পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

অথ রবীশকুমার কথা

  • 11 January, 2023
  • 0 Comment(s)
  • 374 view(s)
  • লিখেছেন : অশোকেন্দু সেনগুপ্ত
অন্যরা যখন অর্থবল বা সরকারের পেশীবলের কাছে আত্মসমর্পণ করে চলেছেন একে একে তখন রবীশকুমার দেখালেন যে, সব মানুষের শিরদাঁড়া বিক্রি হয় না, হবার নয়।


বেশ ছোটবয়সে একটা গান শুনেছিলাম ঃ 'চাক্কু, ছুরিযা তেজ করালে'। একালের নেতা-নেত্রীর কথা শুনলেই মনে হয় তাঁদের জিভও যেন বাস করে সেই চাক্কু বা ছুরি! এবং ভয়ানক তেজে তাও জ্বলছে। সমস্যা কী? অন্তত মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চের বিচারে কোনও সমস্যা ধরা পড়েনি। তবু নিশ্চিত হতে পারি না।
আমরা জানি ও মানি, অনেকে বলি অনেক সময়, সাহিত্য সমাজের প্রতিফলক। এতো নিশ্চয় সত্য। ভাবুন, যদি নেতা-নেত্রীদের ব্যবহৃত ভাষায় গল্প-উপন্যাস লেখা হয় তবে! একটা উদাহরণ দেব? না থাক। নেতা-নেত্রীদের নিয়ে রসিকতাও নাকি অনেকের বিলকুল অপছন্দ। রবীশকুমার চাকরির মুখে ঝাঁটা মেরে নিজেই একটা চ্যানেল খুলেছেন। বেশ করেছেন। সে কথাও বলব, পরে।
রবীশকুমারের প্রধান কথাই যেন সেইসব নেতা-নেত্রীদের কথার ধার মাপার চেষ্টা।  তিনি প্রথমেই ধরেছেন শাসকদলের সাংসদ সাধ্বী প্রজ্ঞা ঠাকুরের ভাষা। আরে বাবা, তেমন কি খারাপ কথা বলেছেন তিনি। এর চেয়ে অনেক বেশি খারাপ খারাপ কথা বলে থাকেন আমাদের দিলীপবাবু বা কুনালবাবুরা। তবে তাঁরা অবশ্যি যা বলেন তা বাংলাতেই বলেন।
সাধ্বী  চেয়েছেন মেয়েদের সুরক্ষা। একথা তো সত্য যে সরকার পারছে না মেয়েদের সুরক্ষা দিতে। তারা কেবল একের পর এক আইন রচনা করে চলেছে। তারপরও দেখছি (টি ভি খুললেই) ধর্ষণের গল্প। এমন অবস্থায় সরকারও যে আর কিছু করতে পারে না সরকার তা স্বীকারও করে নিয়েছে ( NCRB - র রেকর্ড দেখুন,  বছরের পর বছর খুন বা ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে)। বাস্তব তো মানবেন যে, কোনও সরকারই সব করে দিতে পারে না। এই মোদী সরকারও পারছেন না, অপরাধীরা সংখ্যায় বাড়ছে ( যদিও এই সরকারের আমলে কোনও নির্ভয়া কান্ড ঘটেনি)। সেনা, আধাসেনা, পুলিস- সান্ত্রী- সেপাই সবাই হার মেনেছে।  এবং এহেন পরিস্থিতি দেখে প্রজ্ঞাজি মেয়েদের ছুরি, চাকু, বঁটি, কাঁচি বা যার কাছে যা অস্ত্র আছে তাই ব্যবহার করতে বলেছেন আত্মরক্ষায়। সরকার পারছে না বলে বসে থাকবে নাকি দেশের মেয়েরা? সরকার পারছে না- এর চেয়ে সোজাসরল স্বীকারোক্তি কেউ শুনেছেন, দেখেছেন? রবীশকুমার উত্তরে 'বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও' প্রসঙ্গ তুলেছেন।
কিন্তু কেন? সরকারকে বেইজ্জত করতে! তিনি নিশ্চয় জানেন যে, এদেশে এখনও মেয়েদের সাক্ষরতার হার ছেলেদের তুলনায় অনেকটা কম। আর, এই যে মহামারীর কালে দেশের খেটে খাওয়া মানুষ আজও শিক্ষার আঙ্গিণায় মেয়েদের হাতে দিতে চায় না ( বা পারে না মোবাইল ফোন)। অথচ আমরা সকলেই জানি যে, বেটি যদি সুশিক্ষা পায় তো সে নিশ্চয় বাঁচবে। 'খাপ পঞ্চায়েতের' ভ্রুকুটি এড়িয়েই।


রবীশকুমার কি জানেন না যে এই সরকারের কোনও ইজ্জতই নেই, যদি ইজ্জত থাকত তবে,  প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রতিশ্রুতি অর্থমন্ত্রী বাতিল করতে পারতেন না। পেতাম না অর্থিক সাহায্যের বদলে হাজার রকমের ঋণের প্রতিশ্রুতি।  অথবা, প্রতিবেশী দুর্বল ছোট ছোট দেশগুলিও (যথা নেপাল বা ভূটান) এমন অবহেলা করতে সাহস পেত? দেখছি তাই, এখন প্রধানমন্ত্রী ব্যস্ত হয়ে কখনও সংবাদমাধ্যম কখনও বিচারব্যবস্থাকে নিজের পক্ষে টানতে ব্যস্ত। রবীশকুমার জানেন না বুঝি কানাকে কানা বা খোঁড়াকে খোঁড়া বলতে নেই।



এবার বলি রবীশকুমারের কথা। নিশ্চয় চেনেন সবাই তাঁকে। যারা হিন্দি অনুষ্ঠান শোনার জন্য এন ডি টিভি খোলেন তারা তো চেনেনই, অন্যরাও চেনেন আশা করি। অকুতোভয় (কয়েকবারই পেয়েছেন খুনের হুমকি) এই ভারতীয় সাংবাদিক ম্যাগসাইসাই পুরস্কার ও রামনাথ গোয়েনকা পুরস্কারে ভূষিত।  তাঁর কথা বলার আগে অন্য কিছু কথাও বলে রাখি। নিজের কথা, নিজের সময়ের কথা।
বেশিদূরেও যাব না। একটা সময় আমরা শুনতাম মন দিয়ে, কী বলছেন বিনোদ দুয়ারা। প্রকৃত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ শোনা যেত তাদের কথায়। এখন শুনি না। বিনোদ দুয়ারা নেই বলেই কী?  নাকি আমার বয়স বেড়েছে বলেই!
 বিনোদ দুয়াদের পরও তো কতজন এলেন বা গেলেন তাঁরা কেউই যেন শূন্যপূরণের যোগ্য হয়ে উঠলেন না, চেষ্টাও করলেন না যেন। বরখা ডাট বা নিধি রাজদান বা  সোম বা সরদেশাই বা আর কেউ শূন্যস্থানপূরণে এগিয়ে  যেতে পারলেন না কেন শ্রোতাদের মনজয়ে? পুরস্কার পেয়েছেন কেউ কেউ তবুও তারা কেউ হ'ন নি বিনোদ দুয়া বা রবীশকুমার। নাকি এসব খেদই আমার বয়সজনিত ভ্রম!
পুরোটাই যে ভ্রম নয় তা প্রমাণ করলেন বুঝি এই তরুণ রবীশকুমার। অন্যরা যখন অর্থবল বা সরকারের পেশীবলের কাছে আত্মসমর্পণ করে চলেছেন একে একে তখন রবীশকুমার দেখালেন যে, সব মানুষের শিরদাঁড়া বিক্রি হয় না, হবার নয়।


সবাই আমরা জেনে গেছি এর মধ্যে যে এই সরকার কোনও বিরুদ্ধতা পছন্দ করে না, শুধু তাই নয় এই সরকার প্রয়োজন  হলে অগণতান্ত্রিক পথে হাঁটতেও দ্বিধা করে না যে। ব্যাপম কেলেংকারীর কথা কে না জানে। রবীশকুমার সব জেনেই সরকারের অগণতান্ত্রিক কাজের প্রতিবাদ জানানোর পথ বেছে নিয়েছেন স্বেচ্ছায়। খুলেছেন নিজস্ব নিউজ পোর্টাল। আদানী-আম্বানী ও এই  স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে যেন একা যুদ্ধে নেমেছেন। আমরা এও অনুমান করি যে, এই কোভিড মহামারীর দিন ফুরোলে  দিন ফুরোবে ই-মাধ্যমের যাবতীয় হৈচৈ। এতো আর শিক্ষাপ্রসারে কেন্দ্রীয় উদ্যোগ নয় ( একটা উপযুক্ত এন্ড্রয়েড মোবাইল পেলে, আর মোবাইল টাওয়ার ও তড়িত- সংযোগ হলেই হয় - যেন শিক্ষাপ্রসারে শিক্ষক বা শিক্ষালয় না হলেও চলে ) বা সংবাদ পরিবেশনের বিকল্প আয়োজন নয় যে কোভিডভীতি বিতাড়িত হলেই স্কুল-কলেজ-অফিস- মাঠঘাট- কারখানা থেকে ফিরেই আমরা চাইব টি ভি চালিয়ে দিনের খবর শুনতে আর শিক্ষা  নিতে।  অর্থাৎ  যেমন ছিল আমাদের জগতটা।  মানতেই হবে, কোভিডও নিশ্চয় চিরকাল তার খেলা দেখাতে আসেনি, কোভিডের ভয় দেখানোর খেলাটাও শেষ হবে একদিন। তখন, কী করবেন রবীশকুমাররা? সমাজমাধ্যম তার দৌড় থামালে কি করবেন রবীশকুমার?  একা যে লড়া যায় না কুমারসাহাব! নিশ্চয় রবীশকুমারও ভেবেছেন এই নিয়ে।

স্বৈরাচারী শাসক যা চাইবে তাই হবে নাকি!


দোষটা কার? কেবল ঐ স্বৈরাচারী শাসকের এবং তার কিছু আপনজনের? আমাদের দোষ নেই কিছু? অন্তত বঙ্গজদের? নিশ্চয় আছে। আমরা রবীন্দ্রনাথের  গান গাইতে পারি,  আমরা করতেই পারি নিন্দা-সমালোচনা গোদী মিডিয়ার, ঐতিহ্যের গল্প শোনাতে পারি একে অন্যকে ইত্যাদি।  কিন্তু, তাতে লাভ হবে কী?  মানতেই হবে যে, সাংবাদিকরা তো আকাশ থেকে নেমে আসেন নি, এই সেদিনও যে ওরা ছিলেন আমাদের লোক, এখন যদি প্রাণভয়ে বা অর্থলোভে তারা শিবির বদলায় তা মেনে নিতে সমস্যা কোথায়? এমন শিবির বদল তো আমাদের অভিজ্ঞতাতেও ( জনপ্রতিনিধিদের আচরণ ভুলি কেমন করে?) আছে।

প্রার্থনা করি আসুন সবাই মিলে প্রার্থনা করি, আমাদের সমাজমাধ্যম তথা ই-মাধ্যম থাকুক তার সব বৈশিষ্ট্য নিয়ে, প্রতিবাদী চেহারা নিয়ে। রবীশকুমাররা থাকতে পারেন, কেবল যদি আমরা পাশে থাকি, কেবল আমাদের গান দিয়ে বা কথা দিয়ে বা স্লোগান দিয়ে নয় আমরা পাশে থাকব, আমাদের অফুরান ও কার্যকর সমর্থন নিয়ে। থাকতেই হবে, নইলে যে স্বৈরাচারী শাসক আমাদের গণতন্ত্রকে শেষ করে দেবে।

মনে রাখতে চাই যে, কিছু মানুষ আজও আছেন যাঁরা ভয় পেয়ে বা চাপে পড়ে শিরদাঁড়া বেচে দেবার লোক না।

0 Comments

Post Comment