পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

পাশ ফেল ও আমরা

  • 23 June, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 309 view(s)
  • লিখেছেন : সুপর্ণা সেনগুপ্ত
অনুত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের পাশ করিয়ে দেওয়া দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, উৎসে গিয়ে তার কারণ খুঁজেছেন এক শিক্ষক। ছাত্র-শিক্ষক-বিদ্যালয়ের আন্তসম্পর্কের হদিস করতে চেয়েছেন। আর ছাত্রছাত্রীদের জন্য তাঁর মূল্যবান পরামর্শ।

উচ্চমাধ্যমিকের ফল প্রকাশের পরে সারা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে অনুত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের পাশ করিয়ে দেবার দাবীতে ছাত্রছাত্রী তথা তাদের অভিভাবকেরা মিছিল, মিটিং এমনকী পথ অবরোধ করছেন।

এই সব অসফল ছাত্রছাত্রীরা কিসের ভিত্তিতে পাশ করিয়ে দেওয়াকে তাদের নৈতিক অধিকার আবার কখনো বা সাংবিধানিক অধিকার বলে ভাবছে? গত সপ্তাহ দুই আগে মাধ্যমিকের ফলাফল বেরিয়েছে। সেখানেও পাশের হার ছিল ৮৬.৬০ শতাংশ। তখন কিন্তু আমরা অসফল ছাত্রছাত্রীদের কোনরকম আপত্তিজনক ব্যবহার দেখিনি। তাহলে কেন উচ্চমাধ্যমিক অনুত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের এমন অদ্ভুত আচরণ?

পরীক্ষায় পাশ করতে গেলে পড়াশুনো করতে হয়। অন্যের সাহায্য নিয়ে পাশ করাটা অপরাধ। এই সাধারণ বোধটারই অভাব দেখা যাচ্ছে ছাত্রদের মধ্যে। তাদের কাছে শিক্ষার তথাকথিত চিরন্তন মূল্যায়ন ব্যবস্হাটা মূল্যহীন। ১৯৮৬ সালের জাতীয় শিক্ষা নীতি বা ২০০৯ সালের শিক্ষার অধিকার আইন অনুযায়ী চোদ্দ বছর পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হবে সম্পূর্ণ অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক। সেখানে পরীক্ষার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া যাবে না তাদের কচি মনে। স্কুল ছুটদেরও ধরে বেঁধে স্কুলে এনে শিক্ষা দিতে হবে। অক্ষরজ্ঞানহীন কোনও কিশোরকেও তার বয়স অনুযায়ী ক্লাসের যোগ্য করে তুলে মূল স্রোতে ফিরিয়ে দেবার দায়িত্ব শিক্ষকদের। কিন্তু কোনো শিশু বা কিশোর যদি কোনো মতেই ক্লাসের পড়ায় আগ্রহী না হয়েও প্রতিবছর উত্তীর্ণ হয়ে যায় তবে তা পারিপার্শ্বিক ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে কি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে, সে কথা ভেবে দেখা দরকার। তাদের মধ্যে এই ধারনা জন্মাতেই পারে যে, না জেনে না পড়ে যেনতেন প্রকারে পরীক্ষায় পাশ করাটাই তার অধিকার। এবং তাতে যারা বাধা দেবে তারা সমাজের শত্রু।

কোভিড অতিমারীর মতো একটি বিশেষ অবস্থায় জনজীবন প্রাথমিক ভাবে একোবারো স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। মহামারীর আতর্কিত আক্রমণ মোকাবিলায় দীর্ঘ লকডাউন, মহামারীর প্রকোপ, মৃত্যু মিছিল আমাদের জীবনকে চ্যালেঞ্জ জানায়েছিল প্রতি পদক্ষেপে। ২০২১ সালে কিন্তু দুই কিস্তিতে বিদ্যালয়গুলি খুলেছিল। একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের কারও কারও কাছে (গ্রামেঞ্চলে সে সংখ্যা অবশ্য অতি নগণ্য) ট্যাব বা স্মার্ট ফোন থাকলেও অনলাইন ক্লাস বা সেই ক্লাসে শিক্ষক বা ছাত্রদের উপস্থিতির বিষয়ে না-ছিল শিক্ষাদপ্তরের কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশিকা, না-ছিল ছাত্রছাত্রীদের তেমন কোন তৎপরতা। অথচ শিক্ষকরা বিনা দোষেই হয়ে উঠছিলেন গণশত্রু। তাঁরা তাঁদের কর্তব্যের প্রতি দায়বদ্ধ হলেও রাস্তাঘাটে অসম্মানিত হতে হচ্ছিল। সমাজকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল যে, শিক্ষকরা সমাজের সবচেয়ে বড় বন্ধু। তাঁদের প্রতি অশ্রদ্ধা যত বাড়বে, ভবিষ্যত প্রজন্ম তত অধঃপতিত হবে। আজ তারই নিদর্শন পথে ঘাটে, জনসমক্ষে।

অতিমারী পরিস্হিতিতে কোনও কোনও বিদ্যালয় কিন্তু অনলাইন ক্লাস (সকাল, বিকেল) করেছে, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে, পরীক্ষা নেওয়া, মূল্যায়ন, প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের পরিসেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আবার কোন বিদ্যালয় হয়তো থেকেছে নীরব দর্শক। তাই প্রাত্যহিক অনলাইন ক্লাস, টেস্টের পর দু’মাস বাধ্যতামূলক ভাবে দ্বাদশ শ্রেণীর ক্লাস হওয়াটা বিদ্যালয় ও ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে ছিল অত্যন্ত জরুরী। আর সেটা যে একেবারেই হয়নি তা বলা যায় না। অবশ্য এ ব্যাপারে প্রধান শিক্ষক, স্কুল কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষাদপ্তরের আরো যত্নবান হওয়া দরকার ছিল। পরীক্ষা পিছানোর জন্য ও নিয়মিত ক্লাসের জন্য ছাত্রছাত্রীরা প্রয়োজনে মতামত দিতে পারতো শিক্ষা দপ্তরকে। আজ পথে না-নেমে সেদিন আরো নিয়মিত ক্লাসের দাবীতে সরব হতে পারতো।

যে ছাত্রছাত্রীরা আজ রাস্তা অবরোধ করে জনজীবন স্তব্ধ করতে চাইছে— হিসেব নিলে দেখা যাবে এদের বেশীরভাগেরই স্মার্ট ফোন আছে কিন্তু অনলাইন ক্লাস করেনি কিংবা বিদ্যালয়ের পঠনপাঠনকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে তারা পরীক্ষা হলে নকল করে বাজিমাত করায় বিশ্বাসী। কিছু শিক্ষক-শিক্ষিকা আবার নিজেদের দায়িত্ব ভুলে শুধু সরকারী নির্দেশিকার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।

সারা বিশ্ব যেমন অতিমারীর বাধা কাটিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে চলেছে আমরাও তেমনি মূল স্রোতে ফিরতে সচেষ্ট হই। আর অসফল ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে বলি— failure is the pillar of success। তোমাদের আজকের অসফলতাই কালকে সাফল্য আনবে। আর যদি মনে করো তোমাদের মধ্যে কোন ঘাটতি নেই, তোমরা অযথা অন্যায়ের স্বীকার, তবে খাতা রিভিউ করার জন্য দরখাস্ত করতে পারো। প্রধানশিক্ষক ও বিদ্যালয় কতৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরমর্শ নিতে পারো। নিয়ম মেনে শিক্ষাদপ্তরে আবেদন করতে পারো। আইন নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করো না। সহ নাগরিক, অভিভাবক ও শিক্ষক হিসাবে এ আমার বিনীত অনুরোধ।

0 Comments

Post Comment