পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

মতবাদিক দারিদ্র্য প্রসঙ্গে দুচার কথা

  • 24 September, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 1009 view(s)
  • লিখেছেন : অশোক মুখোপাধ্যায়
আমাদের দেশেও প্রুধোঁর সেই কল্যাণকামী খুচরো কর্মসূচিগুলিই বর্তমানে কোথাও টিএমসি, কোথাও আপ, কোথাও অন্য কেউ (এমনকি বিজেপিও) টুকটাক চালু করে চলেছে। এই সমস্ত কর্মসূচির সুবিধা হল, মানুষ এতে সহজেই আকৃষ্ট হয় এবং ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পথ থেকে শুধু সরে আসে তাই নয়, লড়াইকে অপ্রয়োজনীয় মনে করতে থাকে। সমাজ বিপ্লবের সম্ভাবনা কমে যায়।

মার্ক্সবাদ অনুরাগী বিশিষ্ট ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জোন রবিনসন (১৯০৩-৮৩) ১৯৫৬ সালে এক প্রবন্ধে বলেছিলেন, কার্ল মার্ক্সের যৌবন কালের রচনা “দর্শনের দারিদ্র্য” (১৮৪৭) বইতে দু এক জায়গায় কিছু মূল্যবান বক্তব্য থাকলেও সব মিলিয়ে বইটা তেমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয়। ১৯৭০-এর দশকে আমার রাজনৈতিক জীবনের কৈশোরে বইটা হাতে নিয়ে এর শিরোনাম পড়ে খুব মজা পেয়েছিলাম। পিয়র জোসেফ প্রুধোঁ তাঁর বইয়ের উপনাম দিয়েছিলেন দারিদ্র্যের দর্শন। মার্ক্স তাকেই ঘুরিয়ে লিখলেন দর্শনের দারিদ্র্য। বইটার সামনের দিকের কিছু কিছু পাতা উলটে খুব একটা বুঝেছিলাম, এমন নয়, কিন্তু মনে হয়েছিল, সত্যিই এটা আমাদের জন্য তেমন দরকারি বই নয়। একালে না পড়লেও চলবে।

১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দুই দশকে দুরকম ঘটনায় ধীরে ধীরে মত পাল্টাতে হল।

প্রথম, পশ্চিম বাংলায় তখন বামফ্রন্টের দ্বিতীয় ইনিংস চলছে। বেকার ভাতা, বিধবা ভাতা, বার্ধক্য ভাতা, ইত্যাদি একে একে আবির্ভূত হচ্ছে। ফাঁকা বড় দেওয়ালগুলোতে তখন সে কী বজ্র নির্ঘোষ! বিশ্বে এই প্রথম। জনগণের জন্য যথার্থ দরদের কী নিকুণ্ঠ প্রকাশ!! সামান্য হলেও গরিব মানুষের হাতে কিছু অর্থ তো তুলে দেওয়া হচ্ছে। এরা স্বাধীনভাবে খরচ করতে তো পারবে। অল্প হলেও সুখের মুখ তো দেখবে। এই ভাবে জনকল্যাণ কদম কদম এগিয়ে আসবে। ধীরে ধীরে।

দ্বিতীয়, সীমান্তের ওপারে ১৯৯০এর দশকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এক অধ্যাপক, মহম্মদ ইউনুস, গ্রামীন ব্যাঙ্ক খুলে ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প চালু করে গ্রামের নিম্নস্তরের গরিবদের মধ্যে ছোট ছোট গ্রুপে যৌথ ঋণ দিয়ে এক উন্নয়নের খোয়াব দেখাতে শুরু করলেন। তিনি দাবি করলেন, ক্ষুদ্র ঋণ পাওয়া জনগণের একটি মৌলিক অধিকার হওয়া উচিত। কিছু কাল বাদে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারও পেয়ে গেলেন সেই “মহান” কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ।

তখন আবার নতুন করে মনে পড়ল প্রুধোঁর কথা।

হ্যাঁ, ঠিক, প্রুধোঁও তো অনেকটা এরকমই বলেছিলেন এবং চেয়েছিলেন। ধনতন্ত্র থেকে সমাজতান্ত্রিক একটা ন্যায়বিচার সম্মত সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বিপ্লব, সংগ্রাম—এসবের কোনো প্রয়োজন নেই। শ্রমিকদের চাই একটা বাড়ি, একটা ছোট গৃহসংলগ্ন বাগান, আর সামান্য কিছু সুযোগ সুবিধা, যথা, স্বল্প সুদে ব্যাঙ্ক ঋণ, ইত্যাদি। এই সমস্ত অল্পস্বল্প জিনিসের জন্য দাবি দাওয়া পেশ করে আদায় করতে করতেই এক সময় শান্তির নীড় ছায়া সুনিবিড় সমাজতন্ত্র এসে যাবে।

কার্ল মার্ক্সের এতেই আপত্তি ছিল। তিনি তাঁর বন্ধু ফ্রেডরিক এঙ্গেল্‌সের সঙ্গে মিলিতভাবে তখনও শ্রমিক বিপ্লবের আহ্বান জানিয়ে কমিউনিস্ট ইস্তাহার লেখেননি। কমিউনিস্ট বিপ্লবের তত্ত্ব নির্মাণ এবং সংগঠন গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বেলজিয়ামে বসে। মনে মনে প্রবল অশান্ত এই মানুষটি সেদিনের এই বিপ্লবী পথ এড়ানো কর্মসূচিকে মেনে নিতে পারেননি। তাই ফরাসি ভাষায় এই বইটা লিখেছিলেন এবং ব্রাসেল্‌স থেকে প্রকাশ করেছিলেন। আর এতে প্রুধোঁর মতবাদকে আখ্যা দিয়েছিলেন সমাজতন্ত্রের পাতিবুর্জোয়া মন্ত্র (ইংরেজিতে petty bourgeois code of socialism)।

রবিনসন ম্যাডাম প্রয়াত হওয়ার ঠিক পরে পরে, সাম্প্রতিক পশ্চাদ দশকগুলিতে সারা বিশ্ব জুড়েই ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রনায়কদের কাছে প্রুধোঁর সেই মন্ত্র আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দেশের জনমণ্ডলির কারও জমি না থাকলে তাকে এক টুকরো জমি দাও, বাসস্থান না থাকলে একটা বাড়ি বানিয়ে দাও, খাদ্য না পেলে তাকে কিছু খাদ্য অন্তত বিনি পয়সায় দাও (যার গাল ভরা নাম খাদ্য সুরক্ষা), ইত্যাদি শ্লোগানগুলি এখন বিভিন্ন প্রকল্পের মধ্যে মূর্ত হয়ে উঠছে। পশ্চিম বাংলায় বামফ্রন্ট এক সময় যে সমস্ত কর্মসূচি নিয়েছিল, পরে তাঁদেরই পরামর্শে মনমোহন সরকারও একশ দিনের কাজ, জন আবাস যোজনা, অন্ত্যোদয় প্রকল্প, ইত্যাদি গ্রহণ করেছিল—তাও এই প্রুধোঁনিক পাতিবুর্জোয়া জনকল্যাণের মন্ত্র বই অন্য কিছু নয়।

প্রুধোঁ খুব গুরু পাণ্ডিত্যের জারক রস দিয়ে দাবি করেছিলেন, শ্রমিকরা যদি ধর্মঘট করে করে মজুরি বাড়ায়, তাতে বাজারে অবিলম্বে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে, মজুরি বৃদ্ধি কোনো কাজেই আসবে না। মার্ক্স দেখিয়েছিলেন, কথাটা একেবারেই ভুল। মজুরি বাড়লে মালিকের মুনাফায় টান পড়ে বলে ওরা মজুরি বৃদ্ধির বিরোধিতা করে। দুঃখের বিষয়, প্রুধোঁর এই সব থিসিস এখনও বাজারে খুব চলে, বাজারি গণ মাধ্যম এই তত্ত্বকে আজও চালাতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। শ্রমিক কর্মচারিদের মজুরি বাড়িয়ে কিংবা ডিএ দিয়ে লাভ নেই, কেন না ওতে বাজারে সমস্ত পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। যদিও বাস্তবে আমরা জানি ঘটনাটা আসলে উলটোভাবে ঘটে, জিনিসপত্রের দাম বাড়ে বলেই শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানাতে বাধ্য হয়। কর্মচারিরা ডিএ দাবি করে।

আমাদের দেশেও প্রুধোঁর সেই কল্যাণকামী খুচরো কর্মসূচিগুলিই বর্তমানে কোথাও টিএমসি, কোথাও আপ, কোথাও অন্য কেউ (এমনকি বিজেপিও) টুকটাক চালু করে চলেছে। এই সমস্ত কর্মসূচির সুবিধা হল, মানুষ এতে সহজেই আকৃষ্ট হয় এবং ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পথ থেকে শুধু সরে আসে তাই নয়, লড়াইকে অপ্রয়োজনীয় মনে করতে থাকে। সমাজ বিপ্লবের সম্ভাবনা কমে যায়।

সেখানেই ছিল বিপ্লবী যুবক মার্ক্সের আপত্তি। তিনি তখনও ডাস কাপিটাল রচনা করেননি তাই নয়, চিন্তার জগতে সেই মহাগ্রন্থের আয়াস সাধ্য মার্ক্সবাদী মৌল বিচারধারায় পুরোপুরি পৌঁছননি। কিন্তু সমাজ বদলের দুটো মূল সূত্র তিনি ধরে ফেলেছেন: এক, উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে না পারলে উৎপাদন সম্পর্ক বদল করতে হবে, এবং তার দ্বারাই সমাজব্যবস্থার বদল ঘটবে; দুই, বুর্জোয়া ও সর্বহারা শ্রেণির মধ্যে আসন্ন শ্রেণিসংগ্রাম তীব্র রূপ ধারণ করেই এই সমাজ পরিবর্তনের কাজ সম্পন্ন করবে। তাই “দর্শনের দারিদ্র্য” বইটির শেষ অনুচ্ছেদে ছিল একটি অসাধারণ উদ্ধৃতি: “Le combat au la mort; la lutle sanguina!re au Ie neant. C'est ainsi que la question est invinciblement posee.” (জর্জ স্যান্ড-এর রচিত একটি উপন্যাসের এক নায়কের সংলাপ) যার অর্থ: <সংগ্রাম অথবা মৃত্যু; রক্তক্ষয়ী লড়াই অথবা অবলুপ্তি। এছাড়া প্রশ্নটিকে অন্য ভাবে রাখাই যায় না।>

এই পরিপ্রেক্ষিতে পুঁজিবাদের সৌজন্যে এবং অধিকাংশ মার্ক্সবাদীদের অজ্ঞতার সুযোগে মার্ক্সের সেই “দর্শনের দারিদ্র্য” বইটি আজ আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

মার্ক্স যে কারণে প্রুধোঁর মতবাদকে বাতিল করতে চেয়েছিলেন, ঠিক সেই কারণেই একালের বুর্জোয়া শাসকদের কাছে প্রুধোঁ গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছেন। ধনতন্ত্রের রক্ষাকবচ হিসাবে। এমনকি মার্ক্সবাদীরাও সরকারি মসনদে বসে একই ধরনের কার্যক্রম নিয়েছেন এবং তার জন্য গর্ব বোধ করতে সক্ষম হয়েছেন—খুব সম্ভবত এগুলো যে উনিশ শতকের পাতিবুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের বিপ্লব রোধক তাবিজ কবচ হিসাবে আবিষ্কার, তা না জেনেই। সুতরাং অন্যান্য দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলো যখন সেই পথই বেছে নিচ্ছে, তাঁদের আপত্তি করার নৈতিক খুঁটি বেশ নড়বড়ে হয়ে আছে।

বর্তমান রাজ্য সরকারের কন্যাশ্রী, ক্লাবশ্রী, মাতালশ্রী ইত্যাদি প্রকল্পগুলিতে আপত্তি করার আগে স্বীকার করে নেওয়া দরকার, আমাদের বিগত শতকের ভাতা স্কিমগুলিও মার্ক্সীয় মতবাদিক অর্থে ভুল ছিল। বিপ্লব নিরোধক কর্মসূচি ছিল। এক পা এগিয়ে যাওয়ার বদলে তিন পা পিছিয়ে যাওয়া ছিল। গরিব জনগণকে প্রদত্ত খয়রাতি হিসাবে ভুল নয়—উচ্চ আদালতের সংশ্লিষ্ট বক্তব্যের ক্ষেত্রে আমাদের আপত্তি অন্য জায়গায়। তাঁরা ধনীদের জোচ্চুরিতে লক্ষ কোটি টাকার মোদীয় খয়রাতিকে অগ্রাহ্য করে রাজ্য সরকারগুলির পাঁচশ, এক হাজার টাকার খয়রাতিকে ক্ষতিকারক বলছেন। আর আমার বক্তব্য এখানে, মার্ক্সবাদীরা এই সব খয়রাতির প্রশ্নকে কী চোখে দেখবে তা নিয়ে।

আশা করি, অনেক বাক্যজাল ছড়িয়েও শেষ অবধি কিছুই বোঝাতে পারলাম না!

0 Comments

Post Comment