সমুদ্রপৃষ্ঠের জলস্তরের দ্রুত বৃদ্ধি ও বদ্বীপের অস্তিত্ব সংকট নিয়ে সম্প্রতি জাতিসংঘের উদ্যোগে একটি উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই সম্মেলনে ‘সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ ও মোকাবিলার পথ’ (Rising Sea Levels: Challenges and Pathways forward) শীর্ষক একটি প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। জাতিসংঘের সদ্য প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু সংকটের এক নির্মম ও ভয়াবহ বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। প্রতিবেদনে সমুদ্রের জলস্তর দ্রুত বেড়ে যাওয়াকে মানব সভ্যতার টিকে থাকার পক্ষে চূড়ান্ত ‘Threat Multiplier’ বা সর্বনাশা অনুঘটক বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পৃথিবীব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতি বছর গড়ে ৪.৭ মিলিমিটার করে বাড়লেও, ২০২৪ সালে তা লাফিয়ে রেকর্ড ৫.৯ মিলিমিটারে গিয়ে ঠেকেছে—যা স্পষ্ট করে দেয় যে জলস্তর এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভয়ংকর গতিতে বাড়ছে। শতাব্দীর শেষ অর্থাৎ ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রের জলস্তর কমপক্ষে ০.৫৫ মিটার থেকে শুরু করে চরম পরিস্থিতিতে ১ মিটার বা তারও বেশি উঁচুতে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে; আর কার্বন নিঃসরণ বর্তমান হারে চলতে থাকলে এই বৃদ্ধি প্রায় ২ মিটারে গিয়ে ঠেকতে পারে। এই মুহূর্তে বিশ্বের প্রায় ৭৭ কোটি মানুষ (অর্থাৎ প্রতি ১০ জনের একজন) চরম বিপদের মুখে রয়েছেন; কারণ সমুদ্রের সাধারণ জোয়ারের রেখা থেকে মাত্র ৫ মিটারেরও কম উচ্চতায় তাঁরা বসবাস করছেন, ফলে সামান্য জলস্তর বৃদ্ধি বা জলোচ্ছ্বাসের ঘটনা ঘটলে তাঁদের জনপদ চিরতরে জলের তলায় তলিয়ে যেতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান তিনটি উপকূলীয় মেগাসিটি—কলকাতা, মুম্বই এবং ঢাকা—বর্তমানে চরম পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল নিষ্কাশনের ফলে মাটি বসে যাওয়ার কারণে শহরগুলো ‘ডাবল জেপার্ডি’ বা দ্বিমুখী সংকটে পড়েছে। ঢাকার নিচু জলাভূমি ভরাট হয়ে জলাবদ্ধতা, কলকাতার পুরোনো নিকাশি ব্যবস্থা অচল হওয়া এবং মুম্বইয়ের রক্ষাপ্রাচীর ভেঙে পড়ার মতো তীব্র পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই শহরগুলোর ১ কোটি ৪০ লক্ষেরও বেশি মানুষ স্থায়ী জলমগ্নতা ও বাস্তুচ্যুতির মুখে রয়েছেন; বিশুদ্ধ পানীয় জলের সংকট বাড়ার পাশাপাশি ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ জলবায়ুজনিত কারণে বাস্তুচ্যুত হতে পারে। উপকূলীয় অবকাঠামোর ক্ষতি ইতিমধ্যে ১.৮ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং দ্রুত অভিযোজন পদক্ষেপ না নিলে বার্ষিক বিশ্বব্যাপী ক্ষতি ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। উন্নত বিশ্বের শহরগুলোর (যেমন: মিয়ামি, নিউ ইয়র্ক, গুয়াংঝু) উপকূলীয় অঞ্চলে ২ থেকে ৩.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সম্পদ সরাসরি হুমকির মুখে।
সমুদ্রের এই অবিরাম জলস্তর বৃদ্ধির মূলে রয়েছে বিশ্ব উষ্ণায়নের তিনটি প্রত্যক্ষ প্রভাব। প্রথমত, মেরু অঞ্চল ও পর্বতচূড়ার বরফ ও হিমবাহ দ্রুত গলে সমুদ্রে প্রচুর বাড়তি জল যোগ করছে। দ্বিতীয়ত, সমুদ্রের জলের ‘তাপীয় প্রসারণ’—জল গরম হলে যেহেতু তার আয়তন বাড়ে, তাই উত্তপ্ত মহাসমুদ্রগুলো উপকূলে আগের চেয়ে বেশি জায়গা দখল করে নিচ্ছে। আর তৃতীয়ত, গ্রিনহাউস গ্যাসের তৈরি অতিরিক্ত তাপের প্রায় ৯১ শতাংশই শুষে নিচ্ছে মহাসমুদ্র, যা সমুদ্রের জলস্তরকে ক্রমাগত আরও ওপরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে বিপদ
সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; চোখের সামনে ঘটতে থাকা এক নির্মম বাস্তবতা। বরফ গলে যাওয়া আর জলের আয়তন বাড়ার ফলে এই সংকট আজ মানুষের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছে। এরই রেশ ধরে পানীয় জলে নোনা জল মেশা এবং পয়োঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মতো সমস্যাগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ।আর দীর্ঘমেয়াদে উর্বর কৃষিজমি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় হুমকির মুখে পড়ছে খাদ্য নিরাপত্তাও। অর্থনৈতিক ক্ষতির অঙ্ক ছাড়িয়ে এই বিপর্যয় কেড়ে নিচ্ছে মানুষের আশ্রয় ও মৌলিক মানবাধিকার। ভিটেমাটি হারানোর এই গভীর যন্ত্রণা মানুষের মনে বয়ে আনে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষত, আর চিরতরে মুছে দিচ্ছে এক একটি জনপদের শতবছরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা হলো, যেসব ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র বা উন্নয়নশীল দেশ এই উষ্ণায়নের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী, তারাই আজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। অথচ এই সংকট সামলানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে যেখানে বছরে ৩১০ থেকে ৩৬৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, সেখানে ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক সহায়তা মিলেছিল মাত্র ২৬ বিলিয়ন ডলার।
এই বিপর্যয় সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষির ওপর। জমিতে নোনা জল ঢুকে মাটির লবণাক্ততা একধাক্কায় বহুগুন বাড়িয়ে দেয়, ফলে ধান, পাট কিংবা শাকসবজির ফলন একপ্রকার বন্ধ হয়ে যায়। সেচের জলও নোনা হয়ে পড়ায় উর্বর ক্ষেতগুলো ধীরে ধীরে অনুর্বর পতিত জমিতে রূপ নেয়। আয়-রোজগার হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়া অনেক কৃষক তখন শেষ সম্বল হিসেবে চাষের জমিকে বাণিজ্যিক চিংড়ির ভেড়িতে বদলে ফেলেন, যা মাটিকে দীর্ঘমেয়াদে আরও বিষাক্ত ও অকৃষিযোগ্য করে তোলে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা কিংবা মেকং বদ্বীপের মতো অঞ্চলগুলো হলো একেকটি দেশের প্রধান ‘শস্যভাণ্ডার’; ফলে এই উর্বর এলাকার কৃষিব্যবস্থা ধসে পড়লে তা পুরো দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও জোগান শৃঙ্খলকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
জলোচ্ছ্বাসের এই কুপ্রভাব কেবল কৃষি বা গ্রামীণ অর্থনীতিতেই আটকে নেই, তা সামুদ্রিক সম্পদভিত্তিক অর্থনীতি বা ‘ব্লু ইকোনমি’কেও (সমুদ্র ও জলাশয়ের বাস্তুতন্ত্রকে অক্ষুণ্ণ রেখে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য সামুদ্রিক সম্পদকে কাজে লাগানোর কৌশল) পঙ্গু করে দিচ্ছে। সমুদ্রের জল ক্রমশ গরম ও অম্লীয় হয়ে ওঠায় প্রবাল প্রাচীর ও মাছের প্রজননক্ষেত্রগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এতে করে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা কোটি কোটি মানুষ যেমন রোজগার হারাচ্ছেন, তেমনই আন্তর্জাতিক মৎস্য বাণিজ্যও গভীর সংকটে পড়ছে। পাশাপাশি জলস্তর বৃদ্ধি ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে একের পর এক উপকূলীয় পর্যটনকেন্দ্র তলিয়ে যাচ্ছে, আর চট্টগ্রাম, কলকাতা কিংবা মুম্বইয়ের মতো বড় বড় সমুদ্রবন্দরের পরিকাঠামো জলে ভেসে যাওয়ায় সামুদ্রিক পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে মাছ ধরা, উপকূলীয় পর্যটন এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের মতো বিরাট সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাতগুলো আজ শত শত বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
তবে এই সংকটের আঘাত কেবল অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি বা জিডিপির হিসেব-নিকেশে আটকে নেই; তা সরাসরি আছড়ে পড়ছে উপকূলের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ওপর। সমুদ্রের জল বাড়ার সাথে সাথে জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কায় মাটির নিচের পানীয় জলের স্তরে নোনা জল ঢুকে পড়ছে, যা চিরতরে নষ্ট করে দিচ্ছে পানীয় জলের উৎসগুলোকে। ফলে সুন্দরবন বা দক্ষিণ এশিয়ার নিচু বদ্বীপের মহিলাদের একটু পানীয় জলের জন্য প্রতিদিন মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়—খরা বা সাইক্লোনের সময় যে দুর্ভোগ পৌঁছে যায় চরম সীমায়।
আর পানীয় জলের এই হাহাকার ডেকে আনছে এক চরম স্বাস্থ্য সংকট। একদিকে, ভালো জলের অভাবে নোংরা ও দূষিত জল খেতে বাধ্য হওয়ায় ডায়রিয়া ও কলেরার মতো রোগ ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, বাধ্য হয়ে নোনা জল খেয়ে মানুষের শরীরে বাসা বাঁধছে দীর্ঘমেয়াদি নানা ব্যধি। জলে অতিরিক্ত লবণের কারণে উপকূল জুড়ে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এর সবচেয়ে নিষ্ঠুর শিকার হচ্ছেন গর্ভবতী মহিলারা—তাদের মধ্যে ‘প্রি-এক্লাম্পসিয়া’-র মতো প্রাণঘাতী জটিলতা আশঙ্কাজনকভাবে দেখা দিচ্ছে। শেষমেশ, একদিকে জীবিকা হারানোর অনিশ্চয়তা আর অন্যদিকে ক্রমাগত এই শারীরিক যন্ত্রণা মিলে মানুষের মনকে ঠেলে দিচ্ছে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অবসাদে।
এই পরিবেশগত বিপর্যয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে জোগান কমে যায়, আর তাতেই খাদ্যপণ্যের দাম একধাক্কায় আকাশ ছুঁয়ে ফেলে। কৃষি ও পশুপালন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শিল্পের কাঁচামালের দাম যেমন বাড়ে, তেমনই জলমগ্ন রাস্তাঘাট ও পরিকাঠামো মেরামতের বাড়তি খরচ যুক্ত হয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। আবার নোনা জল শোধন করে পানের উপযোগী করতে ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট বসানো কিংবা দূর থেকে পাইপলাইনে জল আনার পেছনে সরকারের বিপুল খরচ হয়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয় এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতায় টান ফেলে।
পরিশেষে বলা যায়, কৃষিজমিতে নোনা জল ঢোকা কিংবা পানীয় জলের অভাব কেবল গ্রামীণ সমস্যা নয়; এটি একটি শৃঙ্খল বিক্রিয়া বা চেইন রিঅ্যাকশনের মতো কাজ করে। প্রথমে খাদ্য উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতি ধ্বংস করে, এরপর জনস্বাস্থ্য ভেঙে দেয় এবং পরিশেষে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে পুরো দেশকে মুদ্রাস্ফীতির জালে আবদ্ধ করে।
সংকট উত্তরণের সমাধান
জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন কেবল সংকটের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেই থেমে থাকেনি, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের অবধারিত ধাক্কা সামলাতে এবং উপকূলীয় জনজীবন রক্ষা করতে সুনির্দিষ্ট কিছু টেকসই পথ ও কৌশলগত রূপরেখার প্রস্তাব দিয়েছে।
সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল ডেল্টা অঞ্চল ও উপকূলীয় শহরগুলোকে রক্ষার্থে গতানুগতিক কংক্রিটের বাঁধের বাইরে গিয়ে প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। লবণাক্ততা-সহনশীল ম্যানগ্রোভ রোপণ ও উপকূল জুড়ে সবুজ বেষ্টনি ( Green Wall) তৈরি করা হলে তা সমুদ্রের ঢেউয়ের শক্তি ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। এছাড়া নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং প্রাকৃতিক জলাভূমি ও বালিয়াড়ি পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত জরুরি। এর পাশাপাশি চীনের ‘স্পঞ্জ সিটি’-র ধারণা বা নেদারল্যান্ডস ও লন্ডনের মতো অটোমেটেড জলকপাট (Storm surge barrier) তৈরি করে একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
যেসব নিচু উপকূলীয় এলাকা আর রক্ষা করা সম্ভব নয়, সেখান থেকে মানুষকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ না করে তাদের সম্মতিতে, মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে নিরাপদ উচ্চভূমিতে সুপরিকল্পিতভাবে স্থানান্তর করার কথা বলা হয়েছে। যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষদের যেভাবে আন্তর্জাতিক শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার মানুষদের ক্ষেত্রেও সেই আইনি সুরক্ষার পরিধি প্রসারিত করার প্রস্তাব রয়েছে। এর পাশাপাশি তাদের নতুন আবাসন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও সংস্কৃতি রক্ষার সুনিশ্চিত ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উন্নত প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহারের মাধ্যমে পৃথিবীব্যাপী ও আঞ্চলিক পর্যায়ে অত্যন্ত নিখুঁত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় বা হঠাৎ জলস্তর বৃদ্ধির মতো চরম দুর্যোগগুলো আঘাত হানার আগেই যাতে উপকূলীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া যায়, সেজন্য সর্বাধুনিক আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা (Early Warning Systems) গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। সময়োপযোগী তথ্য ও সতর্কবার্তা উপকূলীয় জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি বহুলাংশে কমিয়ে আনতে সক্ষম।
সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির ফলে ভৌগোলিক অস্তিত্ব হারানোর ঝুঁকিতে থাকা ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্র ও নিচু উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর জন্য এই প্রতিবেদনে একটি অভূতপূর্ব আইনি সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। কোনো দেশের ভূখণ্ড চিরতরে জলের নিচে তলিয়ে গেলেও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যাতে সেই দেশের 'রাষ্ট্রীয় মর্যাদা' (Statehood) বিলুপ্ত না হয় এবং তাদের সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চলের (EEZ) সার্বভৌম অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে—সে বিষয়ে একটি বৈশ্বিক ঐকমত্য ও স্পষ্ট আইনি রূপরেখা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা থেকেই উন্নত ও শিল্পোন্নত দেশগুলোকে আজ এগিয়ে আসতে হবে। কারণ সমুদ্রে ডুবে যাওয়ার এই চরম ঝুঁকিতে থাকা অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশ ও ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র কার্বন নির্গমনের জন্য মূলত দায়ী নয়, অথচ তারাই আজ সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির হাত থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বাঁচাতে সেখানে জলবায়ু সহনশীল পরিকাঠামো নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে পর্যাপ্ত ও নিশ্চিত অর্থায়ন করা এখন সময়ের দাবি। সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধিকে অনিবার্য ধরে নিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকার কোনো অবকাশ নেই। ক্ষয়ক্ষতি কতটা কমিয়ে আনা সম্ভব, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আমাদের বর্তমানের সুনির্দিষ্ট ও সম্মিলিত পদক্ষেপের ওপর। এই সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে মানবজাতি এক সর্বনাশা সংকটের মুখোমুখি দাঁড়াবে।