
ছবির প্রথম চিত্রে ললিতাসনে হংসবাহনা সরস্বতী। দ্বিতীয় চিত্রে ললিতাসনে মেষবাহনা সরস্বতী (সংরক্ষিত বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ)। তৃতীয় চিত্রে পদ্মাসনা সরস্বতী।
একসময় বাংলায় সরস্বতীর মূর্তি গড়ে পুজো হতো টোল বা পাঠশালায়। পণ্ডিত মশাইরা পুজোর দায়িত্ব পালন করতেন। সেকালের কলকাতায় গড়ামূর্তির পুজোতে ধুম লাগতো। কৃষ্ণনগরে ঘূর্ণি অঞ্চলের দেবী প্রতিমা জগদ্বিখ্যাত। প্রাচীনকালে ঋষিরা সরস্বতীর উপাসনা করতেন। যজ্ঞ করতেন। ঋগ্বেদে সরস্বতী ছিল নদীরূপা। দেবীরূপা ভাবেও সরস্বতীকে আমরা বিভিন্ন রূপে পাই। 'মাঘী শুক্লা' পঞ্চমীতে সরস্বতীর পুজো হয়। যার আরেক বিশেষ নাম - শ্রী পঞ্চমী। শ্রী অর্থে লক্ষ্মী। বলা হয় ঋগ্বেদে লক্ষ্মীর প্রয়োগ একবার মাত্র আছে। অর্থবেদে সৌভাগ্য বা মন্দ রমণীকে লক্ষ্মী বলা হয়েছে। শ্রীপঞ্চমী তিথিতে প্রাচীনকালে লক্ষ্মীর পুজো হতো। তাই এর আরেক নাম লক্ষ্মী পঞ্চমী।
এ সম্বন্ধে অনেকগুলো মতামত আছে। এরমধ্যে অন্যতম একটি হলো, সরস্বতী শ্রীকৃষ্ণকে পতিরূপে পেতে চান।
"পতি তমীশ্বরং কৃত্বা মোদস্ব সুচিরং সুখম"
কৃষ্ণ তখন বললেন, তাঁহাকে পাওয়া মানে বিষ্ণুকেই পাওয়া। যা কৃষ্ণের স্বরূপ। আর এই দিনটিতে মানুষ সরস্বতীর পুজো করবে। তাই মাঘী শুক্লা পঞ্চমী - শ্রীপঞ্চমী। শুধু আরাধনা নয়, মানুষ আপন করে নিয়েছে সরস্বতীকে বিদ্যা ও সঙ্গীতের দেবী হিসেবে।

বিষ্ণুর পাশে সরস্বতী, একাদশ শতাব্দী
মূর্তিতত্বে সরস্বতী বসে অথবা দাঁড়িয়ে থাকেন। পাল সেন যুগের বিষ্ণু মূর্তির পাশে কখনও তিনি দন্ডায়মান। তাঁর হাতে বীণা, আবার পদ্মহস্তেও দেবীকে দেখা যায়। বৌদ্ধশাস্ত্রে সরস্বতী আছেন। মথুরায় জৈনদের প্রাচীন নিদর্শনে সরস্বতীকে পাওয়া যায়। যার বাম হাতে একখানা পুঁথি। বৌদ্ধ - মূর্তি বজ্রসারদার হাতে অনেকসম় পুঁথি দেখা যায়।
শাস্ত্রমতে, সরস্বতী শ্বেতপদ্মাসনা। মূর্তি ভাস্কর্যে পদ্মাসীনা হলেও অনেকক্ষেত্রে তিনি ললিতাসনে আছেন। পৌরাণিক দেবীমূর্তির মধ্যে গজলক্ষ্মীকে ললিতাসনে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। যিনি সমুদ্রমন্থনকালে আবির্ভাব হন। ইন্দ্রের হারানো সম্পদ খুঁজে এনেছিলেন। ইন্দ্রের এক কন্যা ছিল। যার নাম দেবসেনা। এনার আবার লক্ষ্মী, ষষ্ঠী, আশা, সুখপ্রদা ইত্যাদি নাম রয়েছে। ইন্দ্র দেবসেনাকে রক্ষার জন্যে এক ভয়ানক দানবকে হত্যা করেন।

প্রথম ও দ্বিতীয় চিত্রে ললিতাসনে গজলক্ষ্মী। তৃতীয় চিত্রে পদ্মাসনা গজলক্ষ্মী।
প্রস্তরমূর্তিতে ললিতাসনে বসে দুই হস্তে বীণা বাদনরত অবস্থায় সরস্বতীকে দেখতে পাওয়া যায়। সঙ্গে স্থান পায় হংস। দেবী ব্রহ্মার শক্তি। যার প্রিয় বাহন হংস। সরস্বতীর সঙ্গে আমরা হংস বাহনকে দেখতে পাই।
একটি চমৎকার পুরাণের কাহিনী বর্ণিত রয়েছে। হংস ব্রহ্মারও বাহন। দেবী সরস্বতীরও বাহন। আর মানস - সরোবরের হংস প্রসিদ্ধ। ব্রহ্মার কল্পনা থেকে উৎপন্ন হয়েছে মানস - সরোবর। মানস অর্থ মন। তাই এই সরোবর ব্রহ্মার প্রিয় স্থান। এখানেই সরোবরে ঘুরে বেড়ায় শ্বেত শুভ্র হংসেরা। পুরাণে আছে, সরস্বতী মানস - সরোবর থেকে উৎপন্ন হয়েছে। সরোবরে সরস্বতী হংস রূপে অথবা হংসের ওপর উপবিষ্ট হয়ে থাকেন। এর থেকেই স্পষ্ট প্রস্তরমূর্তিতে সরস্বতীর সঙ্গে হংসের যোগসূত্র আছে। কালিদাসের মেঘদূতের বর্ণনায় মানস - সরোবরে হংসের কথা পাওয়া যায়।
আর্কিওলোজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা, স্বাধীন গবেষক ও প্রত্নতত্ত্ববিদ স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম সাহেবের অন্য একটি মত আছে। তিনি মনে করতেন, সরস্বতীর বাহন ময়ূর। তিনি জানান যে ভারতের বহু প্রাচীন মন্দির স্থাপত্যতে প্রবেশ পথের দুপাশে থাকেন গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতীর মূর্তি। গঙ্গার বাহন মকর। যমুনার কচ্ছপ ও সরস্বতীর ময়ূর। কারণ সরস্বতী নদীর তীরে একসময় নাকি প্রচুর ময়ূর ছিল। তাই দেবীর বাহনে ময়ূর পাখিটি এসেছে। আজও রাজপুত চিত্রে ময়ূর বাহন সরস্বতী দেখা যায়।
সরস্বতীকে বন্দনা বাঙালি সর্বাধিক করেন। স্কুল, কলেজ, অফিস, সরকারি দপ্তরে পুজো হয়। মাটির দোয়াত, খাগের কলম, চন্দন, তিলেখাজা, দই, মাখন, ধান, বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুল, আম্রমুকুল, ফল ফলাদি দিয়ে দেবীকে আবাহন করেন। সব মেনে প্রাণোন্মাদনায় পুজো পালন হয়। বিদ্যা ও জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সকল ভক্তগণের মনস্কামনা পূরণ করেন।
তথ্যসূত্র:
নীহাররঞ্জন রায়
শ্রী অমূল্যচরণ বিদ্যাভুষন