পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ইরানি পরিচালক কিয়ারোস্তমির ফ্রেমে জেন জি ও রাজপথ

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 201 view(s)
  • লিখেছেন : উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়
সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়া এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যে জেন জি আন্দোলন দেখা গেছে, তার সাথে কিয়ারোস্তমির এই ভাষার একটি গভীর সংযোগ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এই আন্দোলনগুলো প্রচলিত দলকেন্দ্রিক, আত্মস্বার্থে ভরপুর রাজনীতির চেহারা পাল্টে দিয়েছে। কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছাড়া, কোনো দলীয় পতাকা ছাড়া, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং ডিজিটাল ইমেজকে সম্বল করে কীভাবে রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব, তা এই আন্দোলনগুলি দেখিয়েছে।

হোসেন সাবজিয়ান নামে এক ব্যক্তি ইরানের তেহরান শহরে একটি ছাপাখানায় কাজ করতেন। তিনি ছিলেন সিনেমার অন্ধ ভক্ত, বিশেষ করে পরিচালক মহসেন মাখমালবাফের ভক্ত। ১৯৮৯ সালে একদিন বাসে আহানখাহ পরিবারের এক মহিলার সাথে তাঁর আলাপ হয়। কথার ফাঁকে তিনি নিজেকে মাখমালবাফ বলে পরিচয় দিয়ে ফেলেন। ওই পরিবার তাঁকে বিশ্বাস করে বাড়িতে নিয়ে যায়। সাবজিয়ান বলেন, আমি তোমাদের নিয়ে একটি ছবি বানাবো। তিনি বেশ কিছুদিন ওই বাড়িতে যাতায়াত করেন এবং ছবির প্রস্তুতির কথা বলেন। পরে তাঁর আচরণে সন্দেহ হলে পরিবারটি পুলিশকে জানায় এবং তিনি প্রতারণার দায়ে গ্রেপ্তার হন। ইরানি ছবি,আব্বাস কিয়ারোস্তমির 'ক্লোজ আপ'। 

ইরানি সিনেমা নিয়ে আলোচনার সময় একটি শব্দ প্রায়ই ফিরে আসে, তা হলো সেন্সরশিপ। ১৯৭৯ সালের আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামিক বিপ্লবের পর ইরানে চলচ্চিত্র নির্মাণের উপর যে বিধিনিষেধ আরোপিত হয়, তা ছিল অত্যন্ত কঠোর এবং বিস্তারিত। পর্দায় নারীর খোলা চুল দেখানো, নারী ও পুরুষের শারীরিক স্পর্শ, পাশ্চাত্য সঙ্গীতের ব্যবহার এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থার সরাসরি সমালোচনা নিষিদ্ধ করা হয়। এই পরিস্থিতিতে অনেকেই মনে করেছিলেন যে ইরানে স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণের পথ বন্ধ হয়ে গেল। অনেক পরিচালক দেশ ছেড়ে চলে যান। আব্বাস কিয়ারোস্তমি (১৯৪০ - ২০১৬) কিন্তু দেশে থেকে যান। তিনি বিপ্লবের আগে থেকেই ছবি বানাচ্ছিলেন এবং পরে এই নিষেধের মধ্যেই একটি নতুন 'চলচ্চিত্র ভাষা' তৈরি করেন। তাঁর ছবিতে কোনো স্লোগান নেই, কোনো সরাসরি প্রতিবাদ নেই, কিন্তু তাঁর নির্মিত প্রতিটি ফ্রেমই একটি রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করে।

সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়া এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যে জেন জি আন্দোলন দেখা গেছে, তার সাথে কিয়ারোস্তমির এই ভাষার একটি গভীর সংযোগ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এই আন্দোলনগুলো প্রচলিত দলকেন্দ্রিক, আত্মস্বার্থে ভরপুর রাজনীতির চেহারা পাল্টে দিয়েছে। কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছাড়া, কোনো দলীয় পতাকা ছাড়া, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং ডিজিটাল ইমেজকে সম্বল করে কীভাবে রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব, তা এই আন্দোলনগুলি দেখিয়েছে। তাই কিয়ারোস্তমির কয়েকটি ছবির ভেতর দিয়ে সেই নতুন ব্যাকরণ বোঝার সমীকরণ কিন্তু আজ আমাদের কাছে একটি ইতিহাসের সম্পদ।

রাজনীতি এখন ফর্মের মধ্যে লুকিয়ে থাকে - একথা বলা মানেই কিয়ারোস্তমির ছবির প্রসঙ্গ আসে।তাঁর ছবির ফর্মগুলোই অনন্য। তিনি বিশ্বাস করতেন, সরাসরি কিছু বললে তা দ্রুত নিষিদ্ধ হয়ে যায়, কিন্তু যদি দেখানোর ভঙ্গিটাই বদলে দেওয়া যায়, তাহলে সেন্সরশিপও তাকে ধরতে পারে না। তিনি প্রায়ই বলতেন, সেন্সরশিপকে ঘৃণা না করে তাকে সৃজনশীলতার অংশ বানিয়ে নিতে হয়। এর সবথেকে ভাল উদাহরণ ১৯৯০ সালেরই ছবি 'ক্লোজ আপ' যার কাহিনী টি প্রথমেই বলা হয়েছে। এটি একটি সত্য ঘটনা।  
কিয়ারোস্তমি এই ঘটনাটি পত্রিকায় পড়ে আদালতে যান এবং বিচারকের অনুমতি নিয়ে ছবিটি নির্মাণ করেন। ছবির বিশেষত্ব হলো, এখানে কোনো পেশাদার অভিনেতা নেই। সাবজিয়ান নিজেই নিজের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যে পরিবারটি প্রতারিত হয়েছিল তারাও নিজেদের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, এমনকি আসল বিচারকও আছেন। ছবিতে ডকুমেন্টারি এবং ফিকশনের সীমা ইচ্ছে করেই মুছে দেওয়া হয়।

এখানে প্রশ্ন ওঠে, একজন দরিদ্র মানুষ কেন নিজেকে 'বিশেষ অন্য' একজন বলে দাবি করবেন? আদালতে সাবজিয়ান বলেছিলেন, "আমি সিনেমাকে ভালোবাসি, তাই সম্মান পেতে চেয়েছিলাম।" এই একটি বাক্যের মধ্যে ইরানি সমাজের একটি গভীর সংকট ধরা পড়ে। তা হলো পরিচয়ের সংকট এবং শ্রেণীগত দূরত্ব। সিনেমা সেখানে শুধু বিনোদন নয়, এটি সম্মানের, উচ্চবিত্ত সমাজে প্রবেশের একটি মাধ্যম। সাবজিয়ান যে সম্মানটুকু চেয়েছিলেন, তা তাঁর নিজের সামাজিক অবস্থানে সম্ভব ছিল না। তাই তাকে অন্যের পরিচয় ধার করতে হয়েছিল। কিয়ারোস্তমি এখানে কাউকে বিচার করেন না। তাঁর ক্যামেরা দীর্ঘ সময় ধরে সাবজিয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাঁর চোখে জল, লজ্জা এবং ভালোবাসা একসাথে দেখা যায়। এই যে রায় না মানুষটির পক্ষে পাওয়া , এই যে মানুষটিকে তার সমস্ত দুর্বলতা সহ দেখার ধৈর্য, এটাই কিয়ারোস্তমির রাজনৈতিক অবস্থান। তিনি দর্শককে কোনো সিদ্ধান্ত দেন না, তিনি শুধু দেখার সুযোগ করে দেন।

এই পদ্ধতির সাথে জেন জি আন্দোলনের মিল রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে যে আন্দোলন শুরু হয়, তা শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের ডাকা আন্দোলন ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররা এর সূচনা করেন। কোনো একক নেতা ছিলেন না, কোনো লিখিত ইশতেহার ছিল না। আন্দোলনটি ধীরে ধীরে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। সরকারের দমন-পীড়ন, ইন্টারনেট বন্ধ এবং শত শত মানুষের মৃত্যুর পর ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

একইভাবে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নেপালে সরকার যখন দুর্নীতি এবং ভুয়া খবরের অজুহাতে ফেসবুক, ইউটিউব, ইন্সটাগ্রাম, এক্স সহ ২৬ টি সামাজিক মাধ্যম বন্ধ করে দেয়, তখন তরুণরা বিকল্প প্ল্যাটফর্ম ভাইবার এবং টিকটকের মাধ্যমে সংগঠিত হয়। তাদের মূল ক্ষোভ ছিল দুর্নীতি, স্বজনপোষণ এবং কর্মসংস্থানের অভাব নিয়ে। টিকটকে নেপালের রাজনৈতিক নেতার সন্তানদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা, যাকে 'nepo baby' বা 'nepo kid'  বলা হচ্ছিল, তা ভাইরাল হয়। সাধারণ মানুষের দারিদ্র্যের সাথে এই বৈষম্যের ছবি ক্ষোভকে বাড়িয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত ব্যাপক সংঘর্ষে ৭০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫  পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। Transparency International এর Corruption Perceptions Index এ নেপালের অবস্থান ১০৭, যা এই ক্ষোভের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেয়। এই ঘটনার ১৩ মাস আগেই বাংলাদেশের ঘটনা ঘটেছিল। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কাতেও অর্থনৈতিক সংকট, ১২ ঘণ্টার লোডশেডিং এবং ৫০ শতাংশের বেশি মুদ্রাস্ফীতির প্রেক্ষিতে একই ধরনের দলহীন, তরুণ-নির্ভর আন্দোলনে প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপক্ষে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

এই আন্দোলনগুলির কোনোটিই প্রচলিত অর্থে রাজনৈতিক দলের মতো আচরণ করেনি। তাদের কোনো সভাপতি ছিল না, কোনো নির্বাচনী প্রতীক ছিল না। তাদের ছিল একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি, যে এই ব্যবস্থা আর চলতে পারে না। কিয়ারোস্তমির ছবির মতোই, এখানেও বড় বক্তৃতার বদলে ব্যক্তিগত অপমান এবং বঞ্চনার গল্পই প্রধান হয়ে ওঠে।

চলন্ত গাড়ি এবং চলমান ফোন - ব্যক্তিগত পরিসরের রাজনীতি:

কিয়ারোস্তমির ছবিতে গাড়ি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এর কারণ রাজনৈতিক। বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে ঘরের ভেতরের দৃশ্য নির্মাণে অনেক বিধিনিষেধ ছিল। নারী ও পুরুষ কীভাবে এক ঘরে থাকবে, কী পোশাক পরবে, তার কঠোর নিয়ম ছিল। কিন্তু গাড়ির ভেতরটি তুলনামূলকভাবে একটি ব্যক্তিগত এবং চলমান পরিসর হিসেবে বিবেচিত হতো। সেখানে দুজন মানুষ অনেক বেশি স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে।

১৯৯৭ সালে কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল-এ পাম দ্যি অর বিজয়ী ছবি 'টেস্ট অফ চেরি' এই ধারণার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র জনাব বাদি মধ্যবয়স্ক ইরানি লোক। তিনি তেহরানের উপকন্ঠে গাড়ি চালিয়ে যে কোন একজন মানুষ খুঁজছেন যে তার একটি কাজ করে দিতে পারবে। বিনিময়ে তিনি তাকে অনেক অর্থ দেবেন। একসময় বোঝা যায় কাজটি হল তাকে সমাধিস্থ করা। তিনি সেই রাতেই আত্মহত্যা করবেন এবং মারা যাওয়ার পর তাকে সমাধিস্থ করার জন্যই কাউকে খুঁজছেন। ইতোমধ্যে এক পাহাড়ি বিরানভূমিতে তিনি নিজের কবর খুঁড়ে ফেলেছেন। তার মানে ঐ ব্যক্তির কাজ হবে কেবল ভোরে এসে তাকে মাটিচাপা দিয়ে যাওয়া। তিনি অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়ে এই কবরেই শুয়ে থাকবেন। একসময় মারা যাবেন। আর ভোরে এসে তাকে ঐ ব্যক্তি মাটিচাপা দিয়ে যাবে। কবরের পাশে কথামতো অর্থকড়ি-সহ তার গাড়ি থাকবে। মাটি চাপা দেয়ার পর ওই ব্যক্তি গাড়ি নিয়ে চলে যাবে। তিনি আত্মহত্যা করতে চান এবং এমন একজনকে খুঁজছেন যিনি তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে কবর দেবেন। ইরানে আত্মহত্যা নিয়ে ছবি নির্মাণ করা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় ছিল, কারণ ইসলামি আইনে আত্মহত্যা মহাপাপ। কিন্তু কিয়ারোস্তমি আত্মহত্যার পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো বক্তব্য রাখেন না। তিনি বরং বাদির যাত্রা দেখান। পথে তিনি তিনজন মানুষকে গাড়িতে তোলেন। প্রথমজন কুর্দি সৈনিক, দ্বিতীয়জন আফগান মাদ্রাসার ছাত্র এবং তৃতীয়জন একজন বয়স্ক তুর্কি ব্যক্তি যিনি জাদুঘরে মৃত প্রাণী সংরক্ষণের কাজ করেন।

গাড়ি চলছে, বাইরে তেহরানের ধুলোমাখা নির্মাণক্ষেত্র, পাহাড়, শ্রমিকদের বসতি পেরিয়ে যাচ্ছে। আর ভেতরে জীবন ও মৃত্যু নিয়ে কথা হচ্ছে। দ্বিতীয় যাত্রী ধর্মের দোহাই দিয়ে আত্মহত্যা থেকে বিরত থাকতে বলেন। তৃতীয় যাত্রী  বাদিকে একটি গল্প বলেন। একবার তিনিও আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু ভোরবেলা একটি চেরি গাছের নিচে বসে একটি চেরির স্বাদ তাঁকে জীবনের দিকে ফিরিয়ে আনে। তিনি বলেন, একটি চেরির স্বাদের জন্যও বেঁচে থাকা যায়। কিয়ারোস্তমি এখানে কোনো ধর্মীয় উপদেশ দেন না। তিনি কেবল বলেন, জীবনের অতি ক্ষুদ্র অনুভূতিও বেঁচে থাকার কারণ হতে পারে। রাষ্ট্র যখন জীবনকে একটি বড় আদর্শের অংশ হিসেবে দেখতে চায়, তখন কিয়ারোস্তমি জীবনকে তার ক্ষুদ্র, ব্যক্তিগত অনুভূতিতে ফিরিয়ে আনেন। এটাই তাঁর নীরব প্রতিবাদ। ছবির শেষে তিনি ইচ্ছে করেই ফিল্মের সেট দেখিয়ে দেন, যাতে দর্শক বোঝে যে এটি একটি ছবি, বাস্তব নয়। বাস্তব এবং নির্মাণের এই খেলাই তাঁর রাজনীতির অংশ।

জেন জি আন্দোলনে গাড়ির জায়গা নিয়েছে স্মার্টফোন। যখন নেপালে সরকার সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করে দেয়, তখন তরুণরা ভিপিএন ব্যবহার করে বিকল্প প্ল্যাটফর্মে চলে যায়। ফোনের স্ক্রিনই তাদের চলন্ত গাড়ি হয়ে ওঠে। সেখানে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত পরিসর তৈরি করে। রাষ্ট্র যেখানে সংসদে বা টেলিভিশনে আলোচনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেখানে ফোনের ভেতরের এই ব্যক্তিগত পরিসরকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। বাংলাদেশের আন্দোলনে যেমন আবু সাঈদের দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকার ছবি, বা নেপালে নেতাদের সন্তানদের বিলাসবহুল জীবনের ছবি, এগুলি কোনো সংবাদমাধ্যমের তৈরি নয়। এগুলি ফোনে তোলা, দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ইমেজ। কিয়ারোস্তমি যেমন একটি চেরির স্বাদ দিয়ে জীবনের কথা বলেছিলেন, তেমনি আজকের আন্দোলন একটি ১৫ সেকেন্ডের ভিডিও বা একটি মিম্ দিয়ে গোটা দুর্নীতির কাঠামোকে প্রশ্ন করছে। ইমেজ এখানে আর শুধু বিনোদন নয়, শুধু পয়সা কামানোর জন্য যৌনতার পরইন্দ্রীয়পরায়ণ অচেতনতা নয়, কখন এটি একটি সমাজের রাজনৈতিক ভাষা হয়ে গিয়ে রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে স্পর্ধা রাখে - এ অস্ত্র সামলানো বড়ই কঠিন!

অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করা  - নারী এবং বেকার যুবক:

১৯৯৯ সালের ছবি ' দি উইন্ড উইল ক্যারি আস্' - এ কিয়ারোস্তমি অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করার কৌশলটি ব্যবহার করেন। তেহরান থেকে একদল শহুরে মানুষ, যারা নিজেদের ইঞ্জিনিয়ার বলে পরিচয় দেয়, তারা কুর্দিস্তানের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে আসে। তাদের উদ্দেশ্য হলো গ্রামের এক শতবর্ষী নারীর মৃত্যুর পর তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও শোকানুষ্ঠানের ভিডিও চিত্র ধারণ করা । পুরো ছবিতে সেই বৃদ্ধাকে একবারও দেখা যায় না। যা দেখা যায়, তা হলো গ্রামের নারীরা। তারা অন্ধকার রান্নাঘরে, দরজার আড়ালে কাজ করছেন, তাদের মুখ স্পষ্ট নয়। এটি সেন্সরশিপের নিয়ম মেনেই করা হয়েছিল। কিন্তু কিয়ারোস্তমি এই না-দেখানোটাকেই ভাষা বানিয়ে ফেলেন। তিনি বুঝিয়ে দেন, সমাজে নারীরা আছেন, তাদের শ্রম আছে, কণ্ঠস্বর আছে, কিন্তু তাদের দৃশ্যমান হতে দেওয়া হয় না। অনুপস্থিতির মধ্য দিয়েই উপস্থিতি বোঝানো হয়। অন্যদিকে, শহর থেকে আসা মানুষগুলোর হাতে মোবাইল ফোন, তখন ইরানে নতুন এসেছে। গ্রামে নেটওয়ার্ক নেই। তাই একজনকে বারবার পাহাড়ের চূড়ায় দৌড়ে যেতে হয় ফোন ধরার জন্য। এই দৃশ্যটি দুটি ইরানের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করে। একটি ইরান শহুরে, প্রযুক্তি-নির্ভর, যে সবকিছুকে, এমনকি মৃত্যুকেও একটি কনটেন্ট হিসেবে দেখতে চায়। আরেকটি ইরান গ্রামীণ, ধীর, যেখানে মৃত্যু জীবনেরই একটি স্বাভাবিক অংশ। কিয়ারোস্তমি কোনো পক্ষ নেন না, তিনি কেবল দুটি জগতকে পাশাপাশি রেখে দেন।


আজকের জেন জি আন্দোলনও এই অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করার আন্দোলন। পরিসংখ্যান বলছে, নেপালে দেশের অর্থনীতির এক-তৃতীয়াংশ আসে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স থেকে। দেশের ভেতরে তরুণদের জন্য কাজ নেই। বাংলাদেশেও একই চিত্র ছিল। শিক্ষিত বেকার যুবক, যারা কোনো দলের ক্যাডার নয়, তারা নিজেদের অদৃশ্য মনে করছিল। তাদের কথা সংসদে বলা হচ্ছিল না। তাই তারা নিজেদের দৃশ্যমান করার জন্য রাস্তা বেছে নেয়। তারা কোনো দলের হয়ে স্লোগান দেয় না, তারা বলে, আমাদের দেখো। আমাদের চাকরি নেই, আমাদের ভবিষ্যৎ নেই, অথচ নেতাদের পরিবারের বিলাসিতা দৃশ্যমান। এই বৈষম্যের ছবি তুলে ধরাই তাদের রাজনীতি। এখানেও কিয়ারোস্তমির মতোই, না-দেখা মানুষদের দেখানোর চেষ্টা চলছে।

এই প্রসঙ্গে কিয়ারোস্তমি একটি খাতা হারানোর গল্প এবং নৈতিকতার রাজনীতি বেছে নেন। ১৯৮৭ সালের ছবি 'হোয়ার ইজ দ্য ফ্রেন্ড'স হাউস' বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ছবির কেন্দ্রে দুই বন্ধু, আহমেদ এবং মোহাম্মদ রেজা নেমাতজাদা। আহমেদ ভুল করে নেমাতজাদার খাতা নিজের ব্যাগে নিয়ে এসেছে। শিক্ষক কড়া নির্দেশ দিয়েছেন, খাতা ছাড়া হোমওয়ার্ক না করলে নেমাতজাদাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হবে। আহমেদ সন্ধ্যাবেলা তার বন্ধুর বাড়ি খুঁজতে বের হয়। পাহাড়ি গ্রাম, আঁকাবাঁকা পথ, এক দরজা থেকে আরেক দরজা।
পথে আহমেদ ক্রমাগত বাধার সম্মুখীন হয়। প্রতিটি বড় মানুষ তাকে থামিয়ে দেয়, উপদেশ দেয়, কিন্তু কেউ তার আসল সমস্যাটি শুনতে চায় না। এক দাদু বলেন, টাকা নষ্ট করছিস। দোকানদার বলেন, এখন বাড়ি যাও। শিক্ষকের কর্তৃত্ব, দাদুর কর্তৃত্ব, দোকানদারের কর্তৃত্ব, সব মিলিয়ে একটি বৃহত্তর কর্তৃত্বপরায়ণ কাঠামোর প্রতিফলন তৈরি হয়।

এখানে খাতাটি একটি প্রতীক হয়ে ওঠে। এটি একটি নৈতিক দায়িত্বের প্রতীক। একটি শিশু তার বন্ধুর জন্য একটি সামান্য দায়িত্ব পালন করতে চাইছে, কিন্তু তার চারপাশের বড়দের পৃথিবী তাকে সেই দায়িত্ব পালন করতে দিচ্ছে না। কিয়ারোস্তমি এখানে কোনো বড় সংলাপ ব্যবহার করেন না। তিনি শুধু আহমেদের হাঁটার শব্দ এবং পাহাড়ি গ্রামের বাঁকা পথগুলোকে দেখান। আর এর মধ্য দিয়েই বোঝা যায়, একটি সরল নৈতিক কাজ কতটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে যখন চারপাশের ব্যবস্থা সহযোগিতা করে না।

এই গল্পটি আজকের আন্দোলনের সাথে মিলে যায়। জেন জি আন্দোলনের দাবিগুলি অনেকটা সেই খাতা ফেরত দেওয়ার মতোই ছোট এবং নৈতিক। তারা কোনো বড় আদর্শের কথা বলছে না। তারা বলছে, একটি স্বচ্ছ পরীক্ষা চাই, ট্যাক্সের টাকার হিসাব চাই, দুর্নীতি ছাড়া একটি চাকরি চাই। প্রাথমিক স্কুলগুলো ঠিকঠাক চাই। এই দাবিগুলি খুব সামান্য, কিন্তু এই সামান্য দাবিগুলোই যখন একটি বড়, দলকেন্দ্রিক, আত্মস্বার্থে ভরা কাঠামোর মুখোমুখি হয়, তখন তা রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। আহমেদ যেমন কোনো বিপ্লব করতে বের হয়নি, সে শুধু একটি খাতা ফেরত দিতে বেরিয়েছিল, তেমনি আজকের তরুণরাও কোনো ক্ষমতা দখল করতে বের হয়নি, তারা শুধু একটি হিসাব চাইতে বেরিয়েছে।

নিষেধ থেকে নির্মাণ:

কিয়ারোস্তমির ছবি এবং জেন জি আন্দোলন, দুটিই দেখায় যে রাজনীতি সবসময় দলীয় কার্যালয়ে তৈরি হয় না। কখনও কখনও রাজনীতি তৈরি হয় একটি গাড়ির ভেতর, একটি চেরি ফলের স্বাদে, একটি হারিয়ে যাওয়া খাতার খোঁজে, বা একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া সোশ্যাল মিডিয়ার বিকল্প খোঁজার মধ্যে।
যখন সরাসরি কথা বলা নিষিদ্ধ, তখন কীভাবে না বলে কথা বলতে হয়। তিনি সেন্সরশিপকে তাঁর ভাষা বানিয়ে ফেলেছিলেন। আজকের তরুণরা শেখাচ্ছে, যখন প্রচলিত রাজনীতি তাদের কথা শুনতে চায় না, তখন কীভাবে দল ছাড়া, নেতা ছাড়া, শুধু ইমেজ এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যাকরণ তৈরি করা যায়। এই ব্যাকরণে কোনো সেক্টরিয়ান স্লোগান নেই, আছে সমতলীয়, দৈনন্দিন জীবনের হিসাব চাওয়ার স্পষ্টতা।

সারা পৃথিবীতেই এই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ায়, ফিলিপাইনে, কেনিয়ায়, ফ্রান্সে, তরুণরা একইভাবে প্রচলিত রাজনীতির বাইরে গিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তাদের হাতে কোনো দলীয় ইশতেহার নেই, তাদের হাতে আছে ফোন এবং একটি নৈতিক প্রশ্ন। কিয়ারোস্তমির মতোই, তারাও বিশ্বাস করে, একটি মানুষকে ঠিকঠাক দেখাতে পারলে তার চারপাশের সমাজ আপনা থেকেই বোঝা যাবে। এই দেখার ধৈর্য এবং দেখানোর কৌশলই সম্ভবত পচা-ধ্বসা, দলকেন্দ্রিক রাজনীতির চেহারা পাল্টে যাচ্ছে যেন দক্ষিণ এশিয়া।

0 Comments

Post Comment