পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

মুসলিম শাসকদের হিন্দু ধর্মীয় স্থান ভাঙার কাহিনী কি সত্যি ? পর্ব ১

  • 10 May, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 1098 view(s)
  • লিখেছেন : রাধাপদ দাস
হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীরা দেশজুড়ে মসজিদের সামনে মিছিল করে যাচ্ছে ও দাঙ্গা বাঁধানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে জ্ঞানবাপি মসজিদের ভিতরে পুরাতত্ব বিভাগ আদালতের নির্দেশে মন্দিরের অবশেষ খুঁজে বেড়াচ্ছে, মথুরাতেও সেই মর্মে মামলা চলছে, তাজমহলকে তেজো মহালয়ের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রথম দাপ হিসেবে আদালতে মামলা হয়েছে। দেখাতে চেষ্টা করা হচ্ছে যে মুসলিম শাসকরা মন্দিরের পর মন্দির ভেঙেছে, হিন্দু ধর্মের উপরে আঘাত করার জন্য। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলছে।

ভারতের হিন্দুত্ববাদী শক্তির প্রাণপুরুষ এমএস গোলওয়ালকার বলেছিলেন, “Muslims, Christians and Communists are internal threats to the country.”। এই আদর্শকে ভিত্তি করে ভারতে মুসলিম বিদ্বেষের বীজ ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মুসলিম শাসকরা বেছে বেছে শুধুমাত্র হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছেন এই সংবাদ গোয়েবলসের নীতি অনুসারে ভারতের ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তির প্রচারের দ্বারা , আকাশ বাতাসকে এক ব্যাপক পরিমাণে বিষাক্ত করে ছেড়েছে। “মুসলিম শাসকরা হিন্দু মন্দিরও তৈরী করেছেন” আমি এই কথা বলার পর এক ইতিহাসের শিক্ষক আমাকে মুসলিম তোষনকারি সহ আরো এমন কিছু ভাষা প্রয়োগ করলেন যা এখানে লিখিত আকারে প্রকাশও করা যাবেনা। বিখ্যাত ঐতিহাসিক বি এন পাণ্ডে তাঁর ‘ Islam and Indian Culture’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, মহম্মদ-বিন-কাশেম, যিনি ৭১২ খ্রিঃ ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ আক্রমন করেছিলেন, হিন্দুদের ধর্মীয় বিষয়ে খুব সহনশীল ছিলেন এবং যুদ্ধের সময় কোনভাবে যাতে এই ধর্মীয়স্থানের উপর অত্যাচার না হয় সেই জন্য তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন “ The temple of Hindustan are like the churches of christians. He directed the nobles, the principle inhabitants and Brahmin to build their temples”। ভারতবর্ষের মুসলিম শাসনের কয়েকশ বছরের ইতিহাসে নানা ঐতিহাসিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে মুসলিম শাসকরা শুধুমাত্র বহু মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছেন এমন নয় বহু মন্দির কে সারা বছ আর্থিক অনুদান সহ নানা ভাবে সাহায্য করে গেছেন, মন্দিরের পুরোহিত সহ সাধারণ হিন্দু নাগরিকরা যাতে শান্তিতে বসবাস করতে পারেন সেই জন্য নানা ফরমান জারী করেছেন। হিন্দুদের নানা ধর্মীয় পুস্তক যেমন রামায়ন, মহাভারত, পুরান, ভাগবতগীতা, বেদ, উপনিষদ, যোগ বশিষ্ঠ, যোগ শাস্ত্র এবং বেদান্ত শাস্ত্র সহ অনান্য গ্রন্থ পার্সি ও বাংলা সহ অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষায় অনুবাদ করেছেন। সম্রাটরা হিন্দুদের নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন। এই রকম অসংখ্য ধর্মীয় উদারতার দৃষ্টান্ত রেখেছেন। কিন্তু ভারতের মন্দিরওয়ালাদের মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে মুসলিম শাসকদের শুধু মন্দির ধ্বংসকারীর এক তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের মিথ্যা প্রচারের এক বড় অঙ্গ হল মুসলিম শাসনে ভারতে প্রায় ৬০ হাজার মন্দির ধ্বংস হয়েছে। এই ক্ষেত্রে ঔরঙ্গজেবকে হিন্দু মন্দির ধ্বংসকারির নেতা বানিয়ে ছেড়েছেন। বিখ্যাত এক আমেরিকান ঐতিহাসিক. এরিজোনা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রিচার্ড এম. ইটন তাঁর ‘দি টেম্পল ডিসেক্রেশন এন্ড মুসলিম স্টেট ইন মেডিয়াভেল ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে নানা প্রাচীন নথি ও প্রত্নতাত্ত্বিক উদাহরণের সাহায্যে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন যে ১২০৬- ১৭২৯ খ্রিস্টাব্দ, মুসলিম শাসনের এই সময়কালে ভারতে মোট ৮০ টি মন্দির ধ্বংস হয়েছিল।আর ঔরঙ্গজেবের আমলে মোট সংখ্যা হবে ১২ টির মত। ঔরঙ্গজেবকে সাম্রাজ্য বিস্তারের কারণে অন্যান্য হিন্দু বা মুসলিম শাসকদের মত কিছু ধর্মীয় স্থান ধ্বংস করতে হলেও তিনি অনেক হিন্দু মন্দির নির্মানও করেছেন, নিয়মিত মন্দিরের জন্য আর্থিক সাহায্য করা ও নানা মন্দিরে উন্নয়ন মূলক কাজের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আমরা ঔরঙ্গজেব সহ অন্যান্য মুসলিম শাসকদের হিন্দু মন্দির নির্মাণ সহ তাদের ধর্মীয় উদারতার গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত গুলির উপর আলোকপাত করার চেষ্টা করবো।

ভারতে মুসলিম শাসকদের মধ্যে ধর্মীয় উদারতার এক উল্লেখযোগ্য চরিত্র আকবর। তিনি তাঁর শাসনকালে ১৫৯৮ খ্রিস্টাব্দের ২৭ শে আগষ্ট এক ফরমান জারি করে মথুরাতে একটি হিন্দু মন্দির নির্মাণ করেন।সেই বছরের ১১ই সেপ্টেম্বর আরো একটি ফরমান জারি করে বৃন্দাবন ও মথুরাতে একটি করে মন্দির নির্মাণ করেন। আকরের আমলে ফতেপুরসিক্রি ছিল এক ধর্ম ও সংস্কৃতির মিলনস্থান, আকবর সেখানেও একটি হিন্দু মন্দির নির্মান করেন এবং তিনি হিন্দুদের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন। আগ্রায় তিনি জেসুইট পাদ্রিদের জন্য একটি চার্চ তৈরির অনুমতি দিয়েছিলেন। এখানেই তিনি থেমে থাকেন নি এর পর বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় পুস্তক অনুবাদ করে আরো বেশি মানুষের মধ্যে যাতে ছড়িয়ে দেওয়া যায় সেই জন্য বিখ্যাত বিখ্যাত পণ্ডিতদের নিয়ে এসে ফতেপুর সিক্রিতে এক অনুবাদের দপ্তর তৈরি করেন। সেখানে রামায়ন, মহাভারত, বাইবেল পার্সি ভাষায় অনুবাদ করেন।১৫৯০ সালে আকবরের নির্দেশ অনুসরে রাজা মান সিং বৃন্দাবনে এক মন্দির নির্মাণ করেন। এছাড়াও আকবর তাঁর মন্ত্রী টোডরমল কে দিয়ে কাশি বিশ্বনাথ মন্দির মেরামত করিয়েছেন। সেখানকার পণ্ডিতদের কয়েকজনকে তিনি নিযুক্ত করেছিলেন হিন্দুধর্মীয় নানা বিষয়ে একটা মহাকোষ গ্রন্থ রচনার কাজে । ১৫৫৮ সালে সমাপ্ত এই বিশাল রচনাটি টোডরনন্দম নামে পরিচিত।

আর একজন রাজা কাশ্মীরের জয়-নুল-আবেদিন। যাকে কাশ্মিরের আকবর বলা হয়, তিনিও তাঁর শাসন কালে হিন্দুদের জন্য মন্দির নির্মাণ করে দিয়েছেন। তিনি নিজেই সংস্কৃত সাহিত্যের এক বড় পণ্ডিত ছিলেন। তাঁর এই পাণ্ডিত্য ও ধর্মীয় উদারতার কারনেই নিজে মহাভারত, উপনিষদ ও রাজতরঙ্গিনী পার্সিভাষায় অনুবাদ করেন। তার আমলে তিনি হিন্দু পণ্ডিতদের ভাতা দেওয়ার ও ব্যবস্থা করেন । এছাড়া তাঁর শাসনকালে রাজ্যে গোহত্যা বন্ধের নির্দেশ দেন। মুসলিম হয়েও ধর্মীয় উদারতার নিদর্শন হিসাবে হিন্দুদের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন।

আকবরের পর তাঁর পুত্র জাহাঙ্গিরও ধর্মীয় ক্ষেত্রে বাবার নীতি অনুসরণ করে বৃন্দাবন ও মথুরাতে আরো দুটি মন্দির নির্মাণ করে দেন হিন্দুদের জন্য। সেখানে মন্দিরের কাজ যাতে স্বাভাবিক ভাবে পরিচালিত হয়, কোন রকম অর্থনৈতিক সমস্যা না দেখা দেয় সেই জন্য ১২১ বিঘা বা ৩০ হেক্টর জমি মন্দিরের নামে দান করেন; ১৬২০ খ্রিস্টাব্দে সেই বৃন্দাবন মন্দিরে নিজে পরিদর্শনেও গিয়েছিলেন।

অযোধ্যার নবাব সফদরজঙ্গও তাঁর শাসনকালে বেশ কয়েকটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। আরো কয়েকটি মন্দিরকে সংস্কারও করান। অনান্য মন্দিরের সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন যাতে করে কোনভাবে কেউ মন্দিরের ক্ষতি না করতে পারে। অযোধ্যার আর এক নবান সুজা-উৎ-দৌল্লা ২০ হেক্টর জমি দান করেছিলেন অযোধ্যার হনুমানগড়ি মন্দিরের নির্মানের জন্য। এই মন্দির টি ১৭৭৪ সালে তৈরী হয়েছিল। এই তথ্য জানিয়েছেন সেই হনুমানগরি মন্দিরের পুরোহিত মহন্ত জ্ঞান দাস, তিনি একটি তাম্রপত্র তার প্রমান হিসাবে দেখান, যেখানে এই সমস্ত তথ্য এখনো বর্তমান। সুজা-উৎ- দৌল্লার ছেলে নবাব মনসুর আলিও সেই হনুমানগরি মন্দিরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বারে বারে যেতেন ও নানা ভাবে দানকার্য করতেন।

হিন্দু মৌলবাদী শক্তি যে ঔরঙ্গজেবকে মন্দির ধ্বংসের সব থেকে বড় তকমা দিয়ে মিথ্যাপ্রচারের মাধ্যমে ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা করে, সেই ঔরঙ্গজেবও যে তাঁর শাসনকালে বহু মন্দির নির্মাণ করেছেন, বহু মন্দিরকে সংস্কার ও নানা ভাবে সহযোগিতা করেছেন তার কিছু দৃষ্টান্ত নীচে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। এই ক্ষেত্রে বিখ্যাত ঐতিহাসিক Audrey Truschke দক্ষিন এশিয়ার উপর নানা গবেষণার কাজ করেছেন। তিনি রাটগার ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক। মোঘল শাসনের সময়কাল নিয়ে গবেষনার কাজে স্মরনীয় হয়ে আছেন তিনি তাঁর ‘AurangaZeb- the man and the myth’ গ্রন্থের জন্য। এই গ্রন্থে তিনি ঔরঙ্গজেবের আমলে মন্দির ধ্বংস ও নির্মাণের বিষয়ে সবিস্তারে উল্লেখ করেছেন । তিনি দেখিয়েছেন ঔরঙ্গজেবের আমলে ১৬৫৯ সালে বেনারসে যখন কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্রাহ্মণদের উপর নানা অত্যাচার শুরু করেছিল তা জানতে পেরে ঔরঙ্গজেব স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে এক ফরমান জারি করেন, এবং যাতে ব্রাহ্মণ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের উপর কোনরকম অত্যাচার না হয় তার ব্যবস্থা নিতে বলেন। তিনি সেখানে পরিস্কার উল্লেখ করেন, “ you must see that nobody unlawfully disturb the Brahmin and local people………………..”। এখানেই থেমে থাকেন নি এর পর আরো কিছু নির্দেশ দেন যেমন , “ he issued dozens of orders that directed official to shield temple from unwanted interference, granted land to hindu community”.10 ঔরঙ্গজেবের শাসনের নবম বছরে তিনি আসামের গোয়াহাটির উমানন্দ মন্দির কে জমি দান করেন এবং মন্দির কর্তৃপক্ষকে ট্যাক্স আদায়েরও অধিকার দেন। ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দে তিনি আর একটি নির্দেশনামাতে সই করেন, সেখানে উলেখ করা হয় ভাগবত গোসাঁই নামে এক হিন্দু ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি যিনি বেনারসে গঙ্গারতীরে বসবাস করতেন সেখানে যাতে তিনি শান্তিতে বসবাস করে ধর্মীয় কাজ করতে পারেন। মাত্র একজন ব্যক্তি তিনি যাতে তাঁর ধর্ম কর্ম শান্তিতে করতে পারেন সে আবার শাসকের ধর্ম নয় অন্য এক ধর্মের, তার জন্য ভারতের সম্রাট নির্দেশ দান করছেন তা ধর্মীয় উদারতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

এছাড়াও ঔরঙ্গজেব যে সমস্ত মন্দির নির্মান করেছিলেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দির ,চিত্রকুটের বালাজি মন্দির, গুয়াহাটির উমানন্দ মন্দির, সরঞ্জয়ের জৈন মন্দির। এছাড়াও বহু মন্দির কে তিনি সংস্কার করতে সাহায্য করেছেন। ঔরঙ্গজেব সোমেশ্বরনাথ মহাদেব মন্দিরের কাজকর্ম যাতে সুন্দর ভাবে পরিচালিত হয় সেই জন্য মন্দিরের নামে একটি জাগির দান করেছিলেন এবং নগদ অর্থও দিয়েছিলেন। বেনারসের জঙ্গমবাদী শিব মন্দিরকে এক ফরমান জারি করে একটি জাগির দান করেছিলেন। এখানকার এক মহন্ত যিনি মূলত ধর্মকর্ম নিয়ে থাকতেন তাকে নানা ভাবে অত্যাচার করার জন্য নাজির বেগ নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ১৬৭২ সালে ১৩ জুলাই ঔরঙ্গজেব এক ফরমান জারী করেন। এছাড়াও ১৭৮ বিঘা জমি তিনি দান করেছিলেন এই মন্দিরের নানা নির্মাণ কাজের জন্য। উজ্জ্বয়িনীর মহাকালেশ্বর শিবমন্দিরে সারা দিন-রাত্রি ধরে যে একটি দ্বীপ জ্বলতে থাকে তার জন্য প্রতিদিন চার সের ঘির প্রয়োজন হয়। মন্দির কর্তৃপক্ষের পক্ষে এই ঘি জোগাড় করা নিয়ে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছিল, ঔরঙ্গজেব যখন এই কথা শুনতে পেলেন সঙ্গে সঙ্গে সেই মন্দিরে যাতে এই দ্বীপ জ্বালানোর জন্য কখনো ঘি-এর কোনো সমস্যা না হয় সেই জন্য পুরো ঘি তিনি দান করলেন ।১৩ ১৬৯১ সালে তিনি চিত্রকুটের বালাজী মন্দিরকে আটটি গ্রাম ও সমপরিমাণ জায়গা মহন্ত বালাক দাস নির্বানীর নামে দান করেছিলেন । ১৬৯৮ সালে মধ্যভারতের দক্ষিন খান্দেশের ব্রাহ্মণ রঙ ভট্টকে করমুক্ত জমি দান করেছিলেন। একইভাবে জৈনধর্মের মানুষদের কল্যানেও নানা উন্নয়ন মূলক কাজ করে গেছেন।

0 Comments

Post Comment