পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

পরবর্তী সংবাদ

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 726 view(s)
  • লিখেছেন : গৌরাঙ্গ দাস
আজ কয়েকদিন হল আমাদের পাড়ার হাওয়াটা এলোমেলো ভাবে বইছে। সেজন্য গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে এসেছে এক আতঙ্কের ছায়া। আমিও এমন অস্বাভাবিকতার ছোঁয়ায়, এক অস্বস্তির মধ্যে আছি। আসলে অপ্রীতিকর কোন কিছুই আমার কোনদিন পছন্দ নয়। পাড়ার এমন অসুস্থ পরিবেশ আমাকে খুব চিন্তায় ফেলেছে, বারবার মনে হচ্ছে এভাবে চলতে থাকলে, মানুষতো বেপরোয়া হয়ে উঠবে। ইটের আঘাত পাটকেলে দিতে শুরু করবে।

ফকির, আমি একইসঙ্গে পড়াশোনা করেছি। আমি এখন একটা ইস্কুলে পড়াই। ফকিরের চায়ের দোকান। ওর দোকানে আমরা বেশ কয়েকজন বন্ধুরা চুটিয়ে আড্ডা মারি। ওর দোকানের জন্মলগ্ন থেকে। বেশ কাটছিল আমাদের সকাল সন্ধ্যা, গরম করা আড্ডার মধ্যে দিয়ে। কি যে হল ফকিরের, দোকানটা বন্ধ করে দিল। শুধু দোকানটা বন্ধ করে দেয়নি, পুরো পরিবার, বাড়ি ছাড়া হয়ে গেল। কোথায় গেছে কেউ বলতে পারে না। তবে কেন গেছে- পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিতে আমি কারণটা অনুভব করতে পারছি। শুধু ফকির নয়। গ্রামের বেশ কয়েকঘর হিন্দু ও মুসলিম পরিবার রাতারাতি গ্রাম ছাড়া হয়েছে। এছাড়াও এলোমেলো হাওয়ার জন্য গ্রামের বেশ কিছু মানুষ ভীষণ ভয়ের মধ্যে আছে। তারা শান্তি প্রিয়, নরম মনের মানুষ। কোনো সাতে-পাঁচে থাকে না, নীরবে সহ্য করে সব রকম সমস্যা।

এলোমেলো হয়ে যাওয়া পরিস্থিতি চলছে আজ চার দিন। ফকিরের দোকান বন্ধ হয়েছে ও গ্রামবাসীরা পালিয়ে গেছে একদিন পর থেকে, অর্থাৎ আজ তিন দিন। এই পালিয়ে যাওয়া বিষয়টা আমাকে ভীষণ অস্থির করে তুলেছে। অস্থির করে তুলেছে, বিরোধীপক্ষের অফিসগুলো ভাঙচুর করে দখল করে নেওয়া বিষয়টা। এমন সব অস্থিরতা থেকে আমি আমার প্রিয় বন্ধু সুরেশকে ফোন করলাম। বললাম আমার অস্বস্তির বিষয়টা। সুরেশ বলল- ও সবই জানে, তাছাড়া ও নিজেও বিষয়টা নিয়ে খুব চিন্তিত। আমরা আলোচনার মধ্যে দিয়ে স্থির করলাম প্রশাসনের কাছে যাওয়া।

সুরেশ আমি বিমর্ষ মুখে থানার দরজা ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। বড়বাবু স্পষ্ট বললেন-আমার হাত-পা বাঁধা। উপরমহলের অর্ডার, কমপক্ষে একমাস অন্ধ হয়ে থাকতে হবে।

সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছি আর ভাবছি, কি করলে আমাদের পাড়ায় শান্তি ফিরে আসবে? এমন সময়, পাড়ার ছেলে চুন্নু বাবলুর ফোন এলো। বাবলু আমার সমবয়সি। বেকারত্বের থেকে বাঁচতে সেই যে চোলাই মদের ব্যবসা শুরু করেছিল, সে প্রায় দশ বছর হয়ে গেল। আজও ছাড়তে পারেনি। বরং চোলাই বেচতে বেচতে খাওয়াটা শিখেছে মাত্রা পেরোনো।

তবে মাতলামি করে না। তাছাড়া এই চুল্লুর ব্যবসা করে বাবলু ওর বৃদ্ধ মাকে ভাতে ওষুধে বাঁচিয়ে রেখেছে। একটা বোন ছিল বিয়ে দিয়েছে। ভাইটাকে পড়াচ্ছে। সম্ভবত কলেজে পড়ে। সুতরাং বাবলুকে লোকে চুন্নু বলে ডাকলেও আমি ওকে শ্রদ্ধা করি, ওর পরিবারের প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য বোধের জন্য। ওর নিষ্পাপ মন মানসিকতার জন্য।

- বললাম বল, কি বলতে চাস?

তুমি কোথায় আছো দাদা? এদিকে তো এক ভয়ানক ঘটনা ঘটতে চলেছে।

কি হয়েছে?

- রঘুকে বলাই ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গ ধরে নিয়ে গেছে। উড়োভাষা শুনলাম, ওকে নাকি জানে মেরে দেবে ঠিক করেছে। মানুষ ভুল করতে পারে, একটা অপরাধ করতে পারে, তার জন্যে তার শাস্তি মৃত্যু, খুন! ভাবতে পারছি না দাদা। তুমি পারলে ব্যস্ত হয়ে- বিলপাড়ের পোড়ো বাড়িটায় চলে যাও। ওখানে রঘুকে আটকে রেখেছে। ওকে মৃত্যুর হাত থেকে, বাঁচাতে চেষ্টা করো। আমার বিশ্বাস ওরা তোমার কথা ফেলবে না। একবার চেষ্টা করে দেখো দাদা। বেশি দেরি করো না। আমার কিন্তু খুব ভয় করছে।

আমার মাথাটার মধ্যে একটা চক্কর দিয়ে উঠলো। মনে হল আমি পাথর হয়ে গেছি।

তবুও পায়ের শক্তি বাড়াতে চেষ্টা করলাম। মনে জোর এনে প্যাটেলে চাপ দিলাম। ভাবলাম; চুন্নু বাবলু যদি মানুষের মঙ্গলের কথা ভাবতে পারে, আমি কেন নিজের উপর বিশ্বাস রাখতে পারব না? সুরেশকে বললাম- জোরে সাইকেল চালা। একটা অঘটন ঘটতে চলেছে। যদি সময় মত পৌঁছাতে পারি হয়তো প্রাণটা বেঁচে যাবে।

প্রাণপণ শক্তি দিয়ে সাইকেলে প্যাটেল করে এগিয়ে চলেছি। চলতে চলতে পকেট থেকে ফোনটা বের করলাম। রিং করলাম বাবলুকে। প্রশ্ন করলাম, কোথায় তুই?

- আমি বাজারেই আছি। খরিদ্দারের খুব চাপ আছে দাদা।

- আপাতত ব্যবসাটা কারো উপর রেখে, বিলপাড়ের পোড়ো বাড়িটায় যা। বলাইকে আটকাতে চেষ্টা কর। আমি এখন খড়ের মাঠে পৌঁছে গেছি। আরো প্রায় ১৫ মিনিট লাগবে আমার পৌঁছাতে। তার আগে যদি অঘটন ঘটে যায়, সে কথা মাথায় রেখেই তোকে আমি যেতে বলছি। যদি অনুনয় বিনয় করে বলাইকে কিছু সময় আটকে রাখতে পারিস।

ঠিক আছে দাদা, আমি দু চারজনকে সঙ্গে নিয়ে এখনি যাচ্ছি। চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখবো না দাদা, তোমায় কথা দিলাম।

সময় নষ্ট করতে চাই না বলে বাবলুর সঙ্গে আর কথা বাড়ালাম না। সাইকেলের প্যাটেলে সর্বশক্তি প্রয়োগ করলাম।

সুরেশের ফোনটা বেজে উঠল। আমি ওর ফোনের দিকে কান খাড়া করে রেখেছি। না কোন কথা শুনতে পেলাম না। তবে, সুরেশ বলল- দাদা একই সংবাদ। প্রশ্ন করলাম, কে ফোন করেছিল?

- রজত। আর যেটুকু বাড়তি সংবাদ পেলাম, সে খবরটা হল- ভূপেন কাকার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে কারা। পাড়ায় চলছে এক চাপা উত্তেজনা। ভীষণ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে আমাদের পাড়াটা। ভুপেন কাকা তো বাড়ি ছাড়া তুমি হয়তো জানো।- হ্যাঁ জানি।

গ্রামের মধ্যে ঢুকে বুঝতে পারলাম, থমথমে ভাব। ছড়ানো ছিটানো যা দু একটা দোকান আছে পাড়ায়, সব বন্ধ। সব বাড়িঘর নিস্তব্ধ। দুই একজন বয়স্ক মানুষ দেখা যাচ্ছে এদিকে সেদিকে। বিল পাড়ে যাবার রাস্তার মুখে ভূপেন কাকার বাড়িটা এখনো আগুনের দখলে রয়েছে। পাশে দুটো বাড়ি পরে রথীনদের বাড়িটার বারান্দার চালের টালিগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে কারা। রথীনরাও বাড়িছাড়া। আরেকটু এগিয়ে বাঁ হাতে ঢুকে গেছে বসাকপাড়ার রাস্তা। ও রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে এলো একটা টোটো, দুইজন যাত্রী একজনের বুকে মাথা দিয়ে বসে আছে অন্যজন। ওদের জামাপ্যান্ট রক্তে ভেজা। বুঝতে পারলাম ভীষণ হিংসা ছড়িয়ে পড়েছে, আমাদের পাড়ার আশেপাশের পাড়াতেও। মানুষ কি বর্বর হয়ে উঠলো? মনুষ্যত্ববোধ কি রইলো না একটুও? এই হিংসা মারাদাঙ্গা কেন? কারা এই হিংসার জন্য দায়ী? মানুষ তো অনেক সভ্য হয়েছে, অনেক শিক্ষিত হয়েছে। তাহলে কেনো এত হিংস্র হয়ে উঠছে মানুষ? এ কোন সভ্যতা? এ কেমন শিক্ষা? যে শিক্ষা মানুষকে মানুষের মর্যাদা দেয় না, মনে করে শত্রু, আর সে কথা মাথায় নিয়ে পশুসুলভ আচরণ করে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আমরা পৌঁছে গেছি বিলপাড়ের পোড়ো বাড়িটার সামনে। দেখি, বাবলু সহ চারজন বাড়িটার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দেখে ওরা এগিয়ে এলো। আমাদের দাঁড় করালো, বলল- দাদা পারলাম না শেষ রক্ষা করতে। আমরা আসার আগেই সব শেষ হয়ে গেছে।

মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো আমার। চোখের সামনে ভেসে উঠল রাজনৈতিক দলের পতাকা। হাওয়ায় পত পত করে উড়ছে। আর সেই পতাকার দলীয় চিহ্ন দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত, বাংলার পবিত্র মাটিতে। মনে প্রশ্ন জাগলো, রাজনৈতিক পালাবদল কেন রক্তপাতের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যায়? সেই রক্তপাত নেতাদের উপর হয় না কেন? রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যত বলি হয়, কেন সবই সাধারণ মানুষ? গতবারের নির্বাচনে রক্তঝরা ছিল, এবারকার নির্বাচনও তার ব্যতিক্রম নয়, কেন?

সাইকেলটা রেখে রঘুকে শেষ বারের দেখা দেখতে গেলাম। চমকে উঠলাম! গলায় দড়ি দিয়ে ছাদের ফ্যান ঝোলানো হুকে রঘুকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। মাথাটা ঝুলে পড়েছে, নাক কান দিয়ে গড়িয়ে পড়া রক্তের দাগ স্পষ্ট। আমার মনে পড়ে গেল রঘুর বৃদ্ধা মা, অল্প বয়সের বউটার কোলে এক বছরের একটা বাচ্চা। কি হবে ওদের? ওদের অপরাধ কি? মানুষ তো দল করবেই। সমর্থন যার যার, তার তার। রঘুর তবে কি দোষ ছিল?

সাইকেলের কাছে এসে দাঁড়িয়েছি। দেখলাম একটা পুলিশ গাড়ি আসছে। গাড়িটা আমাদের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। গাড়ি থেকে সবাই নামলো। আমাদের উদ্দেশ্য করে একজন বলল। এখানে একদম ভিড় বাড়াবেন না, বাড়ি চলে যান সোজা। দেখলাম ওদের সঙ্গে রঘুর খুনি বলাইও আছে। বলাই পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে বলতে, হেঁটে যাচ্ছে পোড়ো বাড়িটার দিকে। কানে ভেসে এলো কথাটা, তাহলে স্যার ওই কথাই রইল সুইসাইড বলে চালিয়ে দেবেন কেসটা।...

0 Comments

Post Comment