পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

অনলাইন ক্লাস: এখানেও বৈষম্য

  • 16 May, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 868 view(s)
  • লিখেছেন : মোঃ জাহাঙ্গীর আলম
ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য হচ্ছে। সচ্ছল পরিবারের ছেলে মেয়েরা অনলাইনে বা গ্রূপে ক্লাস করার পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। কাজে লাগাক, না লাগাক সুযোগ তো পাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সচেতন বাবা মা গ্রূপে ছেলে মেয়েদের হয়ে প্রশ্ন করছেন। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের মেধাবী ছেলে মেয়েরা যাঁদের স্মার্টফোন ব্যবহারের কোন সামর্থ্য নেই, উপায় নেই তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছে অনলাইন বা গ্রপের ক্লাস থেকে। ওরা এই সুযোগ পেলে নিজেদেরকে শিক্ষক শিক্ষিকাদের সাথে সম্পৃক্ত করে আরো ভালো রেজাল্টের দিকে এগিয়ে যেত।

প্রায় দুমাস হতে চলল, স্কুল বন্ধ। সরকারি অর্ডার অনুযায়ী 10ই জুন অব্দি স্কুল বন্ধ। কিন্তু তারপরেও স্কুল যে খুলবে না সেটা প্রায় নিশ্চিত। টিউশনও বন্ধ। এদিকে ছেলে মেয়েদের পড়াশুনার খুব ক্ষতি হচ্ছে। ওদের কথা ভেবেই শহরে গ্রামে সর্বত্র বিভিন্ন স্কুল অনলাইনের মাধ্যমে বা হোয়াটস আপ গ্রূপের মাধ্যমে ক্লাস চালাচ্ছে। আমাদের স্কুলেও অষ্টম, নবম, দশম এবং দ্বাদশ এর আর্টস এবং সায়েন্স এর ক্লাস হোয়াটস আপ গ্রূপ এবং অনলাইনেও চলছে। এই নতুন ব্যবস্থাপনায় ছেলে মেয়েরাও অনেকেই সক্রিয়। শিক্ষক ও শিক্ষিকারাও এই নতুন ব্যবস্থাপনায় নিজেদেরকে মানিয়ে নেবার চেষ্টা করছেন। তবে সবাই নয়।

এই ব্যবস্থায় ছেলে মেয়েদের উপকার হলেও সমস্যাও আছে বেশ কিছু। একটি ভালো ক্লাসের মূল বৈশিষ্ট হলো স্যারের পড়ানোর সাথে সাথে ছেলে মেয়েদের ফিডব্যাক। তাঁরা প্রশ্ন করবে। বুঝতে না পারলে জানতে চাইবে। গ্রূপের মাধ্যমে পড়ানোয় যেটা হচ্ছে না। শিক্ষক শিক্ষিকা যে পড়ানোর ভিডিও আপলোড করছেন সেটি বেশ কার্যকরী। কিন্তু ছেলে মেয়েরা সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করতে পারছে না। পরে লিখে জিজ্ঞাসা করতে হচ্ছে। এটা সময় ও শ্রম সাপেক্ষ ব্যাপার।

গ্রূপে ক্লাস করতে গিয়ে দুই পক্ষেরই সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষকদের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যেমন ইতিহাস ভূগোল, বাংলা, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ের প্রশ্নের উত্তর ছেলে মেয়েরা খাতায় লিখে ছবি তুলে শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের ব্যক্তিগত নম্বরে দিচ্ছে। গ্রূপে উত্তর দেওয়াতে শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের সেই উত্তর ফলো করতে অসুবিধা হচ্ছে। তাই গ্রূপে প্রশ্ন বা বাড়ির কাজ দেওয়া হলেও উত্তর দিতে হচ্ছে শিক্ষক শিক্ষিকাদের ব্যক্তিগত নম্বরে।
শিক্ষক শিক্ষিকাদের মোবাইল স্ক্রিনে সেগুলো খুব কষ্ট করে পড়তে হচ্ছে। সময় বেশি লাগছে। অনেকের ছবি আবার স্পষ্টও নয়। তারপর উত্তরের ভুল ঠিক কারেকশন করতে হচ্ছে। সেটা উত্তরের উপর তো লেখা যাচ্ছে না। আলাদা করে লিখতে হচ্ছে। আবার যখন একজন শিক্ষক পড়ানোর ভিডিও মোবাইলে তুলে এডিট না করে যখন গ্রূপে আপলোড করছে তখন দুই তিন মিনিটের বেশি আপলোড হচ্ছে না। কারণ অনেকের কাছে কম্পিউটার নেই যেখানে কনভার্টার এর মাধ্যমে ভিডিওর রেজোলিউশন কমিয়ে গ্রূপে আপলোড করবে।

তবে যে ক্লাসে ছেলে মেয়েদের সংখ্যা কম সেই সব ক্লাসে অনলাইন ক্লাস ভালোই হচ্ছে। যেমন দ্বাদশ শ্রেণীর সায়েন্স। দু চারজন বাদে এঁদের সকলের প্রায়ই স্মার্টফোন আছে। তাই এঁদের নিয়ে জুম বা স্কাইপের মাধ্যমে ক্লাস করা যাচ্ছে। এঁদের মধ্যে পঞ্চাশ শতাংশ ছেলে মেয়েদের মোটা মুটি ক্লাসে ভালো উৎসাহ আছে।

কিন্তু পঞ্চম থেকে দশম ছেলেমেয়েদের অধিকাংশরই নিজস্ব মোবাইল ফোন নেই। এঁদের জন্য জুমে বা স্কাইপে ক্লাস করানো সম্ভব নয়। এরা বাবা-মায়েদের বা দাদাদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। এখানে আবার দুটো ভাগ আছে। শহরে প্রায় বেশিরভাগ বাড়িতে এখন স্মার্ট ফোন রয়েছে। এখানে সচেতন অভিভাবকের সংখ্যা বেশি।
কিন্তু গ্রাম এলাকায়, যেমন আমাদের লস্করপুর হাইস্কুল এলাকায় বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে দরিদ্র পরিবার থেকে আসে। এদের বেশিরভাগের বাবা রাজমিস্ত্রি, এবং বাইরে বিভিন্ন রকমের পেশায় নিযুক্ত। মা বিড়ি শ্রমিক। এঁদের বাড়িতে ছোট ফোন আছে। স্মার্টফোন থাকলেও বাবার কাছে আছে, বা দাদার কাছে আছে। যাঁরা বাইরে থাকে।

কিছু গৃহস্থ, ব্যাবসিক ও আর্থিক দিক দিয়ে সচ্ছল পরিবারে স্মার্টফোন আছে। এই পরিবারের ছেলে মেয়েদের অনলাইনে ক্লাস করতে সমস্যা নেই। বাবা মা ফোন দিয়ে দিচ্ছেন। তাঁরা গ্রূপে বা অনলাইনে নিয়মিত ক্লাস করছে। তবে ওদের বাবা মায়েদের কথা অনুযায়ী ক্লাসের নাম করে ইউটিউব এবং ফেসবুক ব্যবহার করছে।

এবার আমরা একটি বিষয় লক্ষ করছি। যাঁরা ক্লাসে বেশি মেধাবী ও আগ্রহী তাঁরাই অনেকে গ্রূপে বা অনলাইনে ক্লাস করার সুযোগ পাচ্ছে না। কারণ তাঁদের বাড়িতে স্মার্টফোন নেই। কেউ কেউ ধার করে স্মার্টফোন ব্যবহার করতে চাইলেও স্কাইপ বা জুমে ক্লাস করার ডেটা খরচ কে দেবে? এমন অনেক আছে, যাঁদের স্মার্টফোন একটা আছে। কিন্তু ডেটা রিচার্জের পয়সা নেই। আমাদের ছেলে মেয়েদের ক্ষেত্রেই হয়েছে এটা। নুন আনতে পান্তা ফুরানো পরিবারের ছেলে মেয়েদের কাছে অনলাইনে ক্লাস এখনো বিলাসিতা। তাছাড়া, লকডাউনের সময় খেটে খাওয়া পরিবারগুলোর অবস্থা এমনিতেই খুব খারাপ।

অন্যদিকে যাঁদের হাতে সব সময় মোবাইল থাকছে, বা যাঁদের স্মার্টফোন ব্যবহার কোন সমস্যা নয়, তাঁরা আবার পড়াশুনায় অমনযোগী। এরা গ্রূপে বা অনলাইনে শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের ক্লাস ও লেসন কম অনুসরণ করে। বাড়ির কাজ ঠিক মতো করে না। হয়তো মোবাইল নিয়েই সারাদিন বসে থাকে।

তবে আমাদের স্কুলে দ্বাদশে পঞ্চাশ শতাংশ এবং সপ্তম থেকে দশমে পনেরো থেকে কুড়ি শতাংশ ছেলে মেয়ে বেশ উপকৃত হচ্ছে। পড়াশুনার চর্চাটা থাকছে। 'কিছু না হওয়ার থেকে কিছু হওয়া ভালো' এই বিশ্বাস নিয়েই এগুতে হচ্ছে। সকলের না হোক কিছু ছেলে মেয়ের তো উপকার হচ্ছে।

তবে, এখানেও আমাদের ইচ্ছে না থাকলেও বৈষম্য হচ্ছে। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য হচ্ছে। সচ্ছল পরিবারের ছেলে মেয়েরা অনলাইনে বা গ্রূপে ক্লাস করার পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। কাজে লাগাক, না লাগাক সুযোগ তো পাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সচেতন বাবা মা গ্রূপে ছেলে মেয়েদের হয়ে প্রশ্ন করছেন। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের মেধাবী ছেলে মেয়েরা যাঁদের স্মার্টফোন ব্যবহারের কোন সামর্থ্য নেই, উপায় নেই তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছে অনলাইন বা গ্রপের ক্লাস থেকে। ওরা এই সুযোগ পেলে নিজেদেরকে শিক্ষক শিক্ষিকাদের সাথে সম্পৃক্ত করে আরো ভালো রেজাল্টের দিকে এগিয়ে যেত।

0 Comments

Post Comment