পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

বিজেপি-নির্ভর বাম রাজনীতি দিয়ে সত্যিকারের বাম পুনরুজ্জীবন অসম্ভব

  • 12 January, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 1117 view(s)
  • লিখেছেন : শংকর
আগামী বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। দেখবার বিষয় হবে এটাই যে তাদের আসন সংখ্যা বাড়ল নাকি কমল। বামপন্থীরা সেই সাউডলাইনের ধারেই পাকাপাকি আসন নিয়েছেন এটাই ভবিতব্য। যদিও বামবৃত্তের বহু নেতাকর্মীর আশা আকাঙ্ক্ষা অন্য রকম। বামপন্থী নেতাদের একটি অতি পুরাতন হঠকারী পদ্ধতি হল কর্মীদের কাছে বাড়িয়ে চাড়িয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা। তাঁরা মনে করেন এতে করে কর্মীদের মনোবল বাড়ে।

যদি এভাবেই সব কিছু চলতে থাকে তাহলে এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনেও বামেদের অবস্থা খুব খারাপ হবে। আসন পাওয়া তো দূরের কথা ভোট শতাংশও কমার আশংকা প্রবল। এবারের নির্বাচনও দক্ষিণপন্থী দুটি দলের মধ্যেই লড়াই-এ সীমাবদ্ধ থাকবে। বিজেপির ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। দেখবার বিষয় হবে এটাই যে তাদের আসন সংখ্যা বাড়ল নাকি কমল। বামপন্থীরা সেই সাউডলাইনের ধারেই পাকাপাকি আসন নিয়েছেন এটাই ভবিতব্য। যদিও বামবৃত্তের বহু নেতাকর্মীর আশা আকাঙ্ক্ষা অন্য রকম। বামপন্থী নেতাদের একটি অতি পুরাতন হঠকারী পদ্ধতি হল কর্মীদের কাছে বাড়িয়ে চাড়িয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা। তাঁরা মনে করেন এতে করে কর্মীদের মনোবল বাড়ে। নইলে তাঁরা নেতিয়ে পড়বেন। সেই প্রেসক্রিপশন মেনে বিগত সব নির্বাচনেই নেতারা চলেছেন। এবারেও তার অন্যথা হবে বলে মনে হয় না। ফলে কর্মীদের অনেকেই আশায় বুক বেঁধে থাকবেন যে, ভালো কিছু হবে। কিন্তু যাঁরাই বর্তমান বাম রাজনীতিকে কাছ থেকে লক্ষ্য করছেন তাঁরাই ক্রমশ বুঝতে পারছেন যে, তা হবার নয়।

 

এবারে বিহার, পশ্চিমবঙ্গ প্রভৃতি ভোটমুখী রাজ্যগুলিসহ একাধিক রাজ্যে এসআইআর (ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন) ঘোষণা করে বিজেপি তার বিরোধীদের হাতে বিরাট অস্ত্র তুলে দিয়েছিল। কিন্তু কোথাওই বিরোধীরা সেই অস্ত্র হাতে তুলে নিতে পারে নি। পশ্চিমবঙ্গও তার ব্যতিক্রম নয়। এর কারণ হল বিরোধীরা এসআইআর নিয়ে সঠিক রাজনৈতিক অবস্থান নিতে পারেন নি। কারণ দক্ষিণপন্থী দলগুলি রাজনীতিকে ক্ষমতায় যাবার একটা পথমাত্র হিসাবেই দেখে থাকেন। রাজনীতি তাদের কাছে দাবা খেলার বোর্ডের থেকে বড় কিছু নয়। মানুষের ব্যাথা বেদনা সুখ দুঃখ হাসি কান্না —- এসবের খুব একটা মূল্য তাদের কাছে থাকে না। কিন্তু বামপন্থীরা? তাঁদের তো এমন হওয়ার কথা নয়। তাহলে তাঁরাও কেন দক্ষিণপন্থীদের মতই রাজনীতিকে ক্ষমতায় যাবার একটা পথ মাত্র হিসাবেই দেখছেন তা সত্যিই একটা গভীর প্রশ্ন। বলা বাহুল্য এই একই দোষে আক্রান্ত হওয়ার কারণে পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীরা খুব কিছু করে উঠতে পারছেন না। বিষয়টি কিছুটা ব্যাখ্যা করা দরকার।

 

পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর ঘোষণা হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীদের একটা প্রতিক্রিয়া ছিল, এইবার তৃণমূল টাইট হবে। আমি কোনো দলের নাম নিচ্ছি না, সাধারণভাবে “বামপন্থী” বলছি। সর্বোপরি আমরা সবাই জানি যে, কমিউনিষ্ট আন্দোলনের গভীর অসুখগুলো কোনো একটি দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। তা গোটা আন্দোলনেই পরিব্যাপ্ত থাকে। যাই হোক, বামেদের একটা বড় অংশের অবস্থান হল, তৃণমূল ভোটার লিস্টে যে গরমিল করে রেখেছে তার পর্দা ফাঁস হয়ে যাবে। তৃণমূল বেকায়দায় পড়বে। এই অবস্থান থেকে তাঁরা এসআইআর-এর প্রতি নরম মনোভাব নিলেন। তাঁরা এর পেছনে আধুনিক ফ্যাসিবাদের কৌশলটি বোঝার চেষ্টাই করলেন না এবং তাকে গুরুত্ব দিলেন না। এই ঘটনা পশ্চিমবঙ্গে বামেদের একটা বড় অংশের ক্ষেত্রে আমরা বারবারই দেখছি। সবাই দেখছেন যে, এর ফলাফল কী হচ্ছে। কিন্তু তবুও তাঁরা তাঁদের সিলেবাসের বাইরে বেরতে পারছেন না। অভ্যস্ত ভাবনাচিন্তার কারাগারে এঁনারা একপ্রকার বন্দী হয়ে রয়েছেন। এর প্রধান কারণ হল বামপন্থী রাজনীতিকে তাঁরা মানুষের সমস্যার সাথে, সুখ দুঃখের সাথে মিশিয়ে দেখছেন না। ক্ষমতায় যাবার হাতিয়ার হিসাবেই শুধু দেখছেন।

 

সকলেরই মনে থাকবে নরেন্দ্র মোদির নোট বাতিল পদক্ষেপের সময়েও এই একই ঘটনা ঘটেছিল। হঠাৎ করে পাঁচশো, হাজার টাকার নোটকে বাতিল ঘোষণা করার পেছনে সরকারের আসল উদ্দেশ্য কী ছিল তা তাঁরা বোঝার চেষ্টা করেন নি। এতে করে সাধারণ মানুষের কী দুর্ভোগ হবে তাও তাঁরা ভাবেন নি। তাঁরা শুধু একটাই কথা ভেবেছিলেন, তা হল এতে করে তৃণমূল বেকায়দায় পড়বে। আর এতেই তাঁরা আত্মহারা হয়েছিলেন। ফলে বাস্তবে যখন এই পদক্ষেপের ফলে মানুষ নাজেহাল হল, এমনকি বেশ কয়েকজনের মৃত্যুও হল তখন বামপন্থীরা এর বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হলেন।

 

এসআইআরের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটছে। এক্ষেত্রেও বামেরা তৃণমূলের বেকায়দা দশা কল্পনা করে এসআইআরের বিরুদ্ধে কোনো সক্রিয় প্রতিরোধ গড়েই তুলতে পারছেন না। তাঁরা বুঝতেই পারছেন না যে, তৃণমূল প্রকৃতপক্ষেই বেকায়দায় পড়বে যদি একটা সত্যিকারের জনদরদী বাম রাজনীতির উত্থান হয়। বিজেপির চালে তৃণমূল বেকায়দায় পড়বে না। আর বিজেপি বা নরেন্দ্র মোদি এমন একটা চাল দেবে (তা সে নোট বাতিল হোক, কিংবা দুর্নীতির দায়ে মমতা বা অভিষেককে জেলে ঢোকানোই হোক, কিংবা এসআইআর-ই হোক) আর বেকায়দায় পড়া তৃণমূলকে উৎখাত করে বামেরা অষ্টম মন্ত্রীসভা গড়বে —- এই দিবাস্বপ্ন, এই বিজেপি নির্ভর ফাঁকবাজির বাম রাজনীতি থেকে বামেরা যতদিন নিজেদের মুক্ত করতে পারবে না, ততদিন সে ব্যর্থ হবে।

 

অথচ, পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে মানুষের কাছে সব থেকে বড় ইস্যু কোনটি? সব থেকে বড় শিরঃপীড়া কোনটি? পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে গঞ্জে চায়ের দোকানে, বাসে, ট্রেনে একটাই আলোচনা, উদ্বেগ। তা হল এসআইআর। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর ঘোষিত হবার পরের দিন থেকেই রোজ রোজ মৃত্যু এবং আত্মহত্যার ঘটনা বিরামহীন ধারায় ঘটে চলেছে। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই তিন চারটি করে মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে এই ক'দিনে এই সংক্রান্ত মোট মৃত্যুর সংখ্যা কত হবে? সঠিক পরিসংখ্যান কারুর কাছেই নেই। কিন্তু তা অন্তত একশ তো বটেই। কখনও বিএলও মারা যাচ্ছেন, কখনও নাম কাটা যাবার আতঙ্কে সাধারন মানুষ মারা যাচ্ছেন। কখনো বা কেউ আত্মহত্যা করছেন। এই সব মৃত্যু কি বাম নেতাকর্মীদের বুকে বাজছে? মানুষের প্রতি যদি সত্যিকারের দরদ থাকত তা হলে রাজনীতি চুলোয় যাক, তাঁরা এর শেষ না দেখে ছাড়তেন না। আর সেটাই হত আসল কমিউনিষ্ট রাজনীতি। এই রাজনীতিই একদিকে বিজেপিকে আটকাতে পারত, অন্যদিকে তৃণমূলকে বেকায়দায় ফেলতে পারত। এটাই হত পশ্চিমবঙ্গে আসল বাম পুনরুজ্জীবন। কিন্তু তা আর হল কই? বামেরা ব্যস্ত রইলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিজেপির সেটিং তত্ত্ব নিয়ে জাবর কাটায় আর ফাইল কেলেঙ্কারি নিয়ে রসালো খোশগল্পে!

 

ওদিকে ২১-শে জানুয়ারি থেকে দিল্লিতে বসতে চলেছে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সর্বসাধারণের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ইত্যাদি গালিভরা নাম নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন। তিন দিনের এই সম্মেলনের বিষয়বস্তু ‘গণতন্ত্র এবং নির্বাচন পরিচালনা’! ৪১-টি দেশের নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলি নাকি তাতে অংশগ্রহণ করবে। সারা বিশ্ব নাকি ভারতের কাছ থেকে শিখবে ভারতের মত এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে ভোট প্রক্রিয়ার অঙ্গনে টেনে আনার রহস্য! কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের কর্তারা জানিয়েছেন এই সম্মেলনে মূল আকর্ষণ নাকি ভারতের এসআইআর প্রক্রিয়া। বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে হাসির উদ্রেককারী হলেও আসল ব্যাপারটা যে ঠিক কী তা গভীর রহস্যের বিষয়। বিশ্বজুড়ে ফ্যাসিবাদী উত্থানের বর্তমান সময়ে নিজের নির্বাচকমন্ডলী নিজেই নির্বাচিত করার যে কৌশল ভারতে ইতিমধ্যে আবিষ্কৃত তা নিয়ে বিশ্ব ফ্যাসিবাদের মাতব্বররা যে কৌতুহলী হবে তা স্বাভাবিক। ভারত কি ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক ভোটার বাদ দেওয়া এবং নিজের পছন্দমত ভোটারদের বা জালি ভোটারদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে চিরস্থায়ীভাবে নির্বাচন জেতার পদ্ধতির বিশ্বপ্রয়োগের আগে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের গিনিপিগ হতে চলেছে? এ বিশ্বে কিছুই অস্বাভাবিক নয়। এদিকে বামেরা এসব নিয়ে এখনও নড়াচড়াই করতেই পারল না।

 

বামেদের উচিৎ ছিল নির্বাচন কমিশনের দপ্তর ঘিরে রাখা। তীব্র বিক্ষোভে রাজ্য অচল করে দেওয়া। কমিশনের কাছে প্রতিটি মৃত্যুর জবাবদিহি চাওয়া। এসব করার ক্ষমতা কি বামেদের নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু তাঁরা ভয় পাচ্ছেন এসআইআর নিয়ে সুর চড়ালে তৃণমূলের সুবিধা হবে এই ভেবে। আর তৃণমূলের ভূমিকা সকলেই দেখছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপির বিরুদ্ধে খুব বেশি আক্রমণাত্মক হতে কখনই চান না। তাঁর লড়াই লড়াই ভঙ্গী খুব নিক্তি মাপা। ইদানীংকালে তিনি কেন্দ্রের সরকারের সমস্ত নীতিগুলিকে মেনে নিয়েছেন, রাজ্যে প্রয়োগ করছেন। তা সে নয়া শিক্ষানীতি হোক আর ওয়াকফ আইনই হোক। বিজেপির প্রতি তাঁর পরিষ্কার বার্তা হল, ‘তুমি রাজ্য শাসন করতে এস না। আমিই তোমার নীতি লাগু করব। তোমার নীতি প্রয়োগ করার জন্য তোমার দরকার নেই। আমিই আছি। আমাকে থাকতে দাও।’ মাঝখান থেকে জনগণ পড়েছে ফাঁপরে। রাজনীতির এই অভিনয়, চালবাজি আর অবিরাম ক্যালকুলেশনে জনগণ রিক্ত, হতাশ, অসহায়। বামেরাও এর থেকে আলাদা হতে পারলেন না।

 

তাই বাম উত্থানও নিকট ভবিষ্যতে দৃশ্যমান নয়। উত্থান দূরের কথা, সামান্য অগ্রগতিও অসম্ভব।

 

 

 

 

0 Comments

Post Comment