পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ফাঁকা শরীরের গান

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 204 view(s)
  • লিখেছেন : অনিরুদ্ধ দত্ত
শীতের রাত। কিন্তু মালতীর গা জ্বলছিল। ক্লিনিকের ভেরতটা নোংরা, দেওয়ালে মাছি বসে আছে, আর ওই ডাক্তার নামধারী মানুষটার হাত কাঁপছিল কি না সেটা স্পষ্ট মনে নেই- কারণ তার আগেই সে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল।

সবচেয়ে ভয়ের জিনিসটা যে ব্যথা তা মনে হয়নি। বরং কুঁড়ে খাচ্ছিল যে যন্ত্রণা, তা এই যে কীভাবে ঘুম থেকে উঠে দেখবে, নিজের ভেতর থেকে কিছু যেন তুলে নেওয়া হয়েছে-যার অস্তিত্ব আগে কখনও এত করে অনুভব করেনি সে।

সেদিন সকালে দালাল বুড়া ভোলা আসে। গায়ে ময়লা ফতুয়া, মুখে পানমশলার রঙ। মালিকের লোক।

"মালতী, তুই পরপর ক'দিন কাজ করিসনি। এইভাবে চললে মালিক অন্য লোক নিবে। তোর জায়গা থাকবে না।"

মালতী চুপ। তার শরীর তখনও কাঁপছে। তিন দিন আগে মাসিকের সময় ব্যথায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল সে। রামু চারপাশে দাঁড়িয়ে কিছুই করতে পারেনি। প্রতিবেশীরা জল ছিটিয়েছিল, লতা মাথায় হাত বুলিয়েছিল।

ভোলা আরও কাছে এসে বসে। গলার স্বর মায়াবী করে বলে-

"একটা ছোট্ট অপারেশন আছে। জরায়ুটা তুলে দিলেই এই ব্যথা থাকবে না। মাসের ওই ক'টা দিন আর কাজও বন্ধ থাকবে না। পুরো মজুরি পাবি। অনেক মেয়ে করেছে। সবাই ভালো আছে। দেখে আয় না, লতা-ও তো করিয়েছে।"

লতার নাম শুনে মালতী চমকে ওঠে। লতা তার সঙ্গী, পাশের কুঁড়েঘরের। সেও কি লুকিয়ে করিয়েছে?

ভোলা চলে যাওয়ার পর মালতী লতাকে ডাকে- “লতা, তুই ওইটা করিয়েছিস?"

লতা মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিছুক্ষণ চুপ থেকে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে-

"করিয়েছি রে। কী করবি বল? গেল বছর তিনবার কাজ বন্ধ করেছিলাম। মালিক বলল, এভাবে চললে তোকে রাখা যাবে না। রামলালের বউ তো কবেই হারিয়ে ফেলেছে চাকরি। ছ'মাস অনাহারে কাটিয়েছে।"

"কষ্ট হয়নি?”

"অপারেশনটা তেমন না। কিন্তু... মনটা খারাপ হয় রে। ভেতরটা যেন ফাঁকা লাগে। সকালে উঠে দেখি, আগের মতো নই। বুঝতে পারি না ঠিক কী কী নেই।"

লতা কথা শেষ করে চলে যায়। কিন্তু মালতী সেদিন রাতে ঘুমোতে পারেনি। তার মাথায় শুধু একটাই প্রশ্ন- আমার শরীরটা কি আমার না?
রামু সেদিন মদ খেয়ে ফিরেছিল। মালতী তাকে বলল-

"শুনলি রামু? ওই দালাল বলছে, জরায়ুটা তুলে দিতে। তাহলে কাজে যেতে পারবো প্রতিদিন।"

রামু চোখ মেলে তাকালো। তার বুদ্ধি তখন ধার কমে শান্ত।

"তুই যা ভালো মনে করিস, কর। আমি কী জানি ওসব!"

মালতী চোখ নামাল। স্বামীর এই আমার কী জানি কথাটা তার কাছে যেন আরেকটা ছুরির মতো। সে নিজে সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু নিজের শরীর নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা কি আদৌ আছে? স্বাধীনতা তো তখনই হয় যখন অন্য কিছু বলার থাকে। এখানে তো একটাই। না কাজ, না খাওয়া, না বাচ্চাদের মুখে অন্ন।

পরদিন সকালে সে রাজি হয়ে যায়। ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার সময় ভোলা পাশে বসেছিল।

পথে মালতী একবার জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল- আখের খেত দু'ধারে দাঁড়িয়ে আছে, যেন প্রহরীর মতো। আর সে যেন বন্দি।

ক্লিনিকের সামনে পৌঁছনোর আগে সে ভাবলো- এটা কি সত্যিই হচ্ছে? কিন্তু ট্রাক একসময় থামল, নেমে পড়তে হলো।

অপারেশন টেবিলে শুয়ে উপরের টিউবলাইটের দিকে তাকাল। মনে পড়ল ছোটবেলার সেই দিনের কথা- মা তাকে প্রথম মাসিকের কথা বলেছিল। মা বলেছিল, "এটা তোর শরীরের বিশেষ জিনিস। এটা থাকলে তুই মা হতে পারবি। এটা তোর শক্তি।"

আজ সেই শক্তিটাকেই তারা সমস্যা বলছে। আর সে সেটা কেটে ফেলতে রাজি হয়েছে। চোখ বোজার আগে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।

অপারেশনের পর যখন জ্ঞান ফিরল, প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না মালতী। শুধু তলপেটে একটা শূন্যতা। যেমন কোনো গাছ উপড়ে ফেললে জমিতে গর্ত থেকে যায়, তেমনই।

ক্লিনিকের দিদি বলেছে, "দু'দিন বিশ্রাম নিও। বেশি নড়াচড়া কোরো না।" কিন্তু মালতীর বিশ্রাম নেওয়ার সময় নেই। তৃতীয় দিনেই ভোলা এসে বলল, "কাল থেকে কাজে নামতে হবে। বেশি মানুষ নেই। আখ কাটার মরশুম চলছে।"

মালতী বলল, "এখনও ব্যথা করে।"

ভোলা হেসে বলল, "ওসব মন থেকে ভুলে গেলেই ভালো। দেখ, লতা কেমন কাজ করছে।"

লতার দিকে তাকালো মালতী। লতা তখন কাস্তে হাতে আখ কাটছে। তার মুখ শুকনো, চোখের নিচে কালি, কিন্তু কাজ থামছে না। একসময় মালতীও উঠে পড়ল। কাস্তে হাতে নিল। প্রথম কয়েকটা কাস্তের আঘাতে শরীরে ব্যথা ছুটলো, কিন্তু দাঁত চেপে তা চাপা দিল।

সারাদিন কাজের পর সন্ধ্যায় কুঁড়েঘরে ফিরে সে শুয়ে পড়লো। কাজল এসে জিজ্ঞেস করল, "মা, তোমার কী হয়েছে? ডাক্তার দেখিয়েছ?"
মালতী বলল, "দেখিয়েছি। এখন ভালো আছি।"

কিন্তু ভালো তো ছিল না। রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়লো, মালতী হাত বুলিয়ে দেখল নিজের পেট। সেই জায়গাটা যেখানে আগে সন্তানেরা বেড়ে উঠেছিল, আজ সেখানে শুধু সেলাই করা ক্ষত।

তার খুব কান্না পেল। কিন্তু কান্নাটা বেরোল শুধু এক চাপা আর্তনাদ- যা শুধু তার বুকে বাজল, কেউ শুনতে পেল না।

একদিন দুপুরে খাওয়ার বিরতিতে লতা ও মালতী আখের গাদার পাশে বসে ছিল। লতা হঠাৎ বলল- “আমার আর মাস হয় না, জানিস?"

মালতী চমকে উঠল। "কী বলছিস?”

"সত্যি। অপারেশনের পর থেকে একটাও হয়নি। বুড়া ভোলা বলেছিল, জরায়ুটা না থাকলে মাস হবে না। কিন্তু আমাকে সেটা আগে বলেনি।"

মালতীর বুকের ভেতর ধড়ফড় করতে লাগল। "তুই জানতিস না?”

"জানতাম না। তারা বলেছিল, শুধু ব্যথাটা যাবে। মাস হবে, কিন্তু ব্যথা থাকবে না।"

"তাহলে এখন তোর...?"

"কিছুই না। শুধু ফাঁকা। সকালে ওঠে দেখি, আগের মতো শরীর নেই। কেমন যেন... অচল।"

লতা তখন মাটিতে আঙুল দিয়ে আঁক কাটছিল। আঁকা শেষ করে বলল-

"একটা সাপ ছিল। তার বিষ ছিল। ওরা বলল, বিষটাই বের করে দিচ্ছি। কিন্তু সাপটাও বের করে দিল। এখন ওই জায়গাটা ফাঁকা। আর কিছু ওখানে লাগাবেও না।"

লতার হাতটা ধরে ফেলল মালতী। দুই নারী চুপ করে রইল। ওদিকে আখের খেতে পুরুষ শ্রমিকরা হাসছে। চিৎকার করছে, ট্রাকে আখ তুলছে। আর এদিকে দুই নারীর হাত ধরা- একটা নীরব বিদ্রোহের মতো।

লতা ফিসফিস করে বলল, "আমার মেয়ে বড় হলে ওকে বলবো- ওর শরীর ওর। ওর রক্ত ওর থাকবে। আর কেউ যেন ওর ভেতরটা খালি করতে না পারে।"

অপারেশনের পর মাসখানেক কেটে গেল। মালতী প্রতিদিন কাজ করছে। তার শরীরে আগের মতো শক্তি নেই, কিন্তু থেমে থাকার উপায় নেই।

একদিন সকালে মালিক নিজে মাঠে এল। গায়ে সিল্কের পাঞ্জাবি, গলায় সোনার চেন। হাতে সিগারেট। সব শ্রমিকদের দিকে তাকিয়ে সে সন্তুষ্ট হয়ে বলল- "দেখছি সবাই এখন ভালো কাজ করছে। মেয়েরা আগের চেয়ে বেশি কাজ দিচ্ছে। ওই অপারেশনের দরুন মাসের ওই কটা দিনের সমস্যাটা গেছে। ভালো ব্যবস্থা করেছে দালাল ভোলা।"

মালিক কথা শেষ করে ফিরে যাচ্ছিল। হঠাৎ মালতী এগিয়ে গেল। লতা তাকে টেনে ধরতে চাইল, কিন্তু সে সামনে দাঁড়াল।
"আমার শরীর আমার,” মালতী বলল। গলা ভারী, কিন্তু চোখে আগুন।

মালিক থমকে দাঁড়াল। ভ্রু কুঁচকে বলল, "কী বলছিস?"

"আপনার হিসেবের খাতায় আমার জরায়ুর দাম লেখা আছে নাকি? আপনার আখের মিষ্টির সঙ্গে ওটার কী সম্পর্ক?"

মাঠের সব কাজ বন্ধ হয়ে গেল। পুরুষ শ্রমিকরা কাস্তে নামিয়ে রাখলো। মহিলারা দাঁড়িয়ে গেল। লতার চোখ বড় বড়।

মালিকের চেহারা হয়ে উঠল রক্তবর্ণ। "তুই আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলবি? তোর জায়গা নেই এখানে। বের করে দেবো।"

মালতী বলল, "বের করবেন। কিন্তু আপনি জানেন কেন আমি ওই অপারেশন করিয়েছি?

কারণ আপনার দালাল বলেছিল, না করলে কাজ থাকবে না। আর কাজ না থাকলে আমার মেয়েরা না খেয়ে থাকবে। আপনার আখের জন্য আমি নিজের জরায়ু বিলিয়ে দিয়েছি। আর এখন আপনি বলবেন আমার এখানে জায়গা নেই?"

মাঠে নিস্তব্ধতা। কেউ নড়ছে না।

মালিক কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। তারপর হয়তো সিগারেটটা মাটিতে ফেলে পা-চাপা দিয়ে বলল, "তুই পাগল হয়ে গেছিস।"

বলে সে চলে গেল। কিন্তু তার পায়ের আওয়াজটা বেশ ভারি ছিল।

লতা দৌড়ে মালতীর কাছে এসে বলল, "পাগলি! ও তোকে বের করে দিতে পারে।"

মালতী হাসল। সেই হাসিতে প্রথমবারের মতো কিছু বল ছিল। সে বলল, "বের করলে অন্য জায়গায় কাজ করব। কিন্তু আর চুপ করে থাকব না।"

সেদিন সন্ধ্যায় মালতী কুঁড়েঘরে ফিরে কাজলকে জড়িয়ে ধরল। কাজলের গায়ে স্কুলের গন্ধ। বইয়ের, কালির, আর মাটির গন্ধ।

"মা, তুমি আজ কী করলে মাঠে? সবার মুখে শুনলাম।"

মালতী বলল, "আমি আজ একটা দেয়াল ভাঙার চেষ্টা করেছি। হয়তো ভাঙেনি, কিন্তু ফাটল ধরিয়েছি। তুই বড় হলে এই ফাটল ধরে পুরো দেয়ালটা ভাঙবি।"

রাতে মালতী ঘুমোতে গিয়ে হাত নিজের পেটে রাখল। ফাঁকা জায়গাটা এখনও ফাঁকা।

কিন্তু তার ভেতর অন্য কিছু গজাতে শুরু করেছে- যেটা অপারেশনের ছুরি দিয়ে কাটা যায় না। সেটার নাম প্রতিবাদ। সেটার নাম মাতৃত্বের নতুন সংজ্ঞা- যেখানে জরায়ু নেই, কিন্তু দাবি আছে। যেখানে শরীর নেই নিজের বলে, কিন্তু অধিকার আছে।

বাইরে আখের খেতে হাওয়া উঠল। আখের পাতা নুয়ে পড়ল, সোজা হয়ে দাঁড়াল। আর মালতীর ঘুম ভাঙল না। প্রথমবারের মতো অনেকদিন পর তার ঘুম গভীরে। যেন তার শরীরের ফাঁকা জায়গাটা কোনও অদৃশ্য শিকড়ে ভরে যাচ্ছে।

পরের দিন সকালে মাঠে নামার সময় মালতী দেখল, লতা আগে থেকেই দাঁড়িয়ে।
লতার চোখে অন্য রকম চমক কিন্তু সেই চমক ভয়ের, বিদ্রোহের নয়।

"তোর কথায় আজ কেউ কাজে আসেনি," লতা ফিসফিস করে বলল, গলায় আতঙ্ক।

মালতী তাকাল। সত্যি, মাঠে দু-চারজন পুরুষ। মহিলারা আসেনি কেউ। খবরটা রাতারাতি ছড়িয়ে গেছে- কীভাবে ছড়াল, কে ছড়াল, কেউ জানে না। কিন্তু গ্রামে এমনিতেই খবর বাতাসের মতো ছড়ায়।

দূর থেকে মালিকের গাড়ির ধুলো ওড়ে। মালিক নেমে এলেন। সেদিন তার মুখে আগের দিনের চেয়ে বেশি রোষ ছিল না। বরং একটা ঠাণ্ডা হিসেব ছিল।

মালিক মালতীর সামনে এসে দাঁড়ালো। বললো, "তোর নামে খবর গেছে। তুই নাকি সব মেয়েদের কাজ বন্ধ করতে বলেছিস?"

"আমি বলিনি,” মালতী বলল। "আমি শুধু নিজের কথা বলেছি।"

মালিক হাসলো। সেই হাসির ভেতর অবজ্ঞা ছিল না, ছিল দূরদর্শিতার হিসেব। পকেট থেকে একটা কাগজ বের করলেন।

"দেখ, এটা তোর অপারেশনের কাগজ। তুই নিজে রাজি হয়ে সই করেছিস। ওই ক্লিনিকটা বন্ধ হয়ে গেছে গতকাল। ডাক্তার পালিয়েছে। এখন পুলিশ জানতে চাইবে- কে তোকে পাঠিয়েছে, কে টাকা দিয়েছে।"

মালতীর মুখ শুকিয়ে গেল।

"আমি কিছু জানি না," সে বলল।

"জানিস না মানে? তুই জানিস না কে তোকে অপারেশন করতে পাঠিয়েছে? জানিস না কে টাকা দিয়েছে?”

মালতী চুপ করল। সে জানত। ভোলা দালাল। কিন্তু ভোলার পিছনে মালিক। এই কথাটা বলতে গেলে তার প্রমাণ নেই। আর প্রমাণ না থাকলে বলাটা মানে মিথ্যা অপবাদ। আর মিথ্যা অপবাদ দিলে মালিক তাকে চিরদিনের জন্য বের করে দিতে পারে। শুধু তাকে নয়, রামুকেও। তখন কী খাবে তার মেয়েরা?

লতা পাশে এসে দাঁড়াল। তার হাত কাঁপছে। "দেখ মালতী,” মালিক বলল, "আমি তোর প্রতি সদয়। তুই যা করেছিস, তা নিয়ে কথা বললে তোর নিজেরই ক্ষতি। ওই মেয়েরা আজ কাজে আসেনি, কিন্তু কাল আসবে। কারণ তাদের খেতে হবে। ভুখা তো মরবে না। তুই যদি পুলিশে যাস, সেখানে তোর সই আছে। তুই রাজি হয়ে করিয়েছিস। জোর করে কেউ করেনি। তাহলে তোর দোষ কী?"

মালতী বুঝতে পারল ফাঁদ। তারা তাকে এমন জায়গায় ফেলে দিয়েছে যেখান থেকে ফেরার পথ নেই। যদি চুপ করে থাকে, তবে সে হার মানল। যদি কথা বলে, তবে তার সই প্রমাণ হয়ে দাঁড়াবে যে সে নিজে রাজি হয়েছিল। আর জোর জবরদস্তির কোনো প্রমাণ নেই।
ভোলা পালিয়ে গেছে। ডাক্তার পালিয়ে গেছে। আছে শুধু কাগজে তার নাম আর সই।

সে ফিরে এল কুঁড়েঘরে। কাজল তখনও ঘুমোচ্ছিল। মালতী বসে পড়ল। রামু এসে বলল, "কী হয়েছে? সবাই বলছে তুই মালিকের সঙ্গে কথা বলছিলি?"

মালতী কিছু বলল না।

রামু আবার বলল, "শুন, আমি ওই কাজের ব্যবস্থা করিনি। তুই নিজে রাজি হয়েছিলি।

তাইলে এখন কথা কিসের?"

মালতী রামুর মুখের দিকে তাকাল। এই একই পুরুষ, যে কদিন আগে বলেছিল- তুই যা ভালো মনে করিস। আজ সে বলছে, তুই নিজে রাজি হয়েছিলি।

সে বুঝতে পারল- এই পৃথিবীতে মেয়েদের রাজি হওয়ার মানে তারই দোষ। আর পুরুষের নীরবতা মানে হলো পুরুষ নির্দোষ।

সন্ধ্যায় লতা এল। দু'জনে বসে রইল। লতা বলল, 'কাল বিকেলে আমার স্বামী বলল-ওসব নিয়ে মাথা ঘামালে সংসার যাবে না। চুপ করে কাজ কর।"

মালতী বলল, "আমার স্বামীও তাই বলল।"

লতা চোখ মুছল। "তবে কী হবে রে?”

মালতী আকাশের দিকে তাকাল। চাঁদ তখনো ওঠেনি। আকাশ অন্ধকার, শুধু কয়েকটা

তারা জ্বলছে- অনিশ্চিত, ফিকে।

"জানি না, মালতী বলল। "শুধু এটা জানি আমার মেয়েরা বড় হলে তাদের এই গল্পটা ঠিক মতো বলতে হবে। বলতে হবে, তাদের মা একবার লড়তে গিয়েছিল। আর হেরেছিল।"

লতা বলল, "হেরেছিল?"

"হ্যাঁ। জিততে পারিনি। কিন্তু লড়তে গিয়েছিলাম। এটুকুও কি কম?"

লতা কিছু বলল না। আঁধারে দু'জন নারী পাশাপাশি বসে রইল। তাদের পায়ের কাছে কাস্তে পড়ে আছে। কাল আবার ভোর হবে। কাল আবার মাঠে নামতে হবে। কাল আবার সেই একই কাজ, সেই একই শরীর, সেই একই ফাঁকা ভেতর। কিন্তু আজ রাতে, শুধু আজ রাতে- মালতী জানে, সে চুপ করে থাকলেও তার ভেতরের সেই ফাঁকা জায়গাটা আর পুরোপুরি ফাঁকা নেই। সেখানে একটা প্রশ্ন গেঁথে গেছে, যার উত্তর হয়তো তার মেয়েরা একদিন খুঁজে পাবে। নাহয় পাবে না। তবুও প্রশ্নটা থেকে গেল।

বাইরে আখের খেতে হাওয়া ওঠে। আখের মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসে। সেই মিষ্টি গন্ধের নিচে চাপা পড়ে থাকে রক্ত, জরায়ু, আর হারানো স্বপ্নের হিসাব।

কাল আবার সূর্য উঠবে। মালতী আবার কাস্তে হাতে নেবে। কিন্তু আজ রাতে- এই একটা রাত- তার কাছে নিজের। এই রাতে সে কেবল হারিয়ে যাওয়া সেই শরীরটাকে মনে করে, যে শরীরটা একসময় তার ছিল। সত্যিই কি ছিল? নাকি জন্ম থেকেই তা অন্যের ছিল?

জানে না। চাঁদ এখনো ওঠেনি।

0 Comments

Post Comment