পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

রূপকথার গল্প আজো তৈরী হয়

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 205 view(s)
  • লিখেছেন : মনীষা বন্দ্যোপাধ্যায়
এই অবরুদ্ধ সময়ে দিনে দিনে বহু মানুষ মেনে নিয়েছেন এর কোনো বিকল্প নেই। এই বিপর্যয় কোনোভাবেই ঠেকানো যাবে না। এই চূড়ান্ত হতাশা এবং নেতিবাচক সময়ের মধ্যে দীপকের মত সাধারণ মানুষই আলো নিয়ে আসেন। রূপকথার গল্প আজো তৈরী হয় তখন। একজন দীপক সহস্র দীপক জ্বালিয়ে দেন।

ঠিক এই সময়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এই যে দেশের উত্তরভাগের  স্থবির গোবলয়ে ফ্যাসিবাদী উগ্র সাম্প্রদায়িকতার উপর হঠাৎ জ্বলে উঠেছেন মহম্মদ দীপক' যার আলোয়  সব কেমন অন্যরকম দেখাচ্ছে।।  ঘৃণা, বিদ্বেষ, বুলডোজারে জর্জরিত ভারতের এই প্রান্তে হঠাৎ  যেন নফরত মুছে গিয়ে মোহাব্বতের দোকান খুলে গেছে যা নিয়ে সমাজ মাধ্যম তোলপাড়। অনেকের মতে বোধহয় হিন্দুত্ব জঙ্গিপনার শেষের শুরু হল গোবলয়ে। 

ঘটনা ঘটেছে অখ্যাত এক জনপদে যার নাম কোটদ্বার। উত্তরাখণ্ডের পাউরি গাড়ওয়াল জেলার এই পৌরনগরটির অন্যতম খ্যাতি সিদ্ধবালী মন্দিরের জন্য, যেখানে হাজার হাজার মানুষ হনুমানজীর দর্শনে আসেন। মহম্মদ দীপক হিসাবে যিনি পরিচয় দিয়েছেন সেই ব্যায়ামাগার বা আধুনিক জবানে জিমের মালিক দীপক কুমারের জিমেও দেওয়াল জুড়ে হনুমানজীর ছবি। এই এলাকা আপাদমস্তক বিজেপি শাসিত। মেয়র, বিধায়ক, সাংসদ সবাই বিজেপির। জনসংখ্যায় হিন্দু ৯০ ভাগ আর তার পরেই মুসলমান ৯ ভাগ। 

এহেন এলাকায় অদ্ভুতভাবে সাধারণতন্ত্র দিবসেই হনুমানজীর স্বঘোষিত ভক্তকুল অর্থাৎ বজরঙ্গ দলের সদস্যেরা সংবিধানকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন সংখ্যালঘু অর্থাৎ  ৯ শতাংশের এক প্রবীণ নাগরিককে উত্যক্ত করতে। তিন দশক ধরে বাজারে 'বাবা' স্কুল ড্রেসের দোকান চালাচ্ছেন ভকিল আহমেদ এবং সাথে তার ছেলে সোয়েব আহমেদ। এলাকার ছেলেমেয়েরা তাঁদের দোকানের পোশাক পরেই স্কুল পেরিয়েছে কিন্তু কিছুকাল থেকেই বজরঙ্গীদের ঘোর আপত্তি বাবা নামটিতে। মুসলমানের দোকানে বাবা নাম হবে কেন? 'বাবা' শব্দটি কবে থেকে বজরঙ্গীদের বাপের সম্পত্তি হয়েছে তা তারাই জানেন, মূলতঃ ফার্সী ভাষার এই শব্দটি জনক, সন্ত এবং আদরের শিশু সবার ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়। 

ভকিল আহমেদ পারকিনসন্স অসুখে আক্রান্ত। তাঁর হাত পা কাঁপে।  দীপক কুমার কাশ্যপ এবং তাঁর বন্ধু বিজয় রাওয়াত যখন দেখেন যে সত্তরোর্ধ্ব অসুস্থ ব্যক্তিকে একদল উত্যক্ত করছে, তাঁরা আপত্তি জানান। নিজেদের মহান কাজে এমন বাধা পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই বজরঙ্গিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং তুই কে জাতীয় বাক্য নিক্ষেপ করে। যে উত্তরটি উঠে আসে তার অভিঘাতে এখন আসমুদ্রহিমাচল আলোড়িত। জিম ইনস্ট্রাকটার দীপক কুমার চোখে চোখ রেখে বলেন 'আমার নাম মহম্মদ দীপক'।‌

যে দিনটিতে এ দেশের জনসাধারণ নিজেদের সংবিধান নিজেদের দিয়েছেন, সেই দিনটিতেই এক সাধারণ নাগরিক উদ্যত ফ্যাসিবাদী হিংসার সামনে সংবিধানের মূল কথাটি তুলে ধরলেন। এই দেশ যে মহামিলন ক্ষেত্র, কর্পোরেট পুষ্ট সাম্প্রদায়িক সঙ্গীদের জমিদারি নয়, শুধু এই কথার জন্যই যেন মানুষের মন আকুল হয়েছিল। নাহলে কেনই বা অঘোষিত হিন্দুরাষ্ট্রের মাটিতে মহম্মদ দীপকের পোস্ট পনেরো লক্ষ লাইক পায়। কেন জাতি ধর্ম নির্বিশেষে বডিবিল্ডার ও জিমট্রেনারদের সংগঠন দীপকের পাশে দাঁড়ালেন! ভিডিও অতিদ্রুত ছড়িয়ে যাওয়ার পর কিছু সাধু সন্তও তাকে আশীর্বাদ করেছেন। উত্তরাখণ্ডের মহিলা মঞ্চের অধ্যক্ষ কমলা পন্ত তাকে সমর্থন জানিয়েছেন এবং সরকারকে আবেদন করেছেন এভাবে মানুষকে উত্যক্ত করা যেন বন্ধ করা হয়। বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী দীপককে সাধুবাদ জানিয়ে তার কথা লেখায় আরো বেশি প্রচার হল। বিশিষ্ট গান্ধীবাদী সমাজকর্মী  লিখলেন 'আমার নাম মহম্মদ হিমাংশু সিংহ পিটার বৌদ্ধ'। 

ফ্যাসিবাদী হিন্দু রাষ্ট্র স্বাভাবিকভাবেই একটু বিচলিত। যাদের ঘোষিত প্রকল্প মুসলমান নিগ্রহ, তারা তো এমন ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। অবশ্য প্রশাসন নিজের কাজ করেছে। বজরঙ্গীদের বদলে দীপক এবং বিজয়ের বিরুদ্ধে শান্তি ভঙ্গের অভিযোগে দায়ের করা এবং আই আর নিয়েছে। এর দুদিন পর শদেড়েক জঙ্গী যখন দীপকের বাড়ি ঘেরাও করে, তখন বার বার ডাকা সত্বেও পুলিশ সময়মত পৌঁছায়নি। কিন্তু অতলে তলিয়ে  থাকা গোদী মিডিয়ার বহু আগে পৌঁছে গেছেন স্বাধীন সাংবাদিক, ইউ টিউবার ইত্যাদি মাধ্যম। আয়ুষ চতুর্বেদীর মত তরুণের নেতৃত্বে পৌঁছেছেন দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তাঁকে সংবর্ধনা দিতে প্রস্তুত।‌ ঝাড়খন্ডের মন্ত্রী তাঁকে পুরস্কৃত করবেন। কিন্তু দীপক বলেছেন এই টাকা দেওয়া হোক অঙ্কিতা ভান্ডারীর মত ঘটনায় নিপীড়িত মানুষদের।‌

কী এমন করলেন দীপক? এইটা বোঝার আগে উত্তরাখণ্ডের পরিস্থিতি দেখতে হবে। এই সেদিন দেওরা পাবলিক স্কুলে ফিল্মের গান বাজছিল "তেরি হ্যায় জমিন তেরা আসমান, তু বড়া মেহেরবান।" গানটির একটি লাইন ছিল "খুদা মেরে তু বখশিস কর্।"   ব্যাস আর যায় কোথায়? বজরঙ্গিরা স্কুলে ঢুকে হাঙ্গামা শুরু করলো।  শিক্ষক বোঝাতে চাইলেন রাম রহিম এক। তারা বললে রহিম শুনিনি। সে কে? শিক্ষক কবীরের কথা বললেন, উত্তরভারতের বিখ্যাত সন্ত,  কিন্তু তারা বললো কে কবীর জানি না। ইস্কুলে মুসলিম গান চলবে না। ধর্মান্তকরণ চলবেন না। উল্লেখ্য যে উত্তরাখণ্ডের ধর্মান্তকরণ বিরোধী আইনের প্রয়োগে বহু নবদম্পতির জেল হয়েছে।‌ সেইখানে দীপক হলেন 'মহম্মদ দীপক' !

দীপকের অব্যাহত বিপুল জনসমর্থনের মরীয়া হয়ে হিন্দুত্ব নেতা লখপত সিং ভান্ডারী তাকে বোঝাতে যাবেন বলছেন। তাঁর মতে দীপক ভুল বুঝছেন, তাঁকে ভুল বোঝানো হয়েছে, ইদানিং তিনি কার সাথে মেলামেশা করছেন জানা দরকার ইত্যাদি। কিন্তু মনে হচ্ছে কোথায় যেন বাঁধ ভাঙছে। মানুষ ভয় মুক্ত হচ্ছেন। এই সেই উত্তরাখণ্ড যেখানে মঙ্গোলীয় চেহারা হওয়ার কারণে একটি ছেলেকে পিটিয়ে মারা হয়েছে এই সেদিন। যেন সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করলেন দীপক মহম্মদ তার সবটুকু মোহাব্বত দিয়ে। 

দীপকের নিজের কথা খুব স্পষ্ট। আমি থাকি বা না থাকি , মানবতা বেঁচে থাকবে। কম বয়সে পিতৃহারা দীপককে বড় করেছেন তার মা। সাথে আছেন স্ত্রী এবং ছোট মেয়ে। উদ্যত হিংসার কারণে তিনি যথেষ্ট চিন্তিত কিন্তু তিনি মনে করেন যে ভয় পায় তার হৃদয়ে শক্তি নেই। 'বাবা' দোকানের মালিক পক্ষও বলেছেন তারা দোকানের নাম বদলাবেন না। তাদের পাশে এখন অনেক মানুষ আছেন।‌

দীপকের মত আশ্চর্য মানুষেরাই কোনো প্রচার, কোনো প্রশংসা কোনো পুরস্কারের তোয়াক্কা না করে যাবতীয় উৎপীড়ন ও সম্ভাব্য লাঞ্ছনার মধ্যে নিজের আদর্শকে তুলে ধরেন। ঠিক যেমন আমরা দেখেছি আটাত্তর বছর বয়সী আই আই টির প্রাক্তন অধ্যাপক পদার্থবিদ বিপিন ত্রিপাঠীকে যিনি পথে পথে সম্প্রীতি ও মানবতার লিফলেট বিলিয়ে চলেন। যেখানেই মানুষ আক্রান্ত সেখানেই ছুটে যান, পাশে দাঁড়ান। যে মূল্যবোধে তিনি বিশ্বাস রাখেন তাই নিয়ে অকুতোভয়ে কথা বলেন, শত চোখরাঙানির সামনে কখনো কুঁকড়ে যান না। 

এই অবরুদ্ধ সময়ে দিনে দিনে বহু মানুষ মেনে নিয়েছেন এর কোনো বিকল্প নেই। এই বিপর্যয় কোনোভাবেই ঠেকানো যাবে না। এই চূড়ান্ত হতাশা এবং নেতিবাচক সময়ের মধ্যে  দীপকের মত সাধারণ মানুষই আলো নিয়ে আসেন।‌ ফেসবুকের পাতা থেকে নেমে অসম্ভব লড়াইয়ে মুখোমুখি হন।‌ একটি দীপক থেকে সহস্র দীপক জ্বলে উঠুক। আমরা গর্বের সাথে বলতে পারি সেই তিনটি বুলেটবিদ্ধ মানুষটির মত আমিই হিন্দু, আমিই মুসলমান, আমিই খ্রীষ্টান, বৌদ্ধ, জৈন। অথবা রবীন্দ্রনাথ, এক দেহে লীন ভারতবর্ষ।‌

0 Comments

Post Comment