পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

জাতধর্মের ঘোলাজলে

  • 26 December, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 247 view(s)
  • লিখেছেন : সামসুন নিহার
সাংবিধানিক নিয়ম মেনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার হস্তান্তরে হঠাৎ সবকিছু বদলে গেল। যে শক্তির হাতে মানুষ রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব তুলে দিল, সে এসে থেকেই বলে চলেছে তোমাদের বোধবুদ্ধি মেধা শ্রম সবকিছু আমাদের কাছে বন্ধক রাখো। না হলে সমূহ সর্বনাশ। আর লেখাপড়া জানা বোধবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ বলে যাদের এতদিন জানা ছিল, তারাও নিষ্পাপ ভক্তে পরিণত হচ্ছেন। লিখছেন সামসুন নিহার।

বাংলা যার মাতৃভাষা সেই বাঙালি। একটা জাতি বিশেষ। আমার মনে হতো, এটা বোধহয় আপামর সাধারণ মানুষ না জানলেও, লেখাপড়া শেখা মানুষ সেটা জানেন। তবে অভিজ্ঞতা সেই ধারণাকে নস্যাৎ করেছে। কিছু লেখাপড়া জানা মানুষ সেটা জানেন, মানেন এবং ক্ষেত্র বিশেষে মানুষকে সেই বিষয়ে সচেতন করে থাকেন। তবে অধিকাংশ মানুষই, সে লেখাপড়া জানা হোক বা না জানা, তারা ধর্ম আর জাতিকে এক করে বোঝেন। বাঙালি মানেই হিন্দু। আর মুসলমান! মুসলমান তো মুসলমানই। সে আবার বাঙালি হতে পারে নাকি!ছোটবেলায় আমি ব্যক্তিটিও এমন কথা শুনে তালগোল পাকিয়ে ফেলতাম, এই বিষয়ে আমার প্রাথমিক ধারণা দিয়েছিলেন আমার স্বর্গত দাদামহাশয়। পরবর্তীকালে এই বিষয়ে আমার পরিষ্কার জ্ঞান হয় আমার শিক্ষাগুরু স্বর্গত পিনাকীনন্দন রায় চৌধুরী মহাশয়ের কাছে।
তবুও এমন কথা বলছি কেন? কারণ ব্যক্তিগত ভাবে আমি মানুষটি এমন বহু অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ। যেখানে আমার নাম শুনে অনেককেই আমার

জাত ধর্ম গুলিয়ে বেশ বিড়ম্বনায় পড়তে দেখেছি। অনেক লেখাপড়া জানা উচ্চশিক্ষিত উচ্চপদস্থ
মানুষকে বলতে শুনেছি, ও, তুমি বাঙালি নও? তুমি মুসলিম? তোমাকে দেখে তো বোঝাই যায় না। কী আশ্চর্যের কথা ভাবুন তো! আমার ধর্মীয় পরিচয়টাও আমার গায়ে সাঁটিয়ে রাখতে হবে।এরপর যখন এক জনৈক ব্যক্তি জানতে চান আপনি বাংলায় কথা বলেন? না উর্দুতে? তখন গ্রাম থেকেএসে সদ্য মফসসলের নাগরিকে রূপান্তরিত হওয়া ব্যক্তি আমি। মহানগরের জৌলুস আর প্রগতিশীল মানুষদের উজ্জ্বলতায় আমার চোখে মনে তখনো গভীর ঘোর লেগে। এমন অবস্থায় অমন প্রশ্ন শুনে আমার মনেহয়েছিল, আমি অন্য কোনো জগতে এসে পড়েছি। এমন অভিজ্ঞতা আমার প্রথম যৌবনের মহানগরের এক বিয়েবাড়িতে। আবার অনেক সময় অনেকে সোজাসুজি জিজ্ঞেস করতে পারতো না, আমার ধর্ম কী। আমি হিন্দু, না মুসলিম। তাই তারা নানাভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, ইনিয়েবিনিয়ে জিজ্ঞেস করত তুমি বাঙালি? না, মানে, তুমি হিন্দু? আর আমার মুখে যখন শুনতো, আমি বাঙালি মুসলিম তখন তারা বিস্মিত দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে থাকতো। কারো কারো অভিব্যক্তি দেখে আমার বুঝতে অসুবিধা হত না যে, আমার উত্তর তাদের সন্তোষজনক মনে হয়নি। সত্যিই তো! তাদের দোষই বা দিই কী করে বলুন তো? তবে যখন এসকল অভিজ্ঞতা আমার মন সঞ্চয় করেছে তখন উপলব্ধি এত গভীর হয় নি। এই গভীর উপলব্ধি হলো উচ্চশিক্ষায় পদার্পণ করে।গবেষণার কর্ম, বাস্তব অভিজ্ঞতা আর উপলব্ধির গভীরতা অনেক, আরো অনেক কিছু শেখালো। নিজের চিন্তা চেতনা আরও বৃদ্ধি পেল। শিখলাম অনেক কিছু। জানলাম আরো অনেক কিছু। বুঝলামও। কেননা সেখানে গিয়ে দেখলাম মুসলমান লেখক, মুসলমান সাহিত্য, মুসলিম সাহিত্যের ইতিহাস, এমন সব সাহিত্যিক বিভাজন। জানলাম সাহিত্যেরও জাত ধর্ম হয়। বাংলার উপকরণ নিয়ে, বাংলা ভাষায় ও বাংলার মাটিতে বসে রচিত সাহিত্যেরও

বিভাজন হয় ধর্মের ভিত্তিতে। সাহিত্য-শিল্পের ও সাহিত্যিক শিল্পীর কোন জাত
হয়না,কোন ধর্ম থাকে না, এমন গালভরা কথা আমি অনেক শুনেছি। আসলে সবকিছুর মধ্যে আছে সুগভীর ও সূক্ষ্ম রাজনীতি। রাজনীতির যে বিভিন্ন স্তর, তার কোনো না কোনো স্তরের কাছে প্রতিটি মানুষ নতজানু।এখন বুঝি, গভীরভাবে বুঝি। আর এই বোঝাতেই যত গোলমাল। তবে এমন ধারণা কেবল এক পক্ষের , এমন নয়। আমার পক্ষেও আছে। তবে তার স্বরূপ ভিন্ন। ভিন্ন বলছি বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সাহিত্যিক প্রমাণের ভিত্তিতে। মনে করে দেখুন জ্যোতির্ময়ী দেবীর 'এপার গঙ্গা
ওপার গঙ্গা' উপন্যাসের কথা। উপন্যাসের পটভূমি ১৯৪৬ এর সাম্প্রদায়িক

দাঙ্গা। সেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় শারীরিক নির্যাতনের

শিকার হিন্দু সম্প্রদায়ের যুবতী সুতারা। অবশ্যই মুসলিম সম্প্রদায়ের পুরুষের দ্বারা। অথচ সেই সম্প্রদায়ের মানুষ নাজিম উদ্দিন

সাহেব যিনি সুতারার পিতার বন্ধু, তাদের পুরাতন
প্রতিবেশী। তিনি ও তাঁর পরিবার সমাজ ও নিজ সম্প্রদায়ের চোখরাঙানিকে উপেক্ষা করে নিজেদের বিপদের ভয়কে তুচ্ছ করে নির্যাতিতাকে কেবল বুকে করে
রক্ষাই করেননি। নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিয়েছেন। সেই পরিবারে থাকার সময়কালে সুতারার

উপবাস ভাঙানোর জন্য লেখক নাজিম উদ্দিন সাহেবের স্ত্রীর মুখ দিয়ে যখন বলান, " ভালো করে খাও মা, গায়ে জোর হবে।নইলে উঠতে পারবে না। তারপর একটা প্রায়শ্চিত্তির করে নিও'খন, কাকীর রান্না খেয়েছো যদি কেউ বলে"-এই উক্তি অনেক না বলা কথা বলে দেয়। যার সত্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠার কোনো
অবকাশ নেই। আবার গৌরকিশোর ঘোষের 'প্রেম নেই'

উপন্যাসের দুই সম্প্রদায়ের দুই সখী টগর ও

গোলাপফুল ওরফে বিলকিসের কথা একটু মনে করে দেখুন। যারা একই পুকুরে একই সাবান একে অপরকে
মাখিয়ে স্নান করে আর রোমান্টিক গল্প করে। তারপর সেই পুকুরের জল মাটির কলসিতে ভরে গোলাপ ফুলের পাশাপাশি পুকুর থেকে উঠে আসে টগর। তখনও পর্যন্ত টগরের জাত ঠিক ছিল, কিন্তু যেই মুহূর্তে গোলাপ ফুল তার হাতে সাবানটা গুঁজে দিল, অমনি সে বলে উঠল, "তুই এডা কি করলি ক'দিনি?

আমার কাঁখে জলের ঘড়া আর তুই আমারে ছুঁয়ে দিলি?"সে মুহূর্তে গোলাপের মুখ কালো হয়ে গিয়েছিল। এই উপন্যাসের এই অংশে পড়ে আমি শিহরিত হয়ে উঠেছিলাম। ঘোর লেগেছিল মনে। সাহিত্য আমার অভিজ্ঞতার কথা বলে! এমন অভিজ্ঞতার স্বাদ আমিও তো পেয়েছি। আমার এক নিকট বন্ধুর পাকা দেখার পনেরো দিনের মাথায় বিবাহ হয়। বাড়িতে মানুষজন এলে আদর-আপ্যায়ন, শপিং
করা থেকে তত্ত্ব সাজানো, সমস্ত কাজে বিপুল উৎসাহ আর আনন্দের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছি। কিন্তু বিশেষ এক মুহূর্তে, বিশেষ এক কাজের ক্ষেত্রে আমাকে শুনতে হয়েছিল, ওকে দিয়ে ওটা

হবে না। ওকে হাত দিতে দিস না। কোনো নির্লজ্জতা ছিল না সেই বলার মধ্যে। নিজ গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকার জন্য পাশের হিন্দু গ্রামের পাঠশালায় আমাদের যেতে হতো। সেখানে পড়তে যাওয়ার সুবাদে সেই অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়েছি। তবে এসবের পাশাপাশি প্রাপ্তিটাও কম ছিল না। বরং বলব প্রাপ্তিটাই বেশি।তবুও এসব নিয়ে একে অপরের সঙ্গে বেশ তো মিলেমিশে ছিলাম। একে অপরের ধর্মীয় বিশ্বাস, ধর্মাচরণ,সংস্কারকে যে যতটা পেরেছে সম্মান জানিয়ে, ধর্মীয় দূরত্ব বজায় রেখেও তো ভালোই ছিলাম, আরশি নগরের পরশি হয়ে। ইতিহাস ও সাহিত্যের পাতাতে ক্ষত সময়ের যে চিহ্ন আছে, মন বলতো সেই ক্ষত, সময়ের মলমে সেরে উঠবে।বাঙালি জাতি নতুন রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে। কখনো কখনো মনে হয়েছে নতুন নতুন প্রজন্মের হাত ধরে সেই সাফল্যের দ্বারে পৌঁছে যাব। কিন্তু কী আশ্চর্য দেখুন! সব কেমন তালগোল
পাকিয়ে গেল। সাংবিধানিক নিয়ম মেনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার হস্তান্তরে কেমন সবকিছু বদলে গেল। যে শক্তির হাতে মানুষ রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব তুলে দিল, সে এসে থেকেই বলে চলেছে তোমাদের
বোধবুদ্ধি মেধা শ্রম সবকিছু আমাদের কাছে বন্ধক রাখো। না হলে সমূহ সর্বনাশ। বাংলাতে সেই আঁচ প্রবলভাবে এসে লেগেছে। কী সাংঘাতিক প্রয়াস, বাংলার কৃষ্টি-সংস্কৃতি, বাংলা ভাষা এবং বাংলার সামাজিক পরিবেশের পরিকাঠামোকে তছনছ করে, বাইরের সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠার। আর কী আশ্চর্যের ব্যাপার দেখুন, অধিকাংশ মানুষই সেই খাতাতেই নাম লেখাচ্ছে। লেখাপড়া জানা বোধবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ বলে যাদের এতদিন জানতাম তাদেরও কী নিষ্পাপ ভক্তে পরিণত হতে দেখছি প্রতি মুহূর্তে। আর আমি বেচারা অসহায় হয়ে, কেবল হেঁচকি তুলছি। আর আমার মতো অবস্থা যে অনেকেরই তাও বেশ আঁচ পাচ্ছি।

লেখক আংশিক সময়ের অধ্যাপক,
চণ্ডীদাস মহাবিদ্যালয়, বীরভূম।

0 Comments

Post Comment