পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

টিপু সুলতান (২০.১১.১৭৫০ - ৪.৫.১৭৯৯)

  • 15 June, 2023
  • 1 Comment(s)
  • 1423 view(s)
  • লিখেছেন : কণিষ্ক চৌধুরী
টিপু সুলতানের চিঠি, মন্দির থেকে প্রাপ্ত সনদ ও ঐতিহাসিক গবেষণা থেকে জানা যায় তিনি ছিলেন একজন উচ্চ শিক্ষিত, একাধিক ভাষায় জ্ঞানী মানুষ। এক কথায় আলোকদীপ্ত শাসক। তিনি তাঁর পিতা হায়দার আলির (১৭২০-১৭৮২ ) মতোই দৃঢ়চেতা, বিবেকবান ও উদার। ইসলামধর্মী নয় এমন বহু ব্যক্তিকেই প্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ তাঁরা দান করেন। আজকে যে টিপু সুলতানের চরিত্র হনন করা হচ্ছে, তাঁর উদ্দেশ্য কী? সেই নিয়েই আজকের আলোচনা। ইতিহাসকে ফিরে দেখা।

১.

হিন্দুত্ববাদীরা ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী ইতিহাসবিদদের জুতোয় পা গলিয়ে চলে – তা আরো একবার প্রমাণ হলো টিপু সুলতান - প্রসঙ্গে। বর্তমানে হিন্দুত্ববাদীরা টিপু সুলতান সম্পর্কে যে সব অভিযোগ তুলছে সেগুলি ইংরেজদের তোলা অভিযোগের মাছি মারা নকল। ১৯৪৭-র পূর্বে হিন্দুত্ববাদীরা যে ব্রিটিশ ভক্তি দেখিয়ে দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, এখনো সে ভক্তি যে অটুট আছে তা বেশ স্পষ্ট। টিপু সুলতানের লক্ষ্যই ছিল দেশের কল্যাণ এবং মাতৃভূমির শত্রুদের বিনাশ। তাই তাঁকে লড়তে হয়েছিল একদিকে মেরুদণ্ডহীন, স্বার্থপর, ক্ষমতালোলুপ দেশীয় শাসক ও জমিদারদের বিরুদ্ধে আর অন্যদিকে কুচক্রী, নিষ্ঠুর পররাজ্যগ্রাসী ইংরেজদের বিতাড়নের লক্ষ্যে। ফলে ইংরাজ লেখকরা তাঁকে মোটেই সুনজরে দেখেনি। তাঁর সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে জন্ম দিয়েছে পাহাড় প্রমাণ মিথ্যার। এইরকম এক মিথ্যাবাদী লেখক হলেন উইলিয়াম কীর্কপ্যাট্রিক (১৭৫৪-১৮১২)। কোম্পানির এই ধুরন্ধর অফিসারটি টিপু সুলতানের নামে বেশ ভালোরকমই নিন্দেমন্দ করেছেন। লন্ডন থেকে ১৮১১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত গ্রন্থ Letters of Tippoo Sultan to Various public Functionaries গ্রন্থে তিনি টিপুকে অসহিষ্ণু ধর্মান্ধ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। মার্ক উইলকস তার History of Mysore-এ টিপুর 'ধর্মান্ধতা'র সঙ্গে যুক্ত করেছে আরো নানা গল্প কথা। তাঁর মতে, বল প্রয়োগ করে ধর্মান্তর ছাড়াও টিপু মন্দির ধ্বংস করে, মন্দির ও ব্রাহ্মণদের জমি কেড়ে নিত। তাই উইলকস টিপুকে অসহিষ্ণু ধর্মান্ধ বলেই চিহ্নিত করতে চায়। বিংশ শতাব্দীতেও এই ধরনের প্রচার থেমে থাকেনি। ১৯২১-এ জে. আর. হেন্ডারসন টিপুকে নিষ্ঠুর ও ধর্মান্ধ বলেই বর্ণনা করেছে। বর্তমানে হিন্দুত্ববাদীদের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে তাদের ব্রিটিশ প্রভুদের কণ্ঠস্বর।

 

২.

অভিযোগগুলি যে সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা তা ইতিহাসের পাতা উল্টালেই নজরে পড়বে। সুরেন্দ্রনাথ সেন-এর মতো পণ্ডিতের মতে, টিপু মোটেই ধর্মান্ধ ছিলেন না। এন. কে. সিনহা টিপুর ধর্মীয় উদারতার উপরে আলোকপাত করেছেন। (N. K. Sinha- 2001: 8:468)। মহাব্বুল হাসান এ বিষয়ে আরো বিস্তৃত আলোচনা করে দেখিয়েছেন যে, টিপু সুলতান একেবারেই ধর্মান্ধ বা হিন্দু বিদ্বেষী ছিলেন না। বরং উল্টোটাই সত্য। তিনি ছিলেন পরধর্ম সহিষ্ণু প্রজাপালক উদার শাসক। সমরেশ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর আলোচনাতে প্রমাণ করে দিয়েছেন, কীর্কপ্যাট্রিক বা উইলকস্-এর তোলা অভিযোগগুলি একেবারেই অসত্য।

 

শুধু ভারতীয় লেখকই নয়, ইউরোপীয় লেখকদের মধ্যে কেউ কেউ টিপুর পক্ষ নিয়ে কথা বলেছেন। এমন কি সাম্রাজ্যবাদী ঐতিহাসিক স্যার জন ম্যারিয়ট টিপু সম্পর্কে সদর্থক মন্তব্যই করেছেন : “টিপু যখন মারা গেলেন, তখন বলা যায় যে ভারতবর্ষের মঞ্চ থেকে এমন একজন অপসৃত হলেন যিনি তখন ছিলেন কোম্পানীর দেশীয় শত্রুদের মধ্যে সবচেয়ে কঠোর, সবচেয়ে অটল, সবচেয়ে একাগ্র এবং সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী। কিন্তু প্রচণ্ড ইংরেজ বিরোধিতা সত্ত্বেও তাঁর জীবনে ও চরিত্রে এমন অনেক কিছু ছিল যা শ্রদ্ধা; এমন কি প্রশংসারও উদ্রেক করতে পারে। আমাদের (অর্থাৎ ইংরেজ পক্ষের) যদি টিপুকে দমন করার জন্য নিজাম এবং পেশোয়া-র সাহায্য খোঁজার অধিকার থাকে, তো টিপুরও অবশ্য অধিকার ছিল ফরাসীদের সাহায্য চেয়ে নিয়ে ভারতভূমি থেকে আমাদের উৎখাত করার। আমরা সফল হয়েছি; টিপু হয়েছেন ব্যর্থ। কিন্তু তিনি সর্বদা সাহস, ঐকান্তিকতা এবং কৌশলের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর পরাজয়ে উৎফুল্ল হয়েও সেই পরাজয় নিবারণে টিপুর জাজ্বল্যমান প্রচেষ্টাকে আমরা শ্রদ্ধা করতে পারি।" (হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ১৯৯০:৩৫৪। ভারতবর্ষের ইতিহাস। কলিকাতা : পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ)।

 

হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ম্যারিয়টকে উদ্ধৃত করার পাশাপাশি ইংরেজ চিন্তাবিদ জেমস মিল-এর বক্তব্যকেও তুলে ধরেছেন। মিল বলেছেন : “তাঁর [টিপু সুলতান] রাজ্যকালের প্রথম দিকে মহীশূর ছিল ভারতবর্ষে সবচেয়ে সুশাসিত অঞ্চল এবং সেখানকার অধিবাসীরা ছিল সবচেয়ে সম্পন্ন; তুলনায় দেখা যায় ইংরেজ ও তাদের মুখাপেক্ষীদের শাসনে অযোধ্যার কিংবা পূর্ব উপকূলে জনসাধারণের দুর্দশা ছিল দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে করুণ।" (পূর্বোক্ত : ৩৫৭) হীরেন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন যে, বিভিন্ন ভাষায় টিপুর যথেষ্ট দক্ষতা ছিল। আর ছিল সাহস, দৃঢ়তা ও উদারতা। ধর্মান্ধতা কোনোদিনই তাকে স্পর্শ করেনি। (পূর্বোক্ত)।

 

হিন্দুত্ববাদীরা কিন্তু তা মনে করে না। আলাউদ্দিন খিলজী, আওরঙ্গজেবের পাশাপাশি  তাঁরা টিপু সুলতানের মুণ্ডপাত করতেই অনেক বেশি আগ্রহী। এর পিছনে না আছে নতুন গবেষণা না আছে জ্ঞান লাভের ইচ্ছা। একটাই উদ্দেশ্য মুসলিম রাজা-বাদশাদের চরিত্রকে কলঙ্কিত করা। এটাও বলা দরকার যে এই আক্রমণ আসছে কোনো ঐতিহাসিকের পক্ষ থেকে নয়, রাজনীতিক ও আমলাদের পক্ষ থেকে। ২০১৭-তে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বি.জে.পি-র প্রবীণ সদস্য ও নেতা অনন্তকুমার হেগড়ে টিপু সুলতান সম্বন্ধে অভিযোগ তুলেছিল যে, টিপু গণহত্যাকারী, ধর্মান্ধ এবং ধর্ষণকারী। এই অভিযোগকে সামনে রেখে বি.জে.পি বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সভার আয়োজনও করে। টিপু সম্পর্কে তাদের আরো অভিযোগ— তিনি জোর করে ধর্মান্তরিত করতেন, মন্দির ধ্বংসের পাশাপাশি কয়েক হাজার ব্রাহ্মণকেও হত্যা করেছিলেন ইত্যাদি। ঘটনা হলো এই সব দাবির পিছনে কোনো ঐতিহাসিক সূত্র নির্দেশ বা প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং এর বিপরীত ছবিই পাওয়া যায়। সেটাই আলোচ্য বিষয়।

 

৩.

টিপু সুলতানের চিঠি, মন্দির থেকে প্রাপ্ত সনদ ও ঐতিহাসিক গবেষণা থেকে জানা যায় তিনি ছিলেন একজন উচ্চ শিক্ষিত, একাধিক ভাষায় জ্ঞানী মানুষ। এক কথায় আলোকদীপ্ত শাসক। তিনি তাঁর পিতা হায়দার আলির (১৭২০-১৭৮২ ) মতোই  দৃঢ়চেতা, বিবেকবান ও উদার। ইসলামধর্মী নয় এমন বহু ব্যক্তিকেই প্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ তাঁরা দান করেন। উভয়ের প্রশাসনেই মীর আসফের পদে ছিলেন পণ্ডিত পূর্ণাইয়া। কোষাধ্যক্ষ কৃষ্ণ রাও, নাগরিক সুরক্ষার জন্য পুলিশমন্ত্রী শ্যামাইয়া আয়েঙ্গার প্রমুখের নাম এখানে উল্লেখযোগ্য। শ্রীরঙ্গপত্তমে উচ্চপদে যাদের নাম পাওয়া যায় তারা হলেন রঙ্গ আয়েঙ্গার এবং নরসিংহ রাও। এছাড়াও উচ্চ প্রশাসনিক পদে আসীন ব্যক্তিদের একটি তালিকার উল্লেখ এখানে প্রয়োজন।

শ্রীনিবাস রাও— -টিপুর প্রধান সহায়ক

আপ্পাজী রাম- -টিপুর প্রধান সহায়ক

মূল চাঁদ— মুঘল দরবারে টিপুর প্রধান প্রতিনিধি

সুজন রাই— মুঘল দরবারে টিপুর প্রধান প্রতিনিধি

নাইক রাও -- টিপুর অত্যন্ত আস্থাভাজন ব্যক্তি

নাইক সঙ্গনা — টিপুর অত্যন্ত আস্থাভাজন ব্যক্তি

সুবা রাও -- প্রধান পেশকার

নরসাইয়া -- অন্যতম মুন্সী

নাগাপ্পায়া (ব্রাহ্মণ) – ক্রুগের ফৌজদার

জনৈক ব্রাহ্মণ— মালাবার অঞ্চলের অরণ্যে গাছ কাটার বিশেষ অধিকার প্রাপ্ত।

জনৈক ব্রাহ্মণ— কোয়েম্বাটুর ও পালঘাটের আসফ। এঁরা ছাড়াও টিপুর প্রশাসনের আমিল ও রাজস্ব আধিকারিকদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন অ-মুসলমান বা ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বী।

হরি সিং – অনিয়মিত অশ্বারোহী বাহিনীর রিসালদার।

 

শ্রীপৎ রাও -- বিদ্রোহী নায়ারদের দমন করতে পাঠানো হয়।

মারাঠী শিবাজী - ৩০০০ অশ্বারোহী বাহিনীর নায়ক;

১৭৯১তে কর্ণওয়ালিসের বিরুদ্ধে

রামা রাও -- অশ্বারোহী বাহিনীর নায়ক।

টিপুর প্রশাসনের দিকে অকালে দেখা যাবে ইসলাম ধর্মাবলম্বী নয় এমন বহু ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও শূদ্রেরা সরকারি প্রশাসনের উচ্চ থেকে নিম্নস্তর পর্যন্ত বিভিন্ন দায়িত্বপূর্ণ পদে চাকরি করতেন। এমন একজন শাসককে 'হিন্দু' বিদ্বেষী বা ধর্মান্ধ বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা মূর্খামির নামান্তর মাত্র।

 

8.

টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ মন্দির ধ্বংস করার। কিন্তু এই অভিযোগ ও দাবি নস্যাৎ হয়ে যায় ১৯১৬-র পর। ঐ বছর রাও বাহাদুর কে. নরসীমাচার (সে সময়ে মহীশূরের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের প্রধান পরিচালক) শৃঙ্গেরী মন্দির থেকে একগুচ্ছ চিঠি উদ্ধার করেন। চিঠিগুলির লেখক স্বয়ং টিপু সুলতান। তাঁর ধর্মীয় মনোভাবকে বোঝার ক্ষেত্রে চিঠিগুলির গুরুত্ব অসীম। এগুলি লেখা হয়েছে ১৭৯১ থেকে ১৭৯৩ পর্যন্ত। এখান থেকে একটি ঘটনার সন্ধান পাওয়া গেলো যা ঐতিহাসিক দিক থেকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রাপ্ত তথ্যটি এইরকম : মারাঠা অশ্বারোহী বাহিনীর নেতা রঘুনাথ রাও পট্টবর্ধন শৃঙ্গেরী মন্দির আক্রমণ করে বহু মানুষকে হত ও আহত করে, যাদের মধ্যে বহু ব্রাহ্মণও ছিল। লক্ষ্য করবার বিষয় হলো, এই সময়ে মহারাষ্ট্রে পেশোয়া শাসন চালু ছিল। পেশোয়ারা ধর্ম বিশ্বাসের দিক থেকে চিৎপাবন ব্রাহ্মণ। মজার কথা হলো ব্রাহ্মণ শাসকদের আক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছে ব্রাহ্মণ্য মন্দির শৃঙ্গেরী মঠ এবং হত হচ্ছে ব্রাহ্মণরা। এক্ষেত্রে হিন্দুত্ববাদীদের ব্যাখ্যাটি কী হতে পারে- তা নিয়ে প্রশ্ন থাকাই স্বাভাবিক। পেশোয়া বাহিনী শুধু হত্যা করেই থামেনি, তারা মন্দিরের মূল্যবান ধনসম্পদ লুঠ করে, দেবী সারদার মূর্তিকে অপবিত্রও করে।

এইরকম একটি ঘটনার ফলে মন্দিরের প্রধান স্বামী বাধ্য হয় সেই স্থান ত্যাগ করতে। আর কারাকল-এ বাস করতে। মন্দিরের স্বামীই মারাঠা আক্রমণ সম্বন্ধে অবহিত করেন এবং দেবী মূর্তির পুনঃ পবিত্রকরণের কাজে সাহায্য প্রার্থনা করেন। এই সংবাদ পেয়ে টিপু ভয়ঙ্করভাবে অসন্তুষ্ট ও ক্রুদ্ধ হন। তিনি স্বামীর চিঠির উত্তরে লেখেন: “যারা পবিত্র স্থানে এই ধরনের পাপকর্ম করেছে, খুব শীঘ্রই তারা এই কাজের জন্য শাস্তি পাবে। ... গুরুদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার ফলের তাদের বংশ লোপ পাবে।" একই সঙ্গে তিনি মন্দিরের স্বামীকে সাহায্য করার জন্য বেদনুর-এর আসফকে নির্দেশ দেন। এই সাহায্যের মধ্যে রয়েছে অর্থ, শস্য ও অন্যান্য দ্রব্য। তিনি স্বামীকে লেখা চিটিতে অনুরোধ করেন যে, দেবীর পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও ব্রাহ্মণ ভোজনের পর যেন স্বামী দেশের উন্নতি ও শত্রু-বিনাশের জন্য প্রার্থনা করেন। দেবীমূর্তি পবিত্রকরণের পর টিপু মন্দির থেকে প্রসাদ ও শাল গ্রহণ করেন এবং এর প্রত্যুত্তরে তিনি দেবীর জন্য দামী কাপড় ও মন্দিরের স্বামীর জন্য এক জোড়া শাল উপহার দেন। (Hasan, Mohibbul. 2017 358-9)

 

অন্য আর একটি চিঠিতে তিনি 'শতচণ্ডী জপ' ও 'সহস্র চণ্ডী জপ'-এর অনুষ্ঠানের জন্য কত পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন সে সংক্রান্ত তথ্য প্রাপ্তির সংবাদ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। এই অনুষ্ঠানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দেশের কল্যাণ ও শত্রুর বিনাশ ঘটানো— তা জেনে তিনি আনন্দ প্রকাশও করেছেন এই চিঠিতে। তিনি আরো লিখেছেন যে, অনুষ্ঠানকে সফল করার জন্য যা কিছু প্রয়োজন তা তিনি একজন সরকারি আধিকারিকের মাধ্যমে শৃঙ্গেরী মঠে পাঠিয়ে দেবেন। মন্দিরে স্বামীকে অনুষ্ঠান করার পাশাপাশি ব্রাহ্মণদের উপহার প্রদান ও প্রতিদিন ১০০০ জন ব্রাহ্মণের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করার কথাও টিপু বলেন।চিঠিগুলির (১৭৯১-৯২) মধ্যে আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। প্রথমত, টিপু বেদনুর-এর আসফকে 'দেবী'র জন্য একটি সুন্দর পাল্কী পাঠাতে নির্দেশ দেন। মন্দিরের স্বামীর জন্যও আর একটি পাল্কী পাঠানো হয় টিপুর নির্দেশে। দ্বিতীয়ত, ১৭৯২-এর একটি চিঠি থেকে জানা যাচ্ছে, মন্দিরের স্বামীর ব্যবহারের জন্য রূপা দিয়ে বাঁধানো একজোড়া হাত পাখাও পাঠানো হয়েছে। টিপু সুলতানের এই চিঠিগুলি লেখা হয়েছে অত্যন্ত মার্জিত ও শ্রদ্ধামিশ্রিত ভাষায়, লেখা হয়েছে 'বিধর্মী', 'কাফের' শৃঙ্গেরী মন্দিরের ব্রাহ্মণ পুরোহিতকে। এর পরেও টিপুকে গোঁড়া, অন্ধ, হিন্দু-বিদ্বেষী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় কি ? তিনি যদি সত্যিই ধর্মান্ধ হতেন তাহলে ব্রাহ্মণ পুরোহিতকে চিঠিতে 'জগৎগুরু' বলে চিহ্নিত করতেন কি? শুধু পুরোহিত নয়, মন্দিরের নানা অনুষ্ঠানে যেমন আর্থিক ও অন্যান্য সাহায্য করেছেন, তেমনি দেবীমূর্তির পুনঃপবিত্রকরণেও তিনি পূর্ণভাবে সহায়তা দান করে গেছেন ছেদহীনভাবে।

 

অনেকে এই যুক্তি দেখাতে পারেন যে, সে সময় টিপু সুলতানের ঘরে-বাইরে শত্রু— তাই তিনি 'হিন্দু' প্রজাদের পূর্ণ সমর্থন ও সাহায্যকে সুনিশ্চিত করার জন্য ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের নানারকম সাহায্য করার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ মন্দিরের প্রতি তার আগ্রহ এবং শৃঙ্গেরী মঠের প্রধান স্বামীর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব— যুদ্ধ ও শান্তি উভয় পর্বেই বজায় ছিল সমানভাবে। স্বামীর সঙ্গে তাঁর পত্র বিনিময় চলেছ নিরবিচ্ছিন্নভাবে, এমন কি শ্রীরঙ্গপত্তমের পরাজয়ের পরেও। তিনি স্বামীকে চিঠি লিখে তাঁর স্বাস্থ্য সম্বন্ধে খোঁজ নিয়েছেন, আর মাঝে মধ্যেই শাল সহ মূল্যবান জামাকাপড় পাঠিয়েছেন দেবীমূর্তির জন্য। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে লেখা একটি চিঠিতে তিনি স্বামীর পত্রপ্রাপ্তির কথা জানিয়েছেন এবং এটা জেনে খুশি হয়েছেন যে, স্বামী তীর্থ ভ্রমণে গেছেন। টিপু এই চিঠিতে লিখেছেন:

 

“আপনি জগৎগুরু, সবসময়ই আপনি পৃথিবী ও পৃথিবীবাসীর কল্যাণের জন্য কৃচ্ছ সাধন করেন। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবেন যাতে আমাদের সাফল্য ও সমৃদ্ধি আসে। যে দেশে আপনার মতো পবিত্র সাধু ব্যক্তি বসবাস করেন, সেখানে শস্য ও সম্পদের বিকাশ হয়।" (পূর্বোক্ত : 360 ) টিপু যদি সত্যিই ধর্মান্ধ হতেন তাহলে বোধহয় কখনোই এই ভাষায় কোনো ব্রাহ্মণ পুরোহিতকে প্রশংসা করতেন না বা তাঁর প্রতি এতটা শ্রদ্ধা প্রকাশ করতেন না। অথবা অনৈশ্লামিক ধর্মকে এই রকম বিশাল পরিমাণে সাহায্য করতেন না।

 

 এখানে আরো বলা দরকার যে টিপু কেবলমাত্র শৃঙ্গেরী মন্দিরকে সাহায্য করার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন নি। তিনি তাঁর রাজ্যের অন্যান্য মন্দিরকেও যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। নানজাঙগুড় তালুকের কালালে গ্রামের লক্ষ্মীকান্ত মন্দিরে পাওয়া গেছে চারটি রূপার পাত্র, একটি রূপার থালা, একটি রূপার পিকদান (থুতু ফেলার পাত্র)। এই পাত্রগুলির খোদাই থেকে জানা যায়, এগুলি টিপু সুলতানের দেওয়া উপহার। একইভাবে মেলুকোটের নারায়ণ স্বামী মন্দিরে সোনার ও রূপার পাত্রের গায়ের খোদাই থেকে জানা যায় এগুলি টিপুরই দেওয়া। এছাড়াও তিনি বহু মূল্যবান ধনরত্ন মন্দিরকে দান করেছিলেন। টিপুর পক্ষ থেকে এই মন্দিরকে ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দে ১২টি হাতি উপহার দেওয়া হয়। এ ছাড়াও তারা পেয়েছিল একটি নাকাড়া (বিশেষ ধরনের বাদ্যযন্ত্র)। নানজাঙগুড়ের শ্রীকান্তেশ্বর মন্দিরে টিপু মণিমানিক্যখচিত একটি পাত্র দান করেন। তিনি সাতটি রূপার পাত্র ও একটি কর্পূর-বাতি দান করেছিলেন শ্রীরঙ্গপত্তমের রঘুনাথ মন্দিরে। এই দ্রব্যগুলির উপর খোদাই করে লেখা হয়েছে: 'টিপু সুলতান পাছছা (পাদশা)'র উপহার'। এছাড়াও নানজাঙগুড়ের নানজানদেবেশ্বর মন্দিরে একটি সবুজ চকচকে পাথরের লিঙ্গ আছে।

এটিকে ‘পাদশার লিঙ্গ' বলা হয়। কথিত আছে যে, এই লিঙ্গটির প্রতিষ্ঠাতা স্বয়ং টিপু সুলতান। (পূর্বোক্ত)।

 

৫.

টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে আরো একটি অভিযোগ হলো— তাঁর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত সকল মন্দির ও ব্রাহ্মণদের জমি দখল। আসলে তিনি যা করেছিলেন তা হলো পুনরাধিকার। যে সব মানুষের বৈধ কাগজপত্র বা পূর্ববর্তী শাসকের সনদ ছিল না এবং উত্তরাধিকারের আইনসম্মত প্রমাণ ছিল না, তাদের সম্পত্তিই তিনি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। একই সঙ্গে তিনি বহু ব্রাহ্মণকে নতুন করে অনুদান (অর্থ) এবং জমি দেওয়া শুরু করেন। আমিলদার কোনাপ্পাকে টিপু তাঁর মারাঠী সনদে নির্দেশ দিয়েছেন যাতে পুষ্পগিড়ি মঠের স্বামী থোনগাপল্লী ও গোলাপল্লী গ্রামের কর সংগ্রহের অধিকার পায়। তা ছাড়া গাঞ্জীকোটার অঞ্জনেস্বামী মন্দিরের পূজার জন্যও অর্থ সাহায্য করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি কমলাপুর তালুকের বহু ব্রাহ্মণকে জমি (ভূমি) দান করেন। ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি মহারাজ হরিপা নামে জনৈক ব্রাহ্মণকে মনজারাবাদ তালুক প্রদান করেন। একটি সংস্কৃত কবিতা থেকে জানা যাচ্ছে যে, তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরবর্তী বহু ব্রাহ্মণকে তিনি জমি প্রদান করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ব্রাহ্মাণ পথিক/পর্যটকদের খাওয়া দাওয়ার জন্য জমি দান করেন। তিনি তাঁর আমলদার হরদেশাইয়াকে সকল ধরণের অনুদান বন্ধ করতে বললেও দেবতার প্রতি দান ও ব্রাহ্মণদের প্রতি দানকে কার্যকর রাখতে বলেন। এছাড়াও ধর্মপুরীর এক ব্রাহ্মণ নরসীমা যোশীকে বংশানুক্রমিক অবসরকালীন ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

টিপু সুলতান কোনোদিন অনৈশ্লামিক উপাসনা ও পূজা-অর্চনায় বাধা দেননি। বরং তিনি সকলের উপাসনার স্বাধীনতাকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। শ্রীরঙ্গপত্তম দুর্গে টিপুর প্রাসাদের পশ্চিমে একশো ইয়ার্ড দূরে শ্রীরঙ্গনাথ মন্দির। প্রাসাদ থেকে টিপু মন্দিরের ঘন্টার আওয়াজ ও ব্রাহ্মণদের মন্ত্রোচ্চারণ শুনতে পেতেন। এর বিরোধিতা তিনি কোনোদিনই করেন নি। তাঁর প্রাসাদের কাছে আরো দুটি মন্দির ছিল— নরসীমা ও গঙ্গাধরেশ্বর। তিনি কিন্তু এই দুটি মন্দির বা তাঁর রাজ্যের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা হাজারেরও বেশি মন্দিরে অ-মুসলমানদের পূজায় কোনো বাধা দেন নি। বরং ব্রাহ্মণদের ও মন্দিরগুলিকে পর্যাপ্ত সাহায্য করেছেন, যাতে তারা তাদের ধর্মীয় কাজগুলিকে সাফল্যের সঙ্গে চালাতে পারে। শৃঙ্গেরী মন্দিরের মতোই রায়াকোট্টাই-এর দুটি মন্দিরকে ভাতা প্রদান করতেন। এই মন্দিরের পুরোহিতরা তাঁর কাছ থেকে সনদও পেয়েছিল। এই সনদ দেখিয়েই ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ কোম্পানির অধিনায়ক মুনরো-র কাছে ভাতা প্রদান বন্ধ না করার আর্জি জানায় পুরোহিতরা। কারণ ভাতা না পেলে মন্দিরের ধর্মীয় কাজ বন্ধ হয়ে যাবে।

টিপু সুলতান বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের (ব্রাহ্মণ/হিন্দু) লোকেদের মধ্যে অর্থ বিতরণ করতেন। ভেঙ্কটাছালাপালি মন্দিরের পূজা-অর্চনা চালিয়ে যাবার জন্য টিপু একটি সনদে নির্দেশ দেন। ঐ সনদেই পাওয়া যায় যে, কুডাপ্পা জেলার পুল্লিভেন্ডলা-তে অঞ্জনেস্বামী মন্দিরের বন্ধ হয়ে যাওয়া পূজাপাঠ পুনরায় শুরু করবার জন্যেও তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় একটি অর্ধনির্মিত মন্দিরের সম্পূর্ণ নির্মাণ করার কাজেও তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে হায়দার আলি কাঞ্জিভরম-এ গোপুর মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করলেও, শেষ করতে পারেন নি। টিপু যখন ঐ অঞ্চলে যান, তখন তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ (১৭৯০-৯২) চলছিল। এই সময়ই তিনি মন্দির সম্পূর্ণ করার জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ প্রদান করেন। তিনি কাঞ্জিভরম শহরে থাকাকালীন সময়ে রথযাত্রা উৎসবে অংশগ্রহণ করেন এবং আতশ বাজী পোড়ানোর উৎসবে বাজীর সমস্ত ব্যয় ভার বহন করেন।

মহীশূরের পারাকাল্লা মঠে প্রাপ্ত একটি সনদ থেকে জানা যায় যে, টিপু ব্রাহ্মণ্য ধর্ম-র মধ্যেকার একটি বিরোধে মধ্যস্থতা করে বিরোধের সমাধান করে দেন। কাজটি করেন অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা দক্ষতার সঙ্গে। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মধ্যেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কতটা ছিল তা এর থেকে বোঝা যায়। ঘটনাটি হলো এই রকম: মেলুকোট মন্দিরে ঈশ্বরের আবাহনমূলক মন্ত্র নিয়ে ব্রাহ্মণদের দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদ বেঁধেছিল। আনচে শ্যামাইয়া (টিপুর রাজ্যের মন্দির দপ্তরের এক আধিকারিক) মেলুকোট মন্দিরে সাবেকী পদ্ধতিতে ঈশ্বরের আবাহনমূলক মন্ত্র অমান্য করে নতুন পদ্ধতির প্রবর্তন করেন। এর ফলে বিবাদ শুরু হয়ে যায়। এরকম সংকটময় পরিস্থিতিতে টিপুকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে হয়। তিনি তাঁর সনদে স্পষ্ট করে বলে দেন যে, নতুন ও পুরানো উভয় পদ্ধতিই বজায় থাকবে। তা ছাড়া মন্দির দপ্তরের প্রধান আধিকারিককে নির্দেশ দেন এই দুই বিবাদমান গোষ্ঠী (ভাদাগালাই ও তেঙ্কালাই)-র প্রতি যেন সবক্ষেত্রেই ন্যায় বিচার করা হয়। এই ভাবে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মধ্যেকার বিরোধে মধ্যস্থতা করে সমস্যাটির সমাধান করেন।

 

মালাবার-এর বিভিন্ন মন্দির থেকে পাওয়া কাগজপত্র থেকে জানা যায়, টিপু সুলতান বহু মন্দির ও ব্রাহ্মণদের জমি দান করেছিলেন। জমিদান-এর তালিকাটি এখানে দেওয়া হলো-

(ক) এরনাদ তালুকের চেলামব্রা আমসম-এ স্থাপিত মান্নুর মন্দিরকে ৭০.৪২ একর জলাভূমি ও ৩.২৯ একর বাগান। দেওয়াহয়।

(খ) পোন্নামি তালুকের এইলাত্তুর আনসমে প্রতিষ্ঠিত তিরুভাঞ্চিকুলম শিব মন্দিরকে দেওয়া হয় ২০৮.৮২ একর জলাভূমি এবং ৩.২৯ একর বাগান।

(গ) পোন্নানি তালুকের অন্তর্ভুক্ত গুরুভায়ূর আমসমের গুরুভায়ূর মন্দির টিপুর কাছ থেকে পার ২৬.০২ একর জলাভূমি ও ৪৫৮.৩২ একর বাগান জমি।।

(ঘ) কালিকট তালুকের কসবা আলসমের ট্রিকানটিয়ূর ভৈট্টাক্কোরুমাকানকাভূ মন্দিরকে প্রদান করা হয় ১০০.৭০ একর জলাজমি ও ৭৩.৩৬ একর বাগান জমি।

(ঙ) পোন্নানি তালুকের কাদিকার আমসম-এর কাট্টু মাদাখিল শ্রীকুমারণ (নাম্বুদিরিপাদ)-কে দেওয়া হয় ২৭.৯৭ একর জলাজমি এবং ৬.৯১ একর বাগান জমি।

(চ) পোন্নানি তালুকের ট্রিক্কানভিয়ূর আমসম-এর টিক্কানাভিয়ূর সাসুহম মন্দির টিপুর কাছ থেকে পায় ২০.৬৩ একর জলাজমি ও ২৬ একর বাগান জমি।

(ছ) ত্রিচূড়-এর নাদুভিল মাদাথিল তিরুমুজ্জুকে প্রদান করা হয় ২০.২৬ একর জলাভূমি ও ২২.১৩ কের বাগান জমি এবং ৪.১৭ একর শুকনো জমি।

 

৬.

টিপুর বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ জোর করে ধর্মান্তরণ। ইংরেজ লেখকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হিন্দুত্ববাদীরা দাবি করেন যে, ক্রুগ ও মালাবার অঞ্চলের ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বীদের বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করেছেন। যুক্তি দিয়ে এই অভিযোগের সত্যতা বিচার করলে দেখা যাবে, এই ধর্মান্তরণের পিছনে যা কাজ করেছিল তা কোনো ধর্মান্ধতা নয়, বরং নির্ভেজাল রাজনৈতিক কারণ। বিষয়টিকে একটু ভেঙে বলা প্রয়োজন। ক্রুগ ও মালাবার অঞ্চলের কিছু স্বার্থান্বেষী ও কুচক্রীদের দ্বারা ভুলভাবে পরিচালিত হয়ে টিপুর বিরোধিতা করতে শুরু করে। এই বিরোধিতা বাস্তবে দেশের মধ্যে অরাজকতা সৃষ্টি করে টিপুর শত্রু বিশেষ করে ইংরেজদের হাতকেই শক্তিশালী করে তুলছিল। তিনি কসিনিকে লেখা একটি চিঠিতে জানিয়েছেন যে, বিদ্রোহীদের শাস্তিদানের উদ্দেশ্যেই নায়ারদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করেছিলেন। নায়াররা ৬ বার বিদ্রোহ করেছিল। তিনি ৬ বারই তাদের ক্ষমা করেছেন। কিন্তু ঘটনা বারবার কখনোই ঘটতে দেওয়া যায় না। শাস্তি তাদের প্রাপ্য ছিল, তাই তাদের তা দেওয়া হয়েছে। টিপু মনে করেছিলেন যে এই ধরনের ভীতিপ্রদর্শন ও উদাহরণ তৈরির মধ্যে দিয়ে ক্রুগদের সংখ্যায় কমানো যাবে এবং নায়ারদের আনুগত্য লাভ করা হয়তো সম্ভব।

 

ক্রুগ ও মালাবার অঞ্চলের কত জন অধিবাসীকে ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল তা নিয়ে ইংরেজ লেখকদের মিথ্যা প্রচারের - কোনো অন্ত নেই। কারণ তাদের লক্ষ্যই ছিল যে কোনো ভাবে টিপুকে অসম্মান করা, ছোটো করে দেখানো। সেই লক্ষ্যেই প্রচার চালানো হয়েছিল। এখানে এটাও লক্ষ্য করার বিষয় হলো, ইসলাম ধর্মাবলম্বী কোনো কোনো লেখক টিপুকে ইসলাম ধর্মের নায়ক বানানোর লক্ষ্যেও বহু মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। যেমন সলতানেত তোয়ারিখ-এর বক্তব্য অনুযায়ী টিপু ক্রগ অঞ্চলে ৭০০০০ (সত্তর হাজার) হিন্দুকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করেছেন। এটা একেবারেই অসত্য কারণ সে সময়ে ক্রুগের মোট জনসংখ্যা ৭০ হাজারের থেকে অনেক কম ছিল। অন্যদিকে রামচন্দ্র রাও-এর মতে ৫০০ জনকে ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল। (Hasan-2017 : 363)

 

এখানে এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, টিপুর উদার ধর্মীয় নীতির কারণে বেশ কিছু ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বেচ্ছাকৃত ধর্মান্তরের ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে। যেমন ক্রুগদের অন্যতম পলাতক নেতা রঙ্গ নায়ার টিপুর আমন্ত্রণে টিপুর সঙ্গে দেখা করে এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। এই রকম বহু বিদ্রোহীই টিপুর উদারতার প্রভাবে স্বেচ্ছায় ইসলামকে বরণ করে নেয়। নায়ারদের নেতারা ধর্মান্তরিত গোষ্ঠীর ওপর নিজেদের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ অটুট রাখার জন্য নিজেরাও ধর্মীয় পরিচয়ের পরিবর্তন ঘটায়। কিন্তু এই ধর্ম পরিবর্তনের নীতি কেবল ক্রগ ও মালাবার অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, এটা কোনো সার্বজনীন নীতি ছিল না। বস্তুতঃপক্ষে বিদ্রোহীদের ক্ষেত্রে এটিকেই তিনি সর্বোচ্চ শাস্তি বলে মনে করেছিলেন। অর্থাৎ ধর্মীয় বিদ্বেষ নয়, রাজনৈতিক কারণই ছিল এর প্রধান কারণ।

 

৭.

ব্রিটিশ লেখকরা টিপুকে প্রাণ ভরে গাল দিয়েছে। তাদের বড় অভিযোগ শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণেই টিপু সুলতান খ্রিশ্চানদের উপর অত্যাচার চালিয়েছে। অভিযোগটি তথ্য ও যুক্তি সহকারে বিচার করা দরকার। শুরুতেই বলে নেওয়া প্রয়োজন খ্রিশ্চানদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কোনোদিনই ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী দ্বারা নির্ধারিত হয়নি। বিষয়টি অনেক বেশি রাজনৈতিক। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়গুলিকে যথেষ্ট উদারতার সঙ্গেই দেখতেন, কিন্তু দেশদ্রোহ, গুপ্তচরবৃত্তি বা অন্য কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয় কখনোই বিবেচ্য বিষয় হতো না। এই সব অপরাধের ক্ষেত্রে তিনি দ্বিধাহীনভাবে শাস্তি দিতেন। ঘটনা সমূহের উপর নজর দিলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে।

 

দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ (১৭৮০-৮৪)-র সময় মহীশূর রাজ্যের প্রজা কন্নড় খ্রিশ্চানরা ইংরাজ কোম্পানিকে তাৎপর্যপূর্ণভাবে সাহায্য করেছিলো। যখন কোম্পানির সেনানায়ক ম্যাথিউস পশ্চিম উপকূলে অনুপ্রবেশ করে, তখন কন্নড় খ্রিশ্চানরা চারটি অপরাধমূলক কাজ করে-

 

(ক) তারা ব্রিটিশ কোম্পানির গুপ্তচরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

(খ) তারা ম্যাথিউসকে ম্যাঙ্গালোর ও বেদনুর দখল করতে সাহায্য করে; (গ) মহীশূরের সৈন্যবাহিনীতে কর্মরত ৩৫ জন খ্রিশ্চান এই সময়ে সেনাবাহিনী ত্যাগ করে ব্রিটিশ বাহিনীতে যোগদান করে।

(ঘ) এছাড়াও কন্নড় খ্রিশ্চানরা ইংরেজদের অর্থ সাহায্য করেছিলো। এই অর্থ সাহায্যের পরিমাণটি জানা যায় ম্যাথিউসের একটি চিঠি থেকে। পরিমাণটি হলো ৩৩০০০ টাকা।

 

টিপু সুলতান যখন ম্যাঙ্গালোর পুনঃরুদ্ধার করেন, তখন কন্নড় খ্রিশ্চানরা গোপনে ইংরেজ কোম্পানির অন্যতম অধিকর্তা ক্যাম্বেলকে সহায়তা করতে শুরু করে। শুধু তাই নয়। টিপু সুলতানকে উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে কাশিম আলি ও মহম্মদ অলি ইংরেজদের জন্য যে চক্রান্ত শুরু করেছিলো তার সঙ্গে এরা নিজেদের যুক্ত করে। মাউন্ট ম্যারিয়ান সেমিনারির প্রধান ফাদার ডন জোয়াকিম ডি মিরান্ডা ইংরাজ সৈন্যবাহিনীকে ১০০০ বস্তা চাল যোগান দেয়। এসব অপরাধ করা সত্ত্বেও টিপু ফাদারকে ক্ষমা করে দেন আর তাঁর সঙ্গে যথেষ্ট মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করেন। তা ছাড়াও নির্দেশ জারি করেন যে ফাদারের উপর যেন কোনো অত্যাচার না করা হয়। পাশাপাশি তার মধ্যস্থতাতেই ১৫০ জন খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীকে মুক্ত করে দেওয়া হয়। এমন উদারতা ও নমনীয়তা টিপু দেখানোর পরেও ফাদার জোয়াকিম-এর আচরণ ছিলো অত্যন্ত ক্ষতিকর। টিপুর মিত্র ফরাসী সেনাপতি কোম্পানি ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধ বিরতির পর মহীশূর থেকে সেনাবাহিনী সরিয়ে নিচ্ছিলেন, তখন ফাদার জোয়াকিম তাকে আশ্রয় দিতে অস্বীকার করে এবং উপকূলের দিকে চলে যেতে বলে। এটা ছিলো প্রায় প্রত্যক্ষভাবে টিপুর বিরোধিতা করা।

 

এইরকম একটি পরিস্থিতিতে টিপু খ্রিশ্চানদের শাস্তি দেওয়া দরকার বলে প্রয়োজন অনুভব করেন। ফাদার জোয়াকিমকে দুর্গে প্রথমে বন্দি করা হয়। একটি বিশেষ আদালতে তিনি দোষী প্রমাণ হওয়ার পর মাউন্ট ম্যারিয়নের গোটা খ্রিশ্চান উপনিবেশ সহ তাকে কোচিনে নির্বাসিত করা হয়। কয়েকজন কন্নড় খ্রিস্টানকে গোয়াতে নির্বাসন দণ্ড দেওয়া হয়, বাকীদের পাঠানো হয় শ্রীরঙ্গপত্তম ও চিতলদুর্গ-এর জেলখানায়। কেবলমাত্র একজনকে ফাঁসি দেওয়া হয়, কারণ সে ছিলো মহম্মদ আলি ও কাশিম আলির দুষ্কর্মের সহযোগী। গবেষকদের মতে, তিনি ঠিক কতজনকে শাস্তি দিয়েছিলেন তা বলা খুব শক্ত। কারণ যে সংখ্যাগুলি ইউরোপীয় লেখকদের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে তা যথেষ্ট সন্দেহজনক। গোয়ার ভাইসরয়ের একটি চিঠিতে সংখ্যাটি ২০০০০ হলেও তারই লেখা অন্য একটি চিঠিতে রয়েছে ৪০০০০। আবার উইলকিস-এর দাবি ৬০০০০। সংখ্যাগুলির সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ এই বিপুল জনসংখ্যা বিশিষ্ট খ্রিশ্চান উপনিবেশ সে সময় না থাকাটাই স্বাভাবিক। পরবর্তীকালে ফরাসী দূতের অনুরোধে টিপুর ফাদার জোয়াকিমকে ম্যাঙ্গালোরে তার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ফিরে যাবার অনুমতি দেন, সেই সঙ্গে তাঁর সম্প্রদায়ের অনেককেই ঐ একই অনুমতি দেওয়া হয়।

 

আরো একটি মিথ্যা টিপুর উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় তা হলো বলপ্রয়োগের মধ্য দিয়ে ধর্মান্তরিত করা। যদিও এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে এটা সত্য যে কোনো কোনো খ্রিশ্চান বন্দি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলো স্বেচ্ছায়, নিজেদের বন্দিত্ব দশা ঘোচাতে। মুক্তির পাবার পর তাদেরকে প্রাসাদ ও সেনাবাহিনীর দায়িত্বপূর্ণ পদে বহাল করা হয়। কিন্তু বিশাল সংখ্যক বন্দি শ্রীরঙ্গপত্তম ও চিতলদুর্গে আবদ্ধই ছিলো। কিন্তু ঘটনা হলো, ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে টিপু গোয়ার আর্চ বিশপের কাছে দূত পাঠিয়ে অনুরোধ করেন যে, খ্রিস্টান বন্দিরা যাতে তাদের ধর্মপালন যথাযথ ভাবে করতে পারে তার জন্যে যেন কয়েকজন পাদ্রীদের পাঠানো হয়। তিনি এর সঙ্গেই ভেঙে যাওয়া চার্চগুলি পুনঃনির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন।

 

এটা মনে করার কোনো কারণ নেই সকল খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীই তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে টিপুর দ্বারা নিগৃহীত হয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে যে সব খ্রিশ্চানরা দেশদ্রোহিতা, বিশ্বাসঘাতকতা বা গুপ্তচর বৃত্তির সঙ্গে জড়িত ছিলো তারাই কেবল শাস্তি পায়। অর্থাৎ এখানে শাস্তি দানের সঙ্গে রাজনীতি ছিলো প্রধান ও একমাত্র কারণ, ধর্ম নয়। বরং দেখা গেছে সিরিয়ান খ্রিশ্চান, আর্মেনিয়ান খ্রিশ্চানরা অনেক বেশি পরিমাণে টিপুর কাছে স্বাগত ছিলো। কিন্তু কন্নড় খ্রিশ্চানরা ছিলো রাষ্ট্রের শত্রু তারা টিপুকে আনুগত্য জানায়নি— ফলে টিপু একান্ত বাধ্য হয়েই তাদের উপর বলপ্রয়োগ করেন।

 

৮.

এতো গেলো 'হিন্দু' ও খ্রিষ্টানদের সঙ্গে টিপুর সম্পর্কের কথা, এবার দেখা দরকার ইসলাম ধর্মাবলম্বী বিদ্রোহীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের দিকটি। ঘটনাটি 'মাধাবি' নামক এক মুসলিম সম্প্রদায়কে নিয়ে ১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দে ইংরাজদের হাতে বন্দি টিপুর ছেলেরা যখন মাদ্রাজ থেকে মুক্তি পায়, তখন টিপু দেবানহাল্লিতে এক উৎসবের আয়োজন করেন। সেই সময় মাধাবি সম্প্রদায়ের মুসলিমরা সেখানে এক বিশেষ ধরনের উপাসনার আয়োজন করেন। এই সম্প্রদায় গঠিত হয় ১৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দে। এর প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ মুহম্মদ জৌনপুরী। টিপু তাদের এই অনুষ্ঠানে কোনো আপত্তি জানাননি, কারণ তিনি উপাসনা ও বিশ্বাসের স্বাধীনতার পক্ষপাতী। সেটা ছিল রমজান মাস। ইসলাম বিশ্বাসী অন্যান্য মুসলিমরা রোজা রাখেন এবং প্রায় শব্দ না করে নমাজ করতেন। কিন্তু মাধাবি সম্প্রদায়ের সদস্যরা উচ্চ স্বরে তাদের উপাসনা ও প্রার্থনা করতো, যা অন্যান্য মুসলিমদের উপাসনায় রীতিমতো ব্যাঘাত ঘটাতো। সেই কারণে টিপু দেওয়ান মীর সাদিককে নির্দেশ দেন যে, এই সম্প্রদায়ের সদস্যরা যাতে সেনা ছাউনির মধ্যে তাদের প্রার্থনা না করেন। কিছু দূরে তাদের প্রার্থনার জন্য আলাদা ছাউনির ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। কিন্তু এই সম্প্রদায়ের প্রধানরা প্রথমে তা মেনে নিলেও হঠাৎ একদিন মাঝরাতে ৩০০০ হাজার মাধাবি চিৎকার করে তাদের উপাসনা করতে শুরু করেন। তখন আইন ভঙ্গের জন্য টিপু তাদের নেতা মহতাব খান ও আলম খানকে বন্দি করেন এবং তাদের সম্প্রদায়ের সদস্যদের শেষ রাজধানী থেকে নির্বাসিত করেন।

 

গবেষকদের প্রশ্ন হলো এটাই যে, টিপু সচরাচর এরকম কঠোর শান্তি না দিলেও এদের ক্ষেত্রে এই কঠোরতা কেন গ্রহণ করলেন। মাত্র কয়েকজনের ত্রুটিতে সমগ্র সম্প্রদায়কে কেন শাস্তি দিলেন? এর কারণ লুকিয়ে রয়েছে একটি সন্দেহের মধ্যে। পরবর্তীকালে যে সন্দেহ সত্য বলেই প্রমাণিত হতে দেখা যাবে। তা হলো বিশ্বাসঘাতকতা। এই সম্প্রদায়টি ছিলো অত্যন্ত সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী, তাদের সাংগঠনিক কাঠামো ছিলো সুবিন্যস্ত। এই কারণেই তিনি গোটা সম্প্রদায়কে নির্বাসনে পাঠান। তাছাড়া দেওয়ান মীর সাদিকের টিপু-বিরোধী চক্রান্তেরও একটি ভূমিকা ছিল। দেখা যায় যে চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ (১৭৯৯)-র ঠিক আগে এই মাধাবিরা ইংরেজ পক্ষ নেয় এবং টিপুকে পরাজিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৯.

আজকে হিন্দুত্ববাদীরা টিপু সুলতান সম্বন্ধে যে সব অভিযোগ তুলছে সেগুলির সঙ্গে ইতিহাসের কোনো সম্পর্ক নেই। একেবারেই নির্জলা মিথ্যা ও কুৎসা। এরা ইংরেজ শাসকদের প্রচারের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই টিপু সম্পর্কে এই চূড়ান্ত অসত্য প্রচরা করছে। হিন্দুত্ববাদীরা আবেদন রাখছে হিন্দু ভাবাবেগের কাছে। তাদের সামনে মুসলিম মানেই গোঁড়া, ধর্মান্ধ ও অত্যাচারী— এটাই প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালাচ্ছে। টিপুর মতো এমন একজন মহান স্বাধীনচেতা উচ্চশিক্ষিত সুশাসককে যেভাবে কালিমালিপ্ত করছে তা তাদের পিতা ব্রিটিশদেরও লজ্জা দেবে। ব্রিটিশরা টিপুর নামে মিথ্যা রটনা করতো, গুজব ছড়াতো গায়ের জ্বালা থেকে। এটাই বরং খুব স্বাভাবিক। কারণ ভারতে আগ্রাসন চালানোর ক্ষেত্রে সবথেকে বড় বাধা ছিলেন টিপু সুলতান, ব্রিটিশরা বারংবার তাঁর কাছে পরাজিত হয়েছে। বর্তমানে হিন্দুত্ববাদীদের পরিকল্পনাটি আরো কুটিল ও ব্যাপক। টিপু সুলতানকে অসম্মানিত করার মধ্য দিয়ে আসলে একটা ঘৃণার ভারতের জন্ম দিতে চাইছে তারা।

1 Comments

Aminul Islam

15 June, 2023

Very good post.

Post Comment