পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

কেউ কথা রাখেনি

  • 03 August, 2023
  • 0 Comment(s)
  • 779 view(s)
  • লিখেছেন : আবীর নিয়োগী
যেভাবে আজ এই মুহূর্তে উত্তরাখন্ড, হিমাচল প্রদেশ, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লীর সাধারণ মানুষ সামগ্রিকভাবেই ডুবেছেন এবং ডুবছেন সেভাবেই আরো প্রবলতম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সামনে পড়বেন তাঁরা যার আর্থ-সামাজিক কু-প্রভাব ছাড় দেবে না আমাদের কারোর জীবনকেই।

গতকাল আর আগামীকাল

মাঝে ভাসছে আজকাল

পুরো বিরিঞ্চীবাবার কালদর্শন। বর্তমান বলে কিছুই নেই। সবই অতীত, নয় ভবিষ্যত। তা বর্তমানতো জলেই গেছে ভেসে। যেমন গিয়েছিল ২০১৩ সালে - উত্তরাখন্ডের কেদারনাথ মন্দির, রুদ্রপ্রয়াগ সহ বিস্তীর্ন অঞ্চল। সেবার ছিল মন্দাকিনী নদীর ফুঁসে ওঠা  আর এইরকমই মুষলধারায় বৃষ্টি। ভূবিজ্ঞানী আর পরিবেশবিদরা খুঁজে বের করেছিলেন এই বিপর্যয়ের কারণ।  নির্বিচারে গাছ কাটা, দূষণের মাত্রা বাড়া  পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে চলেছিল। শুধু ভূ-পৃষ্ঠের নয়, সুমুদ্র-পৃষ্ঠেরও। ফল বেশি মাত্রায় বাষ্পীভবন। বেশি মাত্রায় মেঘ তৈরি। যা উত্তর-পশ্চিমে বয়ে গিয়ে হিমালয়ে ধাক্কা খেয়ে ভারী ও অতিভারী  বর্ষণে পরিণত হয়েছিল। তার ওপর ছিল পাহাড় ফাটিয়ে একের পর এক রাস্তা বানানোর অবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। ইন্ডিয়ান মিটিওরলজিক্যাল সোসাইটি সাবধান করেছিল এই ধেয়ে আসা প্রাকৃতিক বিপর্যয় সম্পর্কে। তাতে কর্নপাত করেনি কেউই।  না প্রশাসন, না সেনাবাহিনি। ভরা তীর্থযাত্রার মরশুম তখন।   ভক্তের ভীড়ে আর অর্থ সমাগমের সম্ভাবনায়  দেবস্থান উত্তাল। কিন্তু সব দেব মাহাত্ম্য চাপা দিয়ে চার দিনের টানা প্রবল বর্ষণ আর চোরাবারি হিমবাহ গলে গিয়ে মন্দাকিনী উঠল ফুলে  ফেঁপে। তারপর পাহাড় ধসিয়ে  হড়পা বান হয়ে উত্তরাখন্ডের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বিধ্বস্ত করে দিল।  ৬০০০ এরও বেশি মানুষের প্রাণ গিয়েছিল সেবার যার মধ্যে অনেকেই ছিলেন তীর্থ যাত্রী।

একই ঘটনা এবারও  ঘটল প্রায় একই জায়গায় দশ বছর প'রে। আগের বারের চেয়ে অনেক বড় পটভূমিকায়। ভারতের পাঁচটি রাজ্য - হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখন্ড, পাঞ্জাব, হরিয়াণা, দিল্লীর ওপর পড়ল বিপর্যয়ের কোপ কারণ দশ বছরে আমরা কেউই কোন শিক্ষা নিইনি। না দেশের সরকার, না দেশের আম জনতা।  

 

 

কালিদাসের থেকেই শেখা

যে ডালে বসা সেটাই কাটা   

আমাদের দেশে পাহাড়ের রাস্তা কতটা চওড়া হবে তার একটা সরকারী মাপ আছে। সাধারণত সেটা ৫.৫ মিটার। তার বেশি করাটা ভীষনই বিপজ্জনক। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের বহু ঢক্কা-নিনাদে ঘোষিত গঙ্গোত্রি, যমুনোত্রি, কেদারনাথ ও বদ্রীনাথকে সড়কপথে সংযুক্ত করার চার ধাম হাইওয়ে প্রজেক্ট ( দৈর্ঘ্য ৮৮৯ কিলোমিটার, খরচ ১২,০০০ কোটি টাকা) তৈরিই হচ্ছে শুধু এই বিপদকে মাথায় নিয়ে নয় তাকে প্রতি মুহূর্তে বাড়িয়ে দিয়ে। এই প্রায় ৯০০ কি.মি. সড়কপথকে ৫.৫ মিটার থেকে বাড়িয়ে করা হবে ১০ মিটার। ভূ-বিজ্ঞানী,
ভূ-ত্বত্তবিদ, পরিবেশ বিজ্ঞানীদের সমস্ত নিষেধ এবং সতর্কতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার অবিচল থেকেছেন তাঁদের অভীষ্ট সিদ্ধিতে – যা অবধারিত ভাবে ডেকে এনেছে আজকের এই বিপর্যয়কে। 

শুধু সড়কপথ নয় এই প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে উত্তরাখন্ডেই ১২৫ কি.মি. লম্বা রেলপথ তৈরি করা যা আড়াআড়ি ভাবে হিমালয়ের মধ্যে দিয়ে গিয়ে একাধিক গন্তব্যকে জুড়বে। এর মধ্যে ১০৫ কি.মি. রেলপথ যাবে ৬৬টি টানেলের মধ্যে দিয়ে। এই টানেল তৈরিও আরেকটি অবিমৃষ্যকারিতার কাজ যেটাও হিমালয়ের ঐ অঞ্চলকে শেষ করে দিতে চলেছে। ঋষিকেশ – কর্ণপ্রয়াগ এই রকমই একটি টানেল পথ যার কাজ শেষ হয়ে এল বলে। ভূ-ত্বত্ত্ববিদদের মতে হিমালয় তুলনায় এখনও নবীন পর্বত এবং টেক্‌টনিক প্লেটের উপর ক্রিয়াশীল। যার ফলে যে কোন খননকার্যই অতিমাত্রায় বিপজ্জনক। তার ওপরে আজকাল যে উন্নত যন্ত্র দিয়ে খননকার্য চলে তাকে যুদ্ধাস্ত্রের থেকে কিছু কম বলা যায় না। তাছাড়া এই টানেল পথের মধ্যে দিয়ে ট্রেন চলাচল করলে যে ভাইব্রেশন বা কম্পন উৎপন্ন হবে তা এতটাই প্রবল হবে যে সেটা পাহাড়ের  স্বাভাবিক ঢালকে চরম ক্ষতিগ্রস্ত করে পাহাড়ে বিশাল আকারে ধ্বস নামাবে।

অতি সাম্প্রতিক কালের যোশিমঠের সংলগ্ন  এলাকায় ফাটল এবং বসে যাওয়া বোধহয় এরই হাতে গরম প্রমান। যোশিমঠ থেকে বদ্রীনাথের ৩০ কি.মি. রাস্তার দূরত্বকে কমিয়ে  আনার জন্য হেলাং বাইপাসকে চওড়া করার কাজ চলছিল। একইভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী ড্রিল মেশিন আর পাথর ফাটিয়ে সজোরে ব্লাস্টিং এর ফলে একটু একটু করে ধ্বসে গিয়ে ঐ ভূমি বিপর্যয় ঘটেছিল যোশিমঠে।

ডঃ সি পি রাজেন্দ্রান (সিস্মো টেক্টনিক্স, ভূমিকম্প এবং সুনামি সংক্রান্ত অগ্রনী
ভু-ত্বত্ত্ববিদ) এই পুরো প্রকল্পকে Freeway to Disaster বলে অভিহিত করে বহুবারই চেষ্টা করেছিলেন এই প্রকল্পকে বন্ধ করার, না হলে অন্তত নতুন ভাবে কাজটাকে করা যাতে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে, বজায় থাকে জল, জঙ্গল, জমির প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডার, পাহাড়ের মূল চরিত্র থাকে অক্ষুন্ন এবং এলাকার অধিবাসীদের জীবন-জীবিকার অধিকার থাকে নিশ্চিত। কিন্তু সে গুড়েও বালি কিচ্‌কিচ্‌ই করেছে শুধু।

হিমালয়ের সামগ্রিক পরিবেশের ওপর চার ধাম সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রভাব তত্ত্বাবধান করার জন্য নিয়োজিত সুপ্রীম কোর্টের হাই পাওয়ারর্ড কমিটির অধ্যক্ষ পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার সময়ে দেরাদুনের বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ডঃ রবি চোপড়া (অধিকর্তা, পিপলস সায়েন্স ইন্সটিটিউট) সরকারকে জানিয়েছিলেন ঐ প্রকল্পের ক্ষতিকর দিকগুলি – তাঁর কথায়, এই প্রকল্প শুরু হতে না হতেই ৬৯০ হেক্টর বনভূমি ধ্বংস করা হয়েছে যা ৮৪,০০০ টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড শুষে নিতে পারত পরিবেশ থেকে... বিরলতম ওক আর দেবদারু গাছের সারিগুলি চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে যোশিমঠের থেকে ঢিল ছোঁড়া দুরত্বে... শুধু গতবছরের হিসাবেই ঐ অঞ্চলে আগত দৈনিক তীর্থযাত্রীর গড় ছিল ৫৮,০০০। তাঁদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য পরিষ্কার করার জন্য পুড়িয়ে দিতে হয়েছিল যা ঐ অঞ্চলকে আরো বিষিয়ে তুলেছিল। কৃষিজীবি সাধারণ মানুষের ক্ষেত-খামারগুলি ভ'রে উঠছিল পাহাড় কাটার আবর্জনায় - সেগুলিকে চাষের অযোগ্য করে তুলে। ডঃ চোপড়ার শেষ সতর্কতাবানী ছিল প্রকৃতি কোনোদিনই ভোলেও না, ক্ষমাও করে না তার বিপুল সম্পদের নয়-ছয় করাকে।

এই সমস্ত বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, প্রতিবেদন বার বার জমা পড়েছে সরকারের কাছে। এলাকার জনপদবাসীদের আবেদন নিবেদনও কম জমা পড়েনি। কিন্তু সবই 'অরণ্যে রোদন'-এ পরিণত হয়েছে। ২০২৪ এর ভোটের বৈতরনী পার হওয়ার যে ক'টি উপায় এই সরকারের সামনে আছে তার মধ্যে হিন্দুত্বের তাস খেলা এই 'চার ধাম সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্প'-ই সেরা তুরুপের তাস। কোনো মতেই কি তাকে হাতছাড়া করা যায়?

এতো গেল তাও ভবিষ্যতের কথা। কিন্তু ঘটমান বর্তমান কি বলছে? পাহাড়ে রাস্তা চওড়া হওয়ার কথা তো তাও জানা কিন্তু নদীখাতের চওড়া কমে যাওয়ার কথাটা কি আমরা  সবাই জানি? বহতা নদীর দুই পাশে তৈরি হয় প্লাবনভূমি (Flood Plain)। নদীখাত থেকে সামান্য নীচুতে – যেখানে জমা হয় নদীতে বয়ে আসা আর বন্যায় ভেসে আসা পলিমাটি। যেকোন নদীর ক্ষেত্রেই নদীখাত আর তার দু’দিকের প্লাবনভূমি তার নির্বিঘ্নে বয়ে চলার প্রাথমিক শর্ত। পাহাড়ী নদী হলে প্রধান শর্ত।  যে বিপাশা নদীর তাণ্ডবলীলার ছবি গত কয়েকদিন ধ'রে আমাদের শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের হিমস্রোত নামাচ্ছে সেই বিপাশার বিস্তৃত প্লাবনভূমি গত কয়েকবছরে পরিণত হয়েছে ব্যস্ত জনপদে। বাড়ি-ঘর, বাজার-দোকান, হোটেল- রিসর্ট কি নয়! ফলে যা হয়েছে তা হওয়ার বাইরে তো আর কিছুই ছিল না। আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নেমেছে পাহাড়ে, তার সঙ্গে মিশেছে বরফগলা জল। সেই বিপুল জলরাশি তোড়ে নেমে এসেছে নিচে। চওড়া জায়গায় জলের গতিবেগ কম হয় আর চওড়া কমে গেলে জলের গতিবেগ হয় বহুগুণ বেশি। নদীর যে তর্জন, গর্জন আমরা শুনেছি তা যেন আর কিছু নয় - নিরুপায় প্রকৃতির শেষ প্রতিরোধ।

পরের বেলা চিম্‌টি কাটি

নিজের বেলা আঁটিশুঁটি

আসলে গল্পতো এখানে শেষ হ'লনা। সরকারী প্রকল্প, সরকারী উদ্যোগের শাপ-শাপান্ত করে গায়ের জ্বালা হয়তো মেটানো যায় কিন্তু সম্যসার সমাধান হয়না। তার জন্য আয়নাটাকে একটু নিজের দিকে ঘোরাতেই হয় – গত দু'বছরে এ.সি.র ব্যবহার বেড়েছে ২০% এই দেশে এবং সরকারী পরিসংখ্যান অনুসারে গত বছরের জুন মাসেই তার বিক্রীর পরিমাণ ছিল ৬০,০০,০০০ (ষাট লক্ষ)। এ বছরের হুদ্‌হুদে গরমে তার বিক্রী কতটা বাড়তে পারে তা সহজেই অনুমেয়। জ্বালা ধরানো গরম, বাতাসে প্রবল জলীয় বাষ্প যখন জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে তখন একটু এ.সি.-র হাওয়া খেতে মন চায়নি এমন মানুষ সত্যিই হাতে গোনা। ভাগ্যের এমনই পরিহাস – যে এ.সি.-র হাওয়া আমাদের ঠান্ডা ক'রে আরাম দেয় সেই এ.সি.র কারণেই পৃথিবীতে উষ্ণায়ন আজ লাগামছাড়া। অবশ্য শুধু এ.সি.-কে দোষ দিয়ে লাভ নেই। দৈনন্দিন প্রয়োজনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিদ্যুতের ব্যবহার সব গণনাকে ছাপিয়ে গেছে। আর সেখান থেকেই শিয়রে শমন হয়ে হাজির হয়েছে গ্রীন হাউস এফেক্ট। বিদ্যুৎ  উৎপাদনের জন্য  যখন কয়লা পোড়ে তখন তার থেকে নির্গত হয় কার্বন-ডাই-অক্সাইড, মিথেন এবং নাইট্রাস অক্সাইড। স্বাভাবিক অবস্থায় এই তিনটি গ্যাস একসঙ্গে সূর্যের বিকীরণকে নিজেদের মধ্যে ধারণ করে পৃথিবীকে বসবাসযোগ্য করে তোলে। কিন্তু  বর্তমান পৃথিবীর যে অস্বাভাবিক অবস্থা তাতে এই তিনটি গ্যাসও এত বেশি পরিমাণে নির্গত হচ্ছে যে সূর্যের বিকীরণও অত্যন্ত বেশি পরিমাণে পৃথিবীতে আটকে গিয়ে তার তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে বহু, বহুগুণে। এই উষ্ণায়ণ আজ সারা পৃথিবীর সমস্যা। তার প্রত্যক্ষ প্রভাব জলবায়ুর পরিবর্তন। সেটা কি আর আমাদের বুঝতে বাকী আছে?

গ্রীন হাউস এফেক্ট কমানোর ভূরি ভূরি উপায় খাতায় কলমে বাতলানো আছে। জাতি সংঘ ( United Nations)-এর মুখে ফেনা উঠে গেল লোকদের তা বোঝাতে বোঝাতে। সবই যে জলে গেছে তার প্রমাণ এই তো আমরা পেলাম এখন হাতে কলমে।

এবার আসছে আমার চড়-থাপ্পড় খাওয়ার পালা। নিদেন পক্ষে একটানা গালাগাল।

যেহেতু পাহাড়ের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম তাই ফিরে যাব তার কাছেই। তার আগে একটু সাহিত্যচর্চা। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের "শ্রীকান্ত-২য় পর্ব"।  চলে যাওয়া যাক শেষ দৃশ্যে। শ্রীকান্ত রাজলক্ষীর পাটনার বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। বিষাদঘন দৃশ্য আর ততোধিক মর্মস্পর্শী  ব্যাখ্যা লেখকের। হুবহু তো মনে নেই। তবে অস্যার্থ এই যে একমাত্র বৃহৎ প্রেমের পক্ষেই সম্ভব ভালবাসার মানুষটির ভালোর জন্যই তাকে ছেড়ে যাওয়া। কোনো ক্ষুদ্র প্রেমের পক্ষে সেটা ভাবাও সম্ভব নয়। একেই আমাদের আজকের জীবনে শুধু কপি-পেষ্ট করে দিতে হবে।  সমতলের মানুষ আমরা। পাহাড় আমাদের বড্ড টানে। তার বিশালতা, তার ঔদার্য্য, তার মুক্ত  অনাবিল পরিবেশ, তার রহস্যময়তার প্রেমে পড়িনি এমন ক'জন আছে বলুন তো? কিন্তু এবারে সেই প্রেমের দিব্যি - পাহাড়কে ছাড়তে হবে যদি সত্যিই তাকে এতটুকু ভালোবেসে থাকি। প্রথমে ছিলাম তীর্থযাত্রী, পরিব্রাজক। পরে হলাম প্রকৃতিপ্রেমী ভ্রমণপিপাসু বা পর্বাতোরোহী।  যাই হই না কেন আমাদের পায়ের ছাপে ছাপে পাহাড় গেছে বদলে। ভেতরে-বাইরে। শহরের মানুষের আরো আরো স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য, বিলাস-বহুলতার জন্য বলি দিতে হলো পাহাড়ের নিজস্ব সম্পদকে, নিজস্বতাকে। এখনই তা আটকাতে না পারলে এই সমস্ত পাহাড়গুলি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে ধ্বসে, বন্যায় বা আর কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে। তাতে আমার আপনার মতো পরিযায়ী পাখীদের হয়তো সেরকম কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না কিন্তু  যেভাবে আজ এই মুহূর্তে উত্তরাখন্ড, হিমাচল প্রদেশ, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লীর সাধারণ মানুষ সামগ্রিকভাবেই  ডুবেছেন এবং ডুবছেন সেভাবেই আরো প্রবলতম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সামনে পড়বেন তাঁরা যার আর্থ-সামাজিক কু-প্রভাব ছাড় দেবে না আমাদের কারোর জীবনকেই।

'ফেলো কড়ি মাখো তেল

 আমি কি তোমার পর?'

আগামী দশটা বছরও যদি আমরা সবাই No Action, Only Reaction মোডে থাকি তাহলে হাতে পড়ে থাকবে দু'টি মাত্র উপায়।

(১) জীব বিজ্ঞানী এবং জিন বিজ্ঞানীদের মিলিত প্রয়াসে মানুষের শরীরে অক্সিজেনের বদলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিয়ে  বেঁচে থাকার জন্য কিছু একটা কেরামতি নিশ্চয়ই বার হবে। তবে অবধারিত ভাবেই তা সাধারণ মানুষের ধরা ছোঁওয়ার বাইরে থাকবে। বিজ্ঞান বহুদিন ধরেই বিত্তের দাসত্ব করে আসছে, এবারেও তার ব্যত্যয় হবে না।

বা

(২) পৃথিবীতে মুষ্টিমেয় কিছু জায়গায় তৈরি হবে Organic Farming এর ধাঁচে Organic Residence। নগরায়ন, বিশ্বায়ন, উন্নয়ন আর উষ্ণায়নের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে অনেক দূরে তৈরি হবে ছোট ছোট জনপদ। কল-কারখানাহীন, বিদ্যুৎহীন সেসব জায়গায় পাওয়া যাবে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্লভতম, দুস্প্রাপ্যতম, দুর্মূল্যতম তিনটি জিনিস -  দূষণমুক্ত পরিবেশ, পরিশুদ্ধ জল আর বিষহীন খাদ্য। দুর্লভতার, দুস্প্রাপ্যতার, দুর্মূল্যতার দাম চোকাতে পারবে যারা তারাই পাবে 'স্বর্গে' প্রবেশের  অধিকার।

আর বাকী পৃথিবী তার আধুনিকতম প্রযুক্তি নিয়ে, নতুন নতুন উদ্ভাবন নিয়ে, বিলাস-ব্যসনের যাবতীয় সম্ভার নিয়ে আজকের মতই ডুববে-ভাসবে, জ্বলবে-পুড়বে এবং মরবে ও মারবে।

 

0 Comments

Post Comment