পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

সিট ও সিবিআই : একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ

  • 04 April, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 465 view(s)
  • লিখেছেন : দেবাশিস আইচ
ব্রিটিশ আমলের পুলিশ কমিশন (১৮৬০) মনে করত “পুলিশকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করা উচিত।“ স্বাধীনতা উত্তর যুগে সে প্রথার অবসান হবে এমনই প্রতিশ্রুতি ছিল। সে প্রতিশ্রুতি পালিত তো হয়ইনি যুগে যুগে পুলিশ রাজনৈতিক ভাবে আরও বেশি বেশি করে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখন তো সামরিক বাহিনীকেও রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহারের অপচেষ্টা চলছে।


বগটুই বিভৎসতার পর চক্রান্ত তত্ত্বকে সামনে এনেছিল রাজ্য সরকার। রাজ্যপালকে লেখা চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী তেমনই ইঙ্গিত করেছিলেন। বিধানসভায় বৃহত্তর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে বগটুই হত্যাকাণ্ডকে চিহ্নিত করেন পরিষদীয় মন্ত্রী পার্থ চচট্টোপাধ্যায়। আড়াই দিনের মাথায় এই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের তত্ত্বকেই শিলমোহর দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ইতিমধ্যেই অবশ্য সিট গঠিত হয়ে গিয়েছে। প্রশ্ন হল, স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এহেন মন্তব্য কি পুলিশি তদন্ত প্রভাবিত করতে পারে না? শুধুই কি মন্তব্য, ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দিলেন কাকে গ্রেফতার করতে হবে। এও কি তদন্তে প্রভাব বিস্তার নয়? ঘটনার প্রায় পাঁচ দিন পরও মুখ্যমন্ত্রী সেই ষড়যন্ত্র তত্ত্বেই স্থির হয়ে আছেন। এবং আঙুল তুলেছেন দেউচা-পাচামির আন্দোলনকারীদের দিকে। মুখ্যমন্ত্রী খেলাটা উন্নয়ন বনাম বিরোধী ষড়যন্ত্রে ঘুরিয়ে দিতে চাইছেন বলেই মনে করা হচ্ছে। লক্ষ্য দেউচা-পাচামির আদিবাসী ও অন্যান্য বাসিন্দাদের আন্দোলনের সমর্থক বাম দলগুলি এবং পরিবেশ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সংগঠনগুলি। হাই কোর্টের নির্দেশে সিট থেকে তদন্তের রাশ সিবিআই-এর হাতে গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সভা ডাকলে যে সরকার মুখ ফিরিয়ে থাকাটাই নিয়ম করে ফেলেছে, সেই তৃণমূলের সাংসদরা বিনা আমন্ত্রণেই অমিত শাহর দরবারে হাজিরা দিয়ে এসেছেন। আবার মুখ্যমন্ত্রী সিবিআই-কে একদিকে যেমন স্বাগত জানিয়েছেন তেমনি 'বেগতিক' দেখলে আন্দোলনের হুমকিও দিয়ে রেখেছেন। ওই নরমে গরমে খেলা বলা যায়। তদন্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা কি বলা যাবে?
এদিকে দুই পুরপিতা খুন, বগটুইয়ের পৈশাচিক বীভৎসতায় হারাতে বসেছে আনিস-কাণ্ড। সেও কম বীভৎস নয়। আনিস হত্যার প্রায় ৬০ ঘণ্টা পর মুখ খুলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সিট ঘোষিত হয়েছিল। বড় মুখ করে ডিজি মনোজ মালব্য বলেছিলেন, ১৫ দিনের মধ্যে খুনের কিনারা হবে। অনেক ১৫ দিন পার হয়েছে এখন পুলিশ চাইছে আনিসের বৃদ্ধ, অসুস্থ পিতা সালেম আলিকে দিল্লি নিয়ে গিয়ে ‘লাই ডিটেক্টর’ বা ‘পলিগ্রাফ’ পরীক্ষায় বসাবে। অত্যন্ত বিতর্কিত, দেশ-বিদেশের বহু মনস্তত্ববিদ যাকে ‘সিউডোসায়েন্স’ আখ্যা দিয়েছেন, আদালতে যার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত নয়—সেই পরীক্ষায় সালেম আলিকে জড়ানো কেন? এই পুলিশকে বিশ্বাস করতে বলছেন মুখ্যমন্ত্রী।

পানিহাটির বিধায়ক অনুপম দত্তের খুনি ধরা পড়ে এলাকাবাসীর হাতেই। পুলিশের বিশেষ কোনও কৃতিত্ব নেই। খুনের ঘটনায় উঠে আসে বেআইনি প্রমোটার-রাজের গল্প। এবং মামলা চলছে, চলতেই থাকবে। একই দিনে সকালে খুন হয়েছিলেন ঝালদার কংগ্রেস পুরপিতা তপন কান্দু। এই হত্যার ঘটনায় মৃতের তৃণমূল ভাইপো দীপক কান্দুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এবং সেই পুলিশ যারা খুনের ঘটনার সময় অকুস্থলের অদূরেই নাকা চেকিং-এ ব্যস্ত ছিল। যে চেকিং পেরিয়ে এসেছে খুনিরা এমনই অভিযোগ। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে গুলিবিদ্ধ পুরপিতাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে অস্বীকার করার অভিযোগ উঠেছে। এও বাহ্য, অভিযোগ উঠেছে ঝালদা থানার আইসি তপন কান্দুকে দলত্যাগ করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। তিনি রাজি হননি। এই খুন নাকি তারই পরিণতি। বিগত ১১ বছরে দলত্যাগে বাধ্য করতে পুলিশি—আইসি কেন, এসপিদেরও—ভূমিকার অজস্র কাহিনি শোনা যায়। যার সত্যি-মিথ্যা কোনও দিন যাচাই হওয়ার নয়।
আইসি ঝালদা তদন্তকারীদের র‍্যাডারে আছেন এমন কোনও খবর নেই। আর এক ভাইপোর সঙ্গে আইসি-র মোবাইলে কথাবার্তার 'রেকর্ডেড' অংশ মিডিয়ার হাতে এসেছে, সম্প্রচারিত হয়েছে। যদিও তার সত্যতা এখনও যাচাই হয়নি। সেই ফোন দু’টি কি তদন্তের স্বার্থে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, যেমন হয়েছে আনিস খানের ফোন। উপরন্তু, বিধানসভায় পেগাসাস প্রসঙ্গ তুলে ক্ষুব্ধ মুখ্যমন্ত্রী বুঝিয়ে দিয়েছেন, এই সব কথাবার্তা রেকর্ড করা, প্রকাশ্যে চাউর হয়ে যাওয়া তাঁর না-পসন্দ। এই পুলিশকে বিশ্বাস করতে বলছেন মুখ্যমন্ত্রী।
ব্রিটিশ আমলের পুলিশ কমিশন (১৮৬০) মনে করত “পুলিশকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করা উচিত।“ স্বাধীনতা উত্তর যুগে সে প্রথার অবসান হবে এমনই প্রতিশ্রুতি ছিল। সে প্রতিশ্রুতি পালিত তো হয়ইনি যুগে যুগে পুলিশ রাজনৈতিক ভাবে আরও বেশি বেশি করে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখন তো সামরিক বাহিনীকেও রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহারের অপচেষ্টা চলছে। দেশের প্রথম জাতীয় পুলিশ কমিশন (১৯৭৭-’৮০) পুলিশের কাজে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে ১১টি ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করেছিল। যার মধ্যে কয়েকটি হল, বিরোধী মতাবলম্বী ব্যক্তিদের মারাত্মক আখ্যা দিয়ে আইন তৈরি; বিরোধী দলের সদস্যদের মিথ্যা ও জটিল অভিযোগে গ্রেপ্তার; বিরোধীদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মারাত্মক গোয়েন্দা রিপোর্ট তৈরি করা এবং তার সাহায্যে বিরোধীদের শায়েস্তা করা্র অধিকার অর্জন করা। বর্তমান সময়ে কী কেন্দ্রে কী রাজ্যে রাজ্যে এই ট্র্যাডিশন বিষবৃক্ষ হয়ে উঠেছে। আসাম ও উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যে তো এনকাউন্টারের নামে ঠান্ডা মাথায় খুন সরকারি আদেশেই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পুলিশকে বিশ্বাস করতে বলছেন মুখ্যমন্ত্রী।
১৪টি রাজ্যে পুলিশের বিরুদ্ধে আনা কয়েক হাজার অভিযোগের পুলিশ-প্রশাসন- ম্যাজিস্ট্রেট এবং বিচারবিভাগীয় তদন্তের বিশ্লেষণ করে জাতীয় কমিশন বলছে, (১) জেলা শাসক ও পুলিশ সুপাররা যে তদন্ত করেন, সেই ক্ষেত্রগুলিতে অভিযোগ প্রমাণের শতকরা হার খুবই কম; (২) অভিযোগ সব থেকে বেশি প্রমাণিত হয় বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশনে; ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তে তার থেকে কম, বিভাগীয় তদন্তে সব থেকে কম; (৩) আদালতে ফৌজদারি মামলাগুলি ব্যর্থ হয়েছে। জাতীয় কমিশনের মতে, বিভাগীয় তদন্তগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রে সত্যকে উদঘাটিত করে না এবং পক্ষপাতমূলক।
আনিস হত্যাকাণ্ডে অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে। ঝালদা পুরপিতা হত্যায় পুলিশি যোগসাজসের অভিযোগ উঠেছে। বগটুই গণহত্যা-কাণ্ডে পুলিশের চরম ব্যর্থতার কারণে আইসি-কে সাসপেন্ড এবং এসডিপিও-কে সরানো হয়েছে। অথচ মুখ্যমন্ত্রী আমাদের রাজ্যের পুলিশ কর্তা দিয়ে গঠিত সিট-কে বিশ্বাস করতে বলছেন। বিশ্বাস করা যেত, যদি পুলিশের উপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ না থাকত। যে রাজ্যে পঞ্চায়েতে বিরোধী পক্ষ জিতলে ‘রুটিন বদলি’-র অজুহাতে থানার ওসি-কে সরিয়ে দেওয়া হয়, পুলিশ আধিকারিক ছাপ্পা ভোটারদের বিরুদ্ধে তৎপর হলে পত্রপাঠ বসিয়ে দেওয়া হয়—সেই রাজনৈতিক প্রশাসন গঠিত সিট-কে বিশ্বাস করতে বলছেন মুখ্যমন্ত্রী।
আর ঠিক এ কারণেই বিশ্বাসযোগ্য নয় সিবিআই। এক সময় ‘ইনভেস্টিগেটিং ব্যুরো অফ ইন্দিরা’ বলে যে নাম সংস্থাটি কামিয়েছিল, এখন তারাই ‘ইনভেস্টিগেটিং ব্যুরো অফ মোদী-শা’। পাহাড় প্রমাণ ব্যর্থতাই তাদের ইউএসপি। নোবেল চুরি থেকে নারদা-সারদা হয়ে কয়লা-গরু একটি ক্ষেত্রেও তারা এখনও পর্যন্ত বলার মতো সাফল্য পায়নি। ভোট-টোট এলে তাদের তৎপরতা বাড়ে। বগটুই-কাণ্ডে পাথর-বালি সিন্ডিকেট, তোলাবাজি, জমির দালালির কথা উঠে এসেছে নানা প্রতিবেদনে। সে কথা ঘুণাক্ষরেও মুখে আনেননি মুখ্যমন্ত্রী। পুলিশি এফআইআর-এও তা না থাকারই কথা। কিন্তু সিবিআই? না আঁচিয়ে বিশ্বাস নেই। সবচেয়ে বড় কথা প্রধানমন্ত্রী তো বলেইছেন রাজ্য সরকারকে তদন্তে সবরকম ভাবে সাহায্য করা হবে। পোশাক দেখেই তো প্রধানমন্ত্রী চিনতে পারেন কারা অপরাধী। আর মুখ্যমন্ত্রীও বলেছেন সিবিআই-কে সহায়তা করার কথা। এখন দেখার কোথাকার জল কোথায় গড়ায়। এবং আঁটি গড়াগড়ি খায় কিনা!

0 Comments

Post Comment