পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ফর্ম ৭ সেই অদৃশ্য রাসায়নিক অস্ত্র যা ভোটার মারছে

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 203 view(s)
  • লিখেছেন : শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ
কংগ্রেস চুপ। তৃণমূলের শক্তিক্ষয় তারা চায়। তাহলে তারা ভাবছে তাদের সোনার দিন ফিরবে। বামেদের একাংশও তাই ভাবে। তথাপি এখন তারা কথা বলতে শুরু করেছে কিছুটা হলেও। ওদিকে তৃণমূল কিন্তু সবটা আসলেই বুঝে বা ভেবে উঠতে পারছে বলে মনে হয় না। আদালতে মামলা অনন্তকাল চলতে পারে। তখন কী হবে? সব হয়ে যাওয়ার পরে এই প্রক্রিয়াকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেও খুব কিছু লাভ হবে? ভারতের প্রজাতন্ত্র, তাঁর সংবিধানের তো তখন হাড় কঙ্কাল পড়ে থাকবে।

গত সোমবার, ১৯ তারিখ বিজেপি-র সদস্য তিনজন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার মনোজ আগরওয়ালের কাছে গেছিলো ফর্ম ৭, যার মাধ্যমে অন্য কোনো ভোটারের নাম বাদ দেবার জন্য আবেদন করা যায়, তা জমা দেবার সময়সীমা বাড়াতে। বিগত কয়েকদিন ধরে রাজ্যে এই ফর্ম ৭ জমা দেওয়া নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে উঠেছে। বিজেপি-র অভিযোগ রাজ্যের বহু জায়গায় তাদের এই ফর্ম জমা দিতে দেওয়া হচ্ছে না। কখনো তৃণমূল আটকাচ্ছে, কখনো রাজ্যের বিএলও থেকে এইআরঅও-রা। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে একেবারে যাঁর নাম বাদ দিতে অভিযোগ করা হচ্ছে তাঁর নাম, এপিক ইত্যাদি সমন্বিত ছাপা ফর্ম একেবারে জমা দিতে গিয়েছে তথাকথিত বিজেপি-র লোকজন। সর্বত্র অভিযোগ উঠছে যে এভাবে বিজেপি এখানে নাম কাটার ব্যবস্থা করছে, আর নির্বাচন কমিশন তাদের চাপে নতিস্বীকার করে তা করতে দিচ্ছে।

অন্য কথায় যাবার আগে ফর্ম ৭ নিয়ে কিছু কথা লেখা প্রয়োজন। এই যে ফর্ম ৭, যা দিয়ে প্রকাশ্যে বা গোপনে বিজেপি বিরোধী-ভোটার নিশ্চিহ্ন করছে, সেই ফর্ম ৭ কিন্তু এসেছিল সত্যিই নেহেরুর আমলে ১৯৬০ সালে। তখন কংগ্রেসের এমন দবদবা যে লোকসভায় বিরোধী দলনেতা বলেও কিছু ছিলো না। তার আগে কোনো ভোটারকে নিয়ে আপত্তির ক্ষেত্রে পদ্ধতি ছিল যে অভিযোগ জমা করলে ঘরে ঘরে শারীরিকভাবে গিয়ে দেখতে হবে, শুনতে হবে। এবং সবচেয়ে বড় কথা ফর্ম ৭ আসলে ছিলো না। সাধারণ অভিযোগ পত্র ছিল সেগুলো। ১৯৬০-এর পরে ফর্ম ৭ সরাসরি আসরে এলো। সেখানে মৃত, অযোগ্য, স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হত বিশেষ সংশোধনীতে। নতুন নাম যোগ করতে ফর্ম ৬ এবং স্থানান্তরিত হলে ফর্ম ৮ কাজ করতো।

আইন আসলে নিজে কিছু করে না। যার হাতে আইন প্রয়োগের ভার থাকে সে আইনকে দিয়ে কাজ করায়। এবং যখন কাজ করায় তখন আইনের অক্ষরগুলোকে গুরুত্ব দেবে না আইনের মর্মকে সে তার উপরেই নির্ভর করে। সেই সময় থেকেই কয়েকটা ত্রুটি থেকে গেছে যা আজকের সময় ভয়ঙ্কর বিষাক্ত রূপ ধারণ করেছে। ত্রুটিটার প্রথমটা হলো, প্রথমতো নির্বাচন কমিশনের কাজ ঝাড়াই-বাছাই করা। নাগরিকের কাজ এটি হওয়ার কথা নয়। গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে, নাগরিকের অংশগ্রহণের দোহাই দিয়ে, অন্যের নামে আপত্তি জানাবার অধিকারকে যদি ধরে নেওয়া যায় বেশ একটা ভালো কাজ বলে, তাহলে প্রশ্ন তোলার দরকার ছিল, যে পুলিশ যখন অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে না, তখন কেন জনগণ অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে পারবে না? ভারতীয় সংবিধানে এমন ধারণা স্পষ্ট করা নেই। কিন্তু আইনের মধ্যে কিছু প্যাঁচ আছে যাতে ভীষণ অপরাধের ক্ষেত্রে, যা বেলযোগ্য নয় এবং কগনিজেবল (যেমন খুন বা ডাকাতি ইত্যাদি) উপস্থিত কোনো নাগরিক অন্য নাগরিককে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ না করে গ্রেপ্তার করতে পারে এবং তাকে অবশ্যই দেরী না-করে পুলিশের হাতে তুলে দিতে হবে। অর্থাৎ ইচ্ছে হলেই এমন করা যাবে না। কেবল নির্দিষ্ট ক্ষেত্রেই করা যাবে। দ্বিতীয়ত, অপরাধের সাক্ষী হিসেবেই একমাত্র ব্যক্তি এই কাজ করতে পারবে। তার মানে সাক্ষ্য-প্রমাণের বিষয়টা এরমধ্যে আছে। কিন্তু ফর্ম ৭-এ যিনি আপত্তি করবেন তার সাক্ষ্য-প্রমাণ দেবার ব্যাপার আছে কি?

নেই। তখনো ছিলো না। আর আজ যখন এই ব্যবস্থাকেই ধারালো করে তুলে বিজেপি এর প্রয়োগ ঘটাচ্ছে ভারতের সর্বত্র তখনও এই ব্যবস্থা কিন্তু রাখা হয়নি। তো এমন অভিযোগ গেলে কমিশন কী করবে? নিজে এসে তদন্ত করবে না, নাগরিককে ডেকে পাঠাবে শুনানীতে তার স্বপক্ষে নথি পেশ করতে। মানে অভিযোগকারীর থেকে দায়টা চলে যাচ্ছে অভিযুক্তের ঘাড়ে প্রমাণ দেবার যে তিনি ন্যায্য ভোটার ও নাগরিক। ঠিক ইউএপিএ জাতীয় অতি-আইনগুলোর ছাঁচে ব্যবস্থা, যেখানে অভিযোগকারীর দায় নেই, অভিযুক্তের সব দায়। অর্থাৎ আইনের মর্মবস্তুতে যে ভাবনাটা ছিল, অপরাধ প্রমাণিত না-হওয়া অবধি তুমি নির্দোষ এবং অভিযোগ প্রমাণের দায় অভিযোগকারীর সেইটা একেবারেই উল্টে গেছে।

সঙ্গে আরো বিষয় রয়েছে যা উল্লেখনীয়। কত ফর্ম ৭ জমা পড়ছে তার হিসেব দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু যে কমিশন নিযুক্তই হয়েছে শাসকদলের দুই নেতার দ্বারা আসলে, বিরোধী দলনেতা যেখানে কাঠপুতুল মাত্র এবং যে কমিশনের মাথাদের আইনের ঊর্ধ্বে করে দেওয়া হয়েছে আইন বদলে সেই কমিশন যে সত্যি হিসেব দিচ্ছে তা যাচাই করার উপায় কোথায়? তারা যা বলবে তা মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো পদ্ধতিই তো নেই। কমিশন যদি চাইতো, তাহলে স্বচ্ছ থাকার জন্য, কারা অভিযোগ করছে কাদের নামে ইত্যাদি সবটা সমেত প্রতিদিন নিজের সাইটেই তো আপলোড করতে পারতো।রাজ্যে, জেলায়, ব্লকে আধিকারিক এবং রাজনৈতিক দলের কর্মীরা ও সাধারণ মানুষ তা সাইট থেকে ডাউনলোড করে দেখে নিতে পারতো। কিন্তু এতো সহজ ও স্বচ্ছ সমাধান কমিশনের আদৌ উদ্দেশ্য নয়। এর সঙ্গে জরুরী আরেকটা বিষয়ও আছে। সামনাসামনি কত ফর্ম জমা হলো তার হিসেব নানা পথে বের হতে পারে, কিন্তু অনলাইনে কত জমা হচ্ছে কে জানবে? তার কোনো তালিকা স্বচ্ছতার জন্য নির্বাচন কমিশন তো তার সাইটে রাখছেও না যা আপডেট করলেই দেখা যায়।   

১৯৬০-এ যা ছিল আপাতনিরীহ বিষয়, তাকেই চূড়ান্ত অস্ত্র বানিয়ে নিয়েছে বিজেপি। কংগ্রেস যে এখন এসব নিয়ে কোনো কথা বলছে না, এক্কেবারে চুপ, একশো দিনের প্রকল্প নিয়ে আন্দোলনে মন দিয়েছে, তার কারণ এইটাই যে এসব নানান বদমাশির শুরু তারাই করেছিল শাসনে থেকে, নানা সময়ে। অতএব আজ কথা বললে তাদের দিকেই আগে আঙুল উঠবে। আর তারা তেমন রাজনৈতিক দল নয় যারা নিজেদের অতীতের ভুল স্বীকার করতে পারে।

আবার তারা নিজেদের গায়ে আঁচ এলে কথা বলে। যেমন কর্ণাটকের ২০২৩ বিধানসভা নির্বাচনে আলন্দের ক্ষেত্রে করেছিল। সেখানে ৬০০০-এরও বেশী ভোটারের নাম ঐ বিধানসভা ক্ষেত্র থেকে বাদ দেবার তোড়জোর করেছিল বিজেপি ফর্ম ৭-এর মাধ্যমে। কর্ণাটকে কংগ্রেস তখন সিআইডি-কে দিয়ে তদন্ত করায় এবং সিট বসায়। তারা অভিযোগ করে তদন্তে যে বিজেপি বিধায়ক সুভাষ গুট্টেদার আর তার ছেলে টাকা দিয়ে মিথ্যে অভিযোগ সব করিয়েছিল। পরে নির্বাচন কমিশন বলে সব অভিযোগের মধ্যে ২৪টা মাত্র সত্যি ছিলো, বাকী মিথ্যে। তার মানে নির্বাচন কমিশন জানে যে এমনটা করা যায় ও করা হয়েওছে। সেক্ষেত্রে সে যখন যা ইচ্ছে করে চলেছে, তাহলে ফর্ম ৭ জমা দিতে হলে স্বপক্ষে নথী দিতে হবে এমনটাও অন্তত যোগ করলো না কেন? ভোট চুরি ঠেকাতে তার সদিচ্ছা আসলে কতটা এতেই বোঝা যাচ্ছে না?

আসলে কমিশন বিজেপি-র নির্দেশে সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে সর্বত্র। এখানেও অজস্র বিএলও আছেন যাঁরা পথে নেমেছেন কমিশনের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে। আবার অনেকেই সব কিছু দেখে অসহায় বোধ করেও চুপ। কারণ এফআইআর করলে, কমিশনের বিধি অনুযায়ী তাঁদের চাকরীও চলে যেতে পারে বলে তাঁরা মনে করছেন। যদিও এখানে রাজ্যসরকার কিন্তু এফআইআর করেনি এখনো অবধি কমিশনের নির্দেশ মেনে। তার মানে তারা তাদের কর্মীদের উপর নামিয়ে আনা অত্যাচার ঠেকাতে লড়ছে। আর কমিশন আসলে ভোট চুরিকে প্রশ্রয় দিতে উদ্যত। নইলে একদল নাগরিককে টাকার জন্য হোক বা ক্ষমতা বা মতাদর্শের জন্য কেনো এমন অন্যায় খুলে আম করতে দিচ্ছে, শুনানী হবের দোহাই দিয়ে? কতজনের নামে, কে বা কারা, কোন প্রমাণে অভিযোগ করছে তাই যদি পরিস্কার না থাকে, তাহলে কাদের শুনানীতে না-ডেকেই নাম বাদ দিলো তা আমরা জানবো কেমন করে? কমিশনের কথায় বিশ্বাস করে তো আমরা চলতে পারি না। এক্ষেত্রে বিশ্বাসে মিলায়ে বস্তু, তর্কে বহুদূর না বলে, আমরা বরং তর্কই করব। একদিকে নাগরিকের অকারণ হেনস্থা হবে। অন্যদিকে কমিশনের কর্মী রূপে যারা এই অন্যায়কে প্রাথমিক তদন্তেই ধরে ফেলছে তাদের সিদ্ধান্তই শেষ কথা এমনটা কমিশন বলছে না। বলছে, শেষ কথা বলবে তাদের নিয়োজিত কেন্দ্র সরকারের কর্মী মাইক্রো অবসার্ভাররা। তারা বিজেপি-র দলদাস নয় ভাবার মতো শিশুসুলভ আমরা হবো কেন? এরপরেও আলাদা করে বলতে হবে কমিশন আসলে কার দাস? কাদের জন্য কাজ করছে?

কংগ্রেস চুপ। তৃণমূলের শক্তিক্ষয় তারা চায়। তাহলে তারা ভাবছে তাদের সোনার দিন ফিরবে। বামেদের একাংশও তাই ভাবে। তথাপি এখন তারা কথা বলতে শুরু করেছে কিছুটা হলেও। ওদিকে তৃণমূল কিন্তু সবটা আসলেই বুঝে বা ভেবে উঠতে পারছে বলে মনে হয় না। আদালতে মামলা অনন্তকাল চলতে পারে। বিহারের মামলাও চলছে। কিন্তু ভোট অবধি হয়ে গিয়েছে সেখানে। ক্ষমতায় তারাই এসেছে যারা এই খেলা খেলতে পারে। অতএব আদালতের ভরসায় থাকলে শুধু চলবে? রাস্তার আন্দোলনের পাশাপাশি, তারাও কর্ণাটকের রাস্তা তো নিতে পারে। যারা সরাসরি সশরীরে এই ফর্ম ৭ জমা করছে তাদের কাজ নিয়ে তদন্ত করাক। সত্যি না মিথ্যে অভিযোগ, অভিযোগের নেপথ্যে কী আছে, সে তো তারাও তাদের সরকারের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের মতো যাচাই করতেই পারে। দাবী তোলা হোক, যখন ফর্ম ৭ শুনানী হবে, তখন অভিযোগকারীকেও সশরীরে উপস্থিত হয়ে জানাতে হবে, কোন প্রমাণে সে অভিযোগ করেছে। তাহলেই কারা আছে বোঝা যাবে। আর চ্যালেঞ্জও করা যাব সার্বিক ভাবে।

না পারলে ঢের দুঃখ অপেক্ষা করে আছে। ফর্ম ৭-এর শুনানী তাড়াহুড়োয় হবে। নথি বিজেপির সাপ্লাই দেওয়া অবাঙালী ও ভিনরাজ্যের মাইক্রো অবসার্ভাররা না নিলে কার কী করার আছে! রাজ্যের আধিকারিকদের হাত বাঁধা। টার্গেট তো পরিস্কার। সংখ্যালঘু মুসলমান, নমশূদ্র মতুয়ারা, দলিতেরা যারা নিজেদের দলিত বলে এখনো এখানে ভাবতে শেখেননি, বিরোধী ভোটের অন্তর্গত মধ্যবিত্ত (তাতে যদি ওদের পক্ষের লোকও বাদ যায় কিছু আসে যায় না) এবং বিরাট সংখ্যক নারীরা বাদ যাবেন এসব পদ্ধতি মিলিয়ে। সেই জায়গায় জুড়বে অবাঙালী ভোটার, গোবলয়ের রাজ্য থেকে ফর্ম ৬-এর মাধ্যমে। অনুমান করা যাচ্ছে এই অবস্থা চলতে দিলে বিজেপি-র ঘোষণা মতোই প্রায় দেড় কোটি নাগরিককে ভোট ব্যবস্থা থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হবে।

বিজেপি গোহারা হারার অবস্থায় এখানে। অথচ ভোট শেষে দেখা যাবে তাদের আসন বেশ ভালোই রয়েছে এই করে। এমনও কিন্তু হতে পারে, তৃণমূলের আভ্যন্তরীণ কোন্দলে দল ভেঙে বিজেপি-তেই ভোট গেল। তারা দখল করলো পশ্চিমবঙ্গ। বিজেপি শাসক হিসেবে কাম্য তো নয়ই, প্রধান বিরোধী হিসেবেও কাম্য নয়। অতএব শুধু আত্মরক্ষা করার চেষ্টা না করে, তৃণমূলের এবং বাকী বিরোধীদের এখনই সর্বাত্মক আক্রমণাত্মক হবার সময়। দেরী হয়ে গেলে দেরীই হয়ে যাবে শুধু, আর কিছু হবে না। হাহুতাশেও কাজ হবে না আর।

 

0 Comments

Post Comment