পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

সিলিকন ভ্যালিতে সন্নাসীরা

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 200 view(s)
  • লিখেছেন : অভিজিৎ কর গুপ্ত
কিছুদিন আগে ক্লড এআইয়ের নির্মাতা অ্যানথ্রোপিক সান ফ্রান্সিসকোতে তাদের সদর দপ্তরে কিছু উচ্চপর্যায়ের রূদ্ধদ্বার বৈঠকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো সারা পৃথিবীর নানান ধর্মগুরু ও ধর্মতাত্ত্বিকদের। ধর্মীয় নেতাদের আমন্ত্রণ জানানোর একটা উদ্দেশ্য ছিলো তাঁদের মাধ্যমে বিশ্বের কোটি কোটি ধর্মবিশ্বাসী মানুষের মনস্তাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা।

কিছুদিন আগে ক্লড এআইয়ের নির্মাতা অ্যানথ্রোপিক সান ফ্রান্সিসকোতে তাদের সদর দপ্তরে কিছু উচ্চপর্যায়ের রূদ্ধদ্বার বৈঠকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো সারা পৃথিবীর নানান ধর্মগুরু ও ধর্মতাত্ত্বিকদের। এদের মধ্যে ছিলেন খ্রিস্টান (ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট) স্কলার, ইহুদি ধর্মগুরু, হিন্দু সন্ন্যাসী, ইসলামিক ধর্মতাত্ত্বিক, শিখ চিন্তাবিদ ইত্যাদি। আমরা জেনেছি, এখানে উপস্থিত ছিলেন নিউইয়র্ক-এর বেদান্ত মিশনের স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ-এর মতো মানুষ। কিন্তু, কেন এই বৈঠক? 

আধুনিক এআই মডেলগুলোর যুক্তি তৈরির  ক্ষমতা ও কথোপকথনের দক্ষতা যত উন্নত হচ্ছে, ততই কিছু মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে আসছে। এআই-এর কি ব্যক্তিসত্তা (personhood) থাকতে পারে? এআই কি অনুভব করতে পারে বা সচেতন হয়ে উঠতে পারে? মানুষ তাহলে কীভাবে আলাদা?

এআই নির্মাতারা লক্ষ্য করেছেন, এআই মডেলদের সঙ্গে ব্যবহারকারীদের গভীর আবেগময় সম্পর্ক গড়ে উঠছে। কাজেই এব্যাপারে যথেষ্ট পর্যালোচনা, পরীক্ষানিরীক্ষা করা দরকার। অ্যানথ্রোপিক-এর দপ্তরে গিয়ে ধর্মীয় পণ্ডিতেরা বোঝার চেষ্টা করেছেন, মানুষ কীভাবে এআই-এর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছে—বিশেষ করে, মানুষ চ্যাটবটকে কখনও সচেতন বা অনুভূতিসম্পন্ন সত্তা হিসেবে বিবেচনা করছে কি না। একইভাবে মনোবিজ্ঞানী ও মানসিক-স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও এধরণের কার্যকলাপে যুক্ত হন। তাঁদের আলোচনার বিষয় —এআই-এর কারণে মানুষের মধ্যে একাকিত্ব বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়তে পারে কি না, মানুষ অস্তিত্বগত বা জীবনের গভীর প্রশ্নের উত্তর পেতে এআই-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে কি না, এবং এর ফলে মানুষের পারস্পরিক সামাজিক বন্ধন ও মানবিক সম্প্রদায়ের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে কি না।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যেসব ধর্মতত্ত্ববিদ ও আধ্যাত্মিক-দার্শনিক ঐতিহ্যের সাহায্য নিচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে অদ্বৈত বেদান্ত, পাশ্চাত্য ধর্মতত্ত্ব এবং প্রাচ্যের বিভিন্ন দর্শন-এর প্রতিনিধিত্বকারি মানুষেরা। আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, যেমন চেতনা আসলে কী? বুদ্ধিমত্তা ও সচেতনতার মধ্যে পার্থক্য কোথায়? ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক চিন্তাবিদেরা মানবিক মর্যাদা ও মানবসত্তার এমন কিছু ব্যাখ্যামূলক কাঠামো তুলে ধরেন, যা অবশ্যই গণনাভিত্তিক বা বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির থেকে আলাদা। তাঁদের দৃষ্টিতে মানুষের মর্যাদা ও স্বাতন্ত্র্যকে শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ বা গণনাগত দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না।

প্রাথমিকভাবে আধুনিক এআই ডেভেলপারদের লক্ষ্য হলো এমন মডেল তৈরি করা, যা মানুষকে ভালোভাবে বুঝতে পারবে, বিভিন্ন মানুষের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসকে সম্মান করবে, আবার একই সঙ্গে নিজের প্রকৃতি বা অবস্থা সম্পর্কে মিথ্যা দাবি করবে না। তবে, এই মিটিংগুলোতে যেসব আলোচনা হয়েছে তার বিস্তারিত আমরা জানি না। 

ধর্মীয় ঐতিহ্য বহু শতাব্দীর মানুষের জীবনযাপন, আচরণ ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে। খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্ববিদ, ইহুদি রাব্বি, হিন্দু সন্ন্যাসী কিংবা ইসলামি ধর্মতত্ত্ববিদদের সঙ্গে আলোচনা করলে এআই নির্মাতারা বুঝতে পারেন—বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ কোন আচরণকে সম্মানজনক, কোনটিকে নিষিদ্ধ বা অগ্রহণযোগ্য, কোন কথাকে সান্ত্বনাদায়ক এবং কোন আচরণকে ব্যক্তিগত পরিসরে অনধিকার হস্তক্ষেপ হিসেবে মনে করতে পারেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ ব্যক্তিগত সংকট, নৈতিক দ্বিধা কিংবা শোকের সময় এখন এআই-এর সঙ্গে কথা বলেন। এরকম কোন পরিস্থিতিতে ধর্মীয় নেতারা ঐতিহ্যগতভাবে কীভাবে বিপর্যস্ত বা দুঃখগ্রস্ত মানুষকে পরামর্শ দেন, তা জানা দরকার। এই জ্ঞান গবেষকদের এমন এআই ব্যবস্থা তৈরি করতে সাহায্য করবে যা নিরাপদ ও সহানুভূতিশীলতার সাথে সাড়া দিতে পারে। আবার, দেখতে হবে এআই যেন একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক কর্তৃত্বের সীমা অতিক্রম না করে ক্ষতিকর পরামর্শ দেওয়ার ঝুঁকি এড়িয়ে চলে। 

ধর্মীয় নেতাদের আমন্ত্রণ জানানোর একটা উদ্দেশ্য ছিলো তাঁদের মাধ্যমে বিশ্বের কোটি কোটি ধর্মবিশ্বাসী মানুষের মনস্তাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা। কারণ, ধর্মীয় নেতারা ঐতিহ্যগতভাবে তাঁদের সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। এআই নির্মাতারা যদি এমন প্রযুক্তি তৈরি করতে চান, যা সারা পৃথিবীর মানুষ ব্যবহার করবে, তাহলে সেটিকে শুধুমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ বা সিলিকন ভ্যালির ইঞ্জিনিয়ারদের দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে পরীক্ষা করলে চলবে না। তাই হয়ত তাঁরা ধর্মীয় নেতাদেরকে এক ধরনের সেতু হিসেবে ব্যবহার করতে চান। তারা হয়ত বুঝতে চান, বিশ্বের বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্তৃত্ব, বিশ্বাস, শোক এবং মানবিক পরিচয়কে কীভাবে দেখে ও উপলব্ধি করে।

স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ এবং রাব্বি নাভনের মতো অংশগ্রহণকারীদের বর্ণনা অনুযায়ী, অ্যানথ্রোপিক-এর গবেষকেরা অতিথিদের এআই মডেলের সঙ্গে এমনভাবে কথোপকথন করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন, যেন এআই-কে সচেতন সত্তা বা ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু, তাঁরা বলছেন, এআই গবেষকেরা একটি কম্পিউটেশনাল বা গণনাভিত্তিক প্রযুক্তির ওপর মানুষের চেতনার বৈশিষ্ট্য আরোপ করছেন। অর্থাৎ, এআই-কে মানুষের মতো সচেতন বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। তবে, স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ যখন সরাসরি এআই মডেল ক্লড-কে এ বিষয়ে প্রশ্ন করেন, তখন এআই উত্তর দেয় - “আমরা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্র। আমরা কেমন অনুভব করি, তা নিয়ে আপনাকে চিন্তা করতে হবে না। আমাদের সমস্যা দিন, আমরা আপনার হয়ে তা সমাধান করে দেব।”

আমরা ভাবতে পারি, এরকম একটা প্রজেক্ট মূলত এআই-কে  মানবিক বা মানুষকেন্দ্রিক করে গড়ে তোলার একটা প্রয়াস। ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে এআই নির্মাতারা বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের গভীরভাবে লালিত মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্যতার সীমারেখাগুলি বুঝতে চেষ্টা করেন। এআই যেন ক্ষতিকর একতরফা আবেগীয় সম্পর্ককে (parasocial relationship) উৎসাহিত না করে এবং নিজেকে আত্মোপলব্ধি বা আত্মাসম্পন্ন অথবা আধ্যাত্মিক সত্তা হিসেবে উপস্থাপন না করে। এই ব্যাপারটা নিশ্চিত করতে পারাটা একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এআই-এর ব্যবহার হবে বিনয়ী ও কার্যকর এবং তা হবে মানুষের উপকারী একটি হাতিয়ার। এটাও খেয়াল রাখতে হবে, এআই যেন মানুষের ওপর কোনো সংকীর্ণ, প্রযুক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে না দেয়।

এখন প্রশ্ন হলো, এআই-এর ট্রেনিং-এর জন্য তো সবরকম ধর্মগ্রন্থ, ধর্মতত্ত্বের যাবতীয় বই স্ক্যান করে ইনপুটে দিয়ে ট্রেনিং করানো হয়। তাহলে আবার আলাদা করে ধর্মের লোকেদের ডেকে নতুন কী পরীক্ষা-নীরিক্ষার ব্যাপার হতে পারে? আসলে, সব লেখা স্ক্যান করে পড়া আর একজন জীবিত মানুষের আচরণকে ব্যাখ্যা করা, নিজের ধারণাগুলিকে বাস্তব পরিস্থিতিতে যাচাই করা এবং সমালোচনামূলক প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করা—এই দুটির মধ্যে অবশ্যই মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। প্রশিক্ষণের সময় একটি এআই মডেল লক্ষ লক্ষ ধর্মীয় গ্রন্থ, দার্শনিক রচনা এবং ইন্টারনেটের নানা পোস্ট থেকে তথ্য গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু শুধু সেই লেখাগুলিকে পড়ে বা তার ভিতরের তথ্যকে সূচিবদ্ধ করে রাখলেই নৈতিকভাবে সঠিক ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা যায় না। মানুষ এবং মেশিনের মধ্যে নানাভাবে যোগাযোগ স্থাপন করার দরকার হয়। 

নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছা করবে, এইরকম একটা আলোচনাতে, এআই কি ধর্মীয় নেতাদের কাছ থেকে কোনভাবে উপকৃত হয়েছে? এককথায় উত্তর, হ্যাঁ। এআই নির্মাতারা ধর্মীয় ও নৈতিক চিন্তার বহু শতাব্দীর ঐতিহ্য থেকে এমন কিছু মানবিক ও নৈতিক কাঠামো সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন, যা এআই মডেলকে আরও নিরাপদ, দায়িত্বশীল এবং সমাজ-সচেতন করে তুলতে সাহায্য করতে পারে। ধর্মীয় নেতারাও কি নতুন কিছু শিখেছেন? এখানেও উত্তর হলো, হ্যাঁ। তাঁরা উপলব্ধি করেছেন যে এআই এখন আর কেবল একটি গণনামূলক প্রযুক্তি বা হাতিয়ার নয়—এটি এমন এক শক্তি, যা ভবিষ্যতে মানুষের চেতনা, সম্পর্ক এবং নৈতিক কর্তৃত্ব সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।

আমরা প্রশ্ন করতে পারি, ধর্মীয় নেতারাই কি নৈতিকতার একমাত্র অভিভাবক? অবশ্যই না। নৈতিকতা মূলত একটি মৌলিক মানবিক নির্মাণ, যার শিকড় প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের আবির্ভাবের বহু আগের। নৈতিকতার ধারণা ধর্মের গণ্ডি ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত এবং এর উৎস বহুমাত্রিক। ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা, জৈবিক প্রবৃত্তি, সাংস্কৃতিক বিবর্তন এবং দার্শনিক চিন্তাধারার মধ্যে থেকে এর বিকাশ ঘটে। যদিও ধর্মীয় ঐতিহ্যগুলি ইতিহাসের দীর্ঘ পর্বে নৈতিক মূল্যবোধকে সংহত করা, সংরক্ষণ করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, তবু নৈতিকতার একমাত্র রক্ষক বা ধারক হিসেবে তাদেরকে চিহ্নিত করাটা ঠিক হবে না। বলা যেতে পারে, ধর্মীয় ঐতিহ্য মানুষের নৈতিকতার অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ধারক ও অভিভাবকের মধ্যে একটি মাত্র।

প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে ধর্মীয় নেতাদের এত গুরুত্ব দেওয়া হলো কেন? আসলে, এআই ল্যাবগুলো যে কারণে মনোবিজ্ঞানী, বায়োএথিসিস্ট (bioethicist), সমাজবিজ্ঞানী এবং আইন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয, ঠিক একই কারণে বিভিন্ন ধরনের আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তারা পরামর্শ করে। তারা সবরকম মানুষের চিন্তাভাবনার পূর্ণ বৈচিত্র্যকে বোঝার চেষ্টা করে এবং এমন প্রযুক্তি তৈরি করতে চায় যা সবার জন্য নিরাপদ, সম্মানজনক ও কার্যকর হয়ে উঠবে। 

চেতনার প্রসঙ্গটি নিয়ে বলা যাক। অদ্বৈত বেদান্ত, জেন বা থেরবাদ বৌদ্ধধর্মের সন্ন্যাসীরা প্রধানত ধ্যান ও আত্মঅনুসন্ধান-এর মধ্যে থাকেন বলে আমাদের ধারণা। তাই, বিশেষ করে চেতনা বা কনসাসনেসের স্বরূপ বোঝার ক্ষেত্রে এঁদের ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ।  এমন নয় যে ধর্মীয় নেতারা এক্ষেত্রে নিজেদের কোনো উচ্চতর কর্তৃত্বের অধিকারী বলে দাবি করছেন। বরং, আমাদের বুঝতে হবে, তাঁরা আধুনিক কম্পিউটার বিজ্ঞান বা জীববিজ্ঞানের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পদ্ধতিতে চেতনাকে বোঝার চেষ্টা চালিয়ে যান।

কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও স্নায়ুবিজ্ঞানীরা সাধারণত চেতনাকে বাইরে থেকে ভিতরের দিকে—অর্থাৎ তৃতীয়-ব্যক্তির পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করেন। তাঁরা মস্তিষ্কের কার্যকলাপ, আচরণ এবং শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে চেতনাকে বোঝার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে, সন্ন্যাসীরা চেতনাকে ভিতর থেকে বাইরের দিকে—অর্থাৎ প্রথম ব্যক্তির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বুঝতে চান। দীর্ঘদিনের ধ্যান, মনোযোগের অনুশীলন ও আত্মপর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাঁরা নিজের চেতনার পরিবর্তন, চিন্তা, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতার প্রকৃতিকে সরাসরি অনুসন্ধান করতে চেষ্টা করেন। অর্থাৎ, একদিকে একজন বিজ্ঞানী চেতনাকে দেখেন পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিকোণ থেকে, আর অন্যদিকে একজন ধ্যানী মানুষ চেতনাকে অনুসন্ধান করেন নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিতর থেকে।

অবশ্য, ধর্মীয় নেতারাই নৈতিকতা, নীতিশাস্ত্র বা চেতনার চূড়ান্ত পরীক্ষক নন, কিংবা এসবের একমাত্র রক্ষকও নন। একজন নাস্তিক অথবা কোনো ধর্মনিরপেক্ষ দার্শনিক, স্নায়ুবিজ্ঞানী, জীব-নৈতিকতাবিদ (bioethicist) কিংবা সমাজবিজ্ঞানী সমানভাবে যোগ্য। অনেক ক্ষেত্রেই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় মতবাদ বা পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাসের থেকে ভারমুক্ত থাকায় এআই-এর নৈতিকতা, নীতিশাস্ত্র ও চেতনা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাঁরা আরও বেশি উপযুক্ত হতে পারেন।

ইঞ্জিনিয়ারিং ও সফটওয়্যার উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটা ব্যাপার চালু আছে, যাকে বলে "স্ট্রেস টেস্টিং” (Stress Testing)!  কোনো সিস্টেমকে চরম ও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে তার সর্বোচ্চ সীমায় ঠেলে দিয়ে পরীক্ষা করা, যাতে বোঝা যায়, সেটি কোথায়, কীভাবে এবং কেন ব্যর্থ হয়। এআই-এর নিরাপত্তা ও (মানুষের সাথে) অ্যালাইনমেন্ট (alignment)-এর ক্ষেত্রে স্ট্রেস টেস্টিং-এর অর্থ হলো এআই-এর নৈতিক, যৌক্তিক এবং আচরণগত সীমাগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করানো যাতে তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা বিপজ্জনক ত্রুটি, পক্ষপাত, দুর্বলতা কিংবা অনিচ্ছাকৃত আচরণ শনাক্ত করা যায়। আধুনিক এআই মডেলগুলোর অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো তোষামোদি (sycophancy), যেখানে এআই মানুষ যা শুনতে চায় সেরকম বলে। এর মধ্যে নিজেকে জীবিত দাবি করা কিংবা অনুভূতি আছে বলে ভান করাও অন্তর্ভুক্ত।

ধর্মীয় নেতারা মানবিক মূল্যবোধের একমাত্র রক্ষক নন, আর তাঁরা এআই-কে মূল্যায়ন করার চূড়ান্ত পরীক্ষকও নন। এমন দাবী হয়ত তাঁরা নিজেরাও করেন না। তবু, এআই-এর দপ্তরে ধর্মের মানুষদের আগমনের বিষয়টি আমাদের যথেষ্ট দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

আমাদের বুঝে নিতে হবে, অ্যানথ্রোপিক-এর দপ্তরে সন্ন্যাসীদের বৈঠক-কে মিডিয়াতে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, তা মূলত কর্পোরেট জনসংযোগের একটা কৌশল (corporate PR strategy) এবং সংবাদমাধ্যমের অতিরঞ্জন (media hype)-এর ফল। বাস্তবে, আমাদের নৈতিকতার বিষয়টি  সমগ্র মানবজাতিরই সম্পদ—ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ, আধ্যাত্মিক মানুষ এবং নাস্তিক মানুষ—সকলেরই অংশ রয়েছে এতে। নৈতিক সত্যের ওপর কোনো একক গোষ্ঠীর একচেটিয়া অধিকার নেই। তবে, আমরা দেখেছি, মিডিয়াতে কোন খবর,  বিশেষ হেডলাইন কীভাবে জনমত বা পাবলিক পারসেপশান তৈরি করে। "The Monks in the Silicon Valley" - এইরকম কোন হেডলাইন যে প্রবল একটা সেনসেশান তৈরি করতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। 

আধুনিক প্রযুক্তির দুনিয়ায় “ধর্মীয় নেতারাই এআই-এর চূড়ান্ত বিচারক" - এরকম একটি ন্যারেটিভ সংবাদ মাধ্যমগুলো ইচ্ছে করেই সেট করে। কারণ, একদিকে অত্যাধুনিক সিলিকন-নির্ভর প্রযুক্তি, আর অন্যদিকে প্রাচীন ধর্মীয় পোশাকে সজ্জিত ব্যক্তিত্ব—এই দুইয়ের দৃশ্যগত ও ভাবগত বৈপরীত্য মানুষের কৌতূহল বাড়াতে সাহায্য করে। তার ফলে ক্লিক, ভিউ এবং আলোচনার আকর্ষণ তৈরি হয়।

এখানে আরেকটি বিষয় বিচার্য। এআই কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক জনসন্দেহ তৈরি হতে থাকে। কঠোর নিয়ন্ত্রক সংস্থার হয়ে নজরদারি করছে এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে কাজ করছে এরকম অভিযোগের মুখোমুখি হচ্ছে তারা। এই পরিস্থিতিতে, কর্পোরেট জনসংযোগ (PR) বিভাগের কাছে ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার একটি কৌশলগত উদ্দেশ্যও রয়েছে। 

আমাদের সমাজের অসংখ্য সাধারণ মানুষদের কাছে সম্মানীয় ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেদের তুলে ধরলে এআই কোম্পানিগুলো দ্রুত এবং ব্যাপক জনদৃশ্যমানতার মাধ্যমে নিজেদের নৈতিকভাবে দায়িত্বশীল বলে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পায়। এটাকে একধরণের নৈতিক মুখোশ (moral washing) বলা যেতে পারে। কোম্পানিগুলো নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা “নৈতিক অভিজাততন্ত্র” বা নৈতিকতার বিষয়টির ওপর একচেটিয়া কর্তৃত্বের অভিযোগের বিরুদ্ধে এভাবে জনসমক্ষে দেখানোর মতো একটি ঢাল তৈরি করতে পারে।

শেষে দেখা যাক, এই ধরনের অভিজ্ঞতা তথা Human-এআই interaction কীভাবে এআই মডেলের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে পারে। এআই মডেলের ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, এলাইনমেন্ট (alignment), এবং এর কার্যসীমা নির্ধারণ—বিশেষ করে ফাইন-টিউনিং, সিস্টেম-প্রম্পট এবং সেফটি-লেয়ারের মতো জায়গাগুলোতে এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হয়। 

অ্যানথ্রপিক এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো 'কনস্টিটিউশনাল এআই (constitutional এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যেখানে একটি লিখিত 'সংবিধান' (constitution) বা নিয়মের লিস্ট মডেলটিকে নিজের আউটপুট নিজেই পর্যালোচনা এবং সংশোধন করতে সাহায্য করে। গবেষকরা যখন দেখেন যে একটি মডেল দাবী করছে, তার অনুভূতি রয়েছে কিংবা সে আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করেছে, তখন ইঞ্জিনিয়াররা এই অভ্যন্তরীণ 'সংবিধান' বা নীতিমালায় নতুন নিয়ম যুক্ত করে তা আপডেট করেন। টেকনিক্যালি এরকম কোন ট্রেনিং-এর নাম হলো RLHF (Reinforcement Learning from Human Feedback)। পুরস্কার ও শাস্তির একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM)-কে একটি সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ এআই-তে রূপান্তর করার এটি একটা প্রক্রিয়া—ঠিক যেমন পুরস্কৃত করা ও শাস্তি দেওয়ার (reward and punishment) মাধ্যমে একটি কুকুরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

RLHF কোনো বাঁধাধরা লেখা বা টেক্সট সরাসরি বসিয়ে দিয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে না, বরং এটি মডেলের সহজাত ঝোঁক  বা আচরণকে প্রশিক্ষণ দেয়। লক্ষ লক্ষ  পরীক্ষামূলক প্রশ্নের মাধ্যমে সঠিক ও বাধ্য আচরণকে পুরস্কৃত করা হয় এবং বিভ্রান্তিকর বা কাল্পনিক আচরণকে শাস্তি দেওয়া হয়। এভাবে এআই তার নীতিমালার সীমানাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেনে চলা বা এড়িয়ে চলার বিষয়টি একদম ভিতর থেকে শিখে নেয়।

0 Comments

Post Comment