পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

বিবর্তন, ধর্ষণ, সংস্কার এবং এনকাউন্টার - একটি সামান্য আলোচনা

  • 14 July, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 309 view(s)
  • লিখেছেন : শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ
আইনজীবী, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এবং মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, এনকাউন্টার সংস্কৃতি একটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ এটি আইনের শাসনের পরিপন্থী। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের (তিনি অপরাধী হলেও) আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এনকাউন্টারের মাধ্যমে পুলিশ নিজেই একই সাথে তদন্তকারী, বিচারক এবং জল্লাদের ভূমিকা পালন করে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।

সবার আগে ভারতে ২০১৪ থেকে ঘটা ধর্ষণের পরিসংখ্যান দিই। মনে হয় আজকের সময় এটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়। বছর ধরে ধরেই দিচ্ছি তাই। জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর ‘ভারতে অপরাধ’ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ভারতে মোট ২,৬৬,৮২৫টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

 

২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বার্ষিক পরিসংখ্যানটি নিচে দেওয়া হলো:

  • ২০১৪: ৩৬,৭৩৫
  • ২০১৫: ৩৪,৬৫১
  • ২০১৬: ৩৮,৯৪৭
  • ২০১৭: ৩২,৫‌৫৯
  • ২০১৮: ৩৩,৩৫৬
  • ২০১৯: ৩২,০৩৩
  • ২০২০: ২৮,০৪৬
  • ২০২১: ৩১,৬৭৭
  • ২০২২: ৩১,৫১৬
  • ২০২৩: ২৯,৬৭০
  • ২০২৪: ২৯,৫৩৬
  • ২০২৫: ২০২৫ সালের সামগ্রিক দেশের চূড়ান্ত বার্ষিক ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর রিপোর্ট এখনও সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়নি। তবে আংশিক ও বিভিন্ন রাজ্যভিত্তিক পুলিশ সদর দপ্তরের প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, এই বছরও আনুমানিক ৩০,০০০-এর কাছাকাছি ধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।

যদি আমরা এসব ক্ষেত্রে এনকাউন্টারের, যাদের অধিকাংশকেই ফেক এনকাউন্টার বলছেন নানা মানবাধিকার সংস্থা, দেখতে যাই, তাহলে দেখব এই তালিকা প্রকাশ হয় না। কিন্তু এনকাউন্টারের সংস্কৃতি চলছেই। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশের কথা বলা চলে সবার আগে।

উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ এবং গুজরাটে মোট পুলিশ এনকাউন্টারের (অভিযুক্ত/অপরাধীর মৃত্যু) সংখ্যায় ব্যাপক ভিন্নতা রয়েছে, যার মধ্যে উত্তরপ্রদেশ শীর্ষে অবস্থান করছে। নিচে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং রাজ্য পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ অফিসিয়াল পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই রাজ্যের বিবরণ দেওয়া হলো:

  • মোট এনকাউন্টার অপারেশন: ২০১৭ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত উত্তরপ্রদেশ পুলিশ ১৭,০৪৩টিরও বেশি এনকাউন্টার অভিযান চালিয়েছে।
  • এনকাউন্টারে মৃত্যু: এই দীর্ঘ ৯ বছরের অভিযানে মোট ২৮৯ জন অভিযুক্ত বা অপরাধী পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে। 
  • আহত ও গ্রেফতার: অভিযানে ১১,৮৩৪ জন অপরাধী গুলিবিদ্ধ (মূলত পায়ে গুলি বা 'অপারেশন ল্যাংড়া'-র মাধ্যমে) হয়ে আহত হয়েছে এবং ৩৪,২৫৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তথ্যসূত্র হিন্দুস্তান টাইমস-এর ১৮ইমে, ২০২৬-এর রিপোর্ট।

ভারতে এনকাউন্টার কবে থেকে নথীভূক্ত হতে থাকে এবং তার উল্লেখযোগ্য মুহূর্তগুলোও আমাদের জানা দরকার।

ভারতে প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রথম নথিবদ্ধ পুলিশ এনকাউন্টার শুরু হয় ১৯৮২ সালের ১১ জানুয়ারি মুম্বই পুলিশ ডিটেকশন ইউনিটের দ্বারা। মুম্বাইয়ের ওয়াদালা এলাকায় কুখ্যাত গ্যাংস্টার মনোহর অর্জুন সুর্বে ওরফে 'মানিয়া সুর্বে'-কে মুম্বাই পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর ইসাক বাগওয়ান এবং রাজা তাম্বাট গুলি করে হত্যা করেন। এটিই ছিল ভারতের ইতিহাসে প্রথম অফিশিয়াল বা রেজিস্টার্ড "পুলিশ এনকাউন্টার"।

 

তবে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে এনকাউন্টারের ইতিহাস ও বিবর্তনকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:

  •  
    • ১৯৭০-এর দশক (নকশাল আন্দোলন): ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯৭১ সালে পশ্চিমবঙ্গ ও অন্ধ্রপ্রদেশে নকশাল আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে পরিচালিত যৌথ অভিযানের (যেমন: অপারেশন স্টিপলচেজ) সময় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বন্দুকযুদ্ধের সংস্কৃতি অনানুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। কলকাতার ময়দানে বা অন্যত্র ছেড়ে দিয়ে পালাতে বলে গুলি করাটা তখন জলভাত হয়ে যাচ্ছিল।
    • ১৯৮০-এর দশক (মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের উত্থান): ১৯৮0-এর দশকে দাউদ ইব্রাহিম, করিম লালা এবং অরুণ গাউলিদের মতো ডনদের গ্যাং ওয়ার ও তোলাবাজি রুখতে মুম্বাই পুলিশ প্রথম একটি বিশেষ "এনকাউন্টার স্কোয়াড" গঠন করে মুম্বই পুলিশ ডিটেকশন ইউনিট। এখান থেকেই প্রদীপ শর্মা, বিজয় সালাস্কর এবং দয়া নায়েকদের মতো কর্মকর্তাদের 'এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট' বা বন্দুকযুদ্ধ বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রচার শুরু হয়। 
    • ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশক (পাঞ্জাব ও কাশ্মীর অস্থিরতা): ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে পাঞ্জাবে খালিস্তানি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমনে পাঞ্জাব পুলিশ ব্যাপকভাবে এনকাউন্টার পদ্ধতি ব্যবহার করে, যা তৎকালীন সময়ে 'পাঞ্জাব সলিউশন' নামে পরিচিতি পেয়েছিল। কাশ্মীরেও জঙ্গিবাদ দমনে নিরাপত্তা বাহিনী এই পথ বেছে নেয় বলে অভিযোগ।

শুধুমাত্র এই কয়েক দশকের বিষয়ই নয়, তার আগেও নানা এনকাউন্টার ঘটেছে। চম্বলের ডাকাতদের বিরুদ্ধে (১৯৫০-৬০), তেলেঙ্গানায় নিজামের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে (১৯৪৫-৫১), উত্তর-পূর্ব ভারতের অস্থিরতায় (১৯৫০ থেকে শুরু), নকশালবাড়ির শুরুর সময়েও ঘটেছে এনকাউন্টার।

ভারতে পুলিশ এনকাউন্টার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তা এবং মানবাধিকার বা আইনি বিশেষজ্ঞদের মতামত সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। এই বিতর্কটি মূলত "তাত্ক্ষণিক ন্যায়বিচার" বনাম "আইনের শাসন"-এর দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।

পুলিশের দৃষ্টিভঙ্গি ও যুক্তি আছে এক্ষেত্রে। পুলিশ কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ এবং এনকাউন্টার পরিচালনাকারীদের মতে, বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে এনকাউন্টার এড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। আত্মরক্ষার জন্য পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক দাবি হলো, দাগী অপরাধী বা জঙ্গিরা যখন গ্রেফতার এড়াতে পুলিশের ওপর সরাসরি গুলি চালায় বা অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, তখন আত্মরক্ষার্থেই পুলিশকে পাল্টা গুলি চালাতে হয়।

 

এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়, আইনি ব্যবস্থার ধীরগতি ও ত্রুটি। ভারতের বিচার ব্যবস্থায় একটি মামলার চূড়ান্ত রায় আসতে বহু বছর, এমনকি দশক পার হয়ে যায়। সাক্ষীদের ভয় দেখানো বা প্রমাণের অভাবে অনেক সময় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। পুলিশের একাংশের মতে, এতে অপরাধীদের মনে আইনের ভয় থাকে না, যা এনকাউন্টারের মাধ্যমে তৈরি করা সম্ভব হয়।

 

আরেকটি বিষয় হলো, জনগণের চাপ ও প্রত্যাশা। বিশেষ করে নৃশংস গণধর্ষণ বা সন্ত্রাসী হামলার মতো ঘটনায় জনসাধারণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। মানুষ যখন রাস্তায় নেমে তাত্ক্ষণিক শাস্তির দাবি করে, তখন পুলিশের ওপর এক ধরনের পরোক্ষ রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি হয়।

এর বিরুদ্ধেও যুক্তি আছে। বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গি। আইনজীবী, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এবং মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, এনকাউন্টার সংস্কৃতি একটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ এটি আইনের শাসনের পরিপন্থী। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের (তিনি অপরাধী হলেও) আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এনকাউন্টারের মাধ্যমে পুলিশ নিজেই একই সাথে তদন্তকারী, বিচারক এবং জল্লাদের ভূমিকা পালন করে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।

 

দ্বিতীয়ত ভুয়ো এনকাউন্টার ও ক্ষমতার অপব্যবহার। মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, বেশিরভাগ এনকাউন্টারই আসলে "সাজানো" বা ভুয়ো। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, প্রতিপক্ষকে সরাতে বা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে পুলিশ অনেক সময় নিরীহ বা ছোটখাটো অপরাধীকে ধরে এনে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করে বন্দুকযুদ্ধের গল্প সাজায়।

 

আসল অপরাধ এবং অপরাধী আড়াল হওয়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধীকে জীবিত জেরা না করে এনকাউন্টারে মেরে ফেললে, সেই অপরাধের পেছনে থাকা বড় কোনো রাজনৈতিক মাথা বা মূল চক্রের তথ্য চিরতরে হারিয়ে যায়। এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে এবং এনকাউন্টার সংস্কৃতি রুখতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ২০১৪ সালে ১৬ দফা কঠোর নির্দেশিকা জারি করে। প্রতিটি এনকাউন্টারের পর বাধ্যতামূলকভাবে একটি স্বাধীন সংস্থা (যেমন সিআইডি বা অন্য থানার পুলিশ) দ্বারা তদন্ত করতে হবে। ঘটনার ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্ত হওয়া বাধ্যতামূলক। ঘটনার সাথে সাথেই নিহত ও আহতদের তথ্য মানবাধিকার কমিশনকে জানাতে হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মীদের কোনো বীরত্ব পুরস্কার বা পদোন্নতি দেওয়া যাবে না।

 

সংক্ষেপে, পুলিশ যেখানে এটিকে অপরাধ দমনের একটি "তাৎক্ষণিক ও কার্যকরী" হাতিয়ার মনে করে, সেখানে বিশেষজ্ঞরা একে বিচার ব্যবস্থার পঙ্গুত্ব এবং আইনের শাসনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেও যা আছে, তা এনকাউন্টার পরবর্তী ব্যবস্থা বিষয়ে নির্দেশ। কিন্তু এনকাউন্টারের পূর্ববর্তী সময় সংক্রান্ত নির্দেশ নেই এখানে। তাছাড়া স্বাধীন সংস্থা বলতে যাদের কথা ভাবা যায়, তারা নানা সময় আদালতের দ্বারাই তিরস্কৃত হয়েছে, রাজনৈতিক ও দলীয় নির্দেশ মেনে চলার জন্য। আমরা প্রতিনিয়ত দেখে চলেছি, নানা ধরণের তদন্ত কেমনভাবে প্রভাবিত হয় ক্ষমতাশালীদের দ্বারা। অতএব, এ আসলে বালির বাঁধও নয়, এমন এনকাউন্টার রুখতে।

 

পুলিশ এবং ক্ষমতাশালীদের সম্পর্ককে ছিন্ন করার জন্য, পুলিশ ও নানা তদন্তকারী সংস্থার স্বাধীনতার জন্য, প্রকাশ সিং বনাম ভারত সরকার মামলাটি (২০০৬) উল্লেখযোগ্য। মামলাটিতে ভারতের পুলিশ সংস্কারের ইতিহাসে সবচেয়ে যুগান্তকারী এবং ঐতিহাসিক জুডিশিয়াল রায় পাওয়া যায়। উত্তরপ্রদেশ ও আসামের প্রাক্তন পুলিশ মহানির্দেশক বা ডিজিপি প্রকাশ সিং ১৯৯৬ সালে পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ এক দশক পর, ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সুপ্রিম কোর্ট ভারতের সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের জন্য ৭টি বাধ্যতামূলক নির্দেশিকা জারি করে।

 

১. রাজ্য নিরাপত্তা কমিশন গঠন

  • উদ্দেশ্য: পুলিশ প্রশাসনের ওপর থেকে অন্যায্য রাজনৈতিক চাপ ও সরকারি হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ বন্ধ করা 
  • কাজ: এই কমিশন রাজ্যের পুলিশের কাজের মূল্যায়ন করবে এবং পুলিশ যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে তার জন্য নীতি নির্ধারণ করবে। 

২. রাজ্য পুলিশ প্রধানের নির্দিষ্ট কার্যকাল

  • উদ্দেশ্য: রাজনৈতিক কারণে যখন-তখন সৎ ও যোগ্য পুলিশ প্রধানদের বদলি বা বরখাস্ত করার প্রবণতা রোখা।
  • কাজ: ইউপিএসসি-র প্যানেল থেকে তিনজন প্রবীণ কর্মকর্তার মধ্যে একজনকে ডিজিপি নির্বাচিত করতে হবে এবং তাঁর কার্যকাল অবসরের তারিখ নির্বিশেষে কমপক্ষে ২ বছর নিশ্চিত করতে হবে।

৩. অন্যান্য মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট কার্যকাল

  • উদ্দেশ্য: পুলিশ সুপার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা অন্যান্য অপারেশনাল দায়িত্বে থাকা অফিসারদের কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা।
  • কাজ: রাজনৈতিক চাপের মুখে যেন কোনো সৎ অফিসারকে মাঝপথে সরিয়ে দেওয়া না হয়, তাই তাঁদের জন্যও ন্যূনতম ২ বছরের নির্দিষ্ট কাজের মেয়াদ নিশ্চিত করতে হবে।

৪. তদন্ত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বিভাগ পৃথকীকরণ

  • উদ্দেশ্য: অপরাধের তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, গতিশীল এবং বৈজ্ঞানিক করে তোলা।
  • কাজ: প্রাথমিকভাবে ১০ লাখ বা তার বেশি জনসংখ্যা বিশিষ্ট শহরগুলোতে 'অপরাধ তদন্ত' এবং 'আইনশৃঙ্খলা রক্ষা' -র জন্য পুলিশের দুটি সম্পূর্ণ আলাদা শাখা তৈরি করতে হবে।

۵. পুলিশ এস্টাবলিশমেন্ট বোর্ড গঠন

  • উদ্দেশ্য: পুলিশের পদোন্নতি এবং বদলি প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং স্বচ্ছ করা।
  • কাজ: ডিএসপি বা তার নিচের পদের অফিসারদের বদলি, পদোন্নতি এবং অন্যান্য চাকরি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এই বিভাগীয় বোর্ড নেবে, কোনো রাজনৈতিক নেতা বা মন্ত্রী নয়।

৬. পুলিশ অভিযোগ কর্তৃপক্ষ গঠন

  • উদ্দেশ্য: ক্ষমতার অপব্যবহারকারী এবং দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের সাধারণ মানুষের কাছে জবাবদিহি করানো।
  • কাজ: রাজ্য এবং জেলা স্তরে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে, যা পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু, গুরুতর নির্যাতন বা ধর্ষণের মতো বড় অপরাধের অভিযোগের সত্যতা তদন্ত করবে।

৭. জাতীয় নিরাপত্তা কমিশন গঠন

  • উদ্দেশ্য: কেন্দ্রীয় স্তরের পুলিশ বা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রধান নিয়োগে স্বচ্ছতা আনা।
  • কাজ: সিবিআই, সিআরপিএফ, বিএসএফ-এর মতো কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান বাছাই ও প্যানেল তৈরির জন্য কেন্দ্রীয় স্তরে একটি নির্দিষ্ট কমিশন থাকবে।

কী হলো এ সংস্কারের? সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশিকা জারির পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও, ভারতের অধিকাংশ রাজ্য সরকারই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়ে এই সুপারিশগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করেনি। বেশ কিছু রাজ্য নিজস্ব ছদ্ম-আইন তৈরি করে সুপ্রিম কোর্টের মূল নির্দেশনাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, যা নিয়ে এখনও শীর্ষ আদালতে আইনি লড়াই চলছে।

প্রকাশ সিং মামলার (২০০৬) ৭টি নির্দেশিকার বিপরীতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বাস্তবায়ন এবং বর্তমান কার্যকারিতা আংশিক ও মিশ্র প্রকৃতির রাজ্য সরকার আদালতের নির্দেশ মেনে কিছু ক্ষেত্রে আইন ও প্যানেল তৈরি করলেও, মানবাধিকার সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই সুপারিশগুলো প্রকৃত অর্থে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান কার্যকরী অবস্থান জানানো দরকার। নীচে তালিকা দিচ্ছি।

 

১. পুলিশ অভিযোগ কর্তৃপক্ষ - সচল কিন্তু বিতর্কিত

  • বর্তমান স্থিতি: তৃণমূলের রাজ্য সরকার রাজ্য স্তরের পুলিশ অভিযোগ কর্তৃপক্ষ পুনর্গঠন করেছে। এটি বর্তমানে বাংলার লোকায়ুক্ত এবং অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীম কুমার রায়ের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। এর অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন স্বরাষ্ট্র সচিব এবং রাজ্য পুলিশ প্রধান। কিন্তু সেখানে জড়িতদের অনেকেই এখন নতুন সরকারের নজরাধীন নানা কারণে। স্বরাষ্ট্র সচিবও পাল্টে গেছেন।
  • কার্যকারিতা: এই কর্তৃপক্ষ পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু, গুরুতর নির্যাতন বা ধর্ষণের মতো গুরুতর পুলিশি অসদাচরণের অভিযোগ তদন্ত করতে পারে। তবে মানবাধিকার কর্মীদের সমালোচনা হলো, যে বোর্ডের সদস্য স্বয়ং ডিজিপি এবং স্বরাষ্ট্র সচিব, সেখানে সাধারণ মানুষ পুলিশের বিরুদ্ধে কতটা নিরপেক্ষ বিচার পাবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

২. রাজ্য নিরাপত্তা কমিশন - কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ

  • বর্তমান স্থিতি: সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য নিরাপত্তা কমিশন গঠন করা হয়েছে।
  • বাস্তব চিত্র: নিয়ম অনুযায়ী এই কমিশনে বিরোধী দলনেতা এবং নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের থাকার কথা, যাতে পুলিশকে রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত রাখা যায়। কিন্তু বাস্তবে এই কমিশনের নিয়মিত বৈঠক হয় না বললেই চলে এবং পুলিশের পোস্টিং বা বদলির ওপর রাজ্য সরকারের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণই বজায় রয়েছে।

৩. পুলিশ প্রধান এবং মাঠপর্যায়ের অফিসারদের নির্দিষ্ট কার্যকাল

  • ডিজিপি নিয়োগ: সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ছিল ইউপিএসসি-র প্যানেল থেকে রাজ্যকে ডিজিপি বেছে নিতে হবে এবং তাঁকে ২ বছরের নির্দিষ্ট মেয়াদ দিতে হবে। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকার অনেক সময় ইউপিএসসি-র দীর্ঘ প্যানেল প্রক্রিয়া এড়িয়ে 'ভারপ্রাপ্ত' বা 'অস্থায়ী' ডিজিপি নিয়োগ করে নিজেদের পছন্দমতো অফিসারদের পদে বসিয়েছে, যা নিয়ে আদালতে একাধিকবার বিতর্ক হয়েছে।
  • মাঠপর্যায়ের অফিসার (এসপি/এসএইচও): আইনত ২ বছরের মেয়াদের কথা বলা হলেও, রাজনৈতিক প্রশাসনিক প্রয়োজনে বা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটলে অফিসারদের মাঝপথেই ঘনঘন বদলি করা হয়।

৪. তদন্ত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বিভাগ পৃথকীকরণ

  • বর্তমান স্থিতি: কলকাতা, শিলিগুড়ি, আসানসোল বা ব্যারাকপুরের মতো বড় বড় পুলিশ কমিশনারেট এবং জেলা সদর দপ্তরগুলোতে 'ডিটেক্টিভ ডিপার্টমেন্ট' বা 'ক্রাইম ব্রাঞ্চ' আলাদা করা হয়েছে, যা অপরাধের তদন্ত করে।
  • ত্রুটি: তবে স্থানীয় থানা স্তরে এখনও জনবলের অভাবের কারণে একই পুলিশ কর্মীকে ভিআইপি ডিউটি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং মামলার তদন্ত—সব কাজই একসাথে করতে হয়। এর ফলে তদন্তের মান ব্যাহত হয়।

৫. পুলিশ এস্টাবলিশমেন্ট বোর্ড

  • বর্তমান স্থিতি: রাজ্যে পুলিশের বদলি ও পদোন্নতির জন্য পুলিশ এস্টাবলিশমেন্ট বোর্ড গঠিত হয়েছে। তবে নিচু তলার অফিসারদের বদলি এই বোর্ড কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করলেও, গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের (যা মুখ্যমন্ত্রীর অধীনে) পরোক্ষ সবুজ সংকেত বাধ্যতামূলক থাকে।

সহজ কথায়, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা পুরোপুরি অমান্য করেনি, কিন্তু নিজস্ব আইন (যেমন: পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ আইন) এবং প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে এমনভাবে এগুলো কার্যকর করেছে যাতে পুলিশের ওপর রাজ্য সরকারের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া না হয়। ফলে এটি "আংশিক বাস্তবায়িত" বা প্রধানত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। নতুন সরকার এখনো অবধি এসব পাল্টাতে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন বলে জানা নেই।

 

প্রশ্নটা হচ্ছে এই যে ধর্ষণ এবং পুলিশ সংস্কারের মধ্যে সম্পর্ক কী? আদৌ আছে? সে প্রশ্নের বিচারের আগে আমরা সামাজিক কিছু প্রশ্নের দিকে তাকাবো। আজকে বিজ্ঞান বলছে, আমাদের মধ্যে বহু বিবর্তনের এবং বহু প্রাণের থেকে আসা যে স্বার্থপর জিনেরা আছে, তারাই আমাদের পরার্থপরতাও শিখিয়েছে। আমরা আমাদের স্পিসিস হিসেবে ২৫ লক্ষ বছরের বিবর্তনের ৯৯% কাল শিকারী-সংগ্রাহক রূপে কাটিয়েছি। এই সময় বিভিন্ন গোত্র হয়ে যুদ্ধ করেছি ৯০ ভাগ সময়। ১৫ থেকে ৬০ ভাগ সময়, যুদ্ধে মারা যাবার মতো ঘটনা ঘটতো। স্যামুয়েল বাওয়েলস দেখিয়েছেন (Did Warfare Among Ancestral Hunter-Gatherers Affect the Evolution of Human Social
Behaviors?, Science 5 June 2009: Vol. 324. no. 5932, pp. 1293 - 1298) যে গোত্রের মধ্যে যত বেশী সহযোগিতা, সহমর্মিতা থেকেছে, ততই তাদের টিকে থাকা বেড়েছে।

 

এখান থেকে আমাদের যৌনতার প্রশ্নটিকেও বিবেচনা করা চলে। ধরুন একদল শিম্পাঞ্জি কলোবাস বাঁদরদের দেখা পেল। দেখা পেলেই বাঁদরদের আক্রমণ করবে এমন নয়। হতে পারে, যদি দলে কোনো এমন নারী শিম্পাঞ্জি থাকে যার সঙ্গমের সময়ের ইঙ্গিত শরীরে স্পষ্ট, তাহলে বাঁদরদের আক্রমণ করা হতে পারে। কারণ বাঁদর মেরে যে পুরুষ মাংস এনে দেবে সে যৌনতার সঙ্গীরূপে প্রাধান্য পাবে। যে বেশী মাংস দেয় অকৃপণভাবে সে বেশী প্রাধান্য পায়। এমনটা তাঞ্জানিয়ার হোমো স্যাপিয়েন্স হাডজা শিকারি-সংগ্রাহকদের জন্যও সত্যি। দক্ষ শিকারীরা বহু নারীর সঙ্গলাভ করতে পারে। কিন্তু ধর্ষণ কি আমাদের এমন বিবর্তনের স্বাভাবিক পথ?

 

"এ ন্যাচারাল হিস্ট্রি অফ রেপ" র‍্যান্ডি থর্নহিল এবং ক্রেইগ টি. পামার-এর লেখা, বিতর্কিত কাজ। থর্নহিল বলেছিলেন পুরুষের মনস্তত্ত্বে বিশেষ কার্যকৌশল কাজ করছে অনিচ্ছুক নারীকে জন্মদানের সহযোগী করার জন্য। তাই ধর্ষণ। ক্রেগ বলেছিলেন, অন্যদিকে ধর্ষণ আসলে পুরুষদের যৌনবৈচিত্র্যের জন্য একটি পন্থা, যা সহজে ধর্ষণ করে পরিপূর্ণ করা যায়, যখন তার কোনো শাস্তিমূলক পরিণতির ভীতি না থাকে। তীব্র বিতর্ক জন্মেছিল। তাঁরা নিজেদের সমর্থনে এনেছিলেন বিবর্তনের কথা।

 

অনেকেই বিরোধ করেছিলেন। তার মধ্যে ছিলেন জেরি কয়নে, বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী। তিনি দেখিয়েছিলেন প্রজননের জন্য ধর্ষণ দেখাতে গিয়ে প্রাথমিক সংখ্যাতত্ত্বের বিকৃতি ঘটিয়েছেন এঁরা। যুদ্ধে, দাঙ্গায় যেমন ধর্ষণ নৈমিত্তিক ঘটনা, তেমন চুরি, লুট এবং সম্পত্তির ক্ষতিও। কিন্তু ওগুলোর জন্য কেউ বিবর্তনের কথা বলে না। তাহলে ধর্ষণের জন্য বিবর্তনের কথা কেন? অজস্র জননক্ষমতায় না পৌঁছোনো নারী থেকে সে ক্ষমতা পার হয়ে যাওয়া নারীও ধর্ষিত হন। কিছু কিছু গবেষণায় দেখা গেছে এক-তৃতীয়াংশ ধর্ষণের শিকার নারীরা ১১ বছরের নীচে অথবা ৪৫-এর ঊর্ধ্বে প্রজনন-অক্ষম। ফলে ধর্ষণ বিবর্তনে প্রজননের জন্য গৃহীত কৌশল হতেই পারে না। যুদ্ধে বা দাঙ্গায় যেমন ধর্ষণ হয়েছে বা হয়, তা আদৌ প্রজননের জন্য নয়। এই সব ক্ষেত্রে ধর্ষণের সংখ্যা বিপুল। অগ্রাহ্য করার মতো সংখ্যাতত্ত্ব একেবারেই নয়।

 

কিম হিল, থর্নটনের একদা সহ-অধ্যাপক, প্যারাগুয়ের 'আছে' শিকারি-সংগ্রাহকদের মধ্যে গবেষণা করেছেন। তিনি একটি কাল্পনিক অবস্থা তৈরী করেছিলেন 'আছে' পুরুষদের জন্য, যাতে তারা তাদের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য 'ফিটনেস পয়েন্ট' (টিকে থাকার) পাবে বা পাবে না। উদাহরণস্বরূপ, ধর্ষণ করলে নারীর সঙ্গী অথবা তার আত্মীয়রা লোকটিকে হত্যা করতে পারে। তাতে টিকে থাকা হল না। ধর্ষিত মা যদি শিশুকে পালন করতে না চায়, কোনো প্রজননের জন্য ধর্ষণ টিকলো না। এমনকি ধর্ষক বলে চিহ্নিত হলে বাকীরা খাবার থেকে অন্য বিষয় তাকে বিন্দুমাত্র সাহায্য করবে না হতেই পারে। তাতেও তার ক্ষতি। এমন নানাভাবে তিনি দেখালেন যে আসলে এই প্রজননের জন্য ধর্ষণ বিবর্তনীয় ফলাফল, এই তত্ত্বটি বক্তিমের ফানুসমাত্র।

 

শুধু বিবর্তনীয় মনস্তত্ত্বই ধর্ষণ মনস্তত্ত্বের একমাত্র নিয়ন্ত্রক নয়। কারণ মানুষের কাজকর্ম তার ব্যক্তিগত পরিবেশ এবং সামাজিক প্রভাব দিয়েও তৈরী হয়।  হতে পারে বিবর্তন-জীববিজ্ঞানের মধ্যে এর সূত্র আছে, কিন্তু তাকেই সব বলে ধরা যায় না। যেখানে ধর্ষকের চেয়ে ধর্ষিতাকে সমাজ লজ্জাকর ভাবে, সেখানে ধর্ষণ বাড়বেই। তেমনই যেখানে নারীটির পরিবেশ ও প্রতিবেশে তার সমাজ তাকে সুরক্ষা দেয় না, তাতেও ধর্ষণ বাড়ে। কিন্তু যেখানে ধর্ষকের জন্য দোষারোপ ও শাস্তি বেশী থাকে সেখানে ধর্ষণ সম্ভাবনা কমে। কারণ সে টিকে থাকার যো খুঁজে পাবে না সেখানে। এইখানেই আমরা ব্যক্তিগত পরিবেশ ও সম্পত্তি এবং সমাজে নারীর অবস্থানকে চেপে ধরতে পারি অনুসন্ধানের ক্ষেত্ররূপে। আর এক্ষেত্রে ধর্ষণের সম্ভাবনার সবচেয়ে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকে পিতৃতান্ত্রিক, কতিপয়ের হাতে সম্পদ থাকা, ধর্মান্ধ জনসমাজ।

 

ধর্ষণ হলে এমন সমাজে প্রথমেই ধর্ষিতার দিকে আঙুল ওঠে। জামাকাপড়, চালচলন, দিনে না রাতে ঘোরাফেরা ইত্যাদি হাজার হাজার মন্তব্য করে জনসমাজ। নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে। এমন সব মতামত আসে যা বুঝিয়ে দেয়, নারীকে থাকতে হবে ঘেরাটোপের মধ্যে সারাক্ষণ। তারপরেও কিছু হলে সে তারই দায় হবে। এ হল পিতৃতান্ত্রিক ধর্মগুলোর দ্বারা শাসিত সমাজের রাষ্ট্রীয় সংস্করণ। এমনকি, যারা ধর্ষণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে, তাদেরও বড় অংশই সেই আওয়াজ তুলতে ধর্ষকের মা-বোন ইত্যাদি সম্পর্কে একইরকম ধর্ষণের ইচ্ছে প্রকাশ করে। তার চেহারা সমাজ ও সংস্কৃতির সবক্ষেত্রেই দেখতে পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক কালে 'ধুরন্ধর' বলে একটি সিনেমা সিরিজ খুবই ব্যবসা করেছে ভারতে। তার যে নায়ক, অত্যন্ত দেশপ্রেমী, সে নিজের বোনকে যারা অপহরণ করেছে, তাদের থেকে বোনকে সহিংসভাবে উদ্ধার করতে যায়। গিয়ে বলে, তার বোন কোথায়। বলার সময়, ভিলেনকে সম্বোধন করে এমনভাবে, যাতে বোঝায় ভিলেন তার মায়ের সঙ্গে সঙ্গমে অভ্যস্ত। বোনকে রক্ষা করার মহান বীরের কী নমুনা! এ কিন্তু আমাদের সমাজই তৈরী করেছে, বিভিন্ন ধর্মান্ধ সমাজ-ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। ফলত, আমাদের নানা বয়সের নারী, ভিন্ন লিঙ্গ, এমনকি ছোট ছোট বালকেরাও নিরাপদ নয় বহুযুগ। এবারে এমন নানাবিধ ধর্মান্ধ পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রে ধর্ষণের অভিযোগে এনকাউন্টারকে কেমন ভাবে দেখব আমরা, এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

 

আমার বা আপনার ব্যক্তিগত ক্ষোভ থাকতেই পারে পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে, থাকাটা উচিতও। তার ফলে আপনি মনে করছেন শাস্তিটা দারুণ হয়েছে। আপনি ব্যক্তিগতভাবে এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন, যেখানে যৌনহেনস্থা হয়েছে, কিন্তু কিছু করতে পারেননি, প্রতিপক্ষ ক্ষমতাশালী বলে। অথবা আমাদের ব্যবস্থা অত্যন্ত পিতৃতান্ত্রিক, দুর্নীতিপরায়ণ বলে। তাই আপনি মনে করছেন শাস্তিটা ঠিকই হয়েছে। আপনি শাসকের ভক্ত, তার থেকে সুবিধে পান, পাবার আশা রাখেন, নিদেন পক্ষে তার সাহায্যে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করবেন ভাবেন, তাই আপনার কাছেও শাস্তিটা ন্যায়সঙ্গত। আপনার কন্যাসন্তান আছে, আপনি নিজেই কন্যাসন্তান, যে কোনো ক্ষেত্রেই ভয়ে এবং দুর্ভাবনায় কাঁটা হয়ে থাকেন আজকাল। তাই এমন কড়া শাস্তি হলে আপনি মনে করছেন আর এমন ঘটনা ঘটবে না। এমন অজস্র কারণ আছে, যা আর লিখছি না। আগে এটা লিখি যে, আইনের শাসন আমাদের এমন চুলোয় গিয়েছে যে আমরা আইনের বাইরের শাসনকেই সঠিক বলে মনে করছি।

 

অথচ দেখুন, আইনের শাসন পাবার জন্যই তো আমরা ভোট দিই। যাঁরা আসেন সরকারে তাঁদের কাজ আইনকে বিনা দ্বিধায় দল-মত নির্বিশেষে রক্ষা করার মাধ্যমে, আপনাকে এবং আমাকে রক্ষা করা। আইন তাঁরাই প্রণয়নও করেন সে কাজের দরকারে। তাহলে আপনি কবে প্রশ্ন করবেন, আইনের শাসন কেন আমার-আপনার জন্য যথেষ্ট হচ্ছে না, কেন আমাদের (শুধু ধর্ষণই নয়) সব ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়াতে হচ্ছে, যেখানে তথাকথিত 'আইনের শাসন' 'ভরসার শাসন' থাকা সত্ত্বেও আমরা নানা অপরাধের শিকার হচ্ছি? সমস্যাটা কি আদৌ আপনাকে ভাবাচ্ছে? নাকি যাহোক একটা কিছু হয়ে গেলে, আপনার আপাত প্রতিশোধস্পৃহা মিটলেই আপনি খুশী?

 

এই যে সমাজগুলো, নানাভাবে নিত্য নারী, ভিন্ন লিঙ্গ, বালক ইত্যাদিদের এভাবে নীচুস্তরের বলে মনে করছে, ক্ষমতাসাম্যে আসতে চাইছে না, আসতে দিচ্ছে না, অন্যদিকে সম্পদশালীর দ্বারা ঘটিত অপরাধ নিয়ে ভয়ে কথাও বলছে না, যদি তার ফলে নিজেদের উপর আক্রমণ আসে, এই সমাজগুলোর সংশোধনের ব্যবস্থা কী? শুধু আইন? নাকি ধারাবাহিক আন্দোলন সংস্কারের? নিজেরা সংগঠিত হয়ে করলে, যার মাধ্যমে এগুলোর যথাযথ সংস্কার ঘটে। ভুলে যাবেন না, এখান থেকেই আমাদের আইনপ্রণয়নকারীরা নির্বাচিত হয়ে আসেন।

 

আর এনকাউন্টারে খুশী হলে, আপনার নিজের সর্বনাশ করছেন না তো? তথ্য-প্রমাণ ইত্যাদি ব্যতীত কোনো বিচারই অসম্ভব। যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে বিচার নির্দিষ্ট হয়। আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কেউ অপরাধী নয় - এমনটাই তথাকথিত আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তিমূল ছিল। তাহলে কী হচ্ছে যাতে এইটাই নড়ে যাচ্ছে?

একে একে প্রশ্ন করে দেখতে পারেন এক্ষেত্রে! লেখার শুরুতে যে কারণে ধর্ষণের পরিসংখ্যান, এনকাউন্টারের ইতিহাস, পুলিশ ও ক্ষমতার সম্পর্ক সংস্কারের নানা প্রচেষ্টা ও পরিণতি তুলে এনেছিলাম। কারণ শুধুমাত্র এনকাউন্টারের উল্লাসও যদি করেন, তাহলেও পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, এনকাউন্টারের ভয়ে ধর্ষণ কমছে না। তাও যা নথীভূক্ত হচ্ছে সরকারি ভাবে সেটুকু অংশ। যা নথীভূক্তই নয় কিংবা বিবাহের মধ্যে ধর্ষণ, যা স্বীকৃতই নয় এখানে ধর্ষণ বলে, সে সব ক্ষেত্রের কথা তো বলাই বাহুল্য।

 

তাই আগে প্রশ্ন করুন,  তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে যারা, তারা কি যথেষ্ট নিরপক্ষে? না সেবাদাস করে রাখা আছে? আদালতে তর্ক-বিতর্কে যেতে হলে যে উকিল ইত্যাদির জন্য অর্থ-সম্পদ লাগে, সেখানে যার কম সে প্রথমেই হেরে যাচ্ছে কি বেশীরভাগ ক্ষেত্রে? দামী উকিল, শুধু পয়সায় দামী নয়, যোগাযোগেও দামী। কোন আদালতের কোন কক্ষে বিচার হবে থেকে বিচারের নেপথ্যে কি হবে তা দামী উকিল আর তার খদ্দের কি নিয়ন্ত্রণ করছে? তাহলে তো ব্যবস্থাটায় কেউ কোনোদিন বিচার পাবে না। যেমন অনেকেই বিনাবিচারে বন্দী হাজারো জেলে, কতকাল হয়ে গেল তাঁরা বোধহয় বলতেও পারবেন না। তার মানে ব্যবস্থায় বড় খুঁত আছে, তা আসছে সম্পদের অসাম্য থেকে, প্রতিষ্ঠানগুলোর পিতৃতান্ত্রিক বা ধর্মতান্ত্রিক মানসিকতা থেকেও। একে কি সংশোধন করতে ইচ্ছুক আপনি? নাকি হাল ছেড়ে দিয়েছেন?

হাল ছেড়ে দিলে একটা ঘোর সমস্যা কাজ করে। অনেক না লিখে তার দুটো কাল্পনিক উদাহরণ খাড়া করি। স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত ব্যক্তির সঙ্গে প্রতিবেশী একজনের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ আছে। তাঁরা দুটি দলে নাম লিখিয়েছেন নিজেদের রক্ষা করতে। কারণ আইন-শাসন সবই বহুকাল আমাদের দেশে দলনির্ভর হয়ে আছে, যা ব্যবস্থার বিপুলতম ত্রুটি। আইন-আদালত অবধি এর হাত, এতোই লম্বা তা। এবারে তাঁদের একজনের দল ক্ষমতায় এলেন। অন্যজনের বাড়িতে রাতারাতি পুলিশি হানা পড়লো। অভিযোগ যা খুশী হতে পারে। চুরি থেকে ধর্ষণ যা খুশী। পুলিশ তুলে নিয়ে গেল, কদিন পরেই পালাতে গিয়ে এনকাউন্টারে ব্যক্তিটি মৃত। শত্রু মরেছে আপনি খুশী। কিন্তু একদিন আপনি পড়লেন একই বিপাকে। ক্ষমতা পাল্টানো হতে পারে কারণ। হতে পারে ক্ষমতা পাল্টায়নি। কিন্তু আপনারই দলের আপনার চেয়ে শক্তিশালী কেউ আপনার বিপক্ষে চলে গেছেন। অতএব আপনি খরচা।

আরেকটি ক্ষেত্রে ধরুন, দরিদ্র কেউ একজন চুরি থেকে ধর্ষণে অভিযুক্ত হলেন। তিনি কাজটি করেছেন হয়তো সত্যিই। কিন্তু কাজটি করেছেন আরো ক'জনের নির্দেশে যারা দলীয় ক্ষমতা থেকে সম্পদের ক্ষমতায় শক্তিশালী। লোকজন ঘটনাটি নিয়ে ক্ষিপ্ত। অতএব ক্ষোভ কমাতে হবে। আবার যাদের নির্দেশে করেছে বা আর যারা জড়িয়ে তারা ক্ষমতাশালী বলে এর সবচেয়ে সহজ উপায় হল, সবচেয়ে দুর্বল যে ধরা পড়লো, যে সবার নাম জানতো, তাকেই উড়িয়ে দেওয়া। মরে গেলে কে আর কথা বলবে! অতএব বাকীরা নিশ্চিন্ত নিরাপদ। এখন এটি দরিদ্র-ধনী নির্বিশেষেই কারো ক্ষেত্রে ঘটে যেতে পারে। এমনকি আপনি, আজকে নিশ্চিন্ত বোধ করলেও, আপনাকেও একদিন এমন দুর্বল সারিতে ফেলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে, তখনো কেউ কেউ উল্লাস করবেন শাস্তি হলো বলে। আপনি তো খরচা হলেন, বাকীরা কিন্তু বেঁচে গেল। তারা আবারও করবে এসব। তবে এবারে আরো গুছিয়ে করবে, যাতে দুর্বল সুতোই আর না থাকে। কারণ তারা অপরাধে আরো পাকাপোক্ত হয়ে গেল।

এই যে আপনি নিজের খরচা হবার সম্ভাবনা তৈরী করছেন, এ যদি বুঝে ফেলেন তাহলে কিন্তু এতে এতো উল্লসিত হতে পারবেন না। কারণ রাষ্ট্রের যে আলাদা আলাদা বিভাগ করা হয়েছে সংবিধানে, যারা স্ব স্ব ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করবে এমন প্রতিশ্রুতি ছিল, সে এই কারণেই যাতে যে কেউ যেমন খুশী খরচা না হয়ে যান। অপরাধে যারা যুক্ত সবার সমান বিচার হয়। যারা ক্ষতিগ্রস্থ তারা যেন সঠিক বিচার পায়। কিন্তু সেটা তো আর হচ্ছে না, তাই না? আরো হবে না। কারণ আপনি ঘরের চাল থেকে জল পড়ছে বলে, চাল সারাবার ব্যবস্থা করেননি, বা খারাপ চাল সারানো লোকজনকে দায়ী করে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারেননি। শাসনকে বাধ্য করতে পারেননি আপনার ছাদ যে আপনার মানবাধিকার, এইটা মানতে। এই সব নানা কারণে আপনি এমন ক্ষিপ্ত যে শাসন যখন আদেশ দিলো, এবার থেকে বৃষ্টিই বন্ধ করে দিলাম, আপনি আনন্দে নাচলেন। তারপরে প্রবল খরায় না খেতে পেয়ে সপরিবারে টুক করে মরে গেলেন।

সংবিধানের আইনের এবং নৈতিকতার এবং উন্মুক্ত মানবাধিকার সম্পন্ন শাসন চান, না শাসনের যা ইচ্ছে তাই-ই আইন? তা নিয়ে আপনাকে জীবনযাপনের নানা কষ্ট-যন্ত্রণার মধ্যেও ভাবতে হবে, স্থির করতে হবে। তার জন্য দাবী তুলতে হবে। বারবার। কথা বলতে হবে, শুনতে হবে, আন্দোলন করতে হবে। কষ্টকর কাজ। দিন আনি দিন খাই করেও করতে হবে তবু। না হলে সংবিধান স্রেফ ক'টা কাগজ যাকে যে ইচ্ছে যখন ইচ্ছে পাল্টে দিতে পারে। অথবা আরো ক'টা কাগজ জুড়ে বা না জুড়েই খরচ-আইন দিয়ে চালিয়ে যাবে। কারণ সে জেনে গেছে, আপনি আর পেরে উঠছেন না, পারতে চাইছেন না, পারার প্রয়োজন নেই ইত্যাদি বলে দু-হাত তুলে দিয়েছেন। বলছেন 'যা থাকে কপালে'। অতএব আপনি শাসনের নির্বাচক নন, শাসন আপনাকে শাসিতের মধ্যে রাখবে কিনা নির্বাচন করছে।

গণতন্ত্র? তাকে তো নিয়মিত সজীব চিন্তা ও দাবীর মাধ্যমে সংশোধন এবং উন্নত করা বন্ধ হয়ে গেছে কবে। সবাই মিলে তাকে হত্যা করা হয়ে গেছে। এখন আপনি কী বলছেন, আর কী ভাবছেন, তা শুনতে থোড়ি বয়ে গেছে শাসকের। দাসশাসন এভাবেই চলে। যাদের হাত সবরকম অপরাধে রক্তাক্ত, তারাই দাবী করে শাসন এনেছে তারা। আর আপনি নির্বাক হতে হতে মুছে যেতে থাকেন ক্রমশ। কেউ আর মনেও রাখে না ক'জন গেল। কারণ নতুন পালা যা সেধে এনেছেন, তাতে একটাই নীতি, চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা। যদিও প্রাণ বাঁচানোর প্রবল বিলাসিতা মুষ্টিমেয় কয়েকজনের জন্য। আপনি সেই খাঁচার মুরগিগুলোর একটা, যে অন্য একটা মুর্গির গলা কাটা হতে দেখেও নির্বিঘ্নে খাবার খেতে থাকে।

এইসব চাইলে আরো বেশী করে জয়োল্লাস করুন, গালাগাল দিন বিরুদ্ধ ভাবনাকে। আর মুর্গি হোন। নইলে, এক ঝটকায় সমাধান নেই জেনে, ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করতে শুরু করুন। জেনে, বুঝে, ভেবে। অনেক প্রাচীনকালে চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত আইন ছিল। এখনো কোথাও কোথাও এসব আছে। তাতে সেখানে কোনো অপরাধ কমেছে কিনা সত্যিই জেনে নেবেন! কারণ এখানেও জল আছে। ঘেমেনেয়ে যে তথ্য-পরিসংখ্যান জোগাড় করলেন, তাতে শাসন জল মিশিয়েছে কিনা জানেন তো নিশ্চিত? ছেড়ে দিন, ভারতের যে সব রাজ্যে এমন খরচা-আইন স্বাভাবিক হয়েছে, আইনের খাতায় যুক্ত না হয়েও, সেখানে কমে গেছে এসব অপরাধ? দেখছেন তো পরিসংখ্যানই বলছে কমেনি কিছুই।

 

পুলিশি তদন্তের নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। অনেক প্রাক্তন পুলিশ অফিসার এই প্রভাস মণ্ডলের এনকাউন্টার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অত রাত্রে কেন ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য যাওয়া হয়েছে? অফিসারের রিভলবার, কাঁধের সঙ্গে আটকানো থাকে, যাতে কেউ ছিনিয়ে নিতে না পারে, তাহলে ছিনিয়ে নিল কেমন করে? অতজন পুলিশের উপস্থিতিতে? রিভলবারের ছ'টা রাউন্ডের মধ্যে পাঁচটা লোড করা থাকে। প্রথমটা ফাঁকা থাকে। দুর্ঘটনায় যাতে চলে গিয়ে পুলিশের নিজের ক্ষতি না হয়। তার হিসেব কী? ভিডিওগ্রাফি হবার কথা পুনর্নির্মাণের? অন্ধকারে হয়েছে আদৌ? না হলে কেন হয়নি? এমন হাজারো প্রশ্ন তুলতে হবে। কারণ, শাসক-পুলিশ সম্পর্কে বহুসময় আসল অপরাধীরা আড়ালে পড়ে যায়। আজকে আপনি শাসককে প্রশ্ন থেকে রেহাই দিয়ে নায়ক বানাতে চাইলে, সেই একই শাসক একদিন আপনার বিরুদ্ধেই এমন সম্পূর্ণ আজগুবি পদ্ধতিতে বন্দুক তুলবে না তার কি মানে আছে?

 

যে কারোর উদ্যত বন্দুক আর আপনার মধ্যিখানে শুধু অনেক শতাব্দীর মানুষের, মানুষ সম্পর্কে যথাসম্ভব সহমর্মিতা থেকে শাসন, সুবিচার, আইন, তার যথাযথ প্রয়োগের ক্ষেত্রে চেষ্টা ইত্যাদি দাঁড়িয়ে আছে। তার খুঁত আছে প্রচুর। বিবর্তনের মধ্য দিয়েই তো চলছি আমরা সবাই। সে সব খুঁত সারাই করলে, সমাজগুলোর, ধর্মগুলোর অবস্থানকে সহমর্মিতার মাধ্যমে উন্নত করলে, সে এমন এক শক্তপোক্ত ঢাল হবে, যে অন্যায়ের বুলেট ছিটকে দেবে। গণতন্ত্রের অনেক খুঁত আছে, সে তো আমার-আপনারও আছে। একে নিখুঁত করার প্রাণপণ চেষ্টা কি আমরা করবো না, যেমন নিজেদের ক্ষেত্রে করি? নাকি আমার খুঁত আমার গর্ব বলে আমাকেই মুছে দেবার রাস্তা বানাবো? ব্যবস্থাটা কি সুবিধেজনক হবে তাতে?

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

0 Comments

Post Comment