পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

তেলের শতরান ও বোল্ড আউট জনতা

  • 07 July, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 461 view(s)
  • লিখেছেন : শোভনলাল চক্রবর্তী
এমনিতেই কোভিড পরিস্থিতিতে বহু মানুষ চাকরি খুইয়েছেন, বহু মানুষ অর্ধেক মাইনেতে কাজ করছেন। এই সব মানুষের জন্য আজকের বাজারের প্রায় প্রতিটি জিনিসের দাম, বিশেষ করে ভোজ্য তেল এবং রান্নার গ্যাসের দাম ক্রমশ হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকার বলছেন সব কিছুর দাম বাড়বে, কারণ বিশ্বের বাজারে এই সব পণ্যের দাম বাড়ছে, বিশেষ করে তেলের বাজার এখন অনিয়ন্ত্রিত। প্রথমেই বলে রাখা দরকার এই যুক্তি একটি ডাহা মিথ্যা। তেলের ব্যবহারের বৃদ্ধি যে অর্থনীতি ও আয়ের সঙ্গে সমানুপাতিক তা বোঝার জন্য অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন হয় না। সরকার বলছেন মোটা টাকা দিয়ে তেল আমদানি করতে হচ্ছে কারণ দেশে নাকি তেলের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র হল এই যে মোদি জমানায় ভারতে অপরিশোধিত তেলের ব্যবহার কমেছে।

তেলের শতরান - এই নিয়ে সংবাদ মাধ্যম থেকে সমাজ মাধ্যম, প্রতিটি জায়গায় আলোচনার শেষ নেই। গত এক বছরে ৩৪বার বেড়েছে ডিজেলের দাম, ৩৫বার বেড়েছে পেট্রোলের দাম, যার জেরে বোল্ড আউট সাধারণ মানুষ। কেন্দ্রীয় সরকার পরিষ্কার করে বলেছেন দাম আরও বাড়বে। আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে জানিয়েছেন, এই ভাবে দাম বাড়লে বাজারে আগুন লাগবে, তখন পুরো ব্যবস্থাটাই চলে যাবে হাতের বাইরে। তেলের দাম বাড়লে তার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ফল ভোগেন সাধারণ মানুষ, কারণ বাজারের অগ্নিমূল্য। এমনিতেই কোভিড পরিস্থিতিতে বহু মানুষ চাকরি খুইয়েছেন, বহু মানুষ অর্ধেক মাইনেতে কাজ করছেন। এই সব মানুষের জন্য আজকের বাজারের প্রায় প্রতিটি জিনিসের দাম, বিশেষ করে ভোজ্য তেল এবং রান্নার গ্যাসের দাম ক্রমশ হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকার বলছেন সব কিছুর দাম বাড়বে, কারণ বিশ্বের বাজারে এই সব পণ্যের দাম বাড়ছে, বিশেষ করে তেলের বাজার এখন অনিয়ন্ত্রিত। প্রথমেই বলে রাখা দরকার এই যুক্তি একটি ডাহা মিথ্যা। তেলের ব্যবহারের বৃদ্ধি যে অর্থনীতি ও আয়ের সঙ্গে সমানুপাতিক তা বোঝার জন্য অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন হয় না। সরকার বলছেন মোটা টাকা দিয়ে তেল আমদানি করতে হচ্ছে কারণ দেশে নাকি তেলের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র হল এই যে মোদি জমানায় ভারতে অপরিশোধিত তেলের ব্যবহার কমেছে। কারণ অর্থনৈতিক উন্নয়নে ধস নেমেছে, এবং উন্নয়নের সূচক কমতে কমতে ঋণাত্মক হয়ে গেছে।তেল মন্ত্রকের দ্বারা প্রকাশিত তথ্য বলছে ২০০৭-০৮ থেকে ২০১৩-১৪ পর্যন্ত অপরিশোধিত তেলের ব্যবহার বেড়েছিল ৬.৭%।কিন্তু ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৯-২০ এই সময়ে ওই ব্যবহারের পরিমান কমে হয়েছে ২.২%। এই সময়ের ভিতর ভারত নিজে যে তেল উৎপাদন করেছে তার পরিমান ২০১৩-১৪ সালের নিরিখে (যখন উৎপাদন হয়েছিল ৩৭.৮ মিলিয়ন টন) ২০১৯-২০ সালে উৎপাদনে প্রায় ১৫% হ্রাস হয়েছে। এই হ্রাসের কারণ স্পষ্টতই সরকারের তেল উৎপাদনে অনীহা। ওএনজিসি তেলের ভান্ডার খুঁজতে যখন ২০১৩-১৪ সালে খরচ করেছে ১১,৬০০ কোটি টাকা তখন ২০২০ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৬,০০০ কোটি টাকায়, প্রায় অর্ধেক। মার্চ ২০১৪ সালে ওএনজিসি'র হাতে টাকার যা পরিমান ছিল, তার ২০২০-তে প্রায় ৯১% পতন ঘটে। কেন এই পতন? এর কারণ এই যে সরকার বাধ্য করে ওএনজিসি'কে বিপুল পরিমাণ পুঁজি নিয়োগ করে ধুঁকতে থাকা এইচপিসিএল- কে কিনে নিতে, যাতে সরকার এইচপিসিএল-কে বিলগ্নিকরণ করতে পারেন! যে সরকার বিলগ্নিকরণের মাধ্যমে টাকা রোজগারে বিশ্বাসী তাঁদের কাছে কে ওএনজিসি, জাতীয় অর্থনীতিতে কি তার গুরুত্ব, এই সব বিচার, বিবেচনা গৌণ, তা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে। পেট্রল সেক্টর বরাবরই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দুধেল গরু। পূর্ববর্তী সরকার এই গরুটিকে দুইয়েছেন, তবে তার মুখে ঘাস বিচুলি জুগিয়ে। মোদি সরকার গরুর খাদ্য বন্ধ করে দিয়ে শুধুই দুধ চাইছেন তা কি করে হয়? ২০১৪-১৫ সালে সরকার পেট্রোলিয়াম সেক্টরে অনুদান দিয়েছিলেন ৬০ হাজার কোটি টাকা। সেই বছরই ওই সেক্টর থেকে ট্যাক্স, ডিউটি, ডিভিডেন্ড মাধ্যমে সরকারের মোট আমদানি হয় ১.৭২ লক্ষ কোটি টাকা। এরপরে সরকার ২০১৯-২০ সালে অনুদান কমিয়ে দিলেন। অনুদান খাতে ৩৮,৫০০ কোটি টাকা দিলেন, কিন্তু কত ফেরত পেলেন জানেন, ৩.৩৪ লক্ষ কোটি টাকা। এই যে কম বিনিয়োগে বেশি টাকা সরকারের কোষাগারে ঢোকানোর গুজরাটি বেনিয়াদের ভাবনা, এটাই কিন্তু কাল হয়েছে শেষ পর্যন্ত। ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে যে সেক্টরগুলো ভালো করে, যেমন টেলিকম বা আইটি , সেখানে কিন্তু সরকার বাহাদুর ব্যাপক হারে ট্যাক্স ছাড় দেন, পরিকাঠামো উন্নতি খাতে ব্যয় করেন, কিন্তু পেট্রোলিয়াম সেক্টরে ঠিক উল্টোটাই হয়েছে। যেহেতু কম অনুদান দিয়ে অনেক বেশি ফেরত আসছে, তাই কমটাই চলুক -এই হল সরকারের পেট্রোলিয়াম সেক্টর নীতি! তেলের দাম নির্ধারণের পুরোটাই নির্ভর করছে দেশে তেল আমদানি করতে কত খরচ হচ্ছে তার উপর। সেই তেল কোথায় উৎপাদিত হচ্ছে দেশে না বিদেশে, তার সঙ্গে এই দামের কোনও সম্পর্ক নেই। তেলের দাম নির্ধারণ পদ্ধতি হল কোনও একটি উপসাগরীয় দেশের বন্দরে ওই তেলের দাম যা থাকবে তার সঙ্গে যোগ হবে তেল জাহাজে তোলার খরচ, জাহাজের ভাড়া, ইন্সুরেন্স, বন্দরের শুল্ক, কাস্টমস ডিউটি। এই সব যোগ করে তেলের যা দাম দাঁড়ায়, দেখা যাচ্ছে রিফাইনারিতে তেল উৎপাদন করলে সেই তেল প্রায় ৮০% সস্তা পরে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে জনতাকে তেলের সহায়ক মূল্য বলে যেটা বোঝানো হচ্ছে, তার বেশিরভাগই তেলের উপর উপরি খরচ বা ওভেরহেড। ভারতের নিজের যে তেল পরিশোধনাগারগুলো রয়েছে সেখানে তেলের ব্যারেল প্রতি উৎপাদনজনিত যা লাভ, তেমনটা বিশ্বের খুব কম পরিশোধনাগারে হয়ে থাকে। তার একটা বড় কারণ ভারতের সুলভ শ্রমিক। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই সব কথা জনতার দরবারে তুলে ধরবেন কারা? সারা বিশ্ব জুড়ে মুলস্রোতের অর্থনীতিবিদরা এইসব বিষয়ে লেখালেখি করে জনগণকে সমৃদ্ধ করেন। দুর্ভাগ্যবশতভাবে আমাদের দেশের অর্থনীতিবিদরা কৃষক তার নির্ধারিত মূল্যে ফসল বেচতে পারবে কিনা, ফসলের সহায়ক মূল্য পাবে কিনা, এই সম্পর্কে সমানে সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের বিভ্রান্ত করে চলেছেন। কর্পোরেট পুঁজির হাতে তাঁরা কৃষিকে তুলে দিয়ে বসে রয়েছেন, কৃষি বিল তাঁদের সিলমোহর পেয়ে গেছে। এখানে আমাদের প্রশ্ন এই যে অনুরূপ ব্যবস্থা তেলের ক্ষেত্রে হবে না কেন? তেলের সহায়ক মূল্য তেল কোম্পানিগুলো পাবেই, এই গ্যারান্টি দিচ্ছেন সরকার। আর কৃষকদের বেলায় সহায়ক মূল্যের নিলাম হবে, এ কেমন দ্বিচারিতা? সরকারি ট্যাক্স, সেস কমিয়ে দিলেই তেলের দাম কমে যাবে এই খোয়াব যাঁরা দেখছেন, তাঁরা সম্পুর্ন ভুল পথে হাঁটছেন। আসলে তেলের দাম তখনই কমবে যখন তেলের সহায়ক মূল্যের গ্যারান্টি থেকে সরকার হাত তুলে নেবেন। কিন্তু, পেট্রোলিয়াম লবি আদতে একটি বিশাল ভিমরুলের চাক। সেখানে ঢিল ছোঁড়ার সাহস সরকারের নেই। আপাতত এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় একটাই সেটা হল দেশের তেল উৎপাদন বাড়ান। কিন্তু সেখানে অসুবিধা এই যে প্রথমত, আমাদের দেশের তেলের ভান্ডার সীমিত দ্বিতীয়ত, আমরা তেলের ভান্ডারের সন্ধানে যথেষ্ট বিনিয়োগ করিনি। ২০১৯-২০ সালের তথ্য অনুযায়ী ভারতে অপরিশোধিত তেলের ভান্ডারে তেলের পরিমান ৬২ কোটি টন। আমরা যে হারে তেল ব্যবহার করছি তাতে আমাদের তেলের ভান্ডার নিঃশেষিত হতে সময় লাগবে, খুব বেশি হলে পাঁচ বছর। এই অবস্থায় আমাদের দেশে তেলের আমদানি ঠেকানোর কোনও উপায় নেই। কিন্তু মোদি সরকার তেলের আমদানি কমিয়ে তাকে আরও মহার্ঘ্য করে তুলেছেন। এই কুবুদ্ধির পেছনে রয়েছে স্যাঙাততন্ত্রের কালো হাত। তেলের দামের আকাশছোঁয়া বৃদ্ধিতে মার খাওয়া জনতা, যতদিন না মারের পেছনের এই হাতগুলোকে সনাক্ত করতে পারছেন, ততদিন এই অবস্থা চলবে। সাধারণ মানুষ রুখে না দাঁড়ালে অবস্থার পরিবর্তন অসম্ভব।

0 Comments

Post Comment