পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

বিলকিস বানো কি নিছক একটি নাম ?

  • 24 August, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 484 view(s)
  • লিখেছেন : মনসুর মণ্ডল
বিলকিস বানো নিজের এত লাঞ্ছনা, চোখের সামনে নিজের পরিবারের এতজন মানুষের হত্যার পরেও ন্যায়বিচার চাওয়ার সাহস দেখিয়েছিলেন। সেদিন বিচার চাইতে গিয়ে তাঁর সকল অনুভূতিকে প্রজ্জ্বলিত করেছিলেন। আজ তিনি যখন ধর্ষক-হত্যাকারীদের সাজা মকুবের সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় কথা বলছেন, তখন অবধারিতভাবে তাঁর অন্তর আর্দ্র হয়ে উঠেছে। বেদনা কি শুধু তাঁর একার? মুসলমান সমাজের ভিতরে তা কি অনুরণিত হচ্ছে না?

গুজরাতে ২০০২-এ গোধরার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় রাজ্য জুড়ে মুসলিমদের উপর সংগঠিত আক্রমণে অজস্র ধর্ষণ-হত্যার একটা ছিল পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা বিলকিস বানোর উপর গণধর্ষণ ও তাঁর পরিবারের আট জনকে হত্যা করা। ২০০৮-এ মুম্বইয়ের সিবিআই-এর বিশেষ আদালত অভিযুক্ত এগারো জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল। এখন গুজরাতের বিজেপি পরিচালিত সরকার তাদের সাজা মকুব করে দেওয়ায় তারা খালাস পেয়ে গেল।

কোন শুভবুদ্ধিতে এই মুক্তির পক্ষে কথা হতে পারে না। ফলে প্রতিবাদ হচ্ছে দেশে। শীর্ষ আদালতে সাজা মকুবের সিদ্ধান্ত বাতিল করার জন্য ৬ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। আশ্চর্যের কথা এই যে, সাজা মকুবের জন্য এক আসামীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শীর্ষ আদালতের নির্দেশে একটি মুক্তি বিষয়ক পর্যালোচনা কমিটি হয়েছিল, যেটির সুপারিশে এই মকুব। অথচ ২০১৯-এ শীর্ষ আদালতই বিলকিস বানোকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৫০ লক্ষ টাকা ও চাকরি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। অবশেষে আদালতের আর কী করার থাকে, এ নিয়ে যথেষ্ট সংশয় থেকে যায়। সুতরাং হয়তো প্রতিবাদই শেষ কথা।

বিলকিস বানো নিজের এত লাঞ্ছনা, চোখের সামনে নিজের পরিবারের এতজন মানুষের হত্যার পরেও ন্যায়বিচার চাওয়ার সাহস দেখিয়েছিলেন। সেদিন বিচার চাইতে গিয়ে তাঁর সকল অনুভূতিকে প্রজ্জ্বলিত করেছিলেন। আজ তিনি যখন ধর্ষক-হত্যাকারীদের সাজা মকুবের সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় কথা বলছেন, তখন অবধারিতভাবে তাঁর অন্তর আর্দ্র হয়ে উঠেছে। বেদনা কি শুধু তাঁর একার? মুসলমান সমাজের ভিতরে তা কি অনুরণিত হচ্ছে না? ধর্মীয় পরিচিতির সীমা ছাড়িয়ে প্রতিবাদ যেমন ধ্বনিত হচ্ছে, সেভাবেই মানুষের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে বুঝতে হবে ঠিকই। কিন্তু এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত এক ধর্ষিতা মুসলিম নারীর জীবনে ছায়াপাত করেছে এবং গুজরাত গণহত্যা ছিল স্পষ্টভাবে মুসলমান গণহত্যা। তখন মুসলমান সমাজে এর প্রত্যক্ষ অভিঘাত আছে।

গণধর্ষণ ও হত্যার বীভৎসতায় যুক্ত ঐ এগারোজন বিচারের মানদণ্ডে তাদের দুষ্কর্মের শাস্তি ভোগ করছিল, যেমন আর সব ক্ষেত্রেই হয়। নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে তারা জেলের বাইরে আসত। চোদ্দ বছর জেলে ছিল, আর হয়তো ছ’বছর থাকতে হত। তখন কেন তাদের মুক্তি দেওয়ার জন্য তোড়জোর? মুক্তি দেওয়া হল এমন দিনে, যখন দেশে স্বাধীনতার ৭৫তম বার্ষিকী উদযাপন চলছে। মিষ্টিমুখ ও ফুলমালায় তাদের অভিনন্দিত করতে কুণ্ঠিত হল না হিতাকাঙ্ক্ষীরা। আর এই ঘটনাও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয় যে, যখন তাদের মুক্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল, সেসময় গ্রেপ্তার করা হল গুজরাত গণহত্যায় মানবিক ও আইনী সহায়তা নিয়ে পাশে দাঁড়ানো তিস্তা সেতলওয়াড়কে এবং প্রশাসনিকভাবে গণহত্যায় অপরাধীদের যথাযথভাবে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করনোর জন্য তৎপর আর. বি. শ্রীকুমারকে। এরপরও কথা থাকে; এই সবকিছুতে জড়িত গণহত্যার ঘটনা দেশের ভিতরে-বাইরে সবচেয়ে নিন্দিত-ধিক্কৃত। সুতরাং সমস্ত ঘটনায় বেপরোয়া মনোভাব স্পষ্ট। কীসের এত তাগিদ?

আরএসএস জন্মকাল থেকেই দেশের মুসলিমদের উদ্দেশ্য একটা যুদ্ধ-মহড়া চালিয়ে এসেছে। বহিরাগত মুসলিমরা দেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করেছিল। অত্যাচারের মূল নিশানা ছিল হিন্দু মেয়েরা। লক্ষ লক্ষ হিন্দু নারীদের অপহরণ করে মুসলিম শাসক থেকে সেপাইদের মধ্যে বন্টন করে ভোগ করেছিল। কয়েকশো বছর ধরে লক্ষ লক্ষ হিন্দু নারীদের মুসলিমরা ধর্ষণ করেছিল। অন্যদিকে মুসলমান মেয়েদের গর্ভ হল যথেষ্ট উর্বর। গাদাগাদা বাচ্চা পয়দা করতে সক্ষম। এভাবে হিন্দুস্থানে হিন্দুদের দাবিয়ে মুসলমান আধিপত্য কায়েম করেছিল। তার বদলা নিতে হবে। তারজন্য মুসলিমরা হিন্দু নারীদের উপর যে আচরণ করেছে, মুসলিমদের সেইরকম আচরণই ফিরিয়ে দিতে হবে। এই ভাবনা-চিন্তা মিলবে বি. ডি. সাভারকারের লেখা “ভারতের ইতিহাসের ছয়টি স্বর্ণময় অধ্যায়” বইটিতে। আর. এস. এস প্রভাবিত বিভিন্ন নেট-মাধ্যমে এই রকম ঘৃণা-বিদ্বেষের মালমশলা মজুত করা চলে সবসময়। এটা তাদের হিন্দুত্ব-ভাবনার আবশ্যিক বিষয়। গুজরাত গণহত্যার আগে দুই বছর ধরে প্রচারপত্র, ইন্টারনেট থেকে ধর্ম সম্মেলনে মুসলমান বিরোধী প্রচার করা হয়েছিল। এর একটা দিক ছিল হিন্দু মেয়েদের লাঞ্ছনার বদলা নেওয়ার কথা। গণহত্যায় অজস্র ধর্ষণ-গণধর্ষণের পিছনে এটাই ছিল কারণ।

গুজরাত গণহত্যার একটা তাড়না আছে। ভক্তরা হিন্দুত্বের হিংসায় মাতবে, পরিণামে গারদে পচবে—হিন্দুত্বের এমন আদর্শ সৈনিক কোথায়? যাবজ্জীবন বা দীর্ঘ গারদের জীবনে তাদের হিন্দুত্বের মোহ ছুটে যাবে না? রাষ্ট্রক্ষমতা হিন্দুত্ববাদীদের সেরা হাতিয়ার। সুতরাং তাই দিয়ে তারা হিন্দুত্বের জয়ঢাক পেটাতে কোনো রাখঢাক রাখতে নারাজ। এইসঙ্গে তিস্তা সেতলওয়াড়ের মতো হিন্দুত্ববাদীদের হিংসার বিরুদ্ধে নিরলস যোদ্ধাদের গারদে ঢুকিয়ে হিংসার পথটা সুগম করার চেষ্টা।

অপরাধীদের সাজা মকুবের পর বিলকিস বানোর স্বামী ইয়াকুব রসুল যা বলেছেন, তা মানবাধিকার ও সংখ্যালঘু মননের পক্ষে ভয়ানক। তিনি সাংবাদিকদের সামনে তাঁর সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় সাজা মকুব সম্পর্কে কোন মন্তব্য করতে চাননি। উপরন্তু তিনি বলেছেন, আমাদের এখন কোনও ঠিকানা নেই। আমরা লুকিয়ে থাকছি। কারণ তা জানালে আমাদের বাঁচা কঠিন হয়ে পড়বে। (আপনজন পত্রিকা, ১৭ আগস্ট ২০২২) কেউ এভাবে লুকিয়ে বেড়ায়, কেউ দমিত মনে সঙ্কুচিত হয়ে থাকে; গুজরাতে মুসলিমদের যাপনে এই বাস্তবতা থেকে ক’জন বেরিয়ে আসতে পেরেছে? বোধহয় কেউ না। গুজরাত গণহত্যা তাই হিন্দুত্ববাদীদের কাছে অনুপ্রেরণা। হিংসাত্মক মুসলমান বিরোধী অভিযানে গুজরাত মডেল।

গত ১৮ আগস্ট এক বিবৃতিতে বিলকিস বানো বলেন, “…কোনও নারীর বিচার এভাবে শেষ হয় কী করে? আমি আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে বিশ্বাস করতাম। আমি রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রেখেছিলাম এবং আমি ধীরে ধীরে আমার ট্রমা নিয়ে বাঁচতে শিখেছিলাম। এই আসামীদের মুক্তি আমার কাছ থেকে আমার শান্তি কেড়ে নিয়েছে এবং ন্যায়বিচারের প্রতি আমার বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিয়েছে।“ (দিন দর্পণ পত্রিকা, ২০ আগস্ট ২০২২) তাঁর এই আর্তি দেশে যতদূর পৌঁছবে, সবখানেই বিপুল নারীর মন ছুঁয়ে যাবে নিশ্চয়। কিন্তু তাঁর হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস ফিরে পাওয়া, সেটার কী হবে? বিলকিস বানোর লাঞ্ছনা, তাঁর স্বজন হারানো কোনও আপতিক ঘটনা নয়, এক সামাজিক বিকৃতির বহিঃপ্রকাশ। মানব সমাজের নিজের কাছেই তাঁর এই বেদনার জন্য জবাবদিহি করতে হবে। আজকের ভাবনা তো সেটাই হতে হয়।

সি. কে. রাউলজি, যিনি সাজাপ্রাপ্ত এগারো জনের মুক্তি পর্যালোচনা কমিটির দুই বিজেপি বিধায়কের একজন, সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “ওরা ব্রাহ্মণ, সংস্কারী, ভাল পরিবারের। তাছাড়া সাজা দেওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যও তো থাকতে পারে।“ (আনন্দ বাজার পত্রিকা, ১৯ আগস্ট ২০২২) এ হল সনাতনী হিন্দু বর্ণবৈষম্যের সমাজ-পংক্তিতে ব্রাহ্মণ্য বৈভবের গোঁড়ামি, যা মনুস্মৃতির অনুশাসনে নিম্নবর্ণ ও নারীর প্রতি অবদমন-দমনের মানসিকতা-পুষ্ট। এই মানসিকতা দলিত পীড়নে রত হয়। এই মানসিকতাই চরম সিদ্ধান্তে হাথরাসে ধর্ষকামী হয়ে ওঠে। শেষমেশ নারীর প্রতি এই বিকৃত-মনস্কতা জাতধর্মের বেড়া ভাঙতে উদ্যত হয়।

বিলকিস বানোর প্রতি অবিচারের প্রতিবাদ-প্রতিকারে মানুষের কণ্ঠস্বর তাঁর অন্তরকে যতটাই ছুঁতে পারুক, তা যেন বিলকিস বানোর বেদনার জগৎ ছাপিয়ে মানবাধিকারের সামাজিক অবয়ব হয়ে উঠতে পারে। তাহলে বিলকিস বানো শুধু একজন ন্যায়বিচার-প্রত্যাশী বিধ্বস্ত নারী থাকেন না, সমগ্রে নারীসত্তার বিপন্নতার সামনে এক সাহসী নারীসত্তার প্রতীক হয়ে ওঠেন। নারীর প্রতি মনুবাদী বিরূপতার এটাই তো উপযুক্ত জবাব।

0 Comments

Post Comment