পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

উচ্ছেদের আয়নায় বিত্তের মুখ ৪

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 203 view(s)
  • লিখেছেন : শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ
কলকাতা বা বেশীরভাগ তথাকথিত উন্নতিশীল শহরে আর কারখানা থাকে না। থাকলেও আস্তে আস্তে তুলে অন্যত্র নেবার ব্যবস্থা চলছে সর্বত্রই। পোস্ট ফোর্ডিয়ান (ফোর্ডের গাড়ির কারখানা ঘিরে ডেট্রয়েট হয়েছিল যেমন) মডেল এখন। অতএব শ্রমিক আসার দরকার নেই। আজ উচ্ছেদের আয়নায় বিত্তের মুখ প্রবন্ধের চতুর্থ ও শেষ পর্ব।

বহুকাল ধরেই বলা হচ্ছে যাত্রী-পরিবহণে রেলের লোকসান হচ্ছে, পণ্য-পরিবহনে লাভ। অথচ রেলের সবচেয়ে যে বড় সমস্যা, দুর্নীতি, তাকে কেউ উৎখাত করতে চায়নি। ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই এবং রেলওয়ের ভিজিল্যান্স বিভাগ প্রতি বছরই বড় বড় দুর্নীতিচক্রের পর্দাফাঁস করছে। রেলে দুর্নীতির বর্তমান চিত্রটি কয়েকটি প্রধান স্তরে ভাগ করা যায়।

 

এক, প্রাতিষ্ঠানিক ও টেন্ডার স্তরে বড় দুর্নীতি যা এটি রেলওয়ের সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ আইআরএস অফিসার এবং ডিআরএম স্তরের কর্মকর্তা সিবিআই-এর হাতে কোটি কোটি টাকার ঘুষসহ ধরা পড়েছেন। দুই, টেন্ডার ও প্রজেক্ট জালিয়াতি। নতুন রেললাইন স্থাপন বা বৈদ্যুতিকীকরণের মতো বড় প্রজেক্টের টেন্ডার পাইয়ে দিতে বেসরকারি ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোট টেন্ডার মূল্যের নির্দিষ্ট শতাংশ (যেমন ১% বা ২%) ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সম্প্রতি ২০২৬ সালের মার্চ মাসে সেন্ট্রাল রেলওয়ের চিফ ইলেকট্রিক্যাল ডিস্ট্রিবিউশন ইঞ্জিনিয়ারকে একটি ৪০ কোটি টাকার টেন্ডার জালিয়াতির মামলায় ১০ লক্ষ টাকা ঘুষ নেওয়ার সময় হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়। তিন, ভুয়ো বা অতিরঞ্জিত বিল পাস। সরকারের ফ্ল্যাগশিপ প্রজেক্ট, যেমন গতি শক্তি প্রজেক্ট-এ ঠিকাদারদের কাজ খতিয়ে না দেখেই বা অতিরঞ্জিত বিলের অনুমোদন দিয়ে বড় অঙ্কের কাটমানি নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। চার, অবৈধ সম্পত্তি বৃদ্ধি বেশ কিছু শীর্ষ রেল ইঞ্জিনিয়ার ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আয়ের উৎসের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ বিপুল পরিমাণ কালো টাকা এবং সোনা মজুত রাখার মামলা রুজু হয়েছে। পাঁচ, সাধারণ যাত্রী স্তরে দুর্নীতিতে এক দশক আগের তুলনায় এই স্তরে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে, তবে তা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কারণ  আইআরসিটিসি অ্যাপ এবং অনলাইন বুকিং ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের ফলে কাউন্টারে টিকিট বুকিং ক্লার্ক এবং 'দালালদের' সিন্ডিকেট অনেকটাই ভেঙে গেলেও উৎসবের মরশুমে (যেমন পুজো বা দিওয়ালি) স্পেশাল ট্রেনের কনফার্মড টিকিট পাইয়ে দেওয়ার জন্য এখনও কিছু অসাধু এজেন্ট এবং রেল কর্মীদের একাংশ সক্রিয় থাকে। ছয়, টিটিই এবং বিনা টিকিটের যাত্রী। কিছু ক্ষেত্রে ট্রেনের ভেতরে টিটিই-দের বিরুদ্ধে ওয়েটিং লিস্টের বা সাধারণ টিকিট থাকা যাত্রীদের কাছ থেকে রসিদ ছাড়া নগদ টাকা (ঘুষ) নিয়ে স্লিপার বা এসি কোচে বসার জায়গা করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

এর বাইরেও দুটি বিরাট দুর্নীতির জায়গা আছে। এক, রেলের পণ্য পরিবহন ও অন্যান্য স্ক্র্যাপ খাত। মালবাহী ট্রেনের ওজন জালিয়াতি। কয়লা বা অন্যান্য ভারী পণ্য পরিবহনের সময় ওজনে কারচুপি করে রেলের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার পেছনে রেলের একাংশ জড়িত থাকে। দুই, স্ক্র্যাপ বা পুরোনো লোহা বিক্রি। রেলের বাতিল হওয়া লাইন, পুরোনো বগি এবং যন্ত্রাংশ নিলাম করার সময় কম দাম দেখিয়ে ঠিকাদারদের সুবিধা করে দেওয়ার সিন্ডিকেট কাজ করে। এগুলোর সম্পর্কে রেল বা সরকার ব্যবস্থা না নিয়ে যাত্রীপরিবহণে বিমানব্যবস্থার সঙ্গে পাল্লা দেবার কাজ দেখাচ্ছে। দিনে দিনে দূরপাল্লার ট্রেনে জেনারেল কামরা কমিয়ে এসি বাড়ানো হয়েছে প্রচুর। গতি বাড়ানোর নানা প্রলোভন দেখছি আমরা। প্লেনে নয়, ট্রেনেই যেতে পারবে উচ্চ ও উচ্চ-মধ্যবিত্তরা। কিন্তু লোকাল বা দূরপাল্লাতেও যাঁরা দরিদ্র, যাতায়াত করছেন ও করবেন, তাঁদের জন্য চিন্তাই নেই। সে জন্যই পরিবহণ ব্যবস্থার শ্রেণীচরিত্রও পাল্টে যাচ্ছে। 

কলকাতা বা বেশীরভাগ তথাকথিত উন্নতিশীল শহরে আর কারখানা থাকে না। থাকলেও আস্তে আস্তে তুলে অন্যত্র নেবার ব্যবস্থা চলছে সর্বত্রই। পোস্ট ফোর্ডিয়ান (ফোর্ডের গাড়ির কারখানা ঘিরে ডেট্রয়েট হয়েছিল যেমন) মডেল এখন। অতএব শ্রমিক আসার দরকার নেই। শহরের নীচের তলা চালু রাখতে, গৃহশ্রমের লোকজন আনতে যতটুকু সেটুকুই যথেষ্ট। গ্রাম-মফস্বল থেকে আসা চাকুরিজীবীদের বড় অংশই এখন মুছে গেছে কলকাতার মানচিত্র থেকে। পরিষেবা ক্ষেত্র ছাড়া বাকী সব পিছোচ্ছে। মুছে যাচ্ছে ক্রমে। আরো যাবে নয়া-উদারনীতির ও এআই-এর চক্করে। ছাত্রছাত্রীদের জন্য যে বিরাট খরচের বেসরকারী শিক্ষাব্যবস্থা সেখানে বাইরে থেকে নিত্য আসার বদলে বাড়ি ভাড়া নিয়ে বা কিনে নিয়ে থাকাটাই ঐ সব পরিবারের কাছে সহজ। কারণ বিত্ত ছাড়া ঐ শিক্ষা কেউ কিনতে পারবে না। সরকারী স্কুল-কলেজের ক্ষেত্র নিয়ে কেউ ভাবিত নয়। এই অংশের বিপুল ছাত্রছাত্রীদের নিয়েও। কিছুদিন পরে সরকারী ব্যবস্থাটাই উঠে যাবার মতো দিকে চলেছে। তাহলে? রেলের হকার বা নগরের হকার লাগবে কাদের জন্য? বিত্তবানেরা বিত্তব্যয় করতে কুন্ঠিত নয়। বরং নতুন নন্দনতত্ত্বে সর্বত্র ফাঁকা ফাঁকা সুসজ্জিত বিষয় তাদের পছন্দ। এই ফিল গুড ফ্যাক্টরের জন্যই তারা বাঁচে এখন। যারা এমনটায় চলতে পারবে তারা টিকবে, বাকীরা মুছে যাবে কলকাতা নগরাঞ্চল থেকে। তাদের মুছে দেওয়াও একটা জরুরী নয়া-উদারনৈতিক প্রকল্প।

 

আরেকটা কাজও আছে গুরুত্বপূর্ণ। গ্রাম-মফস্বল আর মেট্রোপলিসকে আগে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। এই চলাচল রাজনীতির চলাচল, সামাজিক ভাবনার চলাচল, দর্শনের চলাচলও। একে অপরকে প্রভাবিত করে শুধু নয়, ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও গড়ে। বিশ্ব ইতিহাস বলছে, তথাকথিত আধুনিক সময় নগর থেকেই বেশী দ্রোহজ দর্শন ও ধারণার জন্ম হয়েছে। সেগুলি ছড়িয়েছে গ্রামে-মফস্বলে। এই যোগাযোগটিকেই কেটে দিলে? বিশেষ করে আন্তর্জালকে নিয়ন্ত্রণ করা শাসকেরা সর্বত্র শিখে গিয়েছে। কিন্তু মানবিক সংযোগকে তো মোবাইল ফোনের নজরদারী দিয়েও নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তাকে আটকে দিলে দ্রোহও আটকে যায়। বিরুদ্ধ মত স্থবির হয়ে যায়। অন্তত শাসকদের ভাবনাগুলো এমনি। তাই একে একে শ্রেণীবৈষম্যহীন সমাজভাবনার ডানা কাটতে হয়। সেটা কাটার কাজ চলছে গ্রাম-মফস্বল আর মেট্রোপলিসকে বিচ্ছিন্ন করে।

 

এভাবে চললে, এরপরে কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা নয়, প্রাইমেট সিটি হবে। প্রাইমেট সিটি হলো কোনো দেশের এমন একটি প্রধান এবং একক বৃহত্তম শহর, যা জনসংখ্যা, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির দিক থেকে সেই দেশের অন্য সব শহরের তুলনায় বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে থাকে। ১৯৩৯ সালে ভূগোলবিদ মার্ক জেফারসন প্রথম এই ধারণাটি উপস্থাপন করেন। তার মতে, একটি প্রাইমেট সিটি হবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরের তুলনায় কমপক্ষে দ্বিগুণ বড় এবং সামগ্রিকভাবে দেশের জাতীয় পরিচয় ও অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। সেই কাজই চলছে এখানে। কিন্তু আজকের প্রেক্ষিতে কিছু কিছু বদল সহ।

 

মার্ক জেফারসনের প্রাইমেট সিটি ধারণার সাথে পুঁজিবাদের মুনাফা বাড়ানোর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর এবং অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ডেভিড হার্ভের মতো মার্ক্সবাদী নগর-অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রাইমেট সিটি আসলে কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং এটি পুঁজিবাদের নিজস্ব মুনাফা বৃদ্ধির স্বার্থে তৈরি করা একটি ভৌগোলিক ফাঁদ। এতে পুঁজির কেন্দ্রীয়করণ ও উৎপাদন খরচ কমানো হয়। ধনতন্ত্রের মূল লক্ষ্য হলো সর্বনিম্ন খরচে সর্বোচ্চ মুনাফা করা। একটি দেশে যদি শিল্পকারখানা, ব্যাংক, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দক্ষ শ্রমিক আলাদা আলাদা শহরে ছড়িয়ে থাকে, তবে পুঁজিপতিদের যাতায়াত, কাঁচামাল পরিবহন এবং যোগাযোগের খরচ বেড়ে যায়।

 

তার সমাধান হল পুঁজিবাদী শক্তিগুলো দেশের (ভৌগলিক অঞ্চল অনুসারে) একটি বা একাধিক বড় শহরকে প্রাইমেট সিটি করা এবং সেখানে সমস্ত সুযোগ-সুবিধা পুঞ্জীভূত করা। একে অর্থনীতিতে বলা হয় 'অ্যাগ্লোমারেশন ইকোনমিক্স'। একই জায়গায় সবকিছু পেয়ে যাওয়ার ফলে উৎপাদন খরচ ও লেনদেনের খরচ এক ধাক্কায় অনেক কমে যায়, যা সরাসরি পুঁজিপতিদের করপোরেট মুনাফা বাড়িয়ে দেয়। সঙ্গে শ্রমিকের বিশাল রিজার্ভ ফোর্স এবং সস্তা শ্রম যা গ্রামাঞ্চলের দারিদ্র এবং বর্তমানে বেনাগরিকদের বিরাটাংশকে নিয়ে তৈরী হচ্ছে। আগে প্রাইমেট সিটি যখন দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির কেন্দ্র হয়ে ঊঠেছে, তখন গ্রামের এবং প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ বাধ্য হয়ে কাজ বা বেঁচে থাকার তাগিদে সেই শহরে ছুটে আসতো। কিন্তু যদি বেনাগরিক সংখ্যা বাড়িয়ে একেক জায়গায় কেন্দ্রীভূত করা যায় তাহলে গ্রামাঞ্চল বা প্রান্ত নয়, নগরেরই উপান্তে রেখে অতি সস্তা শ্রম পাওয়া যায়।  এতে শ্রমের জোগান বেশি থাকায় বড় বড় কোম্পানি, কলকারখানা বা স্টার্টআপগুলো অত্যন্ত কম মজুরিতে হাড়ভাঙা খাটুনি করিয়ে নিতে পারে। শ্রমিকের মজুরি যত কম রাখা যায়, মালিকের পকেটে মুনাফা তত বেশি ঢোকে।

 

এছাড়া রিয়েল এস্টেট ও জমির ফাটকা ব্যবসা বাড়ে। পুঁজিবাদে শুধু পণ্য উৎপাদন করে মুনাফা হয় না, স্থাবর সম্পত্তি বা জমি থেকেও বিশাল মুনাফা লোটা হয়। প্রাইমেট সিটিগুলোতে যখন দেশের অজস্র মানুষ এসে ভিড় করে, তখন সেখানে জমির চাহিদা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। বহুজাতিক ডেভেলপার কোম্পানি ও পুঁজিপতিরা শহরের জমি ও ফ্ল্যাটের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেয়। সাধারণ মধ্যবিত্ত তাদের জীবনের সমস্ত উপার্জন দিয়ে সেই শহরে একটি ফ্ল্যাট কিনতে বা চড়া ভাড়া দিতে বাধ্য হয়, যার বড় অংশটি বড় বড় রিয়েল এস্টেট টাইকুনদের পকেটে যায়।

 

এরজন্য একচেটিয়া বাজার এবং বিশাল ভোক্তা শ্রেণি দরকার ধনতন্ত্রের টিকে থাকার জন্য। প্রাইমেট সিটিতে দেশের সবচেয়ে ধনী, উচ্চ-মধ্যবিত্ত এবং কর্মজীবী মানুষ একসাথে বসবাস করে। ফলে এটি কর্পোরেট ব্র্যান্ড, শপিং মল, মাল্টিপ্লেক্স এবং বিলাসবহুল পণ্যের জন্য একটি 'রেডিমেড' ও বিশাল বাজারে পরিণত হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে পণ্য সরবরাহের ঝামেলা না পুইয়ে পুঁজিপতিরা এই একটি মাত্র শহর থেকেই তাদের সিংহভাগ রাজস্ব ও মুনাফা তুলে নিতে পারে।

 

সঙ্গে থাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সুবিধা ও লবিইং বা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার সুবিধা। প্রাইমেট সিটি সাধারণত দেশের রাজধানী বা প্রশাসনিক কেন্দ্র হয়। কলকাতা প্রদেশের কেন্দ্র অনেককাল। পুঁজিপতিদের তাদের ব্যবসার অনুকূলে নীতি তৈরি করা, ট্যাক্স ছাড় নেওয়া বা সরকারি টেন্ডার পাওয়ার জন্য নীতিনির্ধারক ও আমলাদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বা লবিইং করতে হয়। কর্পোরেট হেডকোয়ার্টারগুলো প্রাইমেট সিটিতে রাখলে সরকারের শীর্ষ স্তরের সাথে এই যোগাযোগ সহজ হয়, যা তাদের ব্যবসাকে সুরক্ষিত রাখে এবং মুনাফা নিশ্চিত করে।

 

তাহলে এর কি কোনো বিকল্প নেই? আছে। "শহরের ওপর অধিকার" তত্ত্ব। এটি হলো একটি সমাজতান্ত্রিক ও বৈপ্লবিক নগর-দর্শন, যার মূল কথা হলো—শহরের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং শহরকে নিজের মতো করে গড়ে তোলার অধিকার কেবল ধনী পুঁজিপতি বা রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের নয়, বরং সেখানে বসবাসকারী প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের রয়েছে। ১৯৬৮ সালে ফরাসি মার্ক্সবাদী দার্শনিক অঁরি ল্যাফেভার তাঁর 'Le Droit à la Ville' বইতে প্রথম এই ধারণাটি দেন। পরবর্তীতে বিখ্যাত ব্রিটিশ ভূগোলবিদ ও চিন্তাবিদ ডেভিড হার্ভে এই তত্ত্বটিকে আধুনিক পুঁজিবাদের প্রেক্ষাপটে আরও বিস্তৃত ও জনপ্রিয় করে তোলেন।

 

হার্ভে এবং ল্যাফেভারের মতে, বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শহরগুলোর রূপান্তর কীভাবে সাধারণ মানুষের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে তা  'বিনিময় মূল্য' বনাম 'ব্যবহার মূল্য' দিয়ে বোঝা যায়। পুঁজিবাদ একটি শহরকে দেখে কেবল মুনাফা অর্জনের মাধ্যম বা পণ্য হিসেবে। পুঁজিপতিরা শহরের জমি, পার্ক বা আবাসনকে 'কমোডিটি' বা পণ্য মনে করে। তারা চিন্তা করে কীভাবে পার্ক ধ্বংস করে শপিং মল বানালে, বা বস্তি উচ্ছেদ করে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট তুললে বেশি লাভ (বিনিময় মূল্য) হবে।

 

কিন্তু নাগরিকের দৃষ্টিভঙ্গি তা নয়। সাধারণ মানুষের কাছে শহরটি বেঁচে থাকার, সামাজিক মেলামেশার এবং সংস্কৃতির জায়গা (ব্যবহার মূল্য)। এই তত্ত্ব বলে, শহরের যেকোনো পরিকল্পনায় 'মুনাফা'র চেয়ে মানুষের 'প্রয়োজন' বা ব্যবহারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এর সঙ্গে আছে শহরকে পুনর্নির্মাণের যৌথ ক্ষমতা। ডেভিড হার্ভে স্পষ্ট করেছেন যে, 'শহরের ওপর অধিকার' মানে কেবল শহরের সুযোগ-সুবিধা (যেমন রাস্তা বা জল) পাওয়ার ব্যক্তিগত আইনি অধিকার নয়। এটি হলো একটি যৌথ ক্ষমতা। নাগরিকরা ঠিক করবেন তাদের শহরটি কেমন হবে। তারা কি বড় বড় ফ্লাইওভার ও হাইরাইজ বিল্ডিং চান, নাকি উন্নত গণপরিবহন, সাশ্রয়ী আবাসন এবং খেলার মাঠ চান? পুঁজিবাদ এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে গুটিকয়েক করপোরেট ও আমলাদের হাতে তুলে দেয়।

 

আছে জেন্ট্রিফিকেশন ও উচ্ছেদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। পুঁজিবাদী নগর পরিকল্পনার একটি বড় হাতিয়ার হলো 'জেন্ট্রিফিকেশন'। এর মাধ্যমে শহরের পুরনো বা দরিদ্র এলাকাগুলোকে 'উন্নয়ন'-এর নামে চকচকে করে তোলা হয়, যার ফলে জমির দাম ও ভাড়া বেড়ে যায়। ফলস্বরূপ, আদি দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত বাসিন্দারা সেখান থেকে বিতাড়িত বা উচ্ছেদ হয়।'শহরের উপর অধিকার' তত্ত্বটি এই অন্যায্য উচ্ছেদের বিরুদ্ধে একটি বড় রাজনৈতিক স্লোগান। এটি দাবি করে, কোনো এলাকায় উন্নয়ন হলেও সেখানকার দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের (যেমন হকার বা দিনমজুর) সেখানে টিকে থাকার এবং সেই উন্নয়নের সুফল পাওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।

 

এটি উদ্বৃত্ত পুঁজির শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই। ডেভিড হার্ভে দেখিয়েছেন, পুঁজিপতিরা যখন কলকারখানা থেকে অতিরিক্ত মুনাফা বা 'উদ্বৃত্ত পুঁজি' অর্জন করে, তখন তারা সেই টাকা খাটানোর জন্য শহরের রিয়েল এস্টেট ও অবকাঠামো খাতকে বেছে নেয়। তারা কৃত্রিমভাবে আবাসন সংকট তৈরি করে ফাটকা ব্যবসা করে। 'শহরের উপর অধিকার' তত্ত্বটি শহরের ওপর পুঁজিবাদের এই একচেটিয়া আগ্রাসনকে ভেঙে ফেলার আহ্বান জানায়।

 

সংক্ষেপে এই তত্ত্বের দাবি হল শহরটি যারা প্রতিদিন তাদের শ্রম দিয়ে সচল রাখছেন—পরিচ্ছন্নতাকর্মী, রিকশাচালক, হকার, পোশাক শ্রমিক, চাকুরিজীবী ইত্যাদিরা - শহরের প্রতিটি ইঁটের ওপর এঁদের অধিকার সবচেয়ে বেশি। শহরটি পুঁজিপতিদের মুনাফার চারণভূমি হবে না, বরং এটি হবে মানুষের মানবিক বিকাশ এবং গণতান্ত্রিক চর্চার কেন্দ্র। হেনরি মেহিউ-এর লন্ডন আমরা চাই না। উচ্ছেদের আয়নায় নিজ নিজ মুখ দেখলেই পক্ষ স্থির করা যায়। কে 'শহরের উপর অধিকার'-এর পক্ষে আর কে বিপক্ষে তা দিয়ে শ্রেণী ও অবস্থানও চিহ্নিত করা যায়। তেমনই এই মুহূর্তে 'রেলের উপর অধিকার' প্রতিষ্ঠার লড়াইও প্রয়োজন। শুধু হকার নয় - সকল দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ইত্যাদি - যাঁরা জনসংখ্যার সবচেয়ে বড় অংশ তাঁদের জন্যও প্রয়োজন।

 

অপরাধের কথা, আইন-বেআইনের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। সেখানেই ফিরি আবার। জেরেমি বেন্থামের মত উপযোগিতাবাদী দার্শনিকও An Introduction to the Principles of Morals and Legislation-এ আনতে বাধ্য হয়েছিলেন ফেলিসিটি ক্যালকুলাস। এটি হলো একটি গাণিতিক বা যৌক্তিক পদ্ধতি যা কোনো কাজের ফলে কী পরিমাণ সুখ বা আনন্দ পাওয়া যেতে পারে তা পরিমাপ করে। কারণ তার আগে মন্তেস্কু, রুশোদের ধারণা নিয়ে চেজারে বোনেশানা বলেছিলেন, ব্যক্তির অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য শাস্তির প্রয়োজন। লিখিত কিছু আইন থাকা দরকার যা সকলের প্রতি প্রযোজ্য হবে এর জন্য। অবশ্যই এর জন্যও যাতে হিংস্র অমিতশক্তিশালীর অত্যাচার থেকে বাঁচা যায়। তিনি বলেছিলেন অপরাধ করে যতটা আনন্দ হবে শাস্তি যেন তার চাইতে সামান্য বেশীই হয়।

 

বেন্থাম, শাস্তির পরিমাপ এবং আনন্দ মাপতে গেছিলেন ফেলিসিটি ক্যালকুলাস দিয়ে। উপযোগিতাবাদী ধারণায় তিনি পৌঁছলেন একটি অনন্য জায়গায়। ব্যক্তির অন্যায়ে, সমাজের কতটা ক্ষতি হল সেই অনুপাতে শাস্তি হোক। তার মূলনীতি হচ্ছে 'সর্বোচ্চ সুখ সর্বোচ্চ সংখ্যার মানুষের জন্য'। এই প্রাইমেট সিটি গড়তে, শাসন ব্যবস্থা যেদিকে যাচ্ছে, তাতে 'সর্বোচ্চ সুখ সর্বনিম্ন সংখ্যার মানুষের জন্য' হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাহলে 'অবৈধ' কোনটা? 'বেআইনি' কোনটা? পরিস্কার হচ্ছে?

 

 

 

 

 

 

 

 

 

0 Comments

Post Comment