দৃশ্যটা মনে আছে? চারজন সিপাই নিয়ে জেলার সাহেব গটগট করে এগিয়ে এলেন। একটা ষড়যন্ত্র উদ্ধার করার উদ্দেশ্যে নির্দেশ দিলেন, আধা সিপাহি ডাঁয়া তরফসে আওর আধা বাঁয়া তরফসে যাও। বাকি সব সিপাহি মেরা সাথ আও -- বলে জেলার সাহেব কিছুদূর এগিয়ে গেলেন। পেছনে ফিরে দেখলেন তার পেছনে কেউ নেই। হ্যাঁ শোলে সিনেমার আসরানি'র সেই অসাধারণ দৃশ্য মনে পড়ছে? হ্যাঁ পড়বেই। কারন, হাতের কাছে লাইফ বোটগুলো নিজেই ডুবিয়েছেন। এখন আঁকড়ে ধরার কিছু নেই, ডুবে মরাই একমাত্র ভবিতব্য। মানে আমি বলতে চাইছি আমরা যখন যা কিছুই করি না কেন, তার একটা অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু পশ্চাত যদি মুছে ফেলি, ইরেজ করে দিই, তাহলে থাকে শুধু অগ্রগতি। সেই অগ্রগতি হলো ভূতগ্রস্ত দিশাহীন দৌড়। অতএব পিছন ফিরে দেখার কোন সুযোগ বা সম্ভাবনা থাকে না। ইতিহাস বই থেকে সমগ্র মুসলমান শাসনের প্রায় ৬০০ বছরের ইতিহাস মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পুরানো কথাটা আবার কেন উঠল বলি।
ঔরঙ্গজেব তার দীর্ঘমেয়াদি দাক্ষিণাত্য অভিযান চালিয়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, স্বার্থান্বেষী সুযোগ সন্ধানী দক্ষিণের মনসবদারের দল, মুঘল বিরোধী শক্তির সাথে গোপন বোঝাপড়া চালায়। বাদশাহ বা তার বিশ্বস্ত সেনাপতিরা ফিরে গেলেই, তারা "বামুন গেল ঘর তো লাঙ্গল তুলে ধর" নীতি গ্রহণ করত। মনসবদাররা নিজেরাও পরস্পর দ্বন্দ্বে লিপ্ত। তারা সহজ হিসেব করে দেখে নিতো, মুঘল বিরোধী শক্তিকে বাধা দিতে গেলে যে সেনাবাহিনী রাখা প্রয়োজন তার জন্য মোট ব্যয় কত। পরিবর্তে যদি মুঘল বিরোধী শক্তিকে তাদের দাবি অনুযায়ী চৌথ ও সরদেশমুখী দিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেনাবাহিনী কম রাখলেও কোন অসুবিধা হয় না। এভাবে একদিকে খাতায়-কলমে যে পরিমাণ সৈন্য রাখা হতো, বাস্তবে তা ছিল অনেক কম। ফলে মুঘল সামরিক শক্তি দুর্বল হচ্ছিল। যখন রাজধানী থেকে মুঘল অফিসাররা সেনাবাহিনীকে সশরীরে গণনা করতেন "চেহরা", তখন আগত অফিসারকে কিছু ঘুষ দিয়ে সবকিছু হিসেব ঠিকঠাক করে নিতেন। অনেকটাই আজকের দিনের অডিট করার মত। অন্যদিকে মুঘলের ভূমি রাজস্ব আত্মসাৎ করে মুঘল বিরোধী শক্তি ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকে। এক সার্বিক দুর্নীতি। এই কারণেই ঔরঙ্গজেব সশরীরে সুদীর্ঘকাল দক্ষিণ ভারত অভিযানে গিয়েছিলেন। বলা যায় বাধ্য হয়েছিলেন।
আচার্য যদুনাথ সরকার মনে করেন এই দীর্ঘমেয়াদী দাক্ষিণাত্য অভিযানের পরিকল্পনা মুঘল সাম্রাজ্যের পক্ষে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হয়েছিল। প্রথমত রাজধানী তে দীর্ঘদিন বাদশাহের অনুপস্থিতি দরবারের অভ্যন্তরে ঔরঙ্গজেব বিরোধী শক্তিকে আনুকূল্য যুগিয়ে ছিল। তাছাড়া দক্ষিনে মারাঠা শক্তির বিরোধিতার সামনে বিজাপুর ও গোলকুন্ডা এই রাজ্যগুলি মুঘল সাম্রাজ্যের মাঝে বাফার স্টেট বা নিরাপত্তা অঞ্চল হিসেবে কাজ করতো। আফজল খান ও শিবাজীর বিরোধ এর সুপরিচিত উদাহরণ। দাক্ষিণাত্য অভিযান এই বাফার স্টেট এর সুরক্ষা থেকে মুঘল সাম্রাজ্য কে বঞ্চিত করেছিল।
এসব কথা বলার প্রয়োজন হতো না। একটু ইতিহাস স্মরণে রাখলে অমিত শাহ ও মোদিজি দেখতে পেতেন সুলতানি থেকে মুঘল যুগ পর্যন্ত কোন শক্তি বাংলাকে কখনো দিল্লির প্রত্যক্ষ শাসনাধীনে আনতে পারেনি। এনে থাকলেও সেটা খুবই সাময়িক। এমনকি গুপ্ত রাজারা মূলত উত্তর ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করলেও, গুপ্ত দের সামন্ত নরেন্দ্র গুপ্ত বা নরেন্দ্রাদিত্য, যিনি শশাঙ্ক নামে পরিচিত। তার হাতে স্বাধীন গৌড়ের প্রতিষ্ঠা হয়। বাংলা কনৌজের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়। এমনকি একটা সময়ে দক্ষিনে রাষ্ট্রকূট, পশ্চিমে প্রতিহার ও বঙ্গে পাল এই তিনটি প্রধান শক্তি ভারতের ইতিহাস কে নিয়ন্ত্রণ করত। সুলতানি যুগে ২০০ বছরের অধিক সময় হোসেন শাহি, ইলিয়াস শাহি শাসনে বাংলা ছিল স্বাধীন। মুঘলদের শাসনেও বাংলায় বারো ভূঁইয়ার স্বাধীনতা রক্ষার প্রয়াস উল্লেখযোগ্য। এই ইতিহাস স্মরণ রাখলে অমিত শাহ এমন পাগলের সিদ্ধান্ত নিতেন না। তিনি রাজধানীতে সব কাজ ফেলে বাংলা দখলের অভিপ্রায়ে ১৫ দিন ধরে এখানে তাঁবু ফেলেছেন। ক্ষমতার রাজনীতিতে তার সিংহাসনটা খুব নিরাপদে আছে, এ কথা তিনিও বলতে পারেন না। কেউই পারেনা।
অমিত শাহ একবারও ভেবে দেখেছেন যদি তিনি এবারেও ব্যর্থ হন তাহলে দলের মধ্যে তার ভাবমূর্তি কোথায় গিয়ে ঠেকবে। অপরাজেয় হিসেবে যে গৌরব সেটা কিন্তু ভেঙে পড়বে। আর অপরাজেয় ধারণা একবার ভেঙে পড়লে, তখন কিন্তু অতি দ্রুত, মাত্র নয় রানের মধ্যে ছটি উইকেট হারিয়ে যায়। কখনোই রাজনীতিতে "ফাইনাল চাল" বলে কিছু ঘোষণা করা যায় না। বাংলায় যদি অমিত সহজে ব্যর্থ হন তাহলে তার রক্তচাপ বেড়ে যেতে বাধ্য। কারণ পরেই উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন সেখানে গুজরাটি নেতাদের কোন কল্কে নেই। ওখানে যা কিছু করবেন যোগীজি। আসলে অমিত শাহজি গোড়ায় গলদ করেছেন। ইতিহাসের পাতা থেকে আগেই সুলতানি যুগ, মুঘল যুগ মুছে ফেলেছেন। বাংলার ২০০ বছরের স্বাধীন সুলতানি যুগ বাদ দিয়েছেন। এখন একমাত্র বস্ত্র খন্ডটি সম্বল আছে। দেখা যাক কি হয়, সেটাও থাকবে কিনা।
এদিকে রাজনীতিতে নতুন ভাষ্য নির্মাণ হয়েছে, সেটা অমিত শাহ খেয়াল করেছেন কি? হিটলারের নাৎসি বিজয় অভিযান এসে থমকে দাঁড়িয়ে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে। সেটাই ছিল হিটলারের প্রথম বাধা। আর ওই বাধার প্রাচীর তিনি টপকাতে পারেন নি। সেখান থেকেই পিছু হটা শুরু হয়। সমগ্র দখলিকৃত অঞ্চল থেকে একে একে সমূলে উচ্ছেদ হয়েছেন। আওয়াজ উঠেছে হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসন হোক বরবাদ, বাংলা হবে স্তালিন গ্রাদ। কেউ কেউ যখন ইতিহাসে চোখ রেখেছেন, অমিত শাহ তখন পিছন ফিরে দেখার কিছু পাচ্ছেন না। কারণ তিনি ইতিহাস মুছে দিয়েছেন। আমরা ইতিহাসে আস্থাবান, আজও। স্তালিন গ্রাদ বলার মধ্য দিয়ে পতনের সূচনা ও আগামী ২০২৯ এর সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেছেন। সেটা কি অমিত শাহ বুঝতে পারছেন?