পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

'সর্দার উধম': সমকালীন সময়ে ইতিহাস-পাঠের রাজনীতি

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 202 view(s)
  • লিখেছেন : উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়
উধমের ২১ বছরের অপেক্ষা সেই ক্ষয়েরই গল্প। আদালতের জবানবন্দিতে উধম যখন বলেন, “I did it for my country, and my country is not just India”, তখন তিনি জাতি-রাষ্ট্রের সংকীর্ণ ভৌগোলিক সীমানা ভেঙে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী এক আন্তর্জাতিক সংহতির কথা বলেন। যখন বর্তমান সময়ে যখন ‘দেশপ্রেম’-এর সংজ্ঞা ক্রমশ একরৈখিক হয়ে উঠছে এবং রাষ্ট্র ও সরকারকে সমার্থক করে দেখার প্রবণতা বাড়ছে, তখন এই সংলাপটি নাগরিক হিসেবে আমাদের আত্মসমালোচনার জায়গায় দাঁড় করায়।

একটি ছবি ও তার সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা 


সমকালীন ভারতের জনপরিসরে ইতিহাস ক্রমশই বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠছে। রাষ্ট্রীয় ন্যারেটিভ যখন অতীতকে নির্বাচিতভাবে ব্যবহার করে সমষ্টিগত পরিচয় নির্মাণ করতে চায়, তখন ‘কী মনে রাখা হবে’ আর ‘কী ভুলিয়ে দেওয়া হবে’ — এই প্রশ্নটি রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। একদিকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে জনমতের মেরুকরণ, অন্যদিকে ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি — এই প্রবণতাগুলো অনেক গবেষককেই গণতান্ত্রিক কাঠামোর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। সমাজতত্ত্ববিদেরা একে ‘বহুসংখ্যাবাদী জাতীয়তাবাদ’ বা ‘ইলেক্টোরাল অটোক্রেসি’-র উত্থান হিসেবেও ব্যাখ্যা করেন। এই প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে সুজিত সরকারের সর্দার উধম (২০২১) শুধু একটি পিরিয়ড ফিল্ম নয়, এটি একটি বিকল্প ইতিহাস-পাঠ। ঔপনিবেশিক হিংসা ও তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রতিরোধের স্মৃতিকে যখন রাষ্ট্রীয় বয়ান একরৈখিক ‘বীরগাথা’-য় পরিণত করে, তখন এই ছবি সেই স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনে তার সমস্ত জটিলতা, ট্রমা, নৈতিক দ্বিধা ও মানবিক মূল্য সমেত। কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি সাধারণত ইতিহাসকে সরল করে, ‘আমরা বনাম ওরা’ বিভাজন তৈরি করে এবং প্রতিশোধের আবেগকে ব্যবহার করে। সর্দার উধম সেই প্রবণতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে দর্শককে আত্মসমালোচনার জায়গায় নিয়ে যায়। তাই সমষ্টিগত বিস্মৃতি ও সরলীকরণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নাগরিক চেতনার বিকাশে এই ছবির আলোচনা আজ বিশেষভাবে জরুরি।
"সর্দার উধম" (Sardar Udham) — সুজিত সরকারের ২০২১ সালের বায়োপিক ছবি, অভিনেতা ভিকি কৌশলের অন্যতম সেরা কাজ। ছবিটা বিপ্লবী উধম সিং-এর জীবন নিয়ে। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে তিনি ২১ বছর ধরে অপেক্ষা করেন। ১৯৪০ সালে লন্ডনে পাঞ্জাবের তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর মাইকেল ও'ডায়ার-কে হত্যা করেন। ছবিটার ট্রিটমেন্ট একটু স্বতন্ত্র ঘরানার। এটা 'হিরোইক রিভেঞ্জ ড্রামা' নয়। বরং উধমের মানসিক যন্ত্রণা, একাকিত্ব, গিল্ট আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার গল্প। জালিয়ানওয়ালাবাগের ১০ মিনিটের সিকোয়েন্সটা ছবির হাইলাইট — কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ছাড়া, শুধু গুলির শব্দ আর আর্তনাদ দিয়ে বানানো। ছবিতে নন-লিনিয়ার স্টোরিটেলিং অর্থাৎ ১৯১৯, ১৯৩০, ১৯৪০ — তিনটি টাইমলাইনে গল্প বলেছেন। উধমের অতীত আর বর্তমান সমান্তরালে চলেছে এবং  রাজনৈতিক অবস্থান এমন যে  ছবিতে উধমকে 'সন্ত্রাসবাদী' না বলে 'বিপ্লবী' হিসেবে দেখানো হয়েছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নিষ্ঠুরতা সরাসরি দেখিয়েছেন। ডিটেলিং বলতে ছিল লন্ডনের সেট, পিরিয়ড কস্টিউম, উধমের একাধিক ছদ্মনাম — সব রিসার্চ-বেসড। ৪ বছর রিসার্চ করেছেন টীম। ভারত, রাশিয়া, ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ডে শুট হয়েছে। জালিয়ানওয়ালাবাগের সেট বানানো হয়েছিল অমৃতসরে, আসল লোকেশন এখন হেরিটেজ সাইট। ভিকি কৌশল ১৫ কেজি ওজন কমান-বাড়ান উধমের বিভিন্ন বয়সের জন্য। এসবও বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া যায়। দেখার মতো দিক ছিল  সিনেমাটোগ্রাফি, সর্দার উধমের রোল-এ ভিকি কৌশলের এক্সপ্রেশন, আর ক্লাইম্যাক্সের আগে কোর্টরুম স্পিচ। ২ ঘণ্টা ৪২ মিনিটের ছবি, কিন্তু স্লো বার্ন ট্রিটমেন্ট।
ছবিটি ৫ টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়  ২০২৩ সালে সেরা হিন্দি ফিচার ফিল্ম, সেরা অডিওগ্রাফি, সেরা প্রোডাকশন ডিজাইন, সেরা কস্টিউম ডিজাইন, সেরা সিনেমাটোগ্রাফি হিসেবে। এছাড়াও 'ফিল্মফেয়ার' -এও ছব টি সেরা চলচ্চিত্র, সেরা পরিচালক, সেরা অভিনেতা সহ ৯টা পুরস্কার অর্জন করে।


ছবিটি সম্পর্কে সাহিত্য ও রাজনীতির ক্রিটিক্যাল অ্যাপ্রিশিয়েশন

ক. ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ বনাম রাষ্ট্রীয় ন্যারেটিভ

প্রচলিত মূলধারার জাতীয়তাবাদী বায়োপিকের একটি নির্দিষ্ট গ্রামার আছে — নায়ককে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ করে তোলা, ঘটনাকে ক্লাইম্যাক্স-কেন্দ্রিক করা এবং শেষে রাষ্ট্রীয় গৌরবের অনুভূতি তৈরি করা। সর্দার উধম সেই গ্রামার সচেতনভাবে ভাঙে। এখানে উধম সিং কোনো মাসক্যুলিন, প্রতিশোধ-পরায়ণ সুপারহিরো নন। তিনি একজন বিপ্লবী, কিন্তু একইসঙ্গে ভাঙাচোরা, নিঃসঙ্গ এবং ২১ বছর ধরে এক গভীর ট্রমা বহনকারী মানুষ।
পরিচালক সুজিত সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে ‘জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড’-কে ছবির ক্লাইম্যাক্সে রাখেননি। বরং প্রায় ১০ মিনিটের সেই দৃশ্যকল্পকে ছবির মধ্যভাগে স্থাপন করে তিনি দর্শককে বাধ্য করেন পুরো আখ্যানটিকে সেই ট্রমার ভেতর দিয়ে দেখতে। এই কৌশল ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের ‘থিসিস অন দ্য ফিলজফি অফ হিস্ট্রি’-র কথা মনে করায়, যেখানে তিনি ইতিহাসের অ্যাঞ্জেলকে বর্ণনা করেছেন ধ্বংসস্তূপের দিকে মুখ ফিরিয়ে থাকা এক সত্তা হিসেবে। রাষ্ট্রীয় উদযাপন যেখানে জালিয়ানওয়ালাবাগকে ‘শহিদ দিবস’-এর আচার-সর্বস্ব আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখে, সেখানে এই ছবি ঘটনাটিকে ‘অতীত’ হতে দেয় না। নন-লিনিয়ার আখ্যান কাঠামো দিয়ে পরিচালক দেখান যে ঔপনিবেশিক হিংসা কোনো বিচ্ছিন্ন ‘ঘটনা’ নয়, বরং একটি চলমান প্রক্রিয়া যার কাঠামোগত জের আজও নানা রূপে থেকে মিশেল ফুকোর ‘বায়োপলিটিক্স’ ও ‘গভর্নমেন্টালিটি’ তত্ত্বের আলোকে দেখলে, মাইকেল ও’ডায়ারের নির্বিচারে গুলি চালানোর আদেশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের ‘সার্বভৌম ক্ষমতা’ এবং ‘প্রাণকে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার’-এর চূড়ান্ত প্রকাশ। ছবিটি প্রশ্ন তোলে, স্বাধীনতার পরেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সেই চরিত্র কতটা বদলেছে।

খ. হিংসা, নৈতিকতা ও প্রতিরোধের দ্বন্দ্ব

উধম সিং-এর প্রতিশোধকে ছবি কোনোভাবেই গ্লোরিফাই করে না। লন্ডনে ও’ডায়ারকে হত্যার দৃশ্যটি প্রায় অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্টিক। কোনো স্লো-মোশন, ড্রামাটিক ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর বা হিরোইক সংলাপ নেই। আছে শুধু উধমের কাঁপা হাত, ফাঁকা চাহনি এবং ঘটনার পরের শূন্যতা। এই ‘ডি-গ্ল্যামারাইজেশন’ বা মহিমা-বর্জন ছবির রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 
হান্না অ্যারেন্টের ‘ব্যানালিটি অফ ইভিল’ তত্ত্বের একটি বিপরীত পাঠ এখানে পাওয়া যায় — ‘ব্যানালিটি অফ রেজিস্ট্যান্স’। অর্থাৎ প্রতিরোধও সবসময় বীরত্বপূর্ণ বা রোমাঞ্চকর হয় না। তা হতে পারে ক্লান্তিকর, একঘেয়ে, দীর্ঘসূত্রী এবং মানসিকভাবে ক্ষয়কারী। উধমের ২১ বছরের অপেক্ষা সেই ক্ষয়েরই গল্প। আদালতের জবানবন্দিতে উধম যখন বলেন, “I did it for my country, and my country is not just India”, তখন তিনি জাতি-রাষ্ট্রের সংকীর্ণ ভৌগোলিক সীমানা ভেঙে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী এক আন্তর্জাতিক সংহতির কথা বলেন।
যেহেতু সিং তার জনগণের প্রতিশোধ নিতে ২০ বছর ধরে অপেক্ষা করেছিলেন, তাই ও'ডোয়ারকে হত্যা করার সময় তিনি নিজের পরিচয় গোপন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি ক্যাক্সটন হিলে ইস্ট ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন এবং দ্য রয়্যাল সেন্ট্রাল এশিয়ান সোসাইটির এক সভায় প্রকাশ্যে সেই প্রাক্তন কর্মকর্তাকে গুলি করেন। কথিত আছে, তিনি একটি বার্তা দেওয়ার জন্যই এমনটা করেছিলেন—বিশ্ব যেন 'ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ ট্র্যাজেডি' কখনো ভুলে না যায়। তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছিলেন।
বর্তমান সময়ে যখন ‘দেশপ্রেম’-এর সংজ্ঞা ক্রমশ একরৈখিক হয়ে উঠছে এবং রাষ্ট্র ও সরকারকে সমার্থক করে দেখার প্রবণতা বাড়ছে, তখন এই সংলাপটি নাগরিক হিসেবে আমাদের আত্মসমালোচনার জায়গায় দাঁড় করায়। এটি মনে করিয়ে দেয় যে দেশপ্রেম মানে অন্ধ সমর্থন নয়, বরং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো।
তাই বলা যায় সুজিতের এভাবে ছবিটি করার কারণ বলতে গেলে তিনি (পরিচালক সুজিত) একটি  ইন্টারভিউতে বলেছেন, উধম সিং-এর গল্প ভারতীয় ইতিহাসে ঠিকঠাক জায়গা পায়নি। শহীদ ভগৎ সিং-এর নাম সবাই জানে, কিন্তু উধম সিং আড়ালেই থেকে গেছেন। সেই শূন্যতা থেকেই ছবিটা বানানো।
অথচ, ও'ডায়ারের হত্যাকাণ্ডের পর ব্রিক্সটন কারাগারে বন্দী হয়েও সিং তাঁর দেশের স্বাধীনতার জন্য কাজ করা বন্ধ করেননি। কথিত আছে, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতে ধর্মীয় ঐক্যের শক্তি ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে তিনি ৩৬ দিনব্যাপী অনশন করেছিলেন। কারাবন্দী থাকাকালীন তিনি নিজেকে "রাম মোহাম্মদ সিং আজাদ" নামেও পরিচয় দিয়েছিলেন। ২০১৮ সালে জালিয়ানওয়ালা বাগে এই বিপ্লবীর মূর্তি স্থাপন করা হয়।

গ. সাবঅলটার্ন কণ্ঠস্বর ও আর্কাইভের রাজনীতি

ছবির একটি বড় অর্জন হল ‘অফিসিয়াল আর্কাইভ’ বা সরকারি নথির বাইরে গিয়ে ইতিহাস নির্মাণ করা। উধম সিং ব্রিটিশ জেলে যে অমানুষিক টর্চারের শিকার হন, তার কোনো সরকারি দলিল নেই। ইতিহাসের এই ‘নীরবতা’-র জায়গায় দাঁড়িয়ে সুজিত সরকার ‘পোস্ট-মেমরি’ নির্মাণ করেছেন। ম্যারিয়ান হির্শ বলেছেন, পোস্ট-মেমরি হল সেই প্রজন্মের স্মৃতি যারা কোনো ট্রমাটিক ঘটনা সরাসরি দেখেনি, কিন্তু পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মাধ্যমে তার ভার বহন করে। 
লন্ডনের শ্রমিকদের পাব, ভূগর্ভস্থ প্রিন্টিং প্রেস, HSRA-র (তৈরী হয় ১৯২৪ সালে। তখন নাম ছিল HRA , ১৯২৮ সালে ভগৎ সিং ও আরো কয়েকজন মিলে নামটি আরেকটু পরিবর্তন করেন - নতুন নাম HRSA = Hindustan Republic Socialist Association) লিফলেট, উধমের একাধিক ছদ্মনাম — এই সমস্ত ‘মাইনর ডিটেল’ বা ক্ষুদ্র উপাদান দিয়ে পরিচালক একটি বিকল্প আর্কাইভ তৈরি করেন। আন্তোনিও গ্রামশির ‘সাবঅলটার্ন’ তত্ত্ব অনুযায়ী, উধম কোনো এলিট রাজনৈতিক নেতা নন। তিনি ‘কমরেড’, প্রান্তিক অবস্থান থেকে উঠে আসা একজন কর্মী। তাঁর রাজনীতি বড় বড় দলীয় ম্যানিফেস্টোতে নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনযাপন, গোপন বৈঠক, লিফলেট বিলি এবং ব্যক্তিগত ত্যাগের মধ্যে নিহিত। এই দৃষ্টিভঙ্গি এলিট-কেন্দ্রিক ইতিহাস-চর্চার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের ‘নিচ থেকে দেখা’ পাঠ হাজির করে।

ঘ. জাতীয়তাবাদ বনাম আন্তর্জাতিকতাবাদ

উধম সিং-এর রাজনৈতিক চেতনায় ভগৎ সিং, HSRA এবং আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রভাব স্পষ্ট। ছবিটি দেখায় যে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। তা ছিল বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী লড়াইয়ের অংশ। লন্ডনে আইরিশ ও অন্যান্য ঔপনিবেশিক দেশের মানুষের সঙ্গে উধমের সংহতি এই বিষয়টিকেই তুলে ধরে। আজকের বিশ্বায়নের যুগে যখন সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দিচ্ছে, তখন এই আন্তর্জাতিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।


ফিল্মের ভাষা

 

সর্দার উধম ভারতীয় বায়োপিক জঁরের (Genre) ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্যারাডাইম শিফট নির্দেশ করে। ‘মঙ্গল পান্ডে’, ‘কেশরী’, ‘উরি: দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-এর মতো ছবিতে ইতিহাসকে ব্যবহার করা হয় মাসক্যুলিন জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রীয় গৌরব নির্মাণের হাতিয়ার হিসেবে। সেখানে ক্যামেরা প্রায়ই লো-অ্যাঙ্গেল থেকে নায়ককে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ করে তোলে, উত্তেজক ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দর্শককে আবেগ তাড়িত করে এবং শত্রুকে একমাত্রিক ভাবে ‘অপর’ হিসেবে দেখানো হয়। পরিচালক ঠিক উল্টো পথে হেঁটেছেন।

ক) 

মি-জঁ-সেন, সিনেমাটোগ্রাফি ও টেম্পোরালিটি : ছবির কালার প্যালেট ইচ্ছাকৃতভাবে অনুজ্জ্বল — ধূসর, বাদামি, শীতল নীল। লন্ডন ও পাঞ্জাব — দুই ভূখণ্ডই ক্লাস্ট্রোফোবিক এবং বিষণ্ণ। প্রোডাকশন ডিজাইনার মানসী মেহতা ও দিমিত্রি মালিচ প্রায় ডকুমেন্টারি-লেভেলের পিরিয়ড অ্যাকুরেসি এনেছেন। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ‘সময়’ বা টেম্পোরালিটি নিয়ে কাজ। সম্পাদক চন্দ্রশেখর প্রজাপতি ২ ঘণ্টা ৪২ মিনিটের ছবিকে ‘স্লো সিনেমা’-র টেম্পো দিয়েছেন। জালিয়ানওয়ালাবাগের দৃশ্যে প্রায় কোনো কাট নেই। স্টেডিক্যামের লম্বা টেক বা লং টেকে আমরা উধমের সাথে কাদা-জলে পড়ে থাকা লাশ, কাতরানি ও মৃত্যুর মধ্যে হাঁটি। ফরাসি দার্শনিক আঁদ্রে বাজাঁ-র ‘ডিউরেশন’ তত্ত্ব এখানে প্রযোজ্য। এই দীর্ঘ সময় দর্শককে নিছক ‘স্পেকটেটর’ বা দর্শক না রেখে ‘উইটনেস’ বা সাক্ষী বানিয়ে দেয়। এটি সের্গেই আইজেনস্টাইনের ‘মন্টাজ অফ অ্যাট্রাকশন’-এর বিপরীত। আইজেনস্টাইনের মন্তাজ দ্রুত কাট ও সংঘর্ষের মাধ্যমে শক তৈরি করে। এখানে শক আসে নীরবতা, দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং বাস্তবতার ভয়াবহতা থেকে।

খ )

সাউন্ড ডিজাইন ও অনুপস্থিতির রাজনীতি

দীপঙ্কর চাকি, সিনয় জোসেফ ও প্রীতমের সাউন্ড ডিজাইন ছবির একটি প্রধান চরিত্র। জালিয়ানওয়ালাবাগের সিকোয়েন্সে কোনো নন-ডাইজেটিক মিউজিক বা আবহ সংগীত নেই। শুধু আছে গুলির ইকো, আহতের গোঙানি, মৃতপ্রায় মানুষের শ্বাস এবং কুয়োয় ঝাঁপ দেওয়ার শব্দ। এই ‘অনুপস্থিতি’ বা নীরবতাই সবচেয়ে সরব। লন্ডনের দৃশ্যে টাইপরাইটারের খটখট, ট্রামের ঘড়ঘড়, কারখানার শব্দ, পায়ের আওয়াজ — এই ‘ডাইজেটিক সাউন্ড’ উধমের নিঃসঙ্গতা ও বিচ্ছিন্নতাকে আরও তীব্র করে তোলে। শান্তনু মৈত্রের আবহ সংগীত অত্যন্ত মিনিমাল এবং প্রায়শই অনুপস্থিত। শব্দের এই ব্যবহার বলিউডের মেলোড্রামাটিক প্রথার সম্পূর্ণ বিপরীত।

গ)

পারফরম্যান্স, বডি ও জেন্ডার পলিটিক্স

ভিকি কৌশলের শরীর এখানে একটি ‘টেক্সট’ হিসেবে কাজ করে। ২১ বছরের ব্যবধানে উধমের তিনটি বয়স, তিনটি ভিন্ন শারীরিক ভাষা তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। জেলে টর্চারের পর তাঁর কুঁজো হয়ে যাওয়া শরীর, চোখের নীচের গভীর কালি, ক্লান্ত হাঁটা — এগুলো শুধু ‘মেথড অ্যাক্টিং’-এর নিদর্শন নয়। এগুলো পোস্ট-কলোনিয়াল বডির উপর রাষ্ট্রীয় হিংসার স্থায়ী ছাপ। প্রচলিত বায়োপিকে নায়কের শরীর হয় পেশীবহুল ও আক্রমণাত্মক। এখানে উধমের শরীর ভঙ্গুর, ট্রমাটাইজড। ভিকি কোনো ‘হিরোইক’ ডায়লগ ডেলিভারি দেন না। তাঁর সংলাপ প্রায়শই ফিসফিসানি, দ্বিধাগ্রস্ত, ভাঙা। এই ‘আন্ডারপ্লে’ এবং ‘ভালনারেবিলিটি’ বা ভঙ্গুরতা প্রদর্শন হিন্দি মেইনস্ট্রিম বায়োপিকের মাসকুলিন গ্রামারকে চ্যালেঞ্জ করে।

ঘ) 

আন্তঃপাঠ ও প্রভাব

ছবিটিতে কোস্টা গাভ্রাসের ‘Z’ বা গিলো পন্টেকোরভোর ‘দ্য ব্যাটল্ অফ্ আলজিয়ার্স' -এর মতো পলিটিক্যাল থ্রিলারের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। আবার সত্যজিৎ রায়ের মতো বাঙালি পরিচালকদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ডিটেলিং-এর ছাপও স্পষ্ট। সুজিত নিজেই বলেছেন, তাঁর বাঙালি পরিচয়ই তাঁকে এই ধরনের গল্প বলার সাহস জুগিয়েছে।


ফিরে আসি শুরুর প্রসঙ্গে। যে কোনো সমাজেই যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর নাগরিক আস্থা কমতে থাকে, যখন ইতিহাসকে বর্তমানের রাজনৈতিক প্রয়োজনে নতুন করে লেখার চেষ্টা হয়, এবং যখন সামাজিক মাধ্যমে ঘৃণা ও বিভাজনের বয়ান প্রাধান্য পায়, তখন সর্দার উধম-এর মতো টেক্সট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই ছবি কোনো সহজ উত্তর দেয় না। বরং এটি প্রশ্ন তোলে — রাষ্ট্রীয় হিংসা ও ব্যক্তিগত প্রতিরোধের নৈতিকতা কী? স্মৃতি কীভাবে নির্মিত হয়? এবং দেশপ্রেমের সংজ্ঞা কে ঠিক করে দেয়?

উধম সিং-এর লড়াই ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। আজকের নাগরিকের লড়াই গণতান্ত্রিক পরিসরকে সংকুচিত করার যে কোনো প্রবণতার বিরুদ্ধে। এই ছবি প্রতিশোধকে মহান করে না, বরং দেখায় যে প্রতিরোধের মূল্য অনেক সময় ব্যক্তিগত ধ্বংস। এটি আমাদের শেখায় যে ‘মনে রাখা’ নিজেই এক সক্রিয় রাজনৈতিক কাজ। 

কর্তৃত্ববাদী কাঠামো সবসময় চায় নাগরিক ভুলে যাক, অথবা শাসকের দেখানো পথেই মনে রাখুক। সর্দার উধম সেই একরৈখিক বিস্মৃতি ও সরলীকরণের বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক হস্তক্ষেপ।

তাই বর্তমান সময়ে, সামাজিক-মানসিক গঠনকে যুক্তিবাদী ও মানবিক রাখার স্বার্থে, এবং ‘নাগরিক’ থেকে নিষ্ক্রিয় ‘প্রজা’ হয়ে যাওয়া ঠেকাতে, এই ছবির পাঠ, বিশ্লেষণ ও তর্ক-বিতর্ক আশু প্রয়োজন। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে জাতি তার অতীতের জটিলতা ও বহুস্বরিকতা ভুলে গিয়ে একরৈখিক বয়ানকে আঁকড়ে ধরে, তাকে প্রায়শই ভবিষ্যতে সেই হিংসা ও বিভাজনেরই পুনরাবৃত্তি দেখতে হয়। সর্দার উধম সেই পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর জন্য একটি জরুরি সাংস্কৃতিক স্মারক।

---

একটু ঘুরে আসা যাক :-

১) ছবির উঠোনে 

Sircar, Shoojit, director. Sardar Udham. Rising Sun Films, 2021.

২) পরিচালকের জবানিতে
 
(ক) “বাঙালি হওয়ার জন্যই সাহস পেয়েছি।” আনন্দবাজার অনলাইন, ২৪ আগস্ট ২০২৩, http://www.anandabazar.com/entertainment/shoojit-sircar-talks-about-sardar-udham-national-award-win/cid/1456832.  
(খ) Sircar, Shoojit. “Director Shoojit Sircar‘s Candid Reaction to ’Sardar Udham‘s National Award Win.” Editorji, 24 Aug. 2023.

৩) খবরের কাগজের পাতা থেকে

“69th National Film Awards: ভিকি কৌশল অভিনীত সরদার উধম জিতে নিল শ্রেষ্ঠ হিন্দি চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় পুরস্কার।” LatestLY বাংলা, 24 Aug. 2023, http://bangla.latestly.com/entertainment/cinema/69th-national-film-awards-sardar-udham-wins-the-best-hindi-film-award-676265.html.

৪) ইতিহাসের থিয়োরির ক্লাসঘর

(ক) Benjamin, Walter. “Theses on the Philosophy of History.” Illuminations, edited by Hannah Arendt, translated by Harry Zohn, Schocken Books, 1968, pp. 253-264.  
(খ) Hirsch, Marianne. The Generation of Postmemory: Writing and Visual Culture After the Holocaust. Columbia UP, 2012.  
(গ) Foucault, Michel. The History of Sexuality, Volume 1: An Introduction. Translated by Robert Hurley, Pantheon Books, 1978.

৫) সিনেমার ব্যাকরণ খুঁজতে

(ক) Bazin, André. _ (আন্দ্রে বাঁজা) What Is Cinema? Volume 1_. Translated by Hugh Gray, U of California P, 1967.  
(খ) Eisenstein, Sergei. Film Form: Essays in Film Theory. Edited and translated by Jay Leyda, Harcourt, 1949.

৬) গবেষণামূলক তথ্য থেকে
 
(ক) Chandra, Bipan, et al. India’s Struggle for Independence. Penguin Books, 1989.  
Hindustan Socialist Republican Association. (খ) “The Philosophy of the Bomb.” 1929.  
Singh, Udham. Court Statement. Central Criminal Court, London, 5 June 1940.

৭) সমকালের আয়নায়

(ক) Jaffrelot, Christophe. Modi’s India: Hindu Nationalism and the Rise of Ethnic Democracy. Princeton UP, 2021.  
(খ) Mehta, Pratap Bhanu. “India’s Withering Democracy.” Journal of Democracy, vol. 33, no. 1, Jan. 2022, pp. 35-49.

৮) আর্কাইভস্

Great Britain. Parliament. Report of the Committee Appointed by the Government of India to Investigate the Disturbances in the Punjab, etc. (Hunter Committee Report). His Majesty’s Stationery Office, 1920.

0 Comments

Post Comment