পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

আমার বন্ধু মীর

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 202 view(s)
  • লিখেছেন : শুভমন
মীর আমার বন্ধু। যার বাড়ি মুর্শিদাবাদ। সময়টাই সহজ ছিল তখন। আমাদের সকাল কেটেছে বিলাস খান-ই তোড়িতে, তো বেলা গড়িয়েছে বৃন্দাবনী সারং-এর সুরে। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়ে ফেলেছি মুজতবা আলী থেকে ধূর্যটি প্রসাদ। আমাদের কান পেকেছে বিলায়েত খাঁ - রবিশঙ্করে। মন কেমনের দুপুরগুলোয় সঙ্গ দিয়েছে জীবনানন্দ - আল মাহমুদ। সন্ধের দখল নিয়েছে দীপ্তি নাভাল - ফারুক শেখ। সেই বড় হয়ে ওঠা, সেই চেনা মানুষেরা যখন চোখের সামনে বদলে যান, তখন অসুবিধা হয়।

মীর আমার বন্ধু। পালোয়ান পরিবৃত সেলিব্রিটি নন। মীর রাকেশ রৌশান। মীর আমার বন্ধু। তবে মীরের দোস্তি আজও আমার হল না আদায়। 

আমার ভালো করে জ্ঞান হওয়ারও আগে বাবা একখানা চার পায়াওলা কাঠের শাটার টানা বাক্সবন্দী সাদাকালো টিভি কিনে এনেছিলেন। পাড়ার সবাই মিলে বসে তাতে এটা সেটা দেখতাম। শীতের মরশুমে ওতে চলত টেস্ট ক্রিকেট। বুঁদ হয়ে থাকতাম খেলাটায়। ছেলেবেলায় আমি কখনও ওয়ার্ড বুক দেখে এ ফর অ্যাপল শিখিনি, লাল মেঝেয় খড়ি দিয়ে লিখতে শিখেছিলাম এ ফর আজহার উদ্দিন। সময়টাই শরিফ ছিল। ইমরানের ওভার বাউন্ডারি দেখে হুংকার নয়, হাততালিতে ফেটে পড়ত ইডেন গার্ডেন্স। ক্রিকেটের নেশাটা বজায় ছিল বেশ বড় বয়স অবধি। কলেজ হস্টেলে ঘরের দেয়ালে টাঙানো থাকত ওয়াসিম আক্রমের পোস্টার। তাতে চোখ পড়লে সহপাঠীদের মুখগুলো চকচক করে উঠত। ঢাকা থেকে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে পড়তে এসেছিল মহম্মদ তারেক হোসেন। মনে আছে ওর সঙ্গে সে বার এক থালায় ভাত খেয়েছিলাম। কই অন্যরকম তো লাগেনি কিছু! সায়ক, পৃথ্বীরাজ, মোবাস্সার, আফজল, অরিজিৎ, ইমানুল সবাই সহপাঠী ছিলাম আমরা। কাউকে আলাদা মনে হয়নি তো  কোনো দিন! বইয়ের তাকে সচ্ছন্দে পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে সালেম আলী আর অজয় হোম। পাখি চিনতে সমস্যা হয়নি বিলকুল! 

মীর আমার বন্ধু। যার বাড়ি মুর্শিদাবাদ। সময়টাই সহজ ছিল তখন। আমাদের সকাল কেটেছে বিলাস খান-ই তোড়িতে, তো বেলা গড়িয়েছে বৃন্দাবনী সারং-এর সুরে। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়ে ফেলেছি মুজতবা আলী থেকে ধূর্যটি প্রসাদ। আমাদের কান পেকেছে  বিলায়েত খাঁ - রবিশঙ্করে। মন কেমনের দুপুরগুলোয় সঙ্গ দিয়েছে জীবনানন্দ - আল মাহমুদ। সন্ধের দখল নিয়েছে দীপ্তি নাভাল - ফারুক শেখ। আমাদের ক্যাসেট প্লেয়ারে বন্দিশ তুলেছে শিবকুমার - জাকির হুসেনের যুগলবন্দী। প্রেমে পড়ে ডুব দিয়েছি মিঞা কি মলহারে। আমাদের রবীন্দ্রনাথ - লালন - নজরুল - জয়দেব। আমাদের রোমাঞ্চ জাগানো রফি - কিশোর, মিছিল জোড়া হেলাল হাফিজ, স্বপ্ন জুড়ে নাজিম হিকমত। কত বড় বয়স অবধি জানতামই না মহামেডান স্পোর্টিং আসলে মহম্মদে বিশ্বাসীদের ক্লাব। 

 মীর আমার বন্ধু। তবু মীরের বন্ধুতা আজও আমার আদায় হল না। মীর রাকেশ রৌশান। যার বাবার নামের শেষে ইসলাম আছে, মায়ের নামে বেগম। এ জীবনে সবচেয়ে বেশি মিস করি যাকে বড় হয়ে জেনেছি সেই "বাবা" ডাকটাও আদতে ইরানি শব্দ। "হিন্দু" কথাটাও যেমন পারস্যের দান। দেখেছি মহাদেবের মাথায় যেমন এক ফালি চাঁদ, ঈদের আগে চাঁদরাতেও তাই। আমাদের জাতীয় পতাকাতেও সবুজ আর গৈরিক, মাঝখানে যা দুহাত মেলে ছুঁয়ে আছে শান্তির সফেদ। আমাদের ঈশ্বর আল্লাহ তেরো নাম সবকো সম্মতি দে ভগবান। সংবিধানের প্রস্তাবনা পড়ে শিখেছিলাম এ দেশটা সেকুলার আর সমাজতন্ত্রী। ফেসবুকেতে লগ ইন করে জানলাম মাকু-সেকু নাকি গালি বিশেষ। 

 মীর আমার বন্ধু। কিন্তু মীরের বন্ধুতা আর হইল না আদায়। নির্বাচনের ফল বের হল যেদিন, সারাদিন মীর ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। জন্মাবধি এত এত অবহেলা, আমাদের এত পৃথকবোধ ওকে মুখ ফেরাতে বাধ্য করেছে এই বাছবিচারের সমাজ থেকে। অথচ লাখ লাখ মানুষ সেদিন চোখের পাতা এক করতে পারেনি। লাখ লাখ মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারছে না এখনও। তুই একা না মীর। ফ্যাসিস্টের চোখে আমরা সবাই সংখ্যালঘু। আমরা সবাই অপনাগরিক। আমার মায়ের জন্ম ঢাকা জেলার ধামরাইল গ্রামে। শৈশবেই চিরদিনের মতো কলকাতায় চলে আসেন। পরে আর কোনো দিন সেখানে বেড়াতেও যাওয়া হয়ে ওঠেনি তাঁর। সেই মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীর ফেসবুক পোস্টে দেখি আমারই ছেলেবেলার সহপাঠী এসে হিন্দুত্ববাদী মন্তব্য লিখে যায়, "দেশভাগের পর (ও দেশ থেকে মায়ের) চলে আসাটা বোকামি। ওখানে কত শান্তিতে ভাই-ভাই হয়ে থাকা যেত।" আর তাতে লাইক দিয়ে যায় আরও দুই "বন্ধু"! 

 কিন্তু মীর, আজ আমার ক্ষমা চাওয়ার দিন। তোর উদাসীনতার দায় আমার। তোর যন্ত্রণার দায়ভার আমার। আমাদেরই ছুতমার্গ রোজ একটু একটু করে তোকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। আমাদেরই বিদ্রুপ তোকে সহনাগরিকের সম্মান দেয়নি। আমরা কোথায় ফেল করলাম জানিস? আমাদের ধমনী জুড়ে যে রক্ত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত তা ব্রাহ্মণ্যবাদী পুরুষতন্ত্র আর ঔপনিবেশিক হ্যাংওভারের ফিউশান। আমাদের চামড়ার ওপর ভদ্রবিত্তের পুরু পলেস্তারা। আমাদের কোটিং জুড়ে নাগরিক নিকোটিন। পত্রিকার সম্পাদকের বোধ সম্পর্কে তুই আক্ষেপ করেছিস যে তার কাছে মীর রাকেশ রৌশান কোনো ফেরিওয়ালার নাম হতে পারে, কিন্তু কবির নাম হয়ে ওঠে না। এদিকে আমরা লিটিল ম্যাগের পুজো সংখ্যায় কবিতা ছাপিয়ে দিব্যি কব্জি ঘুরিয়েছি। লেখা হয়নি কোনো ঈদ সংখ্যায়। আমরা শ্রেণি শত্রুকে চিনে রাখার ডাক দিয়ে ভাষণ ভরিয়েছি আর কায়মনবাক্যে চেয়েছি তামাম শহরের ফুটপাত, মায় রেল স্টেশন অবধি হকারমুক্ত হোক। আমরা স্থানীয় কথন ( ডায়ালেক্ট ) শুনে খিল্লি করেছি। কলকাতাকে ধরে নিয়েছি সাহিত্যের স্বর্গরাজ্য। আর কতিপয় ব্যতিক্রম বাদ দিলে হয়ে গেছে সে সাহিত্য মাফিয়াদের বিচরণ ভূমি। আমাদের কাছে মহার্ঘ ভাতা প্রতীক্ষা, আর প্রান্তিক মানুষের জন্য প্রকল্পগুলি ভিক্ষা। সমবেত গেয়েছি আমরা সর্বহারাদের গান আর "বস্তির মেয়ে" বলে গাল পেড়েছি তাঁকে। আমরা হিটলার থেকে হিরোশিমা, মুসোলিনি থেকে নেতানিয়াহু, ট্রাম্প থেকে পুতিন দেখেছি। দেখেছি ব্রাজিলের প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধান জাইর বলসোনারোকে যিনি পুঁজিবাদী মুনাফার লালসায় নির্দ্বিধায় পুড়িয়ে দিলেন আমাজন বৃষ্টি বনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। আমরা দেখেছি গোধরা থেকে মনিপুর। আর এসব দেখেও চোখ বন্ধ করে এঁড়ে তর্কে মেতে থেকেছি সন্ত্রাসবাদী মানেই নাকি মুসলমান। ছেলে বন্ধুকে হ্যাটা করেছি "মেয়েদের থেকেও অধম" বিশেষণে। সংখ্যাগুরু লিঙ্গ না হলেই বলে উঠেছি "সখী"। নিজেরা ল্যাংটো থেকেও তোকে বলেছি "কাটা"। দলিত দেখে নাক সিঁটকেছি - "ফ্যামিলি ম্যাটার্স ভাই"। আর বিয়ের বাজারে মেয়ে খুঁজেছি ফর্সা। 

 আমরা এসআইআরকে ভালো বলেছি। ফ্যাসিস্টকে বলেছি এ তো কোনো ফ্যাসিস্টই নয়, ফ্যাসিস্টের উপসর্গ মাত্র। নির্বাচন পরবর্তী সন্ত্রাস প্রসঙ্গে ১১-কে ভুলতে পারিনি অতএব মান্যতা দিয়েছি ২৬-কে। তাই লেনিন মূর্তি ভাঙাগুলো কোল্যাটারাল ড্যামেজ। সিধু কানু তো নেগলিজিবল। আমাদের জাতির পিতা কমরেড (সাম্মানিক) রতন টাটা, জাতীয় হবি আইপিএল, উচ্চশিক্ষা মানে ইঞ্জিনিয়ারিং, আর ইতিহাস মানে বলিউড। কেউ প্রশ্ন তুললেই দাগিয়ে দিয়েছি, এ তো দ্বন্দ্বমূলক "প্রতি"-বাদ। নিতান্ত ঘটনাচক্রে পেয়ে যাওয়া প্রিভিলেজ্ড যাপন আমাদের বুঝতে দেয়নি যে এই তথাকথিত ভালো থাকা আসলে হাজার হাজার মানুষের খারাপ থাকার বিনিময়ে অর্জিত। আমাদের প্রাপ্তিগুলোই অপ্রাপ্তির উৎস। 

 মীর আমার বন্ধু। দিনের পর দিন বন্ধুদেরই ছোঁড়া অপমানগুলো ছায়াসঙ্গী হয়ে উঠেছে যার। আমরাই তোকে অন্য বানিয়ে ফেললাম, হতে দিলাম না অনন্য। আসলে আমরা ভেবেছিলাম বানানোর হকদার কেবল বুঝি আমরাই। আমরা তোকে আগলে রাখলাম না ঠিকই, কিন্তু জানিস মীর, এখনও মানুষ আছে যারা তোকে আঁকড়ে রাখবে। এখনও মানুষ আছে যারা তোকে মুসলিম নয়, মানুষ ভাবে। তারা সংখ্যালঘু নয়, তারাই সংখ্যাগুরু। আর সংখ্যালঘু কারা জানিস? এদেশের সম্মিলিত সম্পত্তির চল্লিশ শতাংশ বগলদাবা করে বসে আছে দেশের এক শতাংশ মানুষ। তাদের মধ্যে আবার ১ হাজার কোটি টাকার বেশি সম্পত্তির মালিক মাত্র ১৬৮৮ জন, যাদের মিলিত সম্পত্তি ১৬৬ লাখ কোটি টাকার বেশি। তাদেরই টাকায় রাজনৈতিক দলগুলি ক্ষমতায় আসে যায়, বিনিময়ে তাদেরই বরাত জোগায়। তারাই আদতে সংখ্যালঘু। যারা আমাদের জল জঙ্গল জমিনের অধিকার কেড়ে নিতে চায় বলে আমাদেরই মাতিয়ে রাখে এই ছুতমার্গের ছোঁয়া-না-ছুঁইয়ের খেলায়। আর উল্টো দিকে সরকারি হিসেব অনুযায়ী দেশের প্রায় ৮ কোটি মানুষ (৫.৩%) দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করেন। বেসরকারি ( ২০২৫-এ রিভিউ অফ অ্যাগ্রেরিয়ান স্টাডিজে প্রকাশিত রিপোর্ট ) মতে স্বাস্থ্য শিক্ষা খাদ্যের ক্রয় ক্ষমতার মাপকাঠিতে দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা এ দেশে প্রায় ৩৯ কোটি (২৬. ৪%)। এই খেটে খাওয়া মানুষগুলোই প্রকৃত সংখ্যাগুরু। সংখ্যালঘু তারা যারা নিজেদের ফায়দা তোলার জন্য বিভাজনের বিষ ছড়িয়ে দেয় সমাজের আনাচে-কানাচে। আর আমরা সুতোর টানে নাচি। 

পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় মার্কসের এলিয়েনেশান তত্ত্বের অনুরূপ বিচ্ছিন্নতা দেখা যায় এখানে। আমাদের মতো ভদ্রবিত্তদের হাতে উৎপন্ন এই সামাজিক বিভাজনের প্রকৃত পরিণতি সম্পর্কে দিনের শেষে আমরা এলিয়েন তথা বিচ্ছিন্ন। সামাজিক বিভাজনের মন্থর বিষক্রিয়ার সুচারু পদ্ধতিটি সম্পর্কেও আমরা এলিয়েন। আমাদেরই সহনাগরিকের বিভাজনবোধ, তার অসহায়তা সম্পর্কে আমরা এলিয়েন। এবং সর্বোপরি বিভাজনের খেলায় মত্ত হয়ে আমরা আমাদের নিজেদের অসীম সম্ভাবনা, নিজেদের প্রকৃত হক থেকেই এলিয়েন হয়ে গেলাম। এই এলিয়নেশানের প্রাচীর ভাঙতে না পারলে এই বিভাজনকে নির্মূল করতেও অপারগ থেকে যাবে ভদ্রবিত্ত সমাজ। এ থেকে মুক্তির দিশা দেখাতে পারে শ্রমজীবী মানুষেরাই। সংকটের সঙ্গে যাঁদের নিত্য সহবাস। জীবন সংগ্রামের প্রকৃত সংকট প্রত্যক্ষ করেনি যে, সে আবার সংগ্রামের ইতিহাস গড়তে পারে নাকি? জীবন সংগ্রামে ভদ্রবিত্তের তেমন সংকট নেই বলেই বিভাজনের বিলাসিতায় আত্মতৃপ্তিতে সে দিন গুজরান করতে পারে। দিন আনি দিন খাই মানুষের কাছে তা অকল্পনীয়। তাঁর সংকট নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানির যোগানে আকস্মিক ভাঁটা। সাম্প্রদায়িকতার সুড়সুড়ি তাঁর কাছে সংকট পয়দাকারী কোনো কমোডিটি নয়। নিরন্তর শ্রমের মধ্যে দিয়ে সমাজকে সচল রেখেছেন যাঁরা, অবিরাম সাফাই করে চলেছেন যাঁরা সমাজের কলুষতা, কুলীন সমাজের বিষ দাঁত একদিন উপড়ে ফেলবেন তাঁরাই। অবহেলা আর ঘৃণার বিপরীতে ভালোবাসার নিশান দেখাবেন তাঁরাই। প্রগতিশীলতার মেকি পুলওভার চাপিয়ে নেওয়ার কোনো তাগিদ নেই যাঁদের। অমলতাস সাজার বিলাসিতা নেই যাঁদের, আত্মসম্মান নিয়ে যাঁরা বাঁদরলাঠিতেই বেশ আছেন। 

 পুনশ্চ  :  বাংলার একটি পরিচিত গাছ বাঁদরলাঠি। রবীন্দ্রনাথ তার নতুন নাম রেখেছিলেন অমলতাস।

0 Comments

Post Comment