গত ১১ ই আগস্ট, কলকাতার রামমোহন লাইব্রেরী হলের মঞ্চে আইসা নেত্রী তথা ভবিষ্যতের উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক নেত্রী নেহা বোরার সম্বর্ধনা সভায় উপস্থিত হয়েছিলাম। উৎসাহী মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এর অন্যতম কারণ ছিল বাম ছাত্র ঐক্যের প্রদর্শন তথা অনুশীলন। যে কোন ঐক্যের সুফল হচ্ছে কমিটেড কর্মীদের বাইরে বহু সাধারণ সমর্থকও এতে সামিল হয়। যন্তর মন্তরেও ককরোচ পার্টির সাথে ছাত্র যুব ঐক্যের মিলিত আন্দোলন ও তার সাফল্যের মূল কারণ ছিল অগণিত অসংখ্য দল বহির্ভূত সাধারণ ছাত্র যুবদের খোলা মনে স্বত:স্ফূর্ত যোগদান। যে কোন আন্দোলনের সাফল্য নির্ভর করে দল বহির্ভূত সাধারণের যোগদানের উপর এবং যখন সেই আন্দোলন কোনও সম্মিলিত ঐক্য মঞ্চের চরিত্র ধারণ করে।
ঐ সভায় সবার বক্তব্যেই উঠে এসেছে বাম ঐক্যের জয়গান, লাল পতাকার জয়গান। ভালো, অবশ্যই ভালো। কারণ বাম ঐক্য অবশ্যই জরুরি। কিন্তু সেটিই কি চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য যথেষ্ট? বর্তমানে দেশব্যাপী রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যে বামেরা নির্ণায়ক শক্তির জায়গায় নেই। প্রয়োজন বিভিন্ন বিজেপি বিরোধী জাতীয় ও আঞ্চলিক শক্তির সাথে যুক্ত হবার। লিবারেশন সম্পাদক কমরেড দীপঙ্কর ভট্টাচার্য অবশ্যই বিষয়টি সম্বন্ধে সচেতন তাঁর কুশল নেতৃত্বের গুণে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ইদানিং কিছু আশার ছবিও চোখে পড়ছে।
সেই কাঙ্ক্ষিত ঐক্যের কিছু কিছু সদর্থক লক্ষণ কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে। তৃণমূল নেত্রী মহুয়া মৈত্রের উপর সাম্প্রতিক আক্রমণের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন, প্রতিবাদ করেছেন সিপিএম উচ্চতর নেতৃত্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতাই। বাঁকুড়ার ইন্দাসে সিজেপি কর্মী শেখ আব্দুল আজিজের পিতাকে যেভাবে বিজেপি গুন্ডারা পিটিয়ে মারা হয়েছে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সরব হয়েছেন বিজেপি বিরোধী প্রায় সব পক্ষই। মোদীর লালকেল্লার ভাষণে যেভাবে বিরোধীদের, বিশেষত বামপন্থীদের দিমাগী নকশাল বলে দাগিয়ে দিয়েছে তার বিরুদ্ধে কংগ্রেস দলের অতীত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী চিদাম্বরম সাহেব যেভাবে নিজেকেও ঐ দলভুক্ত করেছেন, তা যথেষ্ট উৎসাহব্যঞ্জক ঘটনা রূপেই মানুষ দেখবে, আশা করা যায়।
ফ্যাসিস্ট সরকার বলতে আমরা ভাবি, হিটলারি শাসনের অনুরূপ একটি চূড়ান্ত অত্যাচারী সরকার। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ফ্যাসিস্টদের চেহারা চরিত্রও বদলেছে। গণতন্ত্রের হাজার অক্ষমতা সত্বেও মানুষের কাছে এর চেয়ে ভালো কোন বিকল্পের সন্ধান এখনও মেলেনি। গণতন্ত্রহীন চীনের অভাবনীয় সাফল্য অবশ্য কিছু প্রশ্নের উদ্রেক করলেও সেই আলোচনা ভিন্ন এবং অন্যত্র তার সুযোগ আছে। ফ্যাসিস্ট শক্তি তার রূপ বদলে খানিক যুগোপযোগী করে নিলেও গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আকর্ষণ অবাধ। অর্থাৎ মানুষ চায়, একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রকৃত নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তারা শাসক নির্বাচিত করবে এবং সাধারণ মানুষের এই অসামান্য ক্ষমতার চাহিদা চূড়ান্ত ও আপোষহীন। বর্তমানে ফ্যাসিস্টরাও কোন সুযোগে একবার ভোটে জিতে আর ক্ষমতা ছাড়তে নারাজ। ফলে নানা অপকৌশলে ক্ষমতায় টিকে থাকতে ক্রমশ গণতন্ত্রকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয় বিরোধী শক্তিকে কোণঠাসা করে নাকাম করতে। সেই লক্ষ্যেই নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করে জোর জবরদস্তি ক্ষমতায় টিকে থাকে। মানুষের রায়ে নয়, অন্যায়ভাবে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে জোর জবরদস্তি ভোটে জিতে ক্ষমতা ভোগই এখন ফ্যাসিস্টদের নয়া পরিবর্তিত রূপ।
স্বাধীনত্তোর কালে নানা প্রকার ভালো খারাপ সরকারের শাসনাধীন আমরা হয়েছি। কিন্তু বর্তমানে মোদি শাহ জুটির সরকারের মতো জনবিরোধী শুধু নয়, গণতন্ত্র ও সংবিধানের জন্য চূড়ান্ত বিপদজনক সরকার অতীতে আমরা দেখিনি। এই সরকারের থেকে মুক্তিলাভ এক চূড়ান্ত কঠিন প্রয়াস। নানা চমকপ্রদ ঘটনা ঘটিয়ে বারংবার নির্বাচনে জিতছে এই জুটি। অথচ বিরোধীরা একজোট হতে ব্যর্থ হচ্ছে। এর এক বড় কারণ, বিজেপির আসল শক্তি আরএসএস শুধুমাত্র বিজেপিতেই নেই, ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন বিরোধী দলেই ট্রোজান হর্সের কৌশল অবলম্বন করে। এরাই ভেতর থেকে বাধা সৃষ্টি করে বিরোধী ঐক্য তথা ইন্ডিয়া জোট গঠনের সর্বনাশ করে চলেছে। ফলে জেন জির আন্দোলন যতই স্বতস্ফূর্ত হোক না কেন, ক্ষমতার পরিবর্তনের জন্য এটি যথেষ্ট নয় এবং এর সাথে ইন্ডিয়া জোটের ঐকবদ্ধতাও নিশ্চিত জরুরি।
সম্পূর্ণ কাছের থেকে দেখা ৬০ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে ধারণা করতে পারি, জেন জি'র আন্দোলন যতই জনমানসকে উদ্বেলিত করুক বা আশা দেখাক, এর সাথে বিরোধী ঐক্যের মহাশক্তি যুক্ত না হলে চূড়ান্ত সাফল্য আসবে না এবং মনে রাখতে হবে, সেটি কার্যকরী হবে পরবর্তী নির্বাচনে মানুষের চূড়ান্ত রায়ে। জেন জি ও বিরোধী ঐক্য একে অপরের পরিপূরক, অর্থাৎ কাউকে বাদ দিয়ে এককভাবে এগোনো সম্ভব নয়। একমাত্র সমস্ত মিলিত ঐক্যবদ্ধ শক্তিই পারে সাফল্যের পূর্ণতা নিশ্চিত করতে। আশা করা যায়, আগামীতে ঐক্যবদ্ধ লড়াই কিছু চোখে পড়বে এবং আশার সঞ্চার করবে।