পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

দানিশকে মনে রেখে

  • 24 July, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 1014 view(s)
  • লিখেছেন : দেবলীনা
“একজন চিত্রসাংবাদিক হিসেবে সব ঘটনা তুমি যেন বা প্রথম সারিতে বসে প্রত্যক্ষ করছ। এটা যেমন এক সম্মান, তেমন দায়িত্বও। যারা সেখানে উপস্থিত নেই, তুমি তাঁদের প্রতিনিধি, তাঁদের চোখ, তাঁদের কান। ছবির যে চরিত্র, তাঁর জায়গায় মানুষ যদি তাঁদের প্রিয়জনকে দেখতে পায়, আমার কাজ সেখানেই শেষ, সেখানেই সফল" আগামী দিনগুলিতেও আপনার ছবি নিয়ে আমাদের আলাপ জারি থাকবে,আমাদের বিবেককে আপনার ক্যামেরা সদাই জাগিয়ে রাখবে,শাসকের ভ্রুকুটিকে থোড়াই কেয়ার দানিশ! লিখলেন দেবলীনা, ছবি এঁকে সহযোগিতা করলেন কৌশিক চক্রবর্তী ।

“একজন চিত্রসাংবাদিক হিসেবে সব ঘটনা তুমি যেন বা প্রথম সারিতে বসে প্রত্যক্ষ করছ। এটা যেমন এক সম্মান, তেমন দায়িত্বও। যারা সেখানে উপস্থিত নেই, তুমি তাঁদের প্রতিনিধি, তাঁদের চোখ, তাঁদের কান। ছবির যে চরিত্র, তাঁর জায়গায় মানুষ যদি তাঁদের প্রিয়জনকে দেখতে পায়, আমার কাজ সেখানেই শেষ, সেখানেই সফল।” তাঁর সম্মানে আয়োজিত সভায় পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত দানিশ সিদ্দিকি বলেছিলেন জামিয়ার পড়ুয়াদের উদ্দেশ্যে,একদা যেখানে তিনি ছাত্র ছিলেন।

স্পিন বোলদাক, তালিবান দখলে চলে যাওয়া আফগানিস্তানের সেই জনপদ, যেখানে আপনি বা আমি উপস্থিত ছিলাম না, সেইখানে, সংঘর্ষের সেই কেন্দ্রবিন্দুর প্রথম সারিতেই তো হাজির ছিলেন দানিশ সিদ্দিকি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্যামেরায় চোখ রেখেছিলেন। যেমন রেখেছেন অতীতে, বহুবার। এই আফগানিস্তানেই, অথবা প্রতিবাদমুখর হংকং-এ,সংঘাতদীর্ণ কাশ্মীরে বা যুদ্ধবিদ্ধস্ত ইরাকে। প্রতিবেশীর থেকে ধার করা ক্যামেরায় হাতখরচা জমিয়ে কেনা সাদাকালো ফিল্ম রোল। দিল্লীর ছেলে দানিশের ছবি জীবনের এভাবেই শুরুয়াত। তাঁর স্থির ছবির জগত নিরন্তর এঁকে চলে এই দুনিয়ার অভূতপূর্ব অস্থির সময়। সারা পৃথিবীতে যখন মাথাচারা দিয়ে উঠেছে মৌলবাদ, ঘৃণার বেওসাদার দক্ষিণপন্থী শাসক জমিয়ে বসেছে যত্রতত্র, আবার অপরিচিত এক ভাইরাসের আক্রমণেও বিপর্যস্ত গোটা জগত।দানিশের ক্যামেরা মানবজীবনের এই চরম সংকটমুহূর্তে প্রত্যয়ী থেকেছে। উপস্থিত থেকেছে ওই সামনের সারিতে। সামনে ঘটে যাওয়া চরম যন্ত্রণার অবিরাম স্রোত থেকে কখনও চোখ সরিয়ে নেয় নি তাঁর নির্ভীক লেন্স। দানিশ বলেছেন “আমার বিষয় এবং আমার দর্শক, তাঁদের মধ্যে আমি যেন বা এক যোগসূত্র। যারা, আমি মনে করি, প্রতিবাদী হয়ে উঠবেন, এবং ভালর জন্য পরিবর্তন আনবেন।”

দানিশ নামের অর্থ আত্মজ্ঞান, অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে নতুন কিছু নয়। শুধুমাত্র যুদ্ধক্ষেত্র নয়, নেপালের ভূমিকম্প বিধ্বস্ত ধ্বংস ছবি,বার্মার বিবাদভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থী, রাষ্ট্র দ্বারা তৈরী করা এক বিপন্ন সময়ে মাইলের পর মাইল হাঁটতে থাকা পরিযায়ী শ্রমিক পরিবার, দিল্লী-উত্তরপ্রদেশ সীমান্তে কৃষকদের জানকবুল আন্দোলন, সবই যেন জীবন্ত হয়ে ধরা পড়ে দানিশের ছবিতে। রাষ্ট্রের গাফিলতিতে কোভিড মৃত্যুর গণচিতা যখন তাঁর ফ্রেমে জ্বলতে থাকে, সেই আগুনের আঁচ উপচে এসে আমাদেরকেও খানিক পুড়িয়ে দিয়ে যায়। ২০২০ সালের দিল্লী দাঙ্গা। গেরুয়াগুন্ডা বাহিনী যখন মহম্মদ জুবেরকে ঘিরে ধরে নির্মম প্রহার করতে থাকে, হেলমেট আর গ্যাস মুখোশ পরে সিদ্দিকি সেখানে উপস্থিত। জুবেরের শরীরের রক্ত তাঁর শরীরেও ছিটকে এসে পড়ে। জুবের তাঁর মাথা আঁকড়ে ধ’রে উপুড় হয়ে পড়ে থাকে আমাদের সামনে, পাঁজর মুচড়ে দেওয়া সেই রক্তক্ষরণ আমাদের সামনে এক আয়না তুলে ধরে না কি? সেই গণপিটুনির দু-একটা লাথি-ঘুষি-বাঁশপেটা তো আমাদের গায়েও এসে পড়ে! এ কোন ভারতবর্ষের ছবি অনিবার তুলে ধরেন দানিশ? এই ঘটনার দু’দিন বাদে দানিশ খুঁজে বের করেন জুবেরকে, সেইদিন তাঁকে সাহায্য করতে না পারার জন্য ক্ষমা চেয়ে নেন। দরদী এই উজ্জ্বল ছবিয়ালকে মৌলবাদ ছেড়ে কথা বলবে কেন?

দানিশ বারেবারে চরম আক্রমণের শিকার হয়েছেন, ট্রোলড হয়েছেন। জুবেরের ছবির উদাহরণই যদি দেওয়া যায়, ছবিটিকে সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দিয়ে হিন্দুত্ববাদীরা উল্টে দানিশকেই বলে জেহাদি। ভারতের সমকালের ছবি তো তাঁদের কাছে চরম অস্বস্তির। সিএএ-এর বিরোধিতা করা প্রতিবাদী জনতার সামনে ‘রামভক্ত গোপাল’ ছেলে বন্দুক উঁচিয়ে ধরে। যতক্ষণ না শাদাব ফারুক নামে এক বিক্ষোভকারী ভক্তের গুলিতে আহত না হয় পুলিশ ভাবলেশহীন মুখে এই হুংকারের সামনে স্রেফ দাঁড়িয়ে থাকে। দানিশের ক্যামেরা সাক্ষী থাকে এই পুরো ঘটনার। যেমন থাকে দয়ারাম কুশওয়াহার অনন্ত যাত্রা। পাঁচশো কিলোমিটার পায়ে হেঁটে দিল্লী থেকে মধ্যপ্রদেশ, পাঁচ বছরের ছেলে শিবম তাঁর কাঁধে। দয়ারাম এবং শিবম, দু’জনাই তাকিয়ে থাকে আমার-আপনার দিকে। আবারও ফ্রেম উপচে পড়ে, বিদ্ধ করে। আমার-আপনার বিবেক চমকে ওঠে। অতিমারির ছবি আবারও চোখে আঙুল গুঁজে দেখিয়ে দেয় উঁচু-মাঝারি-নীচুতলার ভারতবর্ষের বিভেদমাত্র ৫০০ কিলোমিটার নয়, আলোকবর্ষের দূরত্ব। রাষ্ট্র রেগে যায়, গাল পাড়ে, ক্ষমতার দম্ভ দেখায়। যে অগুন্তি গুলি এমন দানিশদের শরীর ঝাঁঝরা ক’রে দেয় তা কি শুধু তালিবানের? দানিশের মৃত্যুর পরে ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতির নীরবতা এবং তার অনুগামীদের নৃশংস উল্লাস কি সেই গোলাগুলির সমতুল নয়? যে দানিশের শরীর আজ মৃত বলে এই উল্লাস, মানবজীবনের নিতান্ত অন্যায়ের-যন্ত্রণার সাক্ষ্য বহন করা সেই সব ফ্রেম তো বেঁচে থাকবে, ভবিষ্যতের চোখের সামনে হাজির থাকবে দানিশের ছবির দলিল,তাঁর ক্যামেরা হাজির থাকবে ভূমিকম্পের নেপালে, দিল্লীর শ্মশানে, ইরাক বা আফগানিস্তানের যুদ্ধভূমিতে, কাশ্মীরে, মিছিলে-মিটিংএ-বিক্ষোভে-প্রতিবাদে-প্রতিরোধে।

আপনি বলেছিলেন, “আমার ভূমিকা আয়নার মতো। পৃথিবীতে ঘটে চলা চরম অন্যায়ের নিষ্ঠুর ছবি আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই... আমি চাই না সেই সব ঘটনার ছবি আর কখনও তুলতে। কিন্তু যদি আবারও সেইসব ঘটে, নিশ্চিন্ত থাকুন, আমি সেখানে আবারও উপস্থিত থাকব এবং আপনাদের সামনে নিয়ে আসব।”

আপনার সঙ্গে আমাদের অনেকেরই হয়ত আলাপ ছিল না। কিন্তু এই শহরের দক্ষিণে বজরং দলের লাঠি যখন আমাদের ক্যামেরা এবং মাথা ভেঙে দিতে চায়, তখন বুঝি ‘রামভক্ত গোপাল’রা ব্যক্তি নয়,যে কোনও প্রতিবাদী কণ্ঠেরই টুঁটি চেপে ধরতে চায়। সুতরাং দানিশ, পরিচয় ছিল না বটে, কিন্তু আমাদের আলাপ বড়ই গভীর-নিবিড় ছিল।

আগামী দিনগুলিতেও আপনার ছবি নিয়ে আমাদের আলাপ জারি থাকবে,আমাদের বিবেককে আপনার ক্যামেরা সদাই জাগিয়ে রাখবে,শাসকের ভ্রুকুটিকে থোড়াই কেয়ার দানিশ!

লাল সেলাম, কমরেড!

* বাঘাযতীনে আক্রমণের ছবি লেখকের ভিডিও থেকে নেওয়া।

0 Comments

Post Comment