সেখান থেকে একটা প্যাকেট ছিঁড়ে খদ্দের ভদ্রলোকের হাতে দিল রতন। টাকার নোটটা ফিরিয়ে বলল- খুচরো নেই, অনলাইনে দিন। কাউন্টারের পাশে কিউবার কোড স্ক্যান করে পেমেন্ট করলেন খদ্দের ভদ্রলোক। যান্ত্রিক শব্দে শোনা গেল- '...ইউ হাভ রিসিভড রুপিজ ফিফটি অনলি'।
সদ্য অমৃতভারত স্টেশন প্রকল্পে তৈরি 'মধ্যমপুর' স্টেশনের টিকিট কাউন্টারে পাশে বেশ সাজানো গোছানো চকচকে ফার্স্টফুডের দোকান 'রাম ভারোসে'! প্ল্যাটফর্মে সদ্য বসানো বাহারি টাইলসের ওপর স্টলগুলির শো’কেসের উপর দিকে শুভ্র শ্মশ্রুমণ্ডিত সহাস্য প্রধানমন্ত্রীর ছবি। শোকেসে খ্যাতনামা কোম্পানির পিৎজা, বার্গার, স্যান্ডউইচ ইত্যাদি।
হঠাৎ আকাশ কালো মেঘে অন্ধকার নেমে এল, শুরু হল বৃষ্টি। রতন খদ্দেরদের সামলাতে সামলাতে আকাশে দিকে তাকাতেই বড়ো একফোঁটা বৃষ্টির জল মুখে এসে পড়ল। চমকে উঠে তাকাতেই সুখের ঘুমটা ভেঙে গেল। রতন তাকিয়ে দেখল, ঘরের টিনের ছাউনির মরচে পড়ে ভাঙা জায়গা দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে। টিনের চালে তখন বৃষ্টির তুর্কীনাচনের শব্দ। রতন তাড়াতাড়ি উঠে বিছানাটা ভিজে যাওয়ার আগেই তোষকটা গুটিয়ে দিল। দরজার ফাঁক দিয়ে তখন ভোরের আভাস। কাঠের চৌকিতে বসে কিছুক্ষণ স্বপ্নে দেখা দৃশ্যগুলি ভাবতে চেষ্টা করল। ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়। কিন্তু স্টলগুলিতে কাজ করার সুযোগ কি তার হবে? কত পড়াশোনা জানা ছেলেমেয়ে আছে। পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে তো কাজ বন্ধ হওয়ার জোগার। কাল মাত্র একশোকুড়ি টাকার ঝালমুড়ি বিক্রি হয়েছে। একশোকুড়ি টাকা তো তার লাভ নয়, মুড়ি, চানাচুর, পেঁয়াজ-লঙ্কা, মশলা আচারের তেল ইত্যাদি বাদ দিয়ে মেরেকেটে আশি-নব্বই টাকার মতো লাভ। তাই দিয়ে কি সংসার চলে?
ঘরের একপাশে খাটিয়ায় পনেরো-ষোলো বছরের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে রতনের বৌ অঘোরে ঘুমাচ্ছে। ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে দেখে মায়া হল রতনের। সারাদিন যা ঝড়ঝাপটা যায় তার উপর। রতনের বৌ মাসখানেক হল ফ্ল্যাটবাড়িতে এক অসুস্থ বৃদ্ধা দেখাশোনার কাজ নিয়েছে। সকালে উঠে রান্নাবান্না, গৃহস্থালির কাজ— পরিষ্কার পরিছন্নতা, সব কাজ করেই যেতে হয় তাকে। রতনের উনিশ-কুড়ি বছরের ছেলে একটা আবাসনে সিক্যুরিটি এজেন্সির হয়ে নাইটগার্ডের কাজ করে। বাড়ি ফিরবে সকাল ছটার পর। বাড়ি বলতে খালপাড়ে বেড়া আর টিনের চাল দেওয়া এক কামরার ঘর, সামনের দিকে একচিলতে বারান্দা, ভাড়ায় নেওয়া। সেখানেই এককোণে রান্না হয়।
বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় বাবা-মা ছ'মাসের রতনকে নিয়ে এখানে আসে। এখানে এসে বস্তির কাছেই প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হয়। ইচ্ছে থাকলেও প্রাইমারি স্কুলে পড়ার পর হাইস্কুলে পড়া সম্ভব হয়নি তার। তখন তো সকলের জন্য দুবেলা অন্ন জোগার করতেই হিমসিম খেতে হত বাবাকে। ট্রেনে শিয়ালদা-কল্যানী প্যাসেঞ্জার টেনে ঝালমুড়ি বিক্রি করতেন রতনের বাবা।
প্রাইমারি স্কুলের পর অভাবের সংসারে একটু সুরাহার জন্য স্টেশনের এক চায়ের দোকানে বেশ কিছুদিন কাজ করত রতন। সেই সময়ে বাবা অনেকদিন অসুস্থ থাকার পর মারা যান। মায়ের মুখে শুনেছে বাবার টিবি হয়েছিল। দীর্ঘদিন কাউকে না জানানোয় কুড়ে কুড়ে খেয়েছিল যক্ষার কীট। রতনের বেশ মনে আছে বাবার শেষ সময়ের কথা। প্রায় প্রতিরাতেই বাবার বীভৎস কাশি হত। কাশতে কাশতে বাবা দৌড়ে যেত বাড়ির বাইরে। বাইরের নালায় ধমকে ধমকে রক্তবমি করতে করতে বসে পড়ত বাবা। বেশ মনে আছে সেই দৃশ্যের কথা। তখন তার বয়স ষোল কি সতেরো।
বাবা মারা যাওয়ার পর উত্তরাধিকারী সূত্রে পাওয়া মুড়ির টিন নিয়ে শিয়ালদা-মুর্শিদাবাদ রুটের লালগোলা প্যাসেঞ্জারে কৃষ্ণনগর পর্যন্ত ঝালমুড়ি বিক্রি শুরু করে রতন। একটু বড়ো হতেই রতনের মা খালপাড়ের বস্তীর এক মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেন। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই মা মারা যান। নাতিনাতনি মুখ দেখে যেতে পারেননি রতনের মা।
মোটামুটি ঝালমুড়ি বিক্রি করে চলে যাচ্ছিল রতনের সংসার। দু’হাজার ছাব্বিশের 'সরকার পাল্টানোর দরকার' শ্লোগানে মজেছিল রতন। ক্ষমতায় এলে লক্ষ্মীভাণ্ডারের দেড়হাজার থেকে তিনহাজার থেকে শুরু করে অজস্র লোভনীয় প্রকল্পের প্রতিশ্রুতিতে মুগ্ধ হয়ে সকলের সঙ্গে গেরুয়া মিছিলে পা মিলিয়েছিল। সেই থেকে অন্যান্য হকারদের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সেই সময় প্রধানমন্ত্রীর ঝাড়গ্রাম সফরে একটা দোকান থেকে ঝালমুড়ি খাওয়ার খবরে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান বোধ তৈরি হয়েছিল রতনের। তারিখটা এখনো মনে আছে তার— '১৯শে এপ্রিল'। নিজেকে ঝালমুড়ি বিক্রেতা বিক্রম সাউয়ের জায়গায় বসিয়েছিল সেদিন। তারপর থেকে নির্বাচনের প্রচারে গেরুয়া পার্টির সঙ্গ দিয়েছিল।
সরকার পাল্টানোর পর শাসকের আক্রমণের প্রথম তীরটা এল বস্তিবাসী আর হকারদের উপর। স্বপ্নভঙ্গ যে এত শিগগিরই ঘটবে, তা তাদের কল্পনার অতীত! বুঝতে পারে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি প্রতি বিশ্বাস করে নিজের উপরেই যেন কুড়ুল চালিয়েছে তারা। গতকাল তাদের বস্তী উচ্ছেদের নোটিস এসেছে। এত পরিশ্রম করে কাকে এনেছে সরকারে! এখন এই বয়সে কোথায় যাবে তারা? ভেবে ভেবে কোনো কূলকিনারা পায় না রতন।
এদিকে রেল নির্দেশিকা জারি করেছে— ১লা জুলাই থেকে হকারি বন্ধ। ধরতে পারলে জরিমানা। তারপর থেকে এইভাবেই রেলপুলিশকে লুকিয়ে-চুরিয়ে ঝালমুড়ি বিক্রি করে রতন। রতনের মতো কালু, রমেশ, মহিম সকলেই লুকিয়ে-চুরিয়ে চিনেবাদাম, ছোলাভাজা, দিলখুশ, গজা, জেলি-লজেন্স ইত্যাদি বিক্রি করতে হয়।
শিয়ালদা স্টেশনে ট্রেনে জেনারেল কামরার বাঙ্কে কাপড়ে মোড়া মুড়ির টিন রেখে দিয়ে নেমে আসে প্ল্যাটফর্মে। ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার পর দরজার উল্টোদিকে এককোণে চুপ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ। দমদম স্টেশনে ট্রেন ছাড়ার পর ঝোলা কাঁধে নিয়ে নিচুস্বরে ঝালমুড়ি… ঝালমুড়ি… ডাকতে ডাকতে ট্রেনবগির এপাশ থেকে ওপাশ পায়চারী করে রতন। অনেকেই, বিশেষ করে ডেইলি প্যাসেঞ্জাররা সেই ডাকে সাড়া দেয়। তারা অনেকেই রতনকে চেনেও। তাদের কথা মতো ঝালমুড়ি বানিয়ে ঠোঙায় করে দিয়ে আসে। তাদের দেখাদেখি অন্যান্যরাও রতনকে ডেকে নেয়। এইভাবে কোনোরকমে টিকে আছে এখনো। ভবিষ্যতের কথা ভাবতে পারে না রতন, কপালে যা আছে হবে।
কল্যাণী স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে যায় রতন। শিয়ালদা থেকে কল্যাণী পর্যন্তই তার হকারির সীমা। কল্যাণী থেকে গেদে লোকাল ধরে দমদম। সেখান থেকে লোকাল ট্রেনে তার আস্তানায় ফেরে। গেদে লোকালে আসার সময়ও ঝালমুড়ি বিক্রি করে একই ভাবে। অবশ্য রাত হওয়ায় রেলপুলিশের দৌরাত্ব থাকে কম।
ইতিমধ্যে বৌ বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছে, মেয়ে এখনো বিছানায়। বৌ ঘরের বাইরে একচিলতে বারান্দায় উনুন ধরিয়ে লাল কষের চা আর একটা বাটিতে মুড়ি দিয়ে বলে— আজ কাজে বেরোবে না? বৌয়ের কথায় সম্বিৎ ফেরে রতনের। চা খেয়ে একটা বিড়ি ধরিয়ে প্রাতকৃত্যের জন্য বেরিয়ে যায়।
আজ শিয়ালদা স্টেশনে গিয়ে ভয়ানক খবরটা পায় রতন। কাঁকিনাড়া স্টেশনে ঝালমুড়ি বিক্রেতা কার্তিক আত্মহত্যা করেছে। এক হকার জানাল, কয়েকদিন আগে রেলপুলিশ কার্তিককে ১৪০০ টাকা জরিমানা করায় কিছুদিন খুব মনমরা ছিল কার্তিক। খবরটা পেয়ে স্তম্ভিত হল রতন। কাজে যাওয়ার হল না তার। এদিকে কার্তিকের আত্মহত্যার খবরটা চাউড় হতে ইউনিয়নের ডাকে শিয়ালদা স্টেশনের বাইরে জমা হতে থাকে হকারেরা। রতন সেই জমায়েতে যোগ দেয়। তাকে দেখে আশেপাশের লোকজন কেমন যেন সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়। তার সম্পর্কে ফিসফিসানিও শুনতে পায়— 'ওই দেখ মালটা এসেছে। চামচা, খবর নিচ্ছে।' রতন বুঝতে পারে তাদের এই আচরণ অকারণ নয়। কয়েকদিন আগে তাকে দেখেছে গেরুয়া ফট্টিতে। মনে মনে ভাবে রতন, এই আচরণ তার প্রাপ্য।
এমন সময় রতনের ওপর কেউ যেন ভর করে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধীরে ধীরে স্টেশনে নামার সিঁড়ির শেষধাপে উঠে চিৎকার করে বলে ওঠে—
''আমার হকার ভাইয়েরা, আমায় ক্ষমা করে দাও। আমি ওদের কথা বিশ্বাস করে পথ ভুল করেছিলাম। আমাকে ক্ষমা করে দাও তোমরা।'
মাথা নীচু করে হাঁটুগেড়ে বসে পড়ে রতন। কয়েক মূহুর্ত, হকারদের হট্টগোল থেমে যায়। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় রতন। যাকে কোনোদিন চিৎকার করতে দেখেনি, সেই রতন চিৎকার করে বলতে শুরু করে—
'নতুন সরকার আসার পর প্রথমেই আক্রমণ এসেছে রেলওয়ে আর ফুটপাতের হকারদের উপর। চৌত্রিশ বছর বাম রাজত্ব, পনেরো বছর তৃনমূল সরকারের আমল, কেউই এভাবে আমাদের উপর এইভাবে আক্রমণ করেনি। প্রয়োজনে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। কিন্তু এই নতুন সরকার কোনো রকম আলোচনা না করে বুলডোজার চালিয়েছে, তারই পরিণতি আমাদের সহকর্মী কার্তিক ভাইয়ের চলে যাওয়া। আপনারা আওয়াজ তুলুন—না, আমরা কোনোরকম জরিমানা দেব না। দরকারে আমরা 'জেলভরো' আন্দোলনে যেতে পারি। আমি কথা দিচ্ছি, শেষদিন পর্যন্ত আমি আপনাদের সঙ্গে থাকব। আবার বলছি এতদিন তোমাদের সঙ্গ ছেড়ে যে অপরাধ করেছি, তারজন্য যে কোনো শাস্তি আমাকে দাও, আমি মাথা পেতে নেব।''
শিয়ালদার যাত্রীদের হৈচৈ কারও কানে ঢুকছিল না। এক মুহুর্ত সকলে তাকিয়ে ছিল রতনের দিকে। এ কোন রূপ দেখছে রতনের। তারপরেই হাততালিতে মুখরিত হয়ে উঠল চারিপাশ।
কিছুক্ষণ পর দেখা গেল একটা মিছিল চলেছে ডিআরএম বিল্ডিং-এর দিকে। মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে ক্রমাগত। মিছিলের সামনের সারিতে শ্লোগানে দিচ্ছে আমাদের রতন। ঝালমুড়ির টিনটা শিয়ালদার বাইরে একা পড়ে থাকে।