আটলান্টা ফেরার ফ্লাইটটায় দেখা গেল হাজার ঝামেলা । সব ফ্লাইটই দেরি, কারণ সরকার ফান্ড নেই বলে বন্ধ চলছে, ATC কন্ট্রোলাররা বেশির ভাগ বাড়িতে বসে, অল্প কিছু আসছে কাজে। তাদের চাকরি আর মাইনেও নিশ্চিত নয়। সিকিউরিটির লোকেরা মাইনে ছাড়াই কাজ করছে, shutdown শেষ হলে পাওয়া যাবে কিনা, তাও নিশ্চিত নয়। আমেরিকায় থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আকাশের সারা শরীরে ব্যথা, কারণ টানা প্রদর্শনী ডিউটি, আর প্রতিদিন পাঁচতারা হোটেলের খাবারে ফ্যাট আর চিনির শ্রাদ্ধ। ডেসারট দেখলে এখনও সামলাতে পারে না আকাশ। পেট এখন শুধু সাদামাটা ডাল-ভাত আর আলুভাতে চাইছে। তার ওপর রমন এই বিপদ নিয়ে হাজির! শিট শিট শিট। কতটা বোকা হলে এমন হয়! আকাশ চিন্তা করছে, প্রজেক্টের ভবিষ্যৎ কী হবে। ডেমো মাত্র দুই মাস পর। রমন তো শুনলই না, “আমাকে বাড়ি যেতে হবে, আমার দেশ, আমার আত্মীয়রা, দীপাবলি মিস করতে পারি না।” আর এখন সবই মিস করবে। কীভাবে সব লোন শোধ করবে? আকাশ ভাবছে, এখন রমনের হয়ে অনেক পেপারওয়ারক করতে হবে, আচ্ছা উটকো ঝামেলা। রমনকে একবার ফোন করা দরকার, কিন্তু কী বলবে ফোন করে?
বাড়িতে অস্মি ইতিমধ্যে কাজে লেগে গেছে। শান্তির সঙ্গে কথা বলছে, চোখ বড়বড় করছে মহিষাসুর মর্দিনীর মত, যুক্তি ভেবে ভেবে বার করেছে আর US কর্তৃপক্ষের গুষ্টি উদ্ধার করছে—“ব্যাটারা বুঝতে পারে না, আমরা কতটা মূল্যবান? এদের তথ্য পরিকাঠামো, টেক ইন্ডাস্ট্রি—সবই তো আমাদের হাতে। লোকালরা কী কাজ করে? চারটের পরেই উধাও। ফ্রাইডে দুপুর হলেই চলল উইকেন্ড করতে। আর আমাদের স্বামীরা দেখো রাতেও কাজ করছে, উইকেন্ডেও কাজ করে, আর এই তার পুরস্কার?”
ফোনে কথা বলতে বলতেই অস্মি দেখল, আকাশ দরজা খুলে ঢুকল। চেহারাটা যেন হারিয়ে যাওয়া লাগেজ, সারা পৃথিবী ঘুরে এসেছে। “শাওয়ার করে নাও, ডিমের ঝোল, ভাত আর ডাল করেছি। তারপর একটু ঘুমিয়ে নাও।” বলেই আবার ফোনে ব্যস্ত হয়ে গেল।
অবশেষে, আকাশ সাহস করে রমনকে ফোন করল।
“হাই, আকাশ হিয়ার। এবার কী প্ল্যান তোমার?”—সব দায় রমনের ওপর ছুঁড়ে দিল, অপেক্ষা করতে লাগল…
“হাই, অস্মির কাছ থেকে সব শুনেছো তো? কী আর প্ল্যান, এখনো কোনো প্ল্যান নেই। কী ভুলটাই না হল! আমার উচিত ছিল থেকে যাওয়া। তুমি বলেছিলে না যেতে, শুনিনি। সময়টা খারাপ। কী করব জানি না। HR-এর সঙ্গে কথা বলেছি, বলেছে, আমি ভারতে থাকলে চাকরি দিতে পারবে না। কোনো সেভারেন্স, কোনো ক্ষতিপূরণ নেই, কারণ আমার দোষ—এই সময়ে ট্রাভেল করতে কে বলেছিল। কখন ভালো সময় হবে, সেটা অবশ্য বলল না। যাই হোক, আমার জন্য বেশি চিন্তা করো না আকাশজি। কিছু একটা করব! কিছু না হলে চাষ করব। এখন কনস্যুলেটে পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে যাচ্ছি। দেখি…”
পুনর্বিবেচনা! এমন কোনো শব্দ নেই। জীবন পুনর্বিবেচনা করে না। জীবন সিদ্ধান্ত নেয়, তুমি পালাও বা মেনে নাও। বোমা পড়ে, গুলি চলে, চাকরি যায়, আত্মীয় মারা যায়, শেয়ারের দাম নেমে যায়, জিনিষের দাম বাড়ে। কী করা যায়? কিছুই না, কারণ এগুলো যখন ঘটবে, তখনই ঘটবে। কোনো বিবেচনা নেই, কোনো পুনর্বিবেচনা নেই।
আকাশ বসে বসে প্রজেক্টের সব কোড আর ডকুমেন্ট দেখল। HR-এর সঙ্গে কথা বলল। তারা বলল, রমনকে ১৫ দিনের মধ্যে সব ট্রান্সফার করতে হবে, তারপর অফিসিয়াল কোনো যোগাযোগ থাকবে না। আকাশ একলা একলা পার্কিং লটে হাঁটতে গেল, রোজ সকালে এখানেই রমন আর সে সব ব্রেনস্টর্মিং করত। আকাশ দেখল, আকাশটা ঝকঝকে নীল, বাতাস পাতলা ফুরফুরে, গাছের পাতা রঙ বদলাচ্ছে। তারা মরছে, আর মৃত্যু দূর থেকে সুন্দর লাগে। অস্মি বলল, ‘বেশি চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।‘ নারীরা মুহূর্তে কেমন ভূমিকা বদলাতে পারে, হয়তো বিবর্তন তাদের এমন নমনীয় করে দিয়েছে।
এই দেশটা আর নিরাপদ মনে হচ্ছে না। ফ্রি-ওয়ে, সীমাহীন রাস্তা, সারা পৃথিবীর ফল, মাংস, ইলেকট্রনিক্স, আর ডলারে বেতন—সবই আছে। All You Can Eat দেশ, বেঁধে ফেলে দেয় একবার এলে, আর ফেরার কথা ভাবা যায় না। আর ফিরে যেতে হবে এমন দেশে, যেখানে গিজ গিজ করছে বেকার, অসুস্থ মানুষ, আর সর্বত্র গুটকা আর পানের পিকের দাগ। সুখ আর নিরাপত্তা সবসময় পরস্পরবিরোধী।
পেছন থেকে হালকা হর্ণ বাজল। CEO বেরিয়ে এল তার নতুন TESLA Model X থেকে, ডাকল—
“আকাশ, Starbucks-এ কফি খাবে? কফি মেশিনের কফি আর ভালো লাগছে না, চলো কথা আছে।” গাড়ির দরজা ঈগলের ডানার মতো দুদিকে খুলে গেল, আকাশের একেবারেই পছন্দ নয়। তবুও, CEO-র গাড়িতে যাত্রা ভাগ্যের ব্যাপার, না বলার উপায় নেই।
CEO, অনেক US CEO-র মতো, একজন ভারতীয়—রঞ্জন রায়, কলকাতা থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি নিয়ে এসেছেন, তারপর চূড়ায় পৌঁছেছেন চাতুর্য আর পরিশ্রমের বিরল রসায়ন আয়ত্ত করে। তবুও, কলকাতার মানুষ বটে, কবিতা লেখেন, নতুন শিল্পীদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। লোকসমাজে কালচার্ড বলে সুনাম আছে।
“রমনের ঘটনার পর হতাশ লাগছে তো? ডিস্টারবড হয়ো না, শান্ত থাকো, এটাই জীবন। সামান্য ভুল করলেই, ফাঁক দিয়ে পড়ে যেতে হয়, সেই ফাঁক গুলো টপকাতে পারাকেই বলে সাফল্য।”
আকাশ হালকা হাসল, “প্রজেক্ট নিয়ে চিন্তা করছি, ডেমো তো দুই মাস পর।”
রঞ্জন গাড়ির সঙ্গে কিছু একটা কথা বলল, গাড়ি নিজেই ফ্রি-ওয়ের দিকে ঘুরল, বাঁ দিকে আসা গাড়ির ওপর লক্ষ্য রেখে।
“প্রজেক্ট সাময়িক, ইমিগ্রেশন স্থায়ী”—স্টারবাক্সে অর্ডার দিয়ে রঞ্জন মুচকি হাসল, বলল, “কে বলেছে? কেউ না। এক্ষুনি মাথায় এলো, একটা কবিতার লাইন হতে পারে। তুমি এখানেই না থাকলে, প্রজেক্ট করবে কীভাবে? কাজেই প্রথম কাজ টিকে থাকা, সাবধান থাকতে হয়। জানি না, তোমার পার্টনার এটা কেন বুঝল না। যাই হোক, এফ ওয়াই আই, প্রজেক্ট আমি বাতিল করে দিলাম। প্রোডাক্ট টিমের সঙ্গে আলোচনা করেছি, ওদের কোন অসুবিধে নেই, ম্যানেজ করে নেবে।” রঞ্জন কফির কাপের ছবিতে হৃদয়ের আকারের ফেনাতে আলতো করে ফুঁ দিতে সেটা পড়ন্ত পাইন পাতার মতো হয়ে গেল।
“এখন তাহলে আমি কী করব?”
“আরে আকাশ, ঘাবড়াচ্ছ কেন, অনেক ongoing business আছে। তোমার ডিপার্টমেন্ট ম্যানেজারকে বলব, Testing-এর কোনো কাজ দেবে, কিছু না কিছু হবে।”
কফি থেকে ফিরে আকাশ আর কারও সঙ্গে কথা বলল না। Testing একটা মহৎ কাজ, কিন্তু কেউ করতে চায় না। আকশেরও পছন্দ নয়। AI-র ফ্রন্টলাইনের নতুন প্রজেক্টের সঙ্গে কোন তুলনা হয়?
এক সপ্তাহ এভাবেই কেটে গেল। আকাশ ধীরে ধীরে প্রায় সবার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিচ্ছিল। অস্মি তার এই ধরনের বিষণ্ণতা দেখে অভ্যস্ত। এই সময় ওর রোল সহানুভূতি দিয়ে সঙ্গী হয়ে পাশে থাকা। ও তাই করল। আমন পড়াশোনা আর তার তারা-গ্রহ-ধুমকেতু নিয়ে ব্যস্ত। রমন আর ফোন করে না। আকাশের মনে যেন একটা ব্ল্যাক হোল তৈরি হচ্ছে, যা তার ইচ্ছাশক্তি গিলে নিচ্ছে।
প্রতিদিন সকালে কেটলির হুইসল বাজে, চায়ের জল ফুটে উঠলেই। অস্মি চায়ের জল ঢালছে বোন চায়নার কাপে, তাতে রাখা মাপ করে দেওয়া এক চামচ ভুরভুরে দার্জিলিং চায়ের পাতা। প্রতিদিনের এই অভ্যেস এখনও বদলায়নি। হঠাৎ আকাশ অস্মির হাত ধরে বলল,
“অস্মি, চল আমরা ফিরে যাই ভারতে। এই দেশ আমাদের গিলে খাবে, তারপর ছুঁড়ে ফেলবে। আমার এখানে একদম সেফ লাগছে না। যে কাজ করছি তা যে কেউ করতে পারে, মানে আমি আর কিছু অসাধারণ করছি না। অথচ সেটাই আমার এখানে থাকার শর্ত। অসাধারণ কিছু করা, তাই তো ভিসা গ্রীন কার্ড এসব দেওয়া হয়েছে।”
“সবসময় অসাধারণ কাজ করতে কে বলেছে?”
“এটাই তো আমার ইমিগ্রেশন কাগজে লেখা। যদি ICE এসে আমাদের কোম্পানিতে হানা দেয়, আমরা কিন্তু বিপদে পড়ে যাবো।”
“ভয় পেও না, আকাশ। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমাদের ভিসা ঠিক আছে, গ্রিন কার্ডও পাব। এখন আর দুশ্চিন্তা করো না। এত কষ্ট করে এখানে এসেছি, আমাদেরও অধিকার আছে একদিন US নাগরিক হওয়ার।”
“কিন্তু US-এর তো কোনো দায়িত্ব নেই আমাদের নাগরিক বানানোর। কিছুই নিশ্চিত নয়। তখন কী করব? এই বড় বাড়ি, AC, TV-এর ইএমআই?”
“পাগলামি করো না। আমি দেখছি, রমনের ঘটনার পর থেকে তুমি খুব টেনশনে আছো। দেখো আমরা ঠিক সব পার হয়ে যাব। আর বলো তো, ফিরে গেলে কোথায় কাজ করবে? এমন স্যালারি কেউ দেবে?”
“এআই টা আমি ভালই বুঝি, আর ইন্ডিয়াতে এখন এআই নিয়ে অনেকে স্টারট করছে, কোনো স্টার্টআপে ঠিক চাকরি পেয়ে যাব। হয়তো এখানে যত পাই, তত পাব না, কিন্তু চলে যাবে । আমি এখানে আর সেফ মনে করছি না,”—আকাশ আরও শক্ত করে অস্মির হাত ধরল। আর ঠিক তখনই আমন স্কুলের জন্য তৈরি হয়ে বেরিয়ে এসে ঘোষণা করল, “মা, আজ স্কুলে খাব, আসলে আমার বন্ধু লিন ইয়াং আর মুত্থুরাজকে আমি আজ ট্রিট দেব বলেছি। ক্লাসে টপার হয়েছি বলে।”
“এদিকে আয়, বাবা আমন, একটা ইম্পরট্যান্ট কথা আছে”—অস্মি ডাকল। আমন সকালবেলা এমন নাটকীয় দৃশ্য দেখে আর সংলাপ শুনে বেশ অবাক, অনিচ্ছাসহ এগিয়ে এল,
“আবার কী? রমন আঙ্কল নিয়ে কিছু?”
“হ্যাঁ, আবার না। তোমার বাবা ভয় পেয়েছে, ভারতে ফিরে যেতে চাইছে, তুমি কী বলো?”
“তুমি কি পাগল, পপ? আমায় বলছো, সবচেয়ে ধনী দেশ ছেড়ে একটা তৃতীয় বিশ্বের দেশে যেতে, যেখানে চারদিকে শুধু রোগ, ভাঙা চোরা রাস্তা—না, কোনোভাবেই না। আমি যাব না।”
“যদি ICE এসে আমায় ধরে নিয়ে যায়?”
আমন বিরক্ত হয়ে কিছু বলল না, চলে গেল। অস্মি সেই বিশেষ ‘লুক’ দিল, যার মানে তুমি আজেবাজে কথা বলছো।
“ভয় পেও না। ওরা অযৌক্তিক কাজ করবে না, নিজের ভালোটা বুঝবে ঠিকই। এই সরকারের তো মাথা খারাপ হয় নি, এরা ঐ থার্ড ওয়ার্ল্ড দেশের মত হাঁদারাম নয় ।” অস্মি একটা ভারী বক্তৃতা দিয়ে উঠে গেল। আকাশ মাথার চুল দুহাতে আঁকড়ে হাঁ করে বসে রইল অনেকক্ষণ।
মধ্যরাতেই সে আসে। সেই টোকা আসে। যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ, সেই মধ্যরাতে। সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ, উঠানে এখন অনেক দিনের জমানো বরফ যেন এসে পড়েছে। পার্কিংয়ের বেশিরভাগ গাড়ির অর্ধেক বরফে ঢাকা, যেন তাদের শরীরের অর্ধেক নেই, আর কোনো অদ্ভুত শ্বেত দানব এসে তাদের মাথাগুলো খেয়ে ফেলেছে।
আর তখনই সেই টোকা। নক নক। এই নির্মম তুষারপাত, নির্জন ঈগলের ডাক, ICE-এর টোকা।
আকাশ ঘুমাচ্ছিল, পুরনো প্রিয় Star Wars-এর একটা এপিসোড দেখে।
কোনো মেসেজ নেই, কোনো নোটিশ নেই, কোনো সতর্কতা নেই। জীবন কখনও সতর্কতা দেয় না, ICE-ও না।
তারা এসেছে হুড পরা মাস্ক পরে । দেখে মনে হয় একদল প্লেনের হাইজ্যাকার কান্দাহার থেকে উঠে এসেছে। ইউনিফর্ম গাঢ় কালো, এই রাতের মতোই অন্ধকার। তাদের সঙ্গে আছে বন্দুক। ছোট P229R ৪০ ক্যালিবারের পিস্তল কোমরে গোঁজা।
বেল বাজল, জিজ্ঞাসা করলে খুব সহজ গলায় উত্তর—আমরা ICE। দরজা খুলুন।
আকাশ অস্মিকে ফিসফিস করে বলল, “অস্মি, শুনছ, ওরা এসে গেছে, মিস্টার পুনাওয়ালাকে ফোন করো চটপট, কোম্পানির লইয়ার। গতকাল নম্বরটা দিয়েছিলাম।”
অস্মির চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল, কিন্তু সে প্রয়োজন হলে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে জানে। তাড়াতাড়ি ফোন নিয়ে টয়লেটে ঢুকে গেল।
আমন গভীর ঘুমে, আকাশ আর তাকে বিরক্ত করল না।
আকাশ দরজা খুলে দেখল একরাশ সাদা বরফের ভিতর থেকে উঠে এলো তিনজন আইস।
“মিস্টার এমন সেনগুপটা। আপনার কাগজপত্র দেখান। আমাদের কাছে তথ্য আছে, আপনার আমেরিকায় থাকার পারমিশান তুলে নেওয়া হয়েছে। “
একজন ভেতরে ঢুকল, দু’জন ওপর-নিচে তাকাল, আকাশকে দেখে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। আকাশকে দেখে কোন গোলমাল করতে পারে কেউই ভাববে না। একজন ৪২ বছরের বাদামী বাঙালি, মোটা লেন্সের চশমা পরে, মুখে আতঙ্কের ছাপ। একে ধমক দিতেও ভাববে দুবার, হার্ট ফেল না করে ফেলে। দ্বিতীয় আইস তৃতীয় আইসকে এসব বোঝাচ্ছিল আর নজর রাখছিল চারদিকে।
ভেতরে ঢোকা লোকটা সোফায় বসল, চারপাশে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “বাকিরা কোথায়?”
অস্মি টয়লেট থেকে বেরিয়ে এল, মুখ-চুল ধুয়ে, পরিষ্কার, এমনকি একটু হাসলও।
“আপনি কি চা খাবেন, স্যার?”—অস্মি জিজ্ঞাসা করল।
লোকটা মাস্ক খুলল, কী বলবে বুঝতে পারল না। ওর বয়স মাত্র ২৫, বর্তমান প্রশাসন তাড়াহুড়ো করে এজেন্ট করে দিয়েছে, মুখে এখনও নিষ্ঠুরতার রেখা পড়েনি। স্যার শুনতে খারাপ লাগলো না।
“না, ধন্যবাদ। আপনি নিশ্চয়ই মিসেস সেনগুপ্টা। ঘরের ভেতরে থাকুন। দরকার হলে ডাকব।”
কাগজপত্র পরীক্ষা হল। কোনো সমস্যা নেই। সব ডকুমেন্ট ঠিক, গ্রিন কার্ডের আবেদন চলছে, কোনো প্রতারণার ইঙ্গিত নেই।
“আশ্চর্য, আপনার কাগজপত্র ঠিক আছে। কিন্তু আমরা দুঃখিত, আমাদের কাছে তথ্য আছে, আপনার এদেশে থাকার মেয়াদ শেষ। এক সপ্তাহের মধ্যে আপনাদের এই দেশ ছাড়ার নির্দেশ। না ছাড়লে কিন্তু ক্রিমিনাল প্রসেস চালু হয়ে যাবে, জোর করে ডিপোরট করা হবে, তা অন্য কোন দেশেও হতে পারে।“ নির্লিপ্ত মুখে ছেলেটা বলে গেল।
“কারণটা জানতে পারি?”
“ইমিগ্রেশন কন্ট্রোল থেকে কাল মেল পাবেন। প্রস্তুতি নিন, প্যাকিং শুরু করুন। থ্যাঙ্ক ইউ ফর দি অফার অফ টি। বাইবাই।”
পরদিন মেল এল—আকাশ পাঁচ বছর আগে ক্রিসমাস ইভ-এ স্পিডিং-এ ধরা পড়েছিল। আর তার সোশ্যাল মিডিয়া-তে সন্দেহজনক গ্রুপে লাইক পাওয়া গেছে। দু দুটো এমন ভয়ঙ্কর অভিযোগের জন্য তার ভিসা আর গ্রিন কার্ড আবেদন বাতিল। তাকে দেশ ছাড়তে হবে। এক সপ্তাহ সময় ব্যাস। এই দেশ সব কিছুই খুব তাড়াতাড়ি চায়। হাত নিশপিশ করে সবার। সাধে কি সবার আগে চাঁদে গেছে। যদিও তারপর থেকে বসে আছে এই বোরিং পৃথিবীতেই।
আইনজীবী বিশেষ সাহায্য করতে পারল না। বলল, কেউ ধরা পড়লে পুরো কোম্পানিতে তদন্ত হয়। দেখা হয় এখানে আরো এমন অনুপ্রবেশকারীদের মদত দেওয়া হচ্ছে কিনা। রমনকে আটকাবার পরে, আপনাদের কম্পানি ওদের লেন্সের নীচে পড়েছে। কিছু করার নেই। দেখুন, যদি কোন আইনের ধারা দিয়ে ডিপোর্ট করা হয় তো আইনী লড়াই করা যায়, কিন্তু এক্সিকিউটিভ অর্ডারে হলে আদালত কোনো আবেদন নেয় না। আর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে না দেশ ছাড়লে, পরিবারসহ গ্রেপ্তার, ডিপোরটেশান সেন্টারে রাখা, তারপর একদিন হাতে পায়ে শিকল পরিয়ে ডিপোর্ট, ভাগ্য ভালো হলে ভারতে। নইলে কি যে হবে কেউ বলতে পারে না। আপনি বেরিয়ে যান, ঐ ডেটের ভিতর। নইলে মুশকিল আছে।
CEO সদয় মানুষ। সংস্কৃতির প্রভাব যাবে কোথায়! বেশ বড় ভাইয়ের মতো আচরণ করলেন। আকাশের USA-র সম্পত্তি, দায়-দায়িত্ব দেখভালের প্রতিশ্রুতি দিলেন। রমনের মত ঘটনা এখন আকছার হচ্ছে। এমন পরিস্থিতির জন্য এজেন্সি তৈরি হয়েছে, যারা সম্পত্তি, মর্টগেজ বিক্রি, সব দেখভাল করে, ফি নিয়ে। প্যাটেল হোম রিটারণ সার্ভিস। যে কোন বিশৃঙ্খলা নতুন ব্যবসার জন্ম দেয়। কেউ কেউ সন্দেহ করে, তারাই ICE-কে তথ্য দেয়, কিন্তু এসব ষড়যন্ত্রের সত্যতা কখনও প্রমাণ হয় না।
পরের দিন সন্ধ্যায় রমন আকাশকে ফোন করল। তার গলা গম্ভীর, কিন্তু খুব বেশি সহানুভূতি বা অনুশোচনা দেখাল না।
“আকাশজি, আমি শুনেছি ভানিশ্রীর কাছে। তোমার টেস্টিং গ্রুপের টিম লিডার। তোমাকেও শেষে ডিপোর্ট করা হয়েছে।”
“হ্যাঁ, রমন।”—আকাশ এক মিনিট চুপ করে থাকল, কী বলবে বুঝতে পারল না।
“আমি বুঝতে পারছি তোমার মনে কি হচ্ছে। আমি নিজেও তো এর মধ্যে দিয়ে গেছি কয়েক মাস আগেই। তুমি আমার থেকেও ভালো ফাইটার, দেখো তুমি ঠিক বেরিয়ে আসবে।”
“মনে হচ্ছে হঠাৎ কেউ আমার বাড়িতে বোমা ফেলেছে, যেমন গাজা টাজায় হয়। সব শেষ—সব পরিকল্পনা, স্বপ্ন, আমনের স্কুল, বাড়ি—সবকিছু।”
রমন চুপচাপ শুনল। সে সব জানে।
“কিছু ঠিক করেছো, দেশে এসে কোথায় থাকবে? কলকাতায় তো তোমার কেউ নেই শুনেছি।”
“ঠিক। কলকাতায় আমার থাকার কোনো জায়গা নেই, কোনো আত্মীয়ও নেই। তোমার মতো না। অস্মির দুই মামা আছে, কিন্তু তারা নিশ্চয়ই USA থেকে ডিপোর্ট হওয়া পরিবারকে রাখবে না। আপাতত কলকাতায় এক মাসের জন্য হোটেল বুক করেছি। দেখি, চাকরির জন্য অ্যাপ্লাই করতে হবে। কলকাতায় opening খুব কম—কেউ আর রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নিয়ে মাথা ঘামায় না। কেবল কল সেন্টার বা BPO। তোমার স্টার্ট-আপ কেমন চলছে?”
“ও, তুমি শুনেছো তাহলে? হ্যাঁ, আমরা কিছু ফান্ডিংয়ের চেষ্টা করছি। টেকনিক্যাল স্টার্ট-আপে বিনিয়োগকারী রাজি করানো কঠিন, সবাই ট্যাক্সি সার্ভিস বা অনলাইন শপ চায়। দেখি চেষ্টা তো করছি, কিছু একটা নিশ্চয়ই হবে।”
দেশে ফেরার টিকিট বুক হল, আর আকাশ সেনগুপ্তের ‘A’ পরিবার ঠিক এক সপ্তাহের মধ্যে উড়ান ভরল হারটফিল্ড এয়ারপোরট থেকে । ইমিগ্রেশন কাউন্টারে কয়েকজন ভারতীয়, আবার কিছু শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান । মুখ দেখে আকাশের মনে হল, আমেরিকানরা খুব খুশি, তাকে বিদায় করতে পেরে। ভারতীয়রা অদ্ভুতভাবে মুখ ফিরিয়ে নিল, হয়তো অর্ডার আছে, ডিপোর্ট হওয়া ভারতীয়দের সঙ্গে কথা না বলতে।
অস্মি আর আমন চুপ। আমন আইপ্যাডে ডুবে রইল, ৩আই/আটলাস নিয়ে পড়তে লাগল। অস্মি প্লেন ছাড়তেই চোখ বন্ধ করে বসে রইল। আকাশ জানে ও এখন অপরাধী। সব দোষ ওর। একদিন যেমন রমনের মাথায় সব দোষ চাপাতে ওর দ্বিধা হয় নি।
চেন্নাইয়ের ইমিগ্রেশন অফিসার সহানুভূতির সঙ্গে জিজ্ঞাসা করল, “H1B?”
আকাশ মাথা নাড়ল।
“ওরা জানে না, কী করছে। আমেরিকা সব H1B-কে বাড়ি পাঠালে, ওদের কম্পিউটার, হাসপাতাল কে চালাবে? বোকা লোক।”
“হ্যাঁ, কিন্তু এটা তো সরকারি নির্দেশ। আপনি নিজেও সরকারি কর্মচারী, ভালো-মন্দ যাই হোক, নির্দেশ মানতেই হয়।”
আকাশ দুর্বলভাবে উত্তর দিল। প্লেনে ঠান্ডা লেগে গেছে, গলা বসে গেছে। অস্মি আর আমন পেছনে দাঁড়িয়ে, যেন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে যাচ্ছে।
পরের দিন সকালে চেন্নাই থেকে কলকাতার কানেক্টিং ফ্লাইট । আকাশ রাতটা ট্রাইডেন্ট চেন্নাই-এ বুক করল। এয়ারপোরট থেকে কাছে, ঝামেলা হবে না। চেক-ইন করল, রুমে ডিনার অর্ডার করে, আকাশ বিছানায় গড়িয়ে পড়ল, তার চোখে নেমে আসছে অসম্ভব এক ক্লান্তি। নিজের দেশ, কিন্তু সম্পূর্ণ অজানা। ৪২ বছর বয়সে এভাবে অপমানিত করে তাকে তাড়িয়ে দেবে এ তার দুঃস্বপ্নেও কোনদিন আসেনি। সামনে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার।
“তুমি একটু শুয়ে নাও, আমি একটু শাওয়ার থেকে পরিষ্কার হয়ে আসি। প্লেনের মধ্যে যে কত ইনফেকশান হাওয়ায় ঘোরে, ভাবলেও কেমন লাগে”। এত দুঃখেও হাসি পেল আকাশের। ঐ জেন্ডারটা ওরকমই। বিশেষ করে অস্মি, নিজেকে একটু ফিটফাট সাজুগুজু করলেই খুশি।
চোখ বন্ধ করতে যাচ্ছে আকাশ, ঠিক সেই সময় রিসেপশন থেকে ফোন এল, “স্যার, মিস্টার রমন আর তার পরিবার আপনাকে রুমে দেখতে চায়। পাঠিয়ে দেব?”
অস্মি কান পেতে ছিল টয়লেটের দরজায়, শুনতে পেল, আকাশ উত্তর দিল, “ওহ নো। ঠিক আছে, ১০ মিনিট পরে পাঠান, একটু ফিটফাট আর ড্রেস আপ করে নি, এই মাত্র চেক ইন করেছি।”
দশ মিনিট পরে হই হই করে যখন রমন শান্তি আর প্রীতি দরজায় বেল দিল, ততক্ষণে অস্মি ফিটফাট, আকাশ চটপট একটা পাঞ্জাবী পাজামা পরে নিয়েছে, যদিও গালে সাত দিনের না কাটা দাড়ি সেটা নিয়ে কেউ মন্তব্য করল না। সাত দিনের কাহিনী সকলেরই জানা।
আকাশের জানার কথা নয়, অস্মি ইতিমধ্যে শান্তিলতাকে এই হোটেলের কথা জানিয়েছে, ল্যান্ড করার পরই হোয়াটসঅ্যাপ করেছে, লাগেজ পেয়েছি, এবার হোটেলে যাচ্ছি,—আকাশ এসব কিছুই জানে না।
রমন স্টার্ট-আপের বিনিয়োগের খবর চমক হিসেবে রেখেছিল। শান্তিলতা আর অস্মি জানত। সারা রাস্তা অস্মি অপূর্ব অভিনয় করে গেল আকাশ ধরতেও পারে নি। ঐ জেন্ডারটা ওরকমই, আকাশ মনে মনে আর একবার ভাবল, এদের পেটে কি আছে আর মুখে কি আছে কোনদিনই মেলাতে পারবে না।
ডিনার অর্ডার বাতিল হল, সবার জন্য এলো ফিল্টার কফি আর মুরুক্কু। স্টেটসে থাকতে রমন-শান্তি নিয়মিত দক্ষিণ ভারতীয় দোকান থেকে পাপড় আর মুরুক্কু আনত, অস্মিও ভাগ বসাতো। সকলেরই খুব পছন্দ। আমন এসে শুকনো মুখে হাই আঙ্কল, হাই আন্টি বলে এক মুঠো মুরুক্কু নিয়ে আইপ্যাড নিয়ে জানলায় বসে পড়ল। বাইরে হু হু করে গাড়ী যাচ্ছে আসছে হাইওয়ে দিয়ে, বেশ গরম চারদিকে, কিন্তু হোটেলে বসে তা বোঝার উপায় নেই। আমনের উলটো দিকের চেয়ারে গিয়ে প্রীতি কিছু একটা বোঝাবার চেষ্টা করছে বলে মনে হল, কিন্তু আকাশ রমনকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ল অভ্যাসমত।
“তুমি এখানে কী করছো, রমন?”—আকাশ বুঝতে পারল, ছয় মাস রমন কিছুই জানায় নি, দুঃখের কথা বলে ওকে অপ্রস্তুত করতে চায়নি।
“এখানে এসেও আমি এ আই নিয়েই চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। তোমাকে ছোট করে বুঝিয়ে বলতে পারি, যদিও ব্যাপারটা একটু জটিল”—রমন আমেরিকান অ্যাকসেন্টে প্রেজেন্টেশান দেবার ভঙ্গীতে বলল, “আসলে আমি আর আমার দুজনের ছোট্ট একটা টিম রক্তের নমুনা থেকে ক্যান্সার, লিম্ফোমার মতো গুরুতর রোগ শনাক্ত করার জন্য কাজ শুরু করি। ছ মাসের চেষ্টায় একটা এপ দাঁড় করিয়েছি, একুরেসি খুব ভাল।
“হঠাত এই ফিল্ডে নামতে গেলে!” আকাশ রমনের বুদ্ধি নিয়ে সন্দেহটা এখনো পুষে রেখেছে বোঝা গেল, “বড় ফার্মা কোম্পানিগুলো তো এটা করছে? তুমি কি করে তাদের সঙ্গে পারবে?”
“ঠিক কথা, অনেকে চেষ্টা করছে, সফল হয়নি কেউই। আর বড় বড় ফারমা গুলো কি করে চটপট টাকা তোলা যায় তা নিয়েই ব্যস্ত। ওদের দরকার বিরাট ইনফ্রাস্ট্রাকচার, অনেক লোকজন, কিন্তু ব্যাপারটার জন্য যে নিঃস্বার্থ ডেডিকেশান দরকার, সেরকম লোক কোথায়?”
“বড় ইনফ্রা না হলে তোমরাই বা করবে কি করে? বিরাট এ আই ফারম লাগবে, লাখ লাখ সারভার লাগবে বা অ্যামাজন থেকে ভাড়া নিতে হবে হাজার হাজার জি পি ইউ।“ আকাশের কাছে ব্যাপারটা রমনের আর এক বোকামির পরিচয় বলেই মনে হচ্ছিল।
“আমাদেরটা এপ্রোচটাই আলাদা। বিশাল ইনফ্রা, বড় AI ফার্মের দরকার নেই। আমাদের এই এই চলবে একটা ল্যাপটপ আর নিজেদের লোকাল নেটওয়ার্কে। ছোট শহর, ব্লক বা গ্রামীণ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সহজেই সেটআপ করা যায়।“
“সে তো বুঝলাম, কিন্তু অন্যভাবেও তো টেস্ট করা যায় বড় বড় হাসপাতালে তো আছেই নানা রকম ডিটেক্ট করার ব্যাবস্থা”
“ঠিকই বলছে আকাশ। কোটি কোটি টাকার মালিক যারা তাদের জন্য তো সুব্যবস্থা আছেই। কিন্তু কোটি কোটি ভারতীয়, যারা নিয়মিত টেস্ট করতে পারে না, তাদের টেস্ট করবে কে। এটাই আমাদের মূল মন্ত্র ছিল, চিকিৎসা বিজ্ঞানকে একেবারে প্রান্তিক মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া। আর তার জন্য আমাদের হাতিয়ার ”
“এ আই” বড় স্যুটের একপ্রান্তে চলছিল অস্মি আর শান্তিলতার গুলতানি। দুজনে মিলে হাতে হাত দিয়ে হঠাত একসঙ্গে বলে উঠল “থ্রি চিয়ারস ফর এ আই, হিপ হিপ হুররে”।
“এত খুশি, তাহলে বিনিয়োগ পেয়ে গেছ নাকি?”
“হ্যাঁ, কঠিন ছিল, কিন্তু পেয়েছি। আমাদের জেলা থেকে কিছু সমাজকর্মী ক্রাউডফান্ড করেছে। তারপর বড় বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হয়েছে। আর গতকালই প্রথম মিলিয়ন ডলারের ভেঞ্চার ফান্ডিং এসেছে।” রমন কথা শেষ করে মুচকি হেসে আকাশের মুখের রেখাগুলোর পরিবর্তন দেখছিল। শক অ্যান্ড অ বলা যেতেই পারে।
আমন আইপ্যাড দেখা বন্ধ করে বিস্মিত চোখে শুনছিল। প্রীতি মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে ওর মাথার ক্লিপ নিয়ে টানাটানি করছিল, যেটা শান্তির খুব অপছন্দ।
“একটা অনুরোধ—কলকাতায় যেও না। আমাদের সঙ্গে যোগ দাও। অস্মি-শান্তি চেন্নাইয়ের সাবারবে থাকার ব্যবস্থা করেছে। সমুদ্রের খুব কাছে, শান্ত পরিবেশ। তুমি রাজি হলে, কাল সকালেই চাবি পেতে পারো।” রমন এবার আসল কথাটা পাড়ে।
এটা যেন রূপকথা, আকাশ ভাবল। এমনটা বাস্তবে হয় না। হয়তো এখনও USA-তে, স্বপ্ন দেখছে, ICE আসেনি, ডিপোর্ট হয়নি, রমনকে দেখেনি, কিছুই সত্যি নয়। সে একটা মুরুক্কু নিয়ে কামড় দিল, সবাই সেই মুরুক্কু ভাঙ্গার শব্দ শুনতে পেল।
“তুমি কী বলো, আমন?”
আমন আইপ্যাড বন্ধ করে জিজ্ঞাসা করল, “চেন্নাই সাবার্ব থেকে আকাশ দেখতে পারব?”
“আমরা সবাই মিলে একটা নতুন আকাশ তৈরি করব, দেখো”—আকাশ আমনকে জড়িয়ে ধরল, চোখে জল, আর এই প্রথম, আমন সরে গেল না।