পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

নদী যে মানুষটাকে ভাসিয়ে নিল

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 201 view(s)
  • লিখেছেন : উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়
'সুবর্ণরেখা'-য় ঈশ্বর আর সীতা উদ্বাস্তু হয়ে কলকাতায় আসে। প্রথমে তারা মানুষ, তারপর তারা রিফিউজি, তারপর তারা বোঝা, তারপর তারা সন্দেহের পাত্র। কলকাতার মধ্যবিত্ত তাদের দেখে করুণা করে, তারপর বিরক্ত হয়, তারপর ভয় পায়। এই ভয়টাই পরে ঘৃণায় বদলায়। সীতা শেষ পর্যন্ত বেশ্যাবৃত্তিতে যেতে বাধ্য হয়। এটা শুধু একটা মেয়ের পতন নয়, এটা হলো একটা ব্যবস্থার পতন, যে ব্যবস্থা উদ্বাস্তুকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেনি, তাকে অপর হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

একটা চিঠি দিয়ে একটা নদীকে মাপা যায় না। উনিশশো পঞ্চান্ন সালের একুশে অক্টোবর কমিউনিস্ট পার্টির কলকাতা জেলা কমিটি থেকে লেখা সেই চিঠিতে ঋত্বিক ঘটককে জানানো হয়েছিল, তদন্তে দেখা গেছে তিনি সদস্যপদের বৈধতা পাননি, তাই ভুল করে রোলে উঠে যাওয়া তাঁর নাম কেটে দেওয়া হলো। কাগজের একটা টুকরো। তাতে সই আছে, সিল আছে, তারিখ আছে। কিন্তু ঋত্বিক ঘটক কাগজের মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন নদীর মানুষ। পদ্মা থেকে তিতাস, তিতাস থেকে সুবর্ণরেখা, সুবর্ণরেখা থেকে মেঘে ঢাকা তারা, তাঁর জীবনটা একটা নদীর মতো বয়ে গেছে, ভাঙতে ভাঙতে, গড়তে গড়তে। চিঠি দিয়ে নদীকে আটকানো যায় না, চিঠি দিয়ে মানুষটাকেও বোঝা যায় না।

ঋত্বিকের জন্ম উনিশশো পঁচিশ সালের চৌঠা নভেম্বর ঢাকায়। বাবা সুরেশচন্দ্র ঘটক ছিলেন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট। ছোটবেলা কেটেছে রাজশাহীতে। সেই রাজশাহী, সেই ঢাকা, সেই পদ্মা, পরে হয়ে উঠবে তাঁর সিনেমার মানচিত্র। উনিশশো ছেচল্লিশ সাল নাগাদ তিনি যখন মার্কসবাদী রাজনীতিতে এলেন, তখন তিনি শুধু একটা মতবাদ গ্রহণ করেননি, তিনি একটা নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। ভারতীয় গণনাট্য সংঘ তখন সেই নদীর একটা ঘাট। তিনি 'কালো সায়র' লিখলেন, 'নবান্ন'-এর পুনরুজ্জীবনে অংশ নিলেন, 'ইস্পাত'-এর মহড়া দিলেন। কিন্তু ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সঙ্গে সাঁতার কাটা মানুষের তফাত থাকে। পার্টি চাইত ঘাটে দাঁড়িয়ে স্লোগান দাও, ঋত্বিক চাইতেন স্রোতে নেমে ডুবে যাও। এই তফাত থেকেই বিরোধ।

এই বিরোধটাকে শুধু শৃঙ্খলা বনাম উচ্ছৃঙ্খলতা বলে বোঝা যাবে না। এটা ছিল দুটো শিল্পদর্শনের বিরোধ। পার্টির একটা অংশ তখন মনে করত, শিল্প হবে আয়না, যাতে মানুষ নিজের মুখ দেখে রাজনীতি শিখবে। ঋত্বিক মনে করতেন, শিল্প হবে ছুরি, যা দিয়ে মানুষ নিজের বুক চিরে দেখবে ভেতরে কী পচে আছে। আয়না আরাম দেয়, ছুরি যন্ত্রণা দেয়। পার্টি আরাম চেয়েছিল, ঋত্বিক যন্ত্রণা চেয়েছিলেন। তিনি মদ খেতেন, এটা সত্যি। কিন্তু মদটা শুধু নেশা ছিল না, মদটা ছিল তাঁর আত্মহত্যার ধীর পদ্ধতি। তিনি নিজেকে শেষ করে দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, এই ব্যবস্থায় একজন সংবেদনশীল মানুষ বাঁচতে পারে না।

উনিশশো আটচল্লিশ থেকে একান্ন সালের মধ্যে পার্টি যখন নিষিদ্ধ, নেতারা যখন জেলে বা আত্মগোপনে, তখন পার্টির ভেতরে ভয় ঢুকে গিয়েছিল। ভয় থেকে জন্ম নিয়েছিল সন্দেহ। শিল্পীকে সন্দেহ, বুদ্ধিজীবীকে সন্দেহ, প্রশ্ন করাকে সন্দেহ। ঋত্বিক প্রশ্ন করতেন। তাই সদস্যপদ নবীকরণের সময় তাঁর নাম বাদ পড়ল। এটা ছিল একটা প্রশাসনিক মৃত্যুদণ্ড। কেউ তাঁকে গুলি করেনি, শুধু একটা রেজিস্টার থেকে নামটা কেটে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একজন মানুষের কাছে নিজের পরিচয় থেকে নাম কেটে দেওয়ার চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে।

অথচ এই কাটা নামটাই পরে হয়ে উঠল তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়। পার্টি থেকে বেরিয়ে এসে তিনি আরও বড় বামপন্থী হয়ে উঠলেন। এখানে ভারতের বামপন্থার বড় ছবিটা বোঝা দরকার। ভারতে বামপন্থা কখনোই একটা পার্টির ফাইলে আটকে থাকেনি। মার্কসবাদ তার একটা শক্তিশালী ধারা, কিন্তু তার পাশে গান্ধীর গ্রাম স্বরাজ, নেহরুর ধর্মনিরপেক্ষ পরিকল্পনা, লোহিয়ার সাত বিপ্লব, আম্বেদকরের জাত ধ্বংসের লড়াই, জয়প্রকাশের সম্পূর্ণ বিপ্লব, সব মিলে একটা বড় নদী তৈরি হয়েছে। গত কয়েক দশকে আমরা এই নদীটাকে ছোট ছোট ডোবায় ভাগ করে ফেলেছি। বামপন্থা মানে শুধু পার্টি, গান্ধী মানে শুধু মূর্তি, আম্বেদকর মানে শুধু ছুটি, লোহিয়া মানে শুধু একটা নাম। এই ভাগাভাগিটা ভারতের জন্য আত্মঘাতী। কারণ ভারতের সংকটটা একরৈখিক নয়। শ্রেণি আছে, জাত আছে, লিঙ্গ আছে, ধর্ম আছে, ভাষা আছে, পরিবেশ আছে। মার্কস ছাড়া শ্রেণি বোঝা যাবে না, আম্বেদকর ছাড়া জাত বোঝা যাবে না, লোহিয়া ছাড়া ভাষা আর সংস্কৃতির রাজনীতি বোঝা যাবে না, গান্ধী ছাড়া নৈতিকতা আর বিকেন্দ্রীকরণ বোঝা যাবে না। ঋত্বিক এই সবগুলোকে একসঙ্গে ধরতে চেয়েছিলেন। তাঁর মার্কসবাদে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন, তাঁর বিপ্লবে ভাটিয়ালি ছিল, তাঁর রাজনীতিতে পুরাণ ছিল।

এই জায়গাতেই এডওয়ার্ড সঈদের কথা এসে পড়ে, যা ঋত্বিকের সিনেমাকে নতুন করে পড়তে সাহায্য করে। সঈদ তাঁর বিখ্যাত লেখা 'রিফ্লেকশনস অন এক্সাইল'-এ বলেছিলেন, নির্বাসন হলো আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় শাস্তিগুলোর একটা। নির্বাসিত মানুষ কখনোই পুরোপুরি ঘরে ফিরতে পারে না, আবার নতুন জায়গাটাকেও পুরোপুরি নিজের বলে মানতে পারে না। সে দুই পাড়ের মাঝখানে ঝুলে থাকে। সে সবসময় অপর হয়ে থাকে। 'ওরিয়েন্টালিজম' বইতে সঈদ দেখিয়েছিলেন, ক্ষমতা কীভাবে অপরকে তৈরি করে। পশ্চিম যেমন প্রাচ্যকে অপর বানিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিল, তেমনি প্রতিটি ক্ষমতাবান ব্যবস্থাই নিজের ভেতরে একটা অপর তৈরি করে নেয়, যাতে নিজের ব্যর্থতাকে তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যায়। ফ্যাসিবাদ এই কৌশলটাকে সবচেয়ে নিখুঁতভাবে ব্যবহার করে। ফ্যাসিবাদ অভিবাসীকে, উদ্বাস্তুকে, সংখ্যালঘুকে, ভিন্ন ভাষার মানুষকে অপর বানায়। বলে, ওরা এসেছে বলেই তোমার চাকরি নেই, ওরা এসেছে বলেই তোমার ঘর নেই, ওরা এসেছে বলেই দেশটা নষ্ট হয়ে গেছে। এভাবে অর্থনৈতিক শোষণের প্রশ্নটা সাম্প্রদায়িক ঘৃণায় বদলে যায়। মানুষ ভুলে যায়, তার দারিদ্র্যের কারণ ব্যবস্থা, সে ভাবতে শুরু করে, তার দারিদ্র্যের কারণ পাশের বাড়ির অপর মানুষটা।

ঋত্বিক এই রূপান্তরের প্রক্রিয়াটাকে তাঁর ছবিতে আগেই এঁকে দিয়েছিলেন, সঈদের ভাষা পাওয়ার অনেক আগে। তিনি শুধু পূর্ববঙ্গের ছিন্নমূল মানুষের দুর্দশার কথা বলেননি, তিনি দেখিয়েছিলেন, ছিন্নমূল মানুষকে কীভাবে ধাপে ধাপে অপর বানিয়ে দেওয়া হয়। 'সুবর্ণরেখা'-য় ঈশ্বর আর সীতা উদ্বাস্তু হয়ে কলকাতায় আসে। প্রথমে তারা মানুষ, তারপর তারা রিফিউজি, তারপর তারা বোঝা, তারপর তারা সন্দেহের পাত্র। কলকাতার মধ্যবিত্ত তাদের দেখে করুণা করে, তারপর বিরক্ত হয়, তারপর ভয় পায়। এই ভয়টাই পরে ঘৃণায় বদলায়। সীতা শেষ পর্যন্ত বেশ্যাবৃত্তিতে যেতে বাধ্য হয়। এটা শুধু একটা মেয়ের পতন নয়, এটা হলো একটা ব্যবস্থার পতন, যে ব্যবস্থা উদ্বাস্তুকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেনি, তাকে অপর হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ঈশ্বর শেষে দুবার হে রাম বলে ওঠে। এই হে রাম কোনো মন্দিরের জপ নয়। এটা একটা ভাঙা মানুষের শেষ আর্তনাদ। ভারতের গ্রামে মানুষ বিপদে পড়লে রাম নাম নেয়, কিন্তু সেই রাম কোনো দেবতা নন, সেই রাম হলেন অসহায়ের শেষ আশ্রয়। আবার এই হে রাম গান্ধীর শেষ উচ্চারণের প্রতিধ্বনিও বটে। ঋত্বিক যেন বলতে চাইছেন, গান্ধীর ভারত মরে গেছে, ঈশ্বরের ভারত মরে গেছে, এখন শুধু আর্তনাদ পড়ে আছে। তিনি রামকে ব্যবহার করেছেন রামকে ভাঙার জন্য, রামকে পূজা করার জন্য নয়। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষ যখন সব হারায়, তখন সে পুরাণের কাছে ফিরে যায়, কিন্তু পুরাণও তাকে বাঁচাতে পারে না।

'মেঘে ঢাকা তারা'-য় নীতার গল্পটাও এই অপর বানানোর গল্প। নীতা পরিবারের জন্য নিজেকে শেষ করে দেয়, কিন্তু পরিবারই তাকে অপর বানিয়ে দেয়। সে যখন যক্ষ্মায় ভোগে, তখন তাকে পাহাড়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যাতে পরিবারের বাকিরা বাঁচে। এটা কি শুধু একটা পরিবারের গল্প। না, এটা হলো সেই সমাজের গল্প, যে সমাজ তার সবচেয়ে ত্যাগী মেয়েটাকে, তার সবচেয়ে পরিশ্রমী মানুষটাকে, ব্যবহারের পর ফেলে দেয়। ফ্যাসিবাদী রাজনীতিও ঠিক এই কাজটাই করে। প্রথমে অভিবাসীকে ব্যবহার করে, তার শ্রম নেয়, তারপর তাকে ফেলে দেয়, তারপর তাকে দোষী বানায়। ঋত্বিকের নীতা তাই শুধু বাঙালি মেয়ে নয়, সে হলো সারা পৃথিবীর নির্বাসিত মানুষের প্রতীক। নীতা যখন বলে, দাদা আমি বাঁচতে চাই, তখন সেটা শুধু একটা সংলাপ নয়, সেটা হলো সঈদের নির্বাসিত মানুষের কণ্ঠস্বর, যে মানুষটা বলছে, আমাকে অপর বানিয়ে দিও না, আমাকে মানুষ বলে মানো।

'তিতাস একটি নদীর নাম' ছবিতে এই নির্বাসনের ছবিটা আরও বড় হয়ে ওঠে। তিতাসের জেলেরা নদী হারায়, নদী শুকিয়ে যায়, তাদের জীবিকা হারায়। নদী শুকিয়ে যাওয়া মানে শুধু জল শুকিয়ে যাওয়া নয়, মানে একটা সংস্কৃতি শুকিয়ে যাওয়া। সঈদ বলেছিলেন, নির্বাসিত মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো, তার মানচিত্র হারিয়ে যায়। তিতাসের জেলেদের মানচিত্র হারিয়ে গেছে। তারা জানে না, তারা কোথায় যাবে। এই হারিয়ে যাওয়া মানচিত্রের গল্পটাই আজকের ভারতে, আজকের পৃথিবীতে, বারবার ফিরে আসছে। আজ যখন অভিবাসী শ্রমিককে ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়া হয়, যখন উদ্বাস্তুকে নাগরিকত্বের প্রমাণ চাওয়া হয়, যখন একটা ধর্মের মানুষকে বলা হয়, তুমি এদেশের নও, তখন ঋত্বিকের ছবিগুলো আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ঋত্বিক দেখিয়েছিলেন, উগ্র জাতীয়তাবাদ কীভাবে মানুষকে বাধ্য করে তার ডিজাইনে ঢুকতে। উগ্র জাতীয়তাবাদ বলে, তুমি হয় আমাদের মতো হবে, নয়তো তুমি শত্রু। তুমি হয় এই ভাষায় কথা বলবে, এই পোশাক পরবে, এই দেবতাকে মানবে, নয়তো তুমি অপর। এই ডিজাইনের বাইরে যে মানুষটা থাকে, তাকে হয় মরতে হয়, নয়তো পালাতে হয়। ঋত্বিকের ঈশ্বর, নীতা, সীতা, বাসন্তী, সবাই এই ডিজাইনের বাইরের মানুষ।

এই কারণেই ঋত্বিক সিনেমার প্রচলিত গ্রামার মানেননি। প্রচলিত গ্রামার বলে, ক্যামেরা হবে অদৃশ্য, শব্দ হবে বাস্তব, গল্প হবে সরল। ঋত্বিক বলতেন, এই অদৃশ্যতাই হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যা। পুঁজিবাদ চায় দর্শক যেন ভুলে যায় সে সিনেমা দেখছে, যেন সে স্বপ্ন দেখছে। ঋত্বিক চাইতেন দর্শক যেন মনে রাখে সে সিনেমা দেখছে, যেন সে জেগে ওঠে। তাই তিনি ব্রেখটের মতো ভাঙন ব্যবহার করেছেন, আইজেনস্টাইনের মতো মন্তাজ ব্যবহার করেছেন, কিন্তু দুজনকেই ছাড়িয়ে গেছেন লোকসংস্কৃতি দিয়ে। তাঁর সিনেমায় ক্যামেরা নাচে, আলো কাঁপে, শব্দ চিৎকার করে। এটা কৌশল নয়, এটা দর্শন। তিনি চাইতেন দর্শকের শরীরে ধাক্কা লাগুক।

শব্দ নিয়ে তাঁর কাজটা এখনো ঠিকমতো আলোচিত হয়নি। ঋত্বিকের ছবিতে শব্দ শুধু সংলাপ নয়, শব্দ হলো একটা আলাদা ইতিহাস। তিনি যখন 'মেঘে ঢাকা তারা'-য় নীতার কান্নার ওপর রবীন্দ্রসংগীত বসান, তখন সেটা শুধু ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক নয়, সেটা হলো দুটো সময়ের সংঘাত। একদিকে উদ্বাস্তু মেয়েটার বর্তমান, অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের একটা হারানো বাংলা। এই দুই সময়ের ধাক্কাতেই জন্ম নেয় ট্র্যাজেডি। আবার যখন তিনি 'যুক্তি তক্কো আর গপ্পো'-তে নিজে নীলকণ্ঠ বাগচী হয়ে বোতল হাতে বলেন, এটা অমৃত, তখন শব্দটা হয়ে ওঠে আত্মস্বীকার। তিনি নিজের ধ্বংসকে অমৃত বলছেন, কারণ তিনি জানেন, এই ধ্বংসের ভেতর দিয়েই সত্য বেরিয়ে আসবে।

ঋত্বিকের সিনেমায় নারীর প্রশ্নটাও এই অপর বানানোর সঙ্গে জড়িত। নীতা, সীতা, তিতাসের বাসন্তী, এরা কেউই শুধু ভিকটিম নয়। এরা হলেন সেই নারীরা যারা পরিবারকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেরা শেষ হয়ে যান। বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারে মেয়েরা এখনো এই ভূমিকাই পালন করে। বড় মেয়ে মানেই ত্যাগ, বোন মানেই দায়িত্ব। ঋত্বিক এই ত্যাগকে মহিমান্বিত করেননি, তিনি এই ত্যাগকে প্রশ্ন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, এই ত্যাগের পেছনে আছে একটা পিতৃতান্ত্রিক অর্থনীতি, যেখানে মেয়ের শরীর, মেয়ের শ্রম, মেয়ের স্বপ্ন, সবকিছুই পরিবারের সম্পত্তি। নীতা যখন বলে, দাদা আমি বাঁচতে চাই, তখন সেটা শুধু একটা মেয়ের কান্না নয়, সেটা হলো একটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।

আরেকটা দিক, যা প্রায় আলোচনায় আসে না, সেটা হলো ঋত্বিকের অসমাপ্ত কাজ। তিনি অনেক ছবি শেষ করতে পারেননি। 'বেদেনি', 'বাগলার বঙ্গদর্শন', 'রঙের গোলাম', এসব ছবির কথা আমরা জানি, কিন্তু সেগুলোর ফুটেজ কোথায় গেল, সেই ইতিহাসটা কেউ লেখেনি। ঋত্বিকের অসমাপ্ততা আসলে ভারতের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অসমাপ্ততা। আমরা একজন প্রতিভাকে কাজ করতে দিইনি, টাকা দিইনি, প্রেক্ষাগৃহ দিইনি, তারপর তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে উৎসব করেছি। এই উৎসবের মধ্যে একটা নিষ্ঠুরতা আছে। আমরা জীবিত ঋত্বিককে অনাহারে রেখেছি, মৃত ঋত্বিককে ফুল দিয়ে সাজিয়েছি।

এবার বাঙালির ঋত্বিক আদিখ্যেতার মনস্তত্ত্বটা বোঝা যাক। বাঙালি মধ্যবিত্ত ঋত্বিককে বুঝুক বা না বুঝুক, তাঁকে নিয়ে আবেগ দেখায় কেন। এর পেছনে তিনটে গভীর কারণ আছে। প্রথমত, স্মৃতির উত্তরাধিকার। বাঙালি মধ্যবিত্তের অনেকেই দেশভাগের সন্তান। তাদের ঠাকুমা, দাদু, বাবা, মা, কেউ না কেউ উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিলেন। কলোনিতে থাকা, রেশন তোলা, রিফিউজি শব্দটা শোনা, এই স্মৃতি তাদের রক্তে আছে। ঋত্বিক সেই স্মৃতিকে ভাষা দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, অপরাধবোধ। মধ্যবিত্ত জানে, সে উদ্বাস্তুদের জন্য কিছু করেনি, সে বামপন্থার কথা বলেছে, কিন্তু নিজের ফ্ল্যাট, নিজের গাড়ি, নিজের আরাম ছাড়েনি। ঋত্বিককে ভালোবেসে সে নিজের অপরাধবোধ থেকে মুক্তি চায়। তৃতীয়ত, আত্মপরিচয়ের খেলা। সত্যজিৎকে বোঝা সহজ, মৃণালকে বোঝা যায়, ঋত্বিককে বোঝা কঠিন। এই কঠিনটাকেই মধ্যবিত্ত নিজের বুদ্ধির প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে। আমি ঋত্বিক বুঝি, অতএব আমি গভীর, এই ভাবনাটা কাজ করে। ফলে ঋত্বিক হয়ে ওঠেন একটা ব্যাজ, একটা পরিচয়পত্র। তাঁর ছবির পোস্টার ঘরে টাঙানো হয়, কিন্তু তাঁর প্রশ্নগুলো জীবনে নেওয়া হয় না। তাঁর গান গাওয়া হয়, কিন্তু তাঁর রাজনীতি এড়িয়ে যাওয়া হয়।

এই এড়িয়ে যাওয়ার মধ্যেই আজকের দক্ষিণপন্থী প্রচারের সুযোগ। তারা চায় ঋত্বিককে শুধু একজন মাতাল, পাগল, বোহেমিয়ান শিল্পী হিসেবে দেখাতে। তাহলে তাঁর রাজনীতিকে মুছে দেওয়া যাবে। তারা চিঠিটাকে অস্ত্র করে। তারা বলে, বামপন্থীরা ঋত্বিককে তাড়িয়েছিল, অতএব বামপন্থার কোনো অধিকার নেই ঋত্বিককে নিয়ে কথা বলার। এই যুক্তিটা আসলে একটা ফাঁদ। কারণ যারা এই কথা বলছেন, তাঁরা নিজেরা ঋত্বিকের ধর্মনিরপেক্ষতা মানেন না, তাঁর উদ্বাস্তুপ্রেম মানেন না, তাঁর পুঁজিবাদ বিরোধিতা মানেন না। তাঁরা ঋত্বিককে ভালোবাসেন না, তাঁরা বামপন্থাকে ঘৃণা করেন। ঋত্বিক তাঁদের কাছে শুধু একটা লাঠি, যা দিয়ে বামপন্থাকে পেটানো যায়। এটাই মায়াকান্না।

কিন্তু বামপন্থীদেরও আত্মসমালোচনা করতে হবে। পার্টি সেদিন ঋত্বিককে ধরে রাখতে পারেনি, এটা সত্যি। একজন শিল্পীকে সংগঠনের ছাঁচে ফেলতে গিয়ে পার্টি তাঁর প্রতিভার প্রতি সুবিচার করেনি। এই ভুলটা স্বীকার না করলে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া যাবে না। তবে ভুল স্বীকার করা আর ঐতিহ্য অস্বীকার করা এক নয়। বামপন্থীরা যদি আজ ঋত্বিককে স্মরণ করেন, সেটা ভণ্ডামি নয়, সেটা হলো নিজের সন্তানকে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা।

শেষ পর্যন্ত ঋত্বিক কার। তিনি কোনো পার্টির সম্পত্তি নন, কোনো দক্ষিণপন্থী প্রচারের হাতিয়ারও নন। তিনি হলেন সেই নদী, যে নদীকে বাঁধ দিয়ে আটকানো যায় না। তিনি ছিলেন বাংলার ছিন্নমূল মানুষের কণ্ঠস্বর, নারীর কান্না, উদ্বাস্তুর আর্তনাদ, শব্দের বিপ্লব। পার্টি তাঁর নাম কেটেছিল, কিন্তু তাঁর সিনেমা থেকে তাঁর নাম কাটতে পারেনি। আজ যারা চিঠি নিয়ে খেলছেন, তাঁরা ইতিহাসকে উল্টো করে পড়ছেন। ঋত্বিককে বুঝতে হলে চিঠি দিয়ে নয়, তাঁর সিনেমা দিয়ে বুঝতে হবে। তাঁর সিনেমা দেখলে একটা কথাই পরিষ্কার হয়, তিনি ছিলেন, আছেন, থাকবেন ভারতের সবচেয়ে বড় বামপন্থী শিল্পীদের একজন, পার্টির বাইরে থেকেও, পার্টির চেয়ে বড় হয়ে।

তথ্যসূত্র
১. Surama Ghatak, 'Ritwik: Padma Theke Titas', Dey's Publishing, Kolkata, 1995.
২. Ritwik Ghatak, 'Cinema and I', Edited by Ritwik Memorial Trust, Rupa and Co., Calcutta, 1987.
৩. ঋত্বিক ঘটক, 'চলচ্চিত্র, মানুষ এবং আরও কিছু', দে'জ পাবলিশিং।
৪. Shantanu Gangopadhyay (Ed.), 'Ritwik Ghatak Rachana Sangraha', Dey's Publishing.
৫. Sanjay Mukhopadhyay, 'Ritwik Ghatak o Tar Chalachchitra', Pratibhas.
৬. Moinak Biswas, 'The City and the Real: Ritwik Ghatak's Cinema and the Partition', in various essays on sound and memory.
৭. Ashish Rajadhyaksha and Paul Willemen, 'Encyclopaedia of Indian Cinema', British Film Institute, 1999.
৮. Amaresh Datta (Ed.), 'Encyclopaedia of Indian Literature', Sahitya Akademi, on IPTA and Ghatak.
৯. Communist Party of India, Calcutta District Committee, Letter to Ritwik Ghatak, 21 October 1955, Reference No. 10/Crg/579, copy circulated on social media and discussed in historical writings.
১০. গণশক্তি ও নাগরিক পত্রিকায় প্রকাশিত ঋত্বিক ঘটক শতবর্ষ বিষয়ক প্রবন্ধসমূহ, ২০২৫-২০২৬।
১১. B. R. Ambedkar, 'Annihilation of Caste', 1936.
১২. Rammanohar Lohia, 'The Caste System', and other socialist writings, Samajwadi Sahitya.
১৩. M. K. Gandhi, 'Hind Swaraj', 1909.
১৪. Jawaharlal Nehru, 'The Discovery of India', 1946.
১৫. Bertolt Brecht, 'Brecht on Theatre', Methuen, on alienation and epic theatre.
১৬. Sergei Eisenstein, 'Film Form' and 'Film Sense', on montage theory.
১৭. Edward W. Said, 'Orientalism', Pantheon Books, 1978.
১৮. Edward W. Said, 'Reflections on Exile and Other Essays', Harvard University Press, 2000.
১৯. Edward W. Said, 'Culture and Imperialism', Alfred A. Knopf, 1993.
২০. Hannah Arendt, 'The Origins of Totalitarianism', on statelessness and the refugee, 1951.
২১. Jibanananda Das and Bengali folk traditions, as discussed in Ritwik Ghatak's essays on folk culture and sound.
২২. আগামীর সময় পত্রিকায় প্রকাশিত 'ভাবা প্র্যাকটিস করার সুবর্ণ অধ্যায়' শীর্ষক প্রবন্ধ, ২০২৬।

0 Comments

Post Comment