ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনী দেশের ১২টি রাজ্যে হলেও আসামে কিন্তু সামারি রিভিশন বা SR প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে অন্যান্য সমস্ত রাজ্যে বহু মানুষকে বাদ দেওয়া হলেও আসামে কিন্তু বাদ যাওয়া মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। কিন্তু বিজেপিকে তো জিততে হবে এবং সেটা যেনতেন প্রকারে, তাই ঐ রাজ্যে ব্যবহার করা শুরু হয়েছে ফর্ম ৭, যার উদ্দেশ্যই হলো, যে কেউ, কোনও একজন নির্দিষ্ট ভোটারের নামে অভিযোগ জমা করতে পারবেন যে তাঁর মনে হচ্ছে ঐ ভোটার এই দেশের নাগরিক নন। নির্বাচন কমিশন সেই অভিযোগের ভিত্তিতে বুথ স্তরের কর্মীদের বলবে অভিযোগের সত্যতা খুঁজে বের করতে। সুমনা রহমান চৌধুরী এবং সেখানকার কিছু বিএলও ফর্ম ৭ এর অভিযোগের সারবত্তা খুজতে গিয়ে দেখতে পেয়েছেন এমন অনেক আবেদন জমা পড়েছে, যেখানে এক ব্যক্তি নিজেই নিজের বিরুদ্ধে নাকি আবেদন করেছেন যে তাঁর নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হোক। সেই আবেদন পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা গেছে অভিযোগকারী বলেছেন, তাঁর স্বাক্ষর নকল করে বা বড় হাতে লিখে কেউ এই অভিযোগ করেছেন। আসামের বিএলও’র এই ভিডিও দ্রুত সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরে, নির্বাচন কমিশন সেই বিষয়ে তদন্ত না করে, ঐ সংশ্লিষ্ট বিএলওকেই এখন চাকরি থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও আসামের মুখমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মাকে সরাসরি বলতে দেখা গেছে যে তিনি মুসলমানদের ভোট কেটে ভোট চুরির চেষ্টা করছেন, তবুও করিমগঞ্জের জেলাশাসক, যিনি আবার নির্বাচনী আধিকারিকও বটে, বিএলও সুমনা চৌধুরীকেই বেছে নিয়েছেন দোষী হিসেবে।
শুধু আসাম নয় সারা দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর আসছে বিভিন্ন রাজ্যে সংখ্যালঘু ও মহিলা ভোটারদের নাম কাটার জন্য বিএলও’দের ধমকানো হচ্ছে। রাজস্থানের এক বিএলও তো সরাসরি বলেছেন, তাঁকে যদি এই রকম চাপ দেওয়া হয়, তাহলে তিনি আত্মহত্যা করবেন। আসামে শুধু তালিকা সংশোধনী চলছে, তাতেই এই অভিযোগ কিন্তু অন্যান্য বহু রাজ্য যা মূলত বিজেপি শাসিত সেখানকার বহু ঘটনা সামনে আসছে যা দেখিয়ে দেয় বিজেপি নির্বাচনে জেতার জন্য যে কোনও রকম পদ্ধতি নিতে পারে। উত্তরপ্রদেশ বা গুজরাট যেখানে দীর্ঘদিনের বিজেপি’র শাসন চলছে, সেখানকার দলিত, মহিলা এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম কাটার উদ্দেশ্যে যথেচ্ছভাবে এই ফর্ম ৭ এর অপব্যবহার করা হচ্ছে। একমাত্র এই বাংলাতেই রাজ্যের শাসকদলের নীচুতলার কর্মীদের তৎপড়তায় কিছু হলেও ফর্ম ৭ জমা দেওয়া আটকানো গেছে। বেশ কিছু জায়গায় সংঘর্ষও হয়েছে, তাও কোথাও কোথাও এইরকম অভিযোগ বিজেপি’র বিএলএরা জমা করেছে কি না, তা এই মূহুর্তে বোঝা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে আবার অনলাইনেও এইরকম কত ফর্ম ৭ জমা পড়েছে, তার সম্পূর্ণ হিসেব দেখা প্রয়োজন।
বোঝাই যাচ্ছে এই ফর্ম ৭ ব্যবহার করে বিজেপি যে বিরোধী ভোট কাটতে চাইছে তা এখন দিনের আলোর মত পরিষ্কার। এই অভিযোগই লোকসভার বিরোধী দলনেতা কর্ণাটকের অলিন্দে বিধানসভার উদাহরণ দেওয়ার সময়ে সাংবাদিক সম্মেলনে করেছিলেন। প্রায় ৬০০০ ভোটারের নাম অনলাইনে মুছে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বিভিন্ন ভুয়ো অ্যাকাউন্ট থেকে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে ঢুকে। যদিও তাঁরা পুরো ৬০০০ জনের নাম মুছতে সক্ষম হয়নি, কিন্তু প্রায় ২৫০০ ভোটারের নাম তাঁরা মুছে দিতে পেরেছিল, যার অধিকাংশই দলিত এবং সংখ্যালঘু। কর্ণাটকের আইটি মন্ত্রী প্রিয়ঙ্ক খাড়গে এই একই অভিযোগ করেছেন যে ২০২৩ সালের মে মাসে কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি এই কাজটিই করে বিরোধী ভোটার বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছে। রাহুল গান্ধী যেমন সরাসরি অভিযোগ করেছিলেন, যে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সমস্ত কিছু জেনে এই ভোট চোরদের আড়াল করছেন, প্রিয়ঙ্ক খাড়গে ঐ সময়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন কে এই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার রেকর্ডগুলো অনুমোদন করেছে? ওটিপি অডিট ট্রেইল কোথায়? বাদ দেওয়া ভোটারদের কবে ফিরিয়ে আনা হবে? নির্বাচন কমিশন কেন সিআইডি-র সাথে সহযোগিতা করতে অস্বীকার করছে? নির্বাচন কমিশন কাকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে?
বিষয়টা সম্পর্কে আরো একটু বিশদে জানা দরকার, কেন বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এই ফর্ম ৭ নিয়ে এত অভিযোগ করছেন? ২০২৩ সালে যখন ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) চুপিসারে ফর্ম ৭ সংক্রান্ত নিয়মাবলীতে পরিবর্তন আনে, তখন কেউ তা লক্ষ্য করেছে বলে মনে হয়নি। ফর্ম ৭ একজন ভোটারকে নির্বাচনী তালিকায় অন্য কোনো ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তিতে আপত্তি জানাতে এবং তাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ করার সুযোগ দেয়। এর আগে, শুধুমাত্র প্রতিবেশী বা একই ভোটকেন্দ্রে নিবন্ধিত ভোটাররাই ফর্ম ৭ জমা দেওয়ার যোগ্য ছিলেন। ২০২৩ সালে এই নিয়মটি পরিবর্তন করা হয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বিধানসভা কেন্দ্রের যেকোনো বুথে নিবন্ধিত যেকোনো ভোটার ফর্ম ৭ জমা দিতে পারবেন। আরেকটি বড় পরিবর্তন ছিল প্রতি আবেদনকারীকে সীমাহীন সংখ্যক আবেদন জমা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া। এই যে পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছিল তাকে কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে চ্যালেঞ্জ করা হয়নি এবং উভয় পরিবর্তনই ২০২৩ সালের মধ্যভাগ থেকে কার্যকর রয়েছে।
আসামে চলমান বিশেষ সংশোধন (এসআর) এবং ১২টি রাজ্য/কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এ যেমনটা স্পষ্ট হয়েছে, প্রায় সমস্ত আপত্তিই মুসলিম, দলিত বা আদিবাসী ভোটারদের বিরুদ্ধে তোলা হয়েছে এবং এর মধ্যে অনেকগুলোই সন্দেহাতীত মুসলিম ভোটারদের নাম ও এপিক (ভোটারের ছবিসহ পরিচয়পত্র) নম্বর ব্যবহার করে দাখিল করা হয়েছে। ২৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ সালে কংগ্রেসের সাংগঠনিক সাধারণ সম্পাদক কে.সি. ভেনুগোপাল বিরোধী দলকে সমর্থনকারী বলে সন্দেহভাজন ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য বিজেপির দ্বারা ‘ফর্ম ৭-এর ব্যাপক অপব্যবহারের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ভেনুগোপাল তাঁর চিঠিতে এই অপব্যবহারকে সুপরিকল্পিত, পদ্ধতিগত এবং ব্যাপক বলে অভিহিত করেন এবং অভিযোগ করেন যে বিজেপি তার কর্মীদের বিশেষ করে নির্বাচনমুখী রাজ্যগুলিতে বিপুল সংখ্যায় আপত্তি জমা দিতে বলেছে। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এই কেন্দ্রীভূত জালিয়াতির একটি মূল উপাদান হলো, বৈধ ভোটারদের কাছে আপত্তি সম্পর্কে অবহিত করার নোটিশগুলো যেন কখনোই তাদের কাছে না পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা। ভেনুগোপাল উল্লেখ করেন যে, এই জালিয়াতিটি কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কেরালা, গুজরাট, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ছত্তিশগড় এবং আসামের ক্ষেত্রে প্রায় একই ধরনের একটি চিত্র তুলে ধরে। এর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো ফর্ম ৭-এর ব্যাপক মুদ্রণ, যেখানে অস্পষ্ট নাম ও স্বাক্ষর, এলোমেলো বা অবৈধ ফোন নম্বর এবং অন্য বৈধ ভোটারদের এপিক নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে।
গুজরাটে প্রজাতন্ত্র দিবসে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত জুনাগড়ের লোকশিল্পী হাজী রামকাদু ঘটনাক্রমে জানতে পারেন যে তার বিরুদ্ধে একটি আপত্তি দাখিল করা হয়েছে। জুনাগড়ে জন্মগ্রহণকারী এই শিল্পী ৭০ বছর ধরে একই বাড়িতে বসবাস করছেন, রাজ্যে তিনি সুপরিচিত এবং গোশালার জন্য তহবিল সংগ্রহের ২৫,০০০ অনুষ্ঠানে বিনামূল্যে পরিবেশনা করার কৃতিত্ব তার রয়েছে। কিন্তু এতকিছুর পরেও বিজেপি কাউন্সিলর সঞ্জয় মানওয়ার রামকাডুর বিরুদ্ধে ফর্ম ৭-এর মাধ্যমে আপত্তি জানাতে পিছপা হননি। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে এবং ক্ষোভ বাড়তে থাকলে, মনওয়ার লজ্জিতভাবে বলেন যে ওই শিল্পীর আধারে নাম ছিল মীর হাজী কাসাম, অথচ তার ভোটার আইডি কার্ডে তার নাম ছিল হাজী রাঠোর।
সরকারি নথিপত্রের এই অতি সাধারণ অসংগতিগুলোকেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিবাহিত নারীরা তাদের নামের পরিবর্তনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বিশেষভাবে সমস্যায় পড়ছেন। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে, যখন সালমা সর্দার এবং সায়েদা মোল্লা নাম পরিবর্তন করে সালমা এবং সায়েদা নস্কর হন, তখন আপত্তি তোলা হয়েছে এবং বলা হয়েছে এগুলৈ নাকি ‘লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ বা যৌক্তিক অসংগতি। মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেস অভিযোগ করেছে যে, ভিন্দ, সিংরৌলি এবং সেহোর জেলায় প্রতিটি বুথের জন্য বিজেপি কর্মীরা শত শত আপত্তি জমা দিচ্ছেন। নির্বাচন কমিশন যুক্তি দিয়েছে যে, ফর্ম ৭ জমা দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাম বাদ পড়ে যায় না, মিথ্যা অজুহাতে ফর্ম ৭-এর মাধ্যমে আপত্তি জানানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং মিথ্যা কারণে যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তারা আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন। কিন্তু একজন ব্যক্তি ভোটার কি পারবেন এই লড়াইটা লড়তে? তিনি কি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে গিয়ে বলতে পারবেন, যে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ একেবারেই সত্যি নয়?
যে সুমনা রহমান চৌধুরীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে, তিনি টেলিফোনে একটি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন “অভিযোগ করে বাদ দেওয়ার তালিকায় আমার প্রধান শিক্ষকের নাম ছিল, যাঁর কাছে আমি প্রতিদিন রিপোর্ট করি। সেখানে আমার ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকদের নামও ছিল, যাঁদের আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। আমি কীভাবে তাঁদের শুনানির জন্য আসতে বলতে পারতাম? আর কীসের ভিত্তিতে? যদি তাঁরা আমার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করতেন, তাহলে কী হতো?” তাঁর কথা অনুযায়ী, এই ধরনের ভুল করলে তো এমনিতেই তাঁর চাকরি যেত, তার থেকে ভুলকে ভুল বলাটা বেশী জরুরি। তার থেকে মেরুদন্ড সোজা করে সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলা ভাল।
মনে পড়ে যাচ্ছে নাজি জার্মানির কথা। লাখ লাখ মানুষের সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ইহুদী গণহত্যা সংঘটিত হতে পারত না। কিছু লোক বুঝতে পেরেছিল যে ইহুদিদের ওপর নির্যাতন ও হত্যার মাধ্যমে তারা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হতে পারে। তারা নির্বাসিত ও নিহত ইহুদিদের সম্পত্তি বা বাড়িঘর দখল করে নেয়। কেউ কেউ দেশত্যাগে বাধ্য হওয়া বা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো ইহুদিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের দখলে নেয়। অন্য কিছু লোক নাৎসি শাসনাকালে চাকরি খুঁজে পায়। এই চাকরিগুলো তাদের অর্থ, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং প্রভাব এনে দেয়। জার্মানি যেসব দেশ আক্রমণ করেছিল, সেসব দেশে অনেক সহযোগী তাদের নতুন শাসকদের সাহায্য করার মধ্যে নিজেদের সুবিধা দেখতে পায়। তারা তাদের ইহুদি প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে বেছে নেয়। সেই একইরকমের বিষয় এই ফর্ম ৭ ব্যবহার করে অভিযোগ, যেখানে অভিযোগকারী লেখেন, তাঁর মনে হচ্ছে একজন প্রতিবেশী ‘ভারতের নাগরিক নন’। ঠিক একই পদ্ধতি নেওয়া হয়েছিল আসামের নাগরিকপঞ্জীকরণের সময়ে। এই ধরনের বহু অভিযোগের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে বহু মানুষের নাম বাদ পড়ে। পরে ফরেনার্স ট্রাইবুনালে গিয়ে তাঁর নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হয়, নানান কাঠখড় পুড়িয়ে।
বিএলও সুমনা চৌধুরী সেই কাজটিই করেছেন যা তাঁর ঠিক মনে হয়েছে। তিনি নিজের কাছে সৎ থেকেছেন। এই লড়াইয়ের জন্য সারা দেশ সুমনা রহমান চৌধুরীকে মনে রাখবে। তাঁর চাকরি ফিরে পাওয়ার লড়াই চলবে এবং আমার বিশ্বাস একদিন তিনি জয়ী হবেন নিশ্চিত। তিনি হয়ে উঠেছেন আমাদের সবার স্বর, তিনি যেন হয়ে উঠেছেন আজকের আগস্ট ল্যান্ডমাইজার।
.