পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

কলিং বেলের আওয়াজ

  • 18 July, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 359 view(s)
  • লিখেছেন : অরিন্দম গোস্বামী
ভোর বেলায় বেশ কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেলো। এখন থেমে গেছে। জাম গাছের মোটা পাতাগুলো এখনো কিছুটা জল ধরে রেখেছে তাদের সর্বাঙ্গে। সজনে পাতাগুলো তুলনায় তাদের ঝাড়া ঝাপটা চেহারা এখনই শুকিয়ে নেবার জন্যে হালকা রোদে গা নাড়া দিয়ে দিয়ে শুকিয়ে উঠছে। এসে গেছে ছাতারে পাখির দল। ভিজে মাটির উপরে ভিজে পাতা উল্টে উল্টে খুঁজছে তারা পোকামাকড়। ডালে ডালে নড়াচড়া করতে শুরু করে দিয়েছে কাঠবিড়ালির দল। একটা বেজি বেরিয়ে এলো বাগানের কোন থেকে, সঙ্গে একটা বাচ্চা। এগিয়ে আস্তে আস্তে একেবারে জানালার কাছে এসে পড়লো। তারপর মুখ তুলে দেখতে পেল মুগ্ধাকে - আর দেখতে পেয়ে নব্বই ডিগ্রি কোণে বেঁকে পালিয়ে গেলো ডানদিকের পাঁচিলের ধারে।


আচমকা একটা তীক্ষ্ণ হর্নের আওয়াজ পাওয়া গেল যেন! কিসের হর্ন? তাহলে কি শুরু হয়ে গেল ট্রেন চলাচল! ট্রেনের কথা ভাবতে গিয়েই একেবারে শৈশবে পৌঁছে গেলো মুগ্ধা। সেই ছোটোবেলায় - বয়েস যখন পাঁচ কি ছয় - মনে আছে হাওড়া থেকে চেপেছিলো মুম্বাই যাবার জনতা এক্সপ্রেস-এ। সেই প্রথম দূরপাল্লার ট্রেনে চাপা। লোকাল ট্রেনে নয় - কি বিশাল স্টিম ইঞ্জিন, সামনের দিকটা ফোলানো মতো। আর সেই ফোলা জায়গার মাঝে একটা বিশাল বড় আলো। দাদা বুঝিয়েছিল, এর নাম কানাডিয়ান ইঞ্জিন। প্ল্যাটফর্মের উঁচু বেদি তার চাকাগুলোকে পুরোপুরি আড়াল করতে পারেনি। বাবা-মা তাগাদা দিচ্ছিলেন পিছিয়ে চলে আসার জন্যে। তারপর জীবনে এতো বার, এতো দূরে যেতে হবে - তখন তো ভাবা যায়নি। ভাবা যায়নি , যে আবার কখনো চন্দননগরের বাড়ি ছেড়ে সামান্য চেন্নাই যেতে কতো রকমের সার্টিফিকেট জোগাড় করতে হবে ওকে।
এখন সকালে অনেক কাজ। এক ফাঁকে ক্যালেন্ডারে চোখ বুলিয়ে নিলো মুগ্ধা - আর মাত্র একদিন বাকি। ট্রেনের টিকিট কেটে ফেলা হয়েছিলো ফেব্রুয়ারি মাসেই। তার মাস খানেক আগেই খবরটা জানিয়েছিলো মানালি। একমাত্র সন্তান - সে নিজেই নাকি আবার মা হতে চলেছে!
সেই মতো জুনমাসের শেষে টিকিট কেটে ফেলা হয়েছিলো একা মুগ্ধার। উনি বলেছিলেন , আমি এখানে ঠিকই থাকতে পারবো, তুমি চিন্তা কোরো না। আর , তেমন বুঝলে ফোন কোরো - যেভাবেই হোক পৌঁছে যাবো।
রাগ করে বলেছিল মুগ্ধা - তোমার কাজটাই বড়ো হলো। মেয়ের কথাটা একবার ভাবছ না কেন?
উনি হেসেছিলেন। বলেছিলেন - তোমার সেটাই মনে হলো? আমি সব সময় খবর নিতেই থাকবো। বোঝোনা কেন - এখন এই পোস্টে দাঁড়িয়ে - তোমার মতো এক-দেড় মাসের ছুটি কি আমার নেওয়া ভালো দেখায়?
- ঐ অফিস আর পোস্ট দেখিয়েই কাটিয়ে দিলে, সারা জীবন।
- সারা জীবন কোথায়? সামনে আর মাত্র দুটো বছর। তারপর দেখো না, সারাক্ষণ তোমার মুখের সামনেই দাঁড়িয়ে থাকবো, তোমার হুকুম তামিল করার জন্যে।
- দেখবো সেটা আমিও, ঠিক কোনো একটা আলাদা ঝামেলা তুমি জুটিয়ে নেবে। ঝামেলা ছাড়া কি তুমি থাকতে পারবে!



কিন্তু এরপর যে ঝামেলা এলো, সেটা তো কোনো একটা মানুষের জীবনে নয়, সারা পৃথিবী জুড়ে সমস্ত মানুষের জীবন যাপনের পদ্ধতি গেল বদলে। মানুষ বাইরের জগত ছেড়ে ঢুকে পড়তে বাধ্য হলো নিজস্ব কোটরে। সেই কোটরের মধ্যে থেকেই তার জীবনধারণের জন্য লড়াই। চারমাস আগে কাটা টিকিট- কিন্তু সেই টিকিটটাই তো হয়ে গেল অর্থহীন। শুধু ট্রেন কেনো? বিমান পরিষেবা বন্ধ হয়ে এই ক'টা মাস কিভাবে যে কেটেছে? মনের মাঝে সারাক্ষণ একটাই চিন্তা - কিভাবে মেয়ের কাছে যাওয়া হবে!
তারপর আস্তে আস্তে একটু একটু করে জট কাটলো। সবার আগে বিমান পরিষেবা শুরু হলো। তারপর স্পেশাল ট্রেন। কিন্তু তাতেও তো জায়গা পাওয়া খুব কঠিন। অনেক বলে কয়ে, একে ওকে ধরে, এক ট্রাভেল এজেন্ট-এর মাধ্যমে চেন্নাই যাবার দুটো টিকিট জোগাড় করা গেছে। যাক, এবার উনি না যাবার কথা ভাবেননি। অবশ্য ভাববেনই বা কী করে? গত চার মাস ধরে উনিও তো বাড়িতেই বন্দি। কিভাবে যে সময় গুলো কাটছে, সেটা আর চোখে দেখা যায় না। উনি না হয় দিনের মধ্যে অনেকটা সময় ব্যস্ত থাকেন ফোন আর ল্যাপটপের মাধ্যমে অফিসের কাজকর্ম নিয়ে। কিন্তু এদিকে মুগ্ধার সময় আর যেন কাটতেই চায় না। প্রথমদিকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো , বাড়ির কাজের লোক। তারপর এই বয়সে পারা গেল না আর বেশিদিন টানতে। তাই একে একে আবার বহাল হয়েছে পূর্ণিমা। ওর মেয়েটার-ও বাচ্চা হবে। তবে, পূর্ণিমার একটা সুবিধা এটাই যে, এপাড়া-ওপাড়ায় মেয়ের শ্বশুরবাড়ি। মাঝে মাঝেই গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখে আসতে পারে। তবে, ওর অসুবিধা-ও কম নেই। কয়েকটা দিন আগে, আমফানের ঝড়ে ঘরের টালি কয়েকটাই ভেঙেছে। সারিয়ে উঠতে পারলো কিনা , কে জানে।
প্রথমদিকে কয়েকটা মাস পূর্ণিমাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কাজ করতে আসা থেকে বিরত রাখতে হয়েছিলো স্বামীর পরামর্শে। উনি কথা দিয়েছিলেন - কোনো চিন্তা নেই। ঘর ঝাড়ু দেওয়া আর বাসন মাজার দায়িত্ব আমার। বাকিটা তুমিই সামলে নিও। কিন্তু তার ফল ভোগ করতে খুব একটা সময় লাগলো না। একজন মাঝ-পঞ্চাশের আর একজন ষাট ছুঁইছুঁই স্বাস্থ্যবতী আর স্বাস্হ্যবান বাঙালির কাছে তাদের সক্ষমতা কতোটা - হাতেনাতেই তার প্রমাণ পাওয়া গেলো। উপরি হিসেবে বাড়িতে এলো, ব্যাথার ট্যাবলেট আর মলম আর একটা হটপ্যাড।
বাড়ির সামনেই যে ছেলেটা সকালবেলায় বাজারের সব্জিপাতি দিতে আসে - সেই ছেলেটার সঙ্গে এখন অনেকটাই আলাপ হয়ে গেছে। তার মুখ থেকেই শোনা গেলো - একটা কলেজে পড়তো সে। এখন বিকল্প জীবিকার খোঁজে এই ফেরিওয়ালা হতে হয়েছে। এর আগে কয়েক মাস পরিযায়ী শ্রমিকদের কী দুর্দশাই না হলো। এখন আবার শোনা যাচ্ছে , তাদের কেউ কেউ আবার ফিরে যেতে চাইছে পুরোনো কাজের জায়গায়।
দিনে বারবার কিসের যেন শব্দ পায় মুগ্ধা । মনে হয়, এই বুঝি কলিংবেল বেজে উঠলো কিন্তু বারবারই উঠে গিয়ে দরজা খুলে কাউকেই আর দেখতে পাওয়া যায় না। কেউ যেন কিছু বলতে চায়, দরজা বন্ধ রেখে সেই স্বর আমরা যেন শুনতে চাইছি না। আর এই কলিং বেলের শব্দ শোনা গেলেই মনে মনে অন্য একটা সময়ে পৌঁছে যায় সে, হয় দূর অতীতের কোথাও আর নয়তো অজানা ভবিষ্যতে।
ঠিক এই সময়ে শোনা গেলো, আর একটা দুঃখের খবর। খুড়তুতো ননদ-ননদাই, ছেলে, ছেলের বউ আর নাতি নিয়ে যাদের সুখের সংসার উলুবেড়িয়ায় - তাদের বাড়িতে হানা দিল এই অদ্ভুত নাছোড়বান্দা রোগ। প্রথমে ননদের ছেলে, তারপর একে একে সেই সূত্রে বাড়ির সবাই। খুব ভাগ্য ভালো বাচ্চাটাকে আগেই সরিয়ে রাখা গেছে তার মামার বাড়িতে। সে বাদ দিয়ে বাড়ির আর সবাই পজিটিভ। ননদ অসুস্থ হলেও বাড়িতে। কিন্তু নন্দাইকে স্থানান্তরিত করতে হয়েছে হসপিটালে। দিনে একবার খবর আসে। সেই খবরের দিকে তাকিয়ে থাকেন আত্মীয়-স্বজন সবাই। সেই খবর হাত ফেরতা হয়ে আটটা-নটার সময় মুগ্ধার বাড়িতে পৌঁছায়। অথচ কাছে গিয়ে পাশে দাঁড়ানোর কোন উপায় নেই। ফোন করে একই কথা বারবার জানাতে পরিজনদের বাধ্য করা - কেমন একটা গ্লানির অনুভূতি নিয়ে আসে। এইসব শুনে ভেতর থেকে আরও বেশি করে যেন সচেতন হয়ে যাওয়া - যেন আরও বেশি ভয় পাওয়া।
পাশের পাড়ার কয়েকজন যুবক মিলে সম্প্রতি চালু করেছে কমিউনিটি কিচেন। যেসব এলাকায় লকডাউন চলছে , সেখানে তারা পৌঁছে দিচ্ছে খাবার বা রেশন। পূর্ণিমার মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সামান্য কিছু তুলে দিতে পেরে, সেদিন খুব ভালো লেগেছিলো মুগ্ধার। মনে হয়েছিলো - নিজেরও যদি এরকম সরাসরি ওদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস থাকতো!
কিছুদিন আগে খবরের কাগজ পড়ে জানা গেছিলো যে - এক শহর থেকে আরেক শহরে গেলে নাকি দু-সপ্তাহ ধরে, আলাদা করে থাকতে হচ্ছে কোনো একটা বিশেষ জায়গায়। সঙ্গে সঙ্গে মেয়ে জামাইকে ফোন করে উনি জানতে চেয়েছিলেন সেটা। জামাই আশ্বস্ত করেছে - যদি সেরকম সত্যিই কিছু হয়, তাহলে পাশের একটা লজ-কে জামাই বলে রেখেছে - যাতে সপ্তাহ দুয়েক সেখানে তারা কাটিয়ে দিতে পারে। আর না হলে এয়ারপোর্ট-এ নেমেই টেস্ট। তার রেজাল্ট আসতে বড়ো জোর তিন দিন। সেটাতে কোনো অসুবিধা না থাকলে, সোজা ওদের ফ্ল্যাটে। এতো কাছে গিয়েও সেদিন তো দূর, আরও কয়েকদিন দেখা যাবে না সামনাসামনি মেয়েটাকে। ভাবতেই খুব কষ্ট হয় মুগ্ধার।
আবার যেন বাড়িতে কলিং বেলটা বেজে ওঠে। দরজা খুলে দিতে ছুটে নেমে গিয়ে কিন্তু কাউকেই দেখা যায় না। মনে পড়ে, ছোটোবেলায় একবার দশহরার সময় মায়ের সঙ্গে মায়ের মামারবাড়িতে যাওয়ার কথা। তখন নয় কি দশ বছর বয়েস। দুপাশে দুটো গার্ডার দিয়ে বাঁধা চুল আর কুঁচি দেওয়া গোলাপি রঙের ফ্রক পড়া একটা মেয়ে। অল্পসময়ের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া গেলো ঐ বয়সের আরও ছয়-সাতজন মেয়েদের সঙ্গে। আর তারপর সারাদিন হুটোপুটি করে খেলা, পুকুরে নেমে ঝাঁপাঝাঁপি। আর পরদিন দুপুরে আর রাতে লাইন দিয়ে একসাথে বসে পেটপুরে মাংসের ঝোল আর ভাত। আরো কিছু হয়েছিলো নিশ্চিত, কিন্তু সেসব কিছুই আর মনে নেই। শুধু মনে আছে, আগুন রঙের ঝোল আর তেমনই আগুনে ঝাল। গপগপ করে খেয়ে নিয়ে, খালি হু-হা করে জিভ দিয়ে জল ফেলা।
তার নিজের মেয়েটাও তো, টেবল টেনিস খেলেছে, সাঁতার কেটেছে ক্লাস এইট পর্যন্ত। তারপর এমন পড়ার চাপ এলো - সব একে একে বাদ দিতে হলো। টুয়েলভ পাস করে আবার বাড়ি থেকেই অনেক দূরে হোস্টেলে চলে যেতে হলো। তখন দু-তিনমাস পর পর বাড়িতে ফিরতো - সঙ্গে কয়েকটা বান্ধবী। লোকজনের সঙ্গে মিশতে আর হৈচৈ করতে খুব ভালোবাসে মেয়েটা। সেই মেয়েটাই এখন আছে, একেবারে একা। সে একটা ঘরে বসে কাজ করছে, জামাই ব্যস্ত তার নিজের কম্পিউটার নিয়ে আর একটা ঘরে। ওদের বাচ্চা হলে, তাকে কে কখন দেখবে? সেদিন কাগজে দিয়েছিলো - বাচ্চাদের ক্রেশগুলো সব বন্ধ হয়ে গেছে , বিভিন্ন শহরে।
আবার বেল বাজে। এবার মাছ-ওয়ালা। মুগ্ধার স্বামী বেরিয়ে আসেন। মুগ্ধা বলে - আজকের দিনটাই আছি কিন্তু এখানে , বেশি নিও না।
মুগ্ধার স্বামী বলেন - নিয়ে যাবে নাকি মেয়েটার জন্যে কয়েকটা পাবদা? ভেজে নিয়ে যেতে না হয়!
- না , না , বলে হাত নেড়ে বারণ করে মুগ্ধা। এয়ারপোর্টে সব কেড়ে নিয়ে নেবে, একদম নিও না।
মাছওয়ালা তবুও খানিকটা বেশি করেই দিয়ে দেয়। মুগ্ধা ভাবে, থাক। পূর্ণিমার মেয়েটাকে নাহয় একটু রেঁধে পাঠিয়ে দেবো। এইসময় তো ওকেও কিছু খাওয়াতে হয়।
সন্ধ্যেবেলায় পূর্ণিমার সঙ্গে বসে দরজাগুলোর সবক'টা চাবি বুঝিয়ে দিতে হলো। বলে দিতে হলো - এখন মাস তিনেক তো বটেই, এমনকি তার চেয়ে বেশি দেরিও হতে পারে ফিরে আসতে। সে ক'টা দিন তোর ওপরেই থাকলো সব কিছু। সব দেখে রাখিস। টবের গাছগুলোতে জল দিস। আর, তোর মেয়েকেও তো এখানেই রাখতে পারিস, এইসময়। কীরে?
আবার কলিং বেলটা বেজে ওঠে। পূর্ণিমার মধ্যে কোনো হেলদোল দেখা যায় না। মুগ্ধা দেখতে পায়, একটা ছোট্ট শিশুর হাত ধরে ও চলেছে পাড়ার উৎসবে। দুজনের পড়নেই নতুন পোশাক। সেখানে গিয়ে দেখা হয়ে গেলো অনেক পুরোনো দিনের লোকজনের সঙ্গে। সবাই বললো - বাঁচা গেলো বলো, কতোদিন যে বাড়িতে আটকে ছিলাম, সাহস করে বেরোতেই পারিনি। সবাই সবাইকে জড়িয়ে ধরছে, বলছে স্বাগতম। রাস্তায় অনেক মানুষের ভিড় সবাই হাসছে, আনন্দের হাসি।
সম্বিত ফিরলো পূর্ণিমার ধাক্কায় - আপনমনে এরকম হাসছো কেন গো?
একটু ভ্যাবলার মতো মুখ করে ফেললো মুগ্ধা। তারপর বললো, একটু এগিয়ে দেখে এলাম বুঝলি! ফিরে এসে তোকে নিয়ে একটা জায়গায় যাবো, বেড়াতে। গতবছর তোকে যে শাড়িটা দিয়েছিলাম, পড়ে ফেলেছিস নাকি? ঠিক আছে, আমার কাছে নতুন শাড়ি আছে। বাইরে যাইনি বলে এই কয়েকটা মাস তো শুধু এই পুরোনো হাবিজাবি পড়েই কেটে গেলো, তাই না?
পরদিন দুপুরে খেয়েদেয়ে বেরিয়ে পড়া। গাড়িতে ওঠার আগেই খুব মায়াজড়ানো চোখে বাড়িটাকে একবার দেখে নেয় মুগ্ধা। এর প্রত্যেক কোণে লুকিয়ে আছে তার সারাজীবনের অনেক হাসি-আহ্লাদ, অনেক গুমরে থাকা কষ্ট - একান্ত নিজস্ব যাপন। আবার ফিরে আসবে তো, সে নিজেই, এই বাড়িটায়? অনেক যত্ন নিয়ে তিলতিল করে গড়ে তোলা এই সংসার। এতোদিন বাড়িতে - এই সংসারে অবরুদ্ধ থেকে থেকে এবার একেবারে অনেক মানুষের সংস্পর্শে - অনেকটাই বাইরের জগতের মুখোমুখি।
গাড়ির ভেতর থেকে উনি উঠে আসতে বলেন। শেষবার পেছনে তাকিয়ে দেখে মুগ্ধা। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে পূর্ণিমা। আগামীকাল থেকেই ওর মেয়েটাকে ও নিয়ে আসবে এখানে। মুগ্ধা বুঝতে পারে না, আগামীকাল সে ঠিক কোথায় থাকবে। যেন, যেদিকে অদৃষ্ট নিয়ে যায়, সেদিকেই ভেসে পড়া। যেন, ঐ ভেসে পড়া জলধারা বেয়ে চলতে চলতে এক পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার সঙ্গে তার দেখা হয়ে যাবে। গাড়ি চলতে শুরু করে। বাঁক নেয় বড়ো রাস্তায় উঠে। ওমনি আশেপাশের আর কিছুই নিজের নয়, কতোটুকু জায়গা আর লাগে নিজের করে পেতে - ভাবতে থাকে মুগ্ধা। পাশের মানুষটা তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। বাইরে তাকিয়ে কাউকেই আর চেনা যায় না, সবার মুখই মুখোশের আড়ালে ঢাকা। সবটাই যদি তার নিয়ন্ত্রণে থাকতো, তাহলে নির্ঘাত মুগ্ধা চাইতো একটা কলিং বেলের আওয়াজ শুনতে - বর্তমানটাকে আর যেন নেওয়া যাচ্ছে না।

0 Comments

Post Comment