পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

না.. যোশীমঠ কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়

  • 14 January, 2023
  • 0 Comment(s)
  • 628 view(s)
  • লিখেছেন : নির্মাল্য রায়
এই মূহুর্তে যোশীমঠ চর্চার মধ্যে রয়েছে,সবাই পড়ছে শুনছে তারপর আবার নতুন কোন খবর এসে যাবে আমাদেরও দৃষ্টি সেদিকে ঘুরে যাবে। আবার কোনদিন দেখবো চামোলি কিম্বা শ্রীনগর কিম্বা দেবপ্রয়াগ কিম্বা রুদ্রপ্রয়াগ সংবাদে উঠে এসেছে, আবার আমরা অবাক হবো। অথচ যে বিনাশ যাত্রার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি তাকে নিয়ে চিন্তা ভাবনা করবো না কখনও।

১৯৮৮ ...


অক্টোবরের একেবারে শেষ প্রান্ত। হিমালয়ে শীতকাল আসতে শুরু করেছে। শেষ বিকেলে হেলাং পেরিয়ে চড়াইপথে বাসটা অতিকষ্টে গোঙাতে গোঙাতে যোশীমঠের পথ ধরেছে। বাসে জনা কুড়ি যাত্রী সঙ্গে আমরা তিন বন্ধু, সকলেরই উদ্দেশ্য বদ্রীনাথ পৌঁছোনো, কিন্তু তা বোধহয় আজ আর সম্ভব হবে না। কারণ যোশীমঠ থেকে শেষ "গেটের" সময় প্রায় পেরিয়ে গেছে। গেট ব্যাপারটা তখনও চালু ছিলো। যোশীমঠ পরবর্তী রাস্তা যথেষ্ট চওড়া না হওয়ার কারণে একদল মোটরযানকে একসঙ্গে ছাড়া হতো, সেই কনভয় গোবিন্দঘাট না পৌঁছোনো পর্যন্ত উল্টো দিক থেকে কোনো যান আসবে না। যোশীমঠ থেকে শেষ যানটির থেকে চিরকুট পেয়ে তবে উল্টোদিকের যান নীচের দিকে যাত্রা করবে। এমনই ব্যবস্থা। অতএব গেট না পাওয়ার অর্থ হল আজ রাত যোশীমঠেই থাকতে হবে।


যোশীমঠ তখন ছোট্ট এক জনপদ, সাকুল্যে দু- তিনটে হোটেল কয়েকটা ধর্মশালা আর যাত্রী বাসের জন্য সামান্য কিছু ব্যবস্থা। খাবার ব্যবস্থা তথৈবচো। সে রাত বিড়লার ধর্মশালায় রাত কাটিয়ে এক গাড়োয়ালী ভদ্রলোকের দোকানে রুটি তরকারী খেয়ে পরেরদিন বদ্রীনাথ পৌঁছোনো গিয়েছিলো।


২০১৮...


অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি। যোশীমঠে পৌঁছেছি কাল দুপুর দুপুর। কয়েকদিনের জন্য অলকান্দার উপনদী ধৌলিগঙ্গা বরাবর ঘোরাঘুরি করা হবে, তাই যোশীমঠেই দিন দুয়েকের আস্তানা। যোশীমঠে এখন দুটো বাস স্ট্যান্ড। আমাদের আস্তানাটা ওপরের বাসস্ট্যান্ডের আরও খানিক ওপরে একজন গাড়োয়ালী ভদ্রলোকের চারতলা বাড়ির নীচের তলায়। পাশেই হেলিপ্যাড, কাল দুপুর থেকেই শুনছি ফরফর করে হেলিকপ্টার উড়ছে। বাড়ির পাশ দিয়ে ঘন ঘন মোটর যান যাতায়াত করছে। আজ ঘুম ভাঙলো মাইক্রোফোন নিঃসৃত গাড়োয়ালী ভাষায় গাওয়া একটা গান শুনে, যার মর্মার্থ হল নগরপালিকার গাড়ি আপনার বাড়ির কাছে দিয়ে যাচ্ছে আপনার বর্জ্য, বিশেষতঃ প্লাস্টিক বর্জ্য, নোংরার গাড়িতে জমা দিন।


উত্থান পতনের ইতিবৃত্ত...


৩০ বছরে একটা ছোট জনপদের পরিপূর্ণ শহর হয়ে ওঠার গল্প ছোট পরিসরে এভাবেই বোধহয় বলা যায়। আদি শঙ্করাচার্য্য প্রতিষ্ঠিত ধর্মশহর জ্যোতির্মঠ বা যোশীমঠ এখন মিউনিসিপ্যাল টাউন। ২০১১ এর সেন্সাস বলছে সাড়ে ষোল হাজারের কিছু বেশী মানুষ এখানে বসবাস করেন। তাহলে এই বিপুল শহরের প্রয়োজন কি? যেখানে অসংখ্য দোকান, মল, প্রচুর হোটেল, হাজারো গাড়ি, ট্রেকিং এজেন্সি আরও কত কি। প্রয়োজন সামরিক কারণে, প্রয়োজন ব্যবসায়িক কারণে, প্রয়োজন ট্যুরিসম ও অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিসম এর কারণে। যোশীমঠ থেকে নিতি পাস মাত্র ৮৮ কিমি ফলে সামরিক কর্মকান্ড এখানে প্রবল, উত্তুঙ্গ হিমালয়ের অন্দরে প্রবেশের আগে শেষ বড়ো জনপদ, তাই তীর্থযাত্রী এবং পদযাত্রীরা ভীড় জমান এখানে আর পার্শবর্তী তাবৎ অঞ্চলে আধুনিক জীবন যাত্রার উপকরণ পৌঁছে দেবার শেষ ঘাঁটি এটিই। অতএব আড়ে বহরে যোশীমঠ বেড়েছে অতি দ্রুতহারে।


২০২৩ এর জানুয়ারী মাসের গোড়া থেকে এই যোশীমঠ নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। গোটা যোশীমঠ শহরটা নাকি ধীরে ধীরে বসে যাচ্ছে, রাস্তায় ফাট ধরছে, বাড়ি ঘরদোরে ফাট ধরছে, মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, ব্রেকিং নিউজ নিয়ে টিভি চ্যানোলেরা ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছে, মোবাইলে মোবাইলে ফাঠা রাস্তা,ফাটা বাড়ির ছবি ঘুরছে, মানুষের উদ্বিগ্ন জিজ্ঞাসা কি হবে?
উত্তর হল - যা হবার ছিল তাই হচ্ছে। এমনইটাই তো হবার কথা ছিলো। গোটা হিমালয় বিশেষতঃ হিমাদ্রী এবং তৎসংলগ্ন অংশটির উত্থান পর্ব এখনও চলছে ফলতঃ এই অংশগুলি এখনও পরিবর্তনশীল। এই সমস্ত অঞ্চলগুলিতে বড়ো নির্মাণকাজ যেমন দুঃসাধ্য তেমনি পরিবেশগত ভাবে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু সে ব্যাপারে মাথা ঘামাচ্ছে কে? পুরো ব্যাপারটা চাহিদা যোগানের প্রাথমিক অর্থনীতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ট্যুরিস্ট এবং সামরিক কারণে যা যা দরকার পরিবেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাই তাই হয়েছে, হচ্ছে এবং তার ফল ফলছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদীগুলোকে ক্রমাগত বাঁধ দেওয়া আর "ড্রিম প্রজেক্ট" চার ধাম সংযুক্তকারী ফোর লেন হাইওয়ে। যাঁরা সাম্প্রতিক অতীতে ও পথে গেছেন তারা জানেন পাহাড় ফাটিয়ে কি বিপুল "কর্মযোগ' চলছে। পাহাড়ের গা কে ডাইনামাইট দিয়ে ফাটিয়ে চেঁচে নামিয়ে, ঠেলে দেওয়া হচ্ছে নদী উপত্যকার দিকে, সেই বিপুল ভাঙা পাথরের বেশ খানিকটা অংশ মিশছে নদীর জলে নদীতে পলির পরিমান বাড়ছে, বাঁধ গুলি ভরছে পলিতে, সমগ্র অঞ্চলটা হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ভারসাম্য অর্থাৎ সব মিলিয়ে পরিবেশকে তছনচ করার এ এক অমোঘ প্রস্তাব। কিন্তু এসব কথা ভাবা বারণ বলা আরও বারণ। কারণ তা হবে উন্নয়ন বিরোধী আর উন্নয়ন শাসকের অত্যন্ত প্রিয় একটি শব্দ। তা সে উন্নয়ন যতোই আত্মঘাতী হোক না কেন।


হিমালয় জুড়ে কাশ্মীর থেকে অরুণাচল যে বিপুল পরিকাঠামোর উন্নয়ন প্রক্রিয়া চলছে যুদ্ধকালীন ভিত্তিতে, সেই অপরিনামদর্শিতার একটা ছোট শিকার হল যোশীমঠ। আজ আমরা দেখছি বটে শহরের বেশ বড়ো একটা অংশ বসে যাচ্ছে কিন্তু এ প্রক্রিয়া আজ শুরু হয়নি উপগ্রহ মানচিত্রে গত পাঁচ সাত বছর আগে থেকেই লক্ষ্য করা যাচ্ছিল যোশীমঠ বসছে। ২০২৩ এর জানুয়ারী থেকে সেই মাত্রাটা হঠাৎ বৃদ্ধি পেয়েছে এই যা। পরিবেশবিদরা বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে পরিবেশ গত ভাবে স্পর্শকাতর অঞ্চল গুলিতে ভিন্নতর উন্নয়নের রূপরেখা বানানোর ওপর জোর দিচ্ছেন যদিও তাতে কেউ কখনও কর্ণপাত করেনি। করার কথাও নয়। কারণ আমাদের দেশে যে কোন কাজে পরিবেশ ভাবনাটা সবার শেষে থাকে। যেমন ধরা যাক যোশীমঠের ওপরেই আউলিতে পেল্লায় একটা পাঁচতারা হোটেল বানানো হয়েছে যাতে ক্যাপসুল লিফট পর্যন্ত আছে যা পুরোটাই চলে জেনারেটারে ডিজেল পুড়িয়ে। ওখানে কি পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো থাকার জায়গা তৈরী করা যেত না? তাতে হয়তো স্বাচ্ছন্দ্য সামান্য কমতো। যেতো হয়তো। কিন্তু বানানো হয়নি। সেখানে পাহাড় কাঁপিয়ে চলছে চলছে কোয়াড বাইক, রোপওয়েতে চেপে হাজার হাজার লোক পৌঁছে যাচ্ছে হিমালয়ের গহীনে আর পরিবেশ সচেতনতা না থাকার কারণে হিমালয়ের ঐ উচ্চ অংশ গুলোও দ্রুত দূষিত করে আসছে। বলার কেউ নেই, দেখার কেউ নেই। কিম্বা ধরা যাক কয়েক বছর আগে আউলিতে বসা ২০০ কোটি টাকা খরচ করা আশ্চর্য্য সেই বিয়ে বাড়িটার কথা, যার ফেলে যাওয়া বর্জ্যের পরিমাণ ছিল ২৪০০০ কেজি। মাত্র ২ কোটি টাকার জরিমানা দিয়ে বিয়ে বাড়ির কতৃপক্ষ ছাড় পেয়ে যায়। বলে রাখা ভালো জায়গাটা পুরোপুরি আলপাইন অংশের মধ্যে। এগুলো দু চারটে উদাহরণ মাত্র।


এই মূহুর্তে যোশীমঠ চর্চার মধ্যে রয়েছে,সবাই পড়ছে শুনছে তারপর আবার নতুন কোন খবর এসে যাবে আমাদেরও দৃষ্টি সেদিকে ঘুরে যাবে। আবার কোনদিন দেখবো চামোলি কিম্বা শ্রীনগর কিম্বা দেবপ্রয়াগ কিম্বা রুদ্রপ্রয়াগ সংবাদে উঠে এসেছে, আবার আমরা অবাক হবো। অথচ যে বিনাশ যাত্রার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি তাকে নিয়ে চিন্তা ভাবনা করবো না কখনও।


এতো গেলো দেবভূমির কথা। আমাদের প্রেমের শহর দার্জিলিং, কিম্বা গ্যাংটক ও কিন্তু এই লাইনের সারিতেই দাঁড়িয়ে আছে। পূর্ব হিমালয় গঠন গত ভাবে আরও ধ্বস প্রবণ। অথচ তা মাথায় না রেখেই অনিয়ন্ত্রিত ভাবে বাড়ছে শহর।বহুতলের সংখ্যা বাড়ছে হু হু করে। দার্জিলিং এর ম্যাল রোড বা লাডেন লা রোড দিয়ে হাঁটলে মনেই হয় না পাহাড়ে আছি।দুপাশে সুউচ্চ বহুতলের সারি। অথচ দার্জিলিং এ সর্বোচ্চ বাড়ির উচ্চতা হবার কথা নাকি তিরিশ ফুট। শহর ছাড়িয়ে "উন্নয়ন" পৌঁছে গেছে মানেভঞ্জন পেরিয়ে সান্দাকফু তক্। দশ হাজার ফুট উচ্চতায় পর্যটকদের জন্য নানান সুযোগ সুবিধা নিয়ে গড়ে উঠছে ইঁট সিমেন্টের জঙ্গল। দেখতে দেখতে পর্যটক নিয়ে গাড়ি পৌঁছে যাচ্ছে ওই উচ্চাতায়। তারপর যদি একদিন সব হুড়মুড়িয়ে ভেঙে তলিয়ে যায় অতল খাদের মধ্যে! কাকে দোষ দেব তখন? তখন কি একবারও ভাববো না প্রকৃতির ভারসাম্যকে বিঘ্নিত করেছি আমরা নিজে হাতে, তার ফল ফলছে আজ!

তৃতীয় সূত্র বিষয়ক...


নিউটন সাহেব এখানেও প্রাসঙ্গিক। আমরা বনভূমি কাটবো,নদীকে বাঁধবো, পাহাড় ফুটো করবো, যথেচ্ছ পাহাড় ভাঙবো তার ফল তো ফলতে বাধ্য আজ না হোক কাল।


তাহলে কি উন্নয়ন বন্ধ?


তা কেন? প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে বজায় রেখে, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য খেয়ে পরে বেঁচে থাকার রসদটুকু রেখে যে উন্নয়নের মডেল গড়ে উঠছে তাকে গ্রহণ করতে অসুবিধে কোথায়? তাতে হয়তো তথা কথিত উন্নয়নের খানিক "স্লো ডাউন” হবে। হলই বা ক্ষতি কি? উন্নয়ন তো মানুষ জাতটার জন্য। সেই যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে উন্নয়ন কার স্বার্থে?

 

লেখক একজন শিক্ষক, প্রাবন্ধিক এবং পর্বতারোহী। ছবি - লেখক।

 

0 Comments

Post Comment