইফটের গান ‘শেক ইট অফ’ (Shake It Off); প্রথাগত বিক্ষোভের সেই স্লোগান ও মিছিলের পরিবেশের সাথে যা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। এই ধরনের বিষয়বস্তু বিক্ষোভ এবং সামাজিক পরিবর্তনকে আনন্দদায়ক ও আকর্ষণীয় করে তোলে। রাজনীতি তখন আনন্দ ও তামাশার বিষয় হয়ে ওঠে। নাৎসি আমলে ফ্যাসিবাদী সামরিক-ধাঁচের শৃঙ্খলাকে তরুণদের উদ্দাম ‘সুইং ড্যান্স’-এর মাধ্যমে উপহাস করার মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
বিগত কয়েক বছরের বিক্ষোভগুলো স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে, তথাকথিত উন্নয়নের আড়ালে সমাজের অভ্যন্তরের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্থবির চাকরির বাজার এবং উচ্চতর ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটানো, এসবই তথাকথিত ‘অগ্রগতি’র সেই ত্রুটিপূর্ণ বয়ানের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। পুঁজিবাদী অন্তহীন মুনাফার জন্য জলবায়ু পরিবর্তন, বর্ণবাদী, জাতিগত বৈষম্য এবং অন্তহীন সংঘাতের বৈশ্বিক প্রভাব সেই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেই সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় যাঁরা এসবের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী। প্রযুক্তির অসীম অগ্রগতি হয়ে চলেছে, অথচ, তাঁরাই আবার প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সুফল থেকে বঞ্চিত। বরং প্রযুক্তি স্বৈরতন্ত্রকেই আরও শক্তিশালী করে তুলেছে, কারণ তরুণরা দেখছে কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ও মেসেজিং অ্যাপগুলো গণতান্ত্রিক অধিকারের ক্ষয় এবং পুলিশি রাষ্ট্রের বিস্তারে সহায়তা করছে।
এদেশেও, ক্রম-বিলীয়মান রোজগারের সম্ভাবনা, আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা সাধারণ মানুষের উপর যে সীমাহীন নির্যাতন নামিয়ে এনে চলেছে, তা আমরা অনুভব করে চলেছি প্রতি মুহূর্তে। বিশেষ এক বর্জনমূলক মতাদর্শের সচেতন প্রয়াসে দেশময় তীব্র ঘৃণা-বিদ্বেষ, অবিশ্বাসের বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছে। সঙ্কুচিত হয়ে চলেছে, সর্বজনীন ভোটাধিকার, নাগরিক অধিকার। দেশ এবং সরকার হয়েছে উঠেছে সমার্থক। সরকারের অগণতান্ত্রিক, সাধারণ মানুষের পক্ষে ক্ষতিকর সিদ্ধান্তের আপত্তি বা নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোনও প্রতিবাদ সংজ্ঞায়িত হয়েছে দেশ-বিরোধীতায়। আদিবাসী, দলিত, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন হয়ে চলেছে প্রত্যহ। দেশ জুড়ে সৃষ্টি করা হয়েছে তীব্র আতঙ্কের পরিবেশ। অপর পক্ষে, প্রশাসন হয়ে উঠেছে গভীর ক্ষমতান্ধ, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অসংবেদনশীল। দেশের নিম্নবিত্ত, প্রান্তিক, মানুষের দৈনিক আহার জোটানোই হয়ে উঠেছে দুঃসাধ্য। সরকারকে প্রশ্ন করা, এই বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশে, দেশদ্রোহীতার নামান্তর। অর্থের বিনিময়ে প্রকৃতি ধ্বংস হয়ে চলেছে। দুর্বিষহ পরিস্থিতির বিরুদ্ধে মানুষ যখনই প্রতিবাদ করেছে, সামিল হয়েছে, এমনকি রাজনৈতিক দল নিরপেক্ষভাবে হলেও, রাষ্ট্র ক্ষমতা সে অসন্তোষকে নানান ফ্রেমে নামাঙ্কিত করেছে, প্রতিবাদীদের কয়েদ করেছে, নামিয়ে এনেছে নৃশংস নির্যাতন। কিন্তু, তবুও, মানুষ একের পর এক প্রতিবাদে সামিল হয়েছে, পথের দখল নিয়েছে বার বার। কখনও তা হয়েছে অনৈতিক, বেআইনি কৃষি আইনের বিরুদ্ধে, কখনও বেনাগরিক করে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় ছকের বিরুদ্ধে, জল-জমি-জঙ্গল-খনি বেচে দেওয়ার বিরুদ্ধে। আকস্মিক অতিমারীর অজুহাতে, মানুষকে ঘরবন্দী করার রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সিএএ-নো এনআরসি আন্দোলনের অকালমৃত্যু হলেও, ২০২০-২১ সময়কালে দিল্লিতে, প্রায় দেড় বছরব্যাপী কৃষকদের সমবেত অহিংস ধর্না, বিক্ষোভের সামনে নত হয়ে তাঁদের মুখ্য দাবিকে মান্যতা দিয়ে, প্রবল প্রতাপশালী সরকার প্রত্যাহার করেছে কৃষক স্বার্থ বিরোধী আইন তিনটি। মধ্য ভারতের আদিবাসী অধ্যুষিত অরণ্যভুমির বিস্তীর্ণ অঞ্চল, হাসদেও আরন্দ অরণ্য, পাতালগড়ি, ওড়িশার রায়গড়ার কুটামাল ও তিজমালি পাহাড় খননের বিরুদ্ধে, আরবল্লির বিপুল মালভূমি ধ্বংসের বিরুদ্ধে, কেন-বেতোয়া নদী সংযুক্তিকরণের বিরুদ্ধে, প্রকৃতি ধ্বংসের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের নাছোড় লড়াই চলেছে দেশময়। চলমান গণ-আন্দোলনগুলো প্রাণবন্ত এবং নিত্য-নতুন সৃষ্টিশীল উপায়ে গড়ে তুলছে হার না-মানা শান্তিপূর্ণ, অহিংস প্রতিরোধ।
অতি সম্প্রতি, ইউনিয়ন সরকার পরিচালিত পরীক্ষা নিয়ামক প্রশাসনের বিরুদ্ধে, ক্রম সঙ্কুচিত, সরকারী চাকরীতে নিয়োগের দুর্নীতিপূর্ণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবং ক্রম বিলীয়মান রোজগারের সম্ভাবনার প্রতি তীব্র ক্ষোভে, নবীন প্রজন্ম রুখে দাঁড়িয়ে সামিল হয়েছিল এক নাছোড় গণ-আন্দোলনে, আর তা গড়ে উঠেছিল কোনও বিরোধী রাজনৈতিক দলের তোয়াক্কা না করেই সদ্য গঠিত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র উদ্যোগে। তার বহু বিবরণ আমরা পড়েছি আর দেখেছি, আশ্চর্যজনকভাবে, এ আন্দোলন আস্থা রেখেছে গান্ধির অহিংস নীতির উপরে। এমনকি যে প্রজন্মটির অধিকাংশই গান্ধী, ভগত সিং, নেতাজি বা স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে হয়তো তেমনভাবে পরিচিতও হন নি, অথচ, তাঁদের আন্দোলনের ধাঁচে দেখা গেছে অহিংস সত্যাগ্রহের স্পষ্ট প্রভাব। সশস্ত্র রাষ্ট্র ক্ষমতার নৃশংস নিপীড়নের উত্তরে কখনই তাঁরা পাল্টা হিংসার পথ নেন নি। অপরপক্ষে, অত্যাচারের মুখে পালিয়ে যাওয়া দুরস্থান, বার বার ফিরে এসেছেন অত্যাচারের মুখোমুখি হতে। তাঁরা অত্যাচারকে, রাষ্ট্রীয় স্বৈর-ক্ষমতাকে প্রশ্ন করেছেন উপহাস করার মধ্য দিয়ে। তীব্র ব্যঙ্গাত্মক পোষ্টারে মন্ত্রীকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন, ‘তাড়াতাড়ি পদত্যাগ কর, কাল আমায় বাড়ী ফিরতে হবে’, কখনও বলেছেন, ‘কোনও একদিন শিক্ষা দফতর পদত্যাগ করলেও, মন্ত্রী থেকে যাবে’, কখন পুলিশকে বলেছেন, ‘খুব গরম লাগছে, একটু জল-কামানটা চালাও’, আবার সশস্ত্র পুলিশকর্মীদের চকোলেট, ফুল উপহার এগিয়ে দিয়েছেন। নিপীড়নকে মোকাবিলায় তাঁদের নাছোড়বান্দা ভঙ্গীতে মনে হয়েছে, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘ভয় না পেলে ভয় দেখাবে কাকে’ । দেখেছি, একদা সশস্ত্র অভ্যুত্থানে আস্থা রাখা এবং পরে সে পথ পরিহার করা বাম মতাদর্শের ছাত্র-যুবরা এই আন্দোলনের অন্যতম অংশ ছিলেন। স্বৈর-ক্ষমতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে, গান্ধির পথে অহিংস আন্দোলন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবীদের অনুসরণে অনশনকে এক জোরালো হাতিয়ার হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন তাঁরা। মনে পড়ে, অগ্রগণ্য কমিউনিস্ট বিপ্লবী হো চি মিনের দ্বিধাহীন উচ্চারন ছিল, ‘আমি এবং অন্যরা হয়তো বিপ্লবী, কিন্তু কম-বেশি আমরা সবাই মহাত্মা গান্ধীরই শিষ্য’।
নবীন প্রজন্মের এই আন্দোলনে সবচেয়ে লক্ষণীয়, আন্দোলনকারীরা নারী-পুরুষ, সচ্ছল-দরিদ্র, উচ্চশিক্ষিত-নিম্নশিক্ষিত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক সঙ্গে থেকেছেন, সংগঠিতভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন, উদযাপন করেছেন আন্দোলনের সময়টুকু। দেশের বিশেষত, উত্তর-ভারতের মতো জাত-বর্ণ বিভাজিত, দলিত ও নারী-দমিত সমাজের আগল ভাঙা এ আন্দোলন এক নীরব বিপ্লব সূচিত করেছে। একাধিক দেশের দুর্নীতি-পরায়ণ, নিপীড়ক রাষ্ট্রনায়কদের মতো এদেশের শাসকেরাও তরুণদের এই অভূতপূর্ব গণ-জাগরণের মোকাবিলা করতে সমস্যায় পড়েছেন। উপহাসের মাধ্যমে তাঁরা দেশের স্বৈরাচারী রাষ্ট্র-নায়কের সযত্ন রচিত ভাবমূর্তিকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন।
এসবই গভীর অর্থবহ। আগামী দিনে এনিয়ে গবেষণা হবে বিস্তর। নিঃসন্দেহে, নব-প্রজন্ম যে, তাঁদের আন্দোলনে গান্ধির অহিংস পথকেই বেছে নিয়েছেন, তা নিশ্চিতভাবে বলার সময় হয়তো আসেনি। তবে এই মুহূর্তে আমাদের মনে হচ্ছে, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গান্ধির অহিংস প্রতিরোধের গণ-আন্দোলন ফিরে আসছে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে, সেই সঙ্গে জোরালো হয়েছে অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে তাঁর ক্রুসেড, অন্য অবয়বে, ভিন্ন এক নতুন রূপে।
বিশ্ব জুড়ে ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের লক্ষ্য, পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদের উপর অন্তহীন লালসা, অবাধ শোষণ, নাগরিক নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য, সহিংসতা, বিদ্বেষ– এই সবই শান্তিপূর্ণ পৃথিবীর স্বপ্নকে অসম্ভব করে দেয়। লোভ, শোষণ, ক্ষমতাসীনের দমন-পীড়ন, হিংস্রতা, ঘৃণা-বিদ্বেষের বাতাবরণ থেকে বেরিয়ে শেষ পর্যন্ত আমাদের একটি ন্যায়, সাম্য, ভালবাসার ভয়মুক্ত সমাজ, মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকারসহ, বহুমতের, প্রকৃত প্রতিনিধিত্বমূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের এক কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ে তোলাই তো প্রধানতম লক্ষ্য, যার ভিত্তি হবে শান্তি, সুস্থিতি, প্রাণবন্ত প্রকৃতি, সৃষ্টিশীল জীবন, সৌহার্দ্যময় সমাজ। অহিংস সত্যাগ্রহ, প্রতিরোধ আন্দোলনের অভ্যন্তরে যে অভাবনীয় এবং বিপুল শক্তি রয়েছে, তা হয়তো এখনও পুরোপুরি ব্যবহার করা যায় নি। যার সঠিক প্রয়োগে পৃথিবী হয়ে উঠতে পারে এক মর্যাদাপূর্ণ, বহুমতের, বহু সংস্কৃতির গণতান্ত্রিক অঙ্গন। মার্টিন লুথার কিং তো কবেই বলে গেছেন, ‘সুপরিকল্পিত ও গঠনমূলক অহিংস প্রতিরোধ ব্যবস্থা এমনকি সর্বগ্রাসী বা একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মধ্যেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে’।
জাতিসঙ্ঘের তৃতীয় মহাসচিব (১৯৬১ - ১৯৭১) ইউ. থান্ট ছিলেন বর্মার (অধুনা মিয়ানমার) মানুষ। বৌদ্ধ পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠার কারণে সহিংসতার প্রতি ছিল তাঁর গভীর বিরাগ। গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর প্রতি, আস্থা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর অহিংস প্রতিরোধের পদ্ধতির উপরে। ওঁর সময়কালের ৩৬ বছর পরে, ২০০৭ সালে, জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদ, গান্ধির জন্মতিথি, ২রা অক্টোবরকে ‘আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তিনি বলেছিলেন, ‘সময় প্রমাণ করবে অহিংস আন্দোলনের গুরুত্ব, শান্তিপূর্ণ উপায়ে স্বৈরাচারী রাষ্ট্র-ক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য, শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলার এটি একটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠবে’। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, একদিন মহাত্মার আদর্শ ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়বে, কারণ তাঁর নীতিসমূহের সর্বজনীন প্রয়োগযোগ্যতা ও চিরন্তন বৈধতা রয়েছে। স্বৈরাচারী ক্ষমতা, একনায়কের হিংস্রতার বিরুদ্ধে পৃথিবীর নানান কোণে সাধারণ মানুষের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে অহিংস সত্যাগ্রহ, আর তা ফিরে আসছে নতুন রূপে।