পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

নাৎসি ভাবাদর্শ ও জার্মানি ইয়ার জিরো

  • 15 May, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 1025 view(s)
  • লিখেছেন : মানস ঘোষ
যুদ্ধ শেষ, নাৎসি বাহিনী পরাজিত, কিন্তু নাৎসিবাদের হাত থেকে পরিত্রাণ মিলবে না সহজে। বহু তরুণের নবীন চেতনা আর বুদ্ধিকে বিষিয়ে তোলার ক্ষমতা তারা আজও রাখে। নাৎসিবাহিনীর থেকে কিছু কম ভয়ঙ্কর নয় নাৎসি মতাদর্শ। জার্মানি ইয়ার জিরো, রবার্তো রোজেলিনি’র এই ছবিটি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দেখা যাবে আজকের ভারতবর্ষ যখন এই হিন্দুত্ববাদী বিজেপি আরএসএসের কবল থেকে মুক্তি পাবে, তখন কি থাকবে? কি অদ্ভুত সাদৃশ্য। আলোচনা করলেন মানস ঘোষ।

জার্মানি ইয়ার জিরো, রবার্তো রোজেলিনি’র ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ত্রয়ী’ সিরিজের শেষ ছবি। রোম, ওপেন সিটি (১৯8৫) ও পাইসঁ (১৯8৬) ছবি দুটির সূত্রে ইটালির এই নব্য বাস্তববাদী চলচ্চিত্রকারের পরিচিতি তখন ইউরোপ তথা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রসারিত। রোজেলিনি তাঁর পরের ছবির প্রেক্ষাপট হিসাবে বেছে নিলেন বার্লিন শহরকে। পরাজিত নাৎসিবাহিনী। একদা রূপকথার নগর, জ্ঞানবিজ্ঞান, সাহিত্য নাট্যকলা আর দর্শনের পীঠস্থান বার্লিন এখন ধস্ত-নগরী। হতাশার অন্ধকারে ডুবে যাওয়া জার্মান সমাজ যুদ্ধের দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠে নিজেদের আবিষ্কার করছে ধবংসস্তুপের মধ্যে নিরন্ন ভিক্ষুকের মতো। কোথায় সেই জার্মান প্রাইড, কোথায় দাম্ভিক একনায়ক আর তার সাগরেদরা, কোথায় নাৎসি সৈন্যের সামরিক জাঁকজমক! চারিদিকে কেবল ধবংসের চিহ্ন, পোড়া চ্যান্সেলার হাউস আর রাইখস্ট্যাগ, বোমায় গুঁড়িয়ে যাওয়া ভগ্ন-প্রাসাদ। প্রায় সুনসান রাস্তাঘাট, আর রুটির জন্য অন্নহীন লম্বা লাইন। মাঝেমাঝে অন্ধকার রাস্তার বুক চিরে বিদেশি মিলিটারি ট্র্যাকের তীব্র হেডলাইট; তারপর আবার অন্তহীন অন্ধকার। হত্যা আর ধবংসের চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অর্ধমৃত নগর।

বেশিদিন আগের কথা নয়, পনেরো-বিশ বছর আগেই যে নগরে মেধার আলো ছড়াতেন আলবার্ট আইন্সটাইন, বের্টল্ট ব্রেখট, ওয়াল্টার বেঞ্জামিন, টমাস মান। নাৎসি শাসনের কল্যাণে আজ তা শ্মশানভূমি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কা সামলেও যে নগর একদিন ছিল জীবনের কল্লোলে মুখরিত আজ তা গলিত শবদেহ আর কঙ্কালসার অট্টালিকার সমাহার-মাত্র। সেখানে মানবিকতার চিহ্নমাত্র নেই, কিন্তু তবু কিছু মানুষ এখনো আছে। বিত্তবানরা পালিয়েছে, নাৎসিরা হয় মরেছে অথবা ভোল বদলেছে। কিন্তু বিত্তহীন, জীবিকাহীন, যুদ্ধে পঙ্গু মানুষগুলোকে বহন করে যেতে হচ্ছে নাৎসি শাসনের চূডান্ত পরিণতির দায়। জীবনের ভারে নুব্জ্য এই মানুষগুলোকে হিটলার-বাহিনী প্রলোভন দেখিয়েছিল উজ্জ্বল ভবিষ্যতের। সেই ঘৃণিত ঘাতকবাহিনী আজ পরাভূত। কিন্তু তারা তো কেবল নিজেরা ধবংস হয়নি, ধবংস করে গেছে জার্মান সমাজটাকে। তাদের কৃতকর্মের বিষবাষ্পে আজও ছেয়ে জার্মানির আকাশ।

যুদ্ধ শেষ কিন্তু আর এক যুদ্ধ উপস্থিত – জীবনযুদ্ধ। বিধস্ত জার্মান সমাজ কি আবার উঠে দাঁড়াতে পারবে অন্য সকালের আলোয়? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে রোজেলিনি একদিন মোটরে চড়ে রওনা হলেন রোম থেকে বার্লিনের উদ্দেশে। নগরের প্রান্তে তিনি দেখলেন একটা দোকান, নাম ‘ইজরায়েল স্টোর’। (হিব্রু মিথে ইয়াকবের আর এক নাম ইজরায়েল) এক ইহুদি দোকানি তার পসরা সাজিয়ে বসেছে। রোজেলিনি বুঝলেন জার্মান ইহুদিরা আবার এক এক করে ফিরে আসছে তাদের জন্মভূমিতে। ধবংসের অন্ধকারে একটু আশার আলো দেখলেন তিনি। আসলে সব প্রকৃত শিল্পীর মতো তিনিও মনে করতেন মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। কিন্তু এটুকু তো যথেষ্ট নয়। রোজেলিনি’র মতো শিল্পী যিনি বাস্তবের চুলচেরা বিশ্লষণে অভ্যস্ত তাঁকে যেতে হবে আরো গভীরে। তিনি জানতেন হিটলার মরেছে, নাৎসিবাহিনী পলাতক কিন্তু যে মতাদর্শগত বিষ তারা ছড়িয়েছে সমাজে তা আমাদের স্লো পয়াজন করে চলবে আরো অনেক কাল। নাৎসি শাসন-পরবর্তী নাৎসিবাদের বিশ্লেষণ দরকার। জার্মানি ইয়ার জিরো (১৯৪৮) সেই কাজটাই করেছে।

ছবির শিরোনাম তিনি ধার নিলেন বিখ্যাত ফরাসী ইহুদি সমাজতাত্ত্বিক এদগা মোরাঁ’র ঐ একই নামের বই থেকে (লঁ জিহু দে ল’এ্যলমঁন, ১৯8৬)। মোরাঁ তাঁর বইতে জার্মান সমাজকে এক পরাভূত জাতি হিসেবে না দেখে দেখলেন এমন এক জনগোষ্ঠী হিসাবে যারা নাৎসি মতাদর্শের শিকার। যাদের স্বাভাবিক সামাজিক জীবন আর নীতিবোধ ঘরে বাইরে আক্রান্ত হয়েছে ঘৃণার আবহে। নাৎসি-বাহিনী যখন প্যারিস অধিকার করলো, দেখা গেল বেশিরভাগ ফরাসি বুদ্ধিজীবী পালাতে ব্যস্ত। হাতে গোনা যে ক’জন প্রতিরোধের পথে হাঁটলেন এদগা মোরাঁ তাঁদের মধ্যে প্রথম সারির মুখ। তিনি গোপনে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিলেন।

পরে প্রতিরোধ বাহিনীর অন্যতম হয়ে পশ্চাদ্ধাবনকারী নাৎসিবাহিনীকে তাড়া করে তিনি বার্লিন পৌঁছুলেন। তখন হতভাগ্য জার্মানদের প্রতি বর্ষিত হচ্ছে ঘৃণা। বিদেশি সৈন্যরা তাদের বলতো “sale boches” যার অর্থ ‘নোংরা জার্মান’। তিনি এই ঘৃণার আবহ থেকে সরে এসে একেবারে সাধারণ জার্মান মানুষগুলোকে দেখতে চাইলেন। বুঝলেন, ফাসিস্ত মতাদর্শের সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের যোগসূত্র বিবিধ জটিলতায় পূর্ণ। কিভাবে একটা সুপ্রাচীন আধুনিক সমাজ নাৎসিদের ‘আতংকের শাসন’কে মেনে নিল, মান্যতা দিল? তিনি দেখলেন বিশ্লেষণের রাস্তাটা বেশ জটিল। যাকে তিনি পরে বলেছেন “complex thought”। তরুণ এদগা মোরাঁ জার্মানসমাজকে কাছ থেকে দেখে লিখলেন তাঁর বই লঁ জিহু দে ল’এ্যলমঁন, যা ইংরাজিতে অনুদিত হয় জার্মানি ইয়ার জিরো নামে।

রোসেলিনি’র ফিল্ম শুরু হয় যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত বার্লিনের ছবি দেখিয়ে। চলমান ক্যামেরায় ধরা পড়ে শহরের বিভিন্ন প্রান্তের ভগ্নদশা। রাস্তায় মানুষ দেখা যাচ্ছে হাতে গোনা। বড়বড় বাড়ি সব দাঁড়িয়ে আছে যেন বাজে পোড়া তালগাছ। এইরকম একটা বিরাট ভাঙ্গাচোরা বাড়ির এক অপরিসর ফ্ল্যাটে মাথাগুজে বাস করে কোহলার পরিবার। বৃদ্ধ অসুস্থ কোহলার, মেয়ে ইভা, যুদ্ধ-ফেরৎ বড়ছেলে কার্ল হেইঞ্জ আর ছোটছেলে তেরো বছরের এডমুন্ড। বৃদ্ধ কোহলারের সামান্য পেনশন, তাও বন্ধ। চাকরি নেই মেয়ে ইভার। হতাশ কার্ল হেইঞ্জ বাড়িতেই বসে থাকে। ছোটছেলে এডমুন্ড স্কুল-ছুট। সেও সামান্য রোজগারের চেষ্টায় শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়াতে থাকে। নিদেনপক্ষে যদি সেদিনের লাঞ্চ বা ডিনারটুকু মিলে যায়। ইভা মিত্রশক্তির সেনাদের পার্টিতে যায় প্রায় প্রতি সন্ধ্যায়, রাতের খাবারটুকু সেখানে মেলে। কার্ল হেইঞ্জ বাড়ি থেকে বেরোয় না। বৃদ্ধ কোহলারের অসুস্থ শরীর ক্রমে আরো ভেঙ্গে পড়তে থাকে অনাহার আর অপুষ্টিতে। ইভা আর এডমুন্ড চেষ্টা করে বাপ-দাদার জন্য খাবার যোগাড় করে আনতে, কিন্তু সে আর কতটুকু!

ছোট্ট এডমুন্ড একদিন রাস্তায় দেখা পায় তার ছেড়ে আসা স্কুলের প্রাক্তন এক শিক্ষকের। নাম তার হের হেনিং। সে এডমুন্ডকে ডেকে নিয়ে যায় একটা ভাঙ্গা বাড়ির ভেতর। হেনিং-এর কথাবার্তায় আমরা বুঝি, সব গেছে, তবু ভাঙ্গা প্রাসাদের ভিতর গোপন ডেরায় তারা এখনো নাৎসিবাদ চর্চা করে। হেনিং তার শিক্ষক পরিচয় কাজে লাগিয়ে তরুণ বালক-বালিকাদের ধরে আনে সেখানে। তারপর চলে সাবধানে তাদের মগজ-ধোলাই। স্কুল-ছুট, ক্ষুধার্ত, উপসী বাচ্চাগুলো হেনিং-এর ফাঁদে পা দেয় সহজেই। হেনিং এদের পরিচয় করিয়ে দেয় ব্ল্যাক মার্কেটের সঙ্গে। সন্ধ্যা নামলে তারা চোরাই মাল বা নিষিদ্ধ জিনিসপত্র বিক্রি করে সামান্য অর্থ উপার্জন করে আর দিনেরবেলায় মাঝেমধ্যে চলে তাদের মাথায় নাৎসি মতাদর্শের বিষ ঢোকানোর কাজ।

একদিন হেনিং এডমুন্ডকে হিটলারের ভাষণের একটা লং প্লে রেকর্ড দিয়ে বলে সেটা লুকিয়ে বিক্রি করে আসতে হবে। সঙ্গে একটা প্লেয়ারও দিয়ে দেয়। কয়েকজন মিত্র সেনা মেমেন্টো হিসাবে সে রেকর্ড কিনতে রাজি হয়ে যায়। রেকর্ডটা ভালোভাবে চলছে কিনা পরীক্ষার জন্য পরিত্যক্ত, ভগ্ন, ভৌতিক চ্যান্সেলার হাউসের (হিটলারের নিবাস ছিল) আলো-ছায়ার মধ্যে তাদের ডেকে নিয়ে রেকর্ডটা চালিয়ে দেয় এডমুণ্ড। হিটলারের স্বর শোনা যায়, ক্রমে তা স্বভাবসিদ্ধ উচ্চগ্রামে পৌঁছোয়। একদিন কত জার্মান এই স্বর শুনে উন্মাদ হয়ে উঠত, বিশ্বাস করত তারা হবে বিশ্বসেরা। আজ তা যেন মনে হয় ধবংসস্তূপ থেকে উঠে আসা অতৃপ্ত প্রেতের কন্ঠস্বর! সাউন্ড ট্র্যাকে বক্তৃতা চলতে থাকে, রোসেলিনি’র ক্যামেরা চলে যায় অন্য জায়গায়। দেখা যায় বোমাবর্ষণে ভগ্ন পোড়া অট্টালিকা; দেখা যায় একটা অর্ধেক ধবংসপ্রাপ্ত বিরাট বাড়ির ভাঙ্গাচোরা চত্বর বরাবর এক বৃদ্ধের সঙ্গে হেঁটে আসছে একটি শিশু। শ্রাব্য ও দৃশ্য মিলে একটা অদ্ভূত অনুভূতির জন্ম হয়। কিছুটা বিদ্রুপাত্মক কিছুটা মর্মান্তিক। নাৎসি মতাদর্শের চরম পরিণতি।

হত্যা, মৃত্যু, আত্মহনন – দিনের শেষে এই তো ফ্যাসিবাদের অবদান। জিঘাংসা ও বাহুবলের উন্মত্ত দম্ভ, দুর্বলকে ‘অপর’ বলে দেগে দিয়ে তাকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা, এই হলো নাৎসিবাদ-ফ্যাসিবাদের বিশ্বজনীন মতাদর্শ। বালক এডমুন্ডকে বিশ্বাস করতে শেখেনো হয় যে দুর্বলের স্থান নেই সমাজে। শক্তিমানই কেবল পারে জাতিকে ‘রক্ষা’ করতে। এডমুন্ড একদিন চায়ের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে তার বৃদ্ধ ও অসুস্থ শয্যাশায়ী পিতাকে হত্যা করে বসে। কারণ তাকে শেখানো হয়েছে দুর্বলরা সমাজের ‘বোঝা’। এই ভয়াবহ কাজটা করার পর সে বাড়ির বাইরে আসে। তার মধ্যে একটা পরিবর্তন দেখা যায়। অস্থির এডমুন্ড যেন কিছুটা বুঝতে পারছে সে কি করেছে। সে হেনিং-এর কাছে যায়, হেনিং তার কৃতকর্মের নৈতিক দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে। এডমুন্ড আবার নেমে আসে রাস্তায়। কোথায় যাবে এবার সে? উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে থাকে পথে পথে। সে আপ্রাণ চেষ্টা করে নিষ্পাপ শৈশবের কাছে ফিরে যেতে। একদল ছেলে রাস্তায় ফুটবল খেলছে, সে তাদের দলে মিশে যেতে চায়। তারা তাকে খেলতে নেয় না। সে একাই এক্কা-দোক্কা খেলার চেষ্টা করে। না, হচ্ছে না। এডমুন্ড বুঝতে পারে আর কোনোদিন সে শৈশবে ফিরতে পারবে না। সে খুনি, ঠান্ডা মাথায় খুন করেছে। আর তার ফেরার জায়গা নেই। নাৎসিবাদের বিষ গলাধকরণ করে তার শরীর আজ বিষে নীল। পরিত্রাণের পথ নেই। ধীর গতিতে হেঁটে সে একটা পরিত্যক্ত বাড়ির উপর পৌঁছোয়। তারপর সেখান থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে। হতভাগ্য এডমুন্ডের ছোট্ট প্রাণহীন দেহটা পড়ে থাকে পথের ধারে।

যুদ্ধ শেষ, নাৎসি বাহিনী পরাজিত, কিন্তু নাৎসিবাদের হাত থেকে পরিত্রাণ মিলবে না সহজে। বহু তরুণের নবীন চেতনা আর বুদ্ধিকে বিষিয়ে তোলার ক্ষমতা তারা আজও রাখে। নাৎসিবাহিনীর থেকে কিছু কম ভয়ঙ্কর নয় নাৎসি মতাদর্শ।

0 Comments

Post Comment