পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

বিকশিত ভারত: কর্পোরেট ঋণখেলাপীদের স্বর্গ রাজ্য

  • 28 March, 2024
  • 0 Comment(s)
  • 618 view(s)
  • লিখেছেন : সুমন কল্যাণ মৌলিক
বিকশিত ভারত: কর্পোরেট ঋণখেলাপীদের স্বর্গ রাজ্য,সেই জন্যেই একদিকে আমরা দেখতে পাই, বিজেপি নির্বাচনী বন্ডের সাহায্যে, সেই ঋণ খেলাপীদের সাহায্য করেছে আর অন্যদিকে নিজেদের সম্পদ বৃদ্ধি করেছে। 'না খাউঙ্গা,না খানে দুঙ্গা' শ্লোগান তুলে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় এসেছিলেন। এই ঋণ খেলাপীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য বহু ঢাকঢোল পিটিয়ে ২০১৬ সালে "Insolvency and Banking proceeding for corporates and individuals " সংশোধনী পাশ করেন।কিন্তু সেই আইনের মধ্যেই কর্পোরেট তোষণের গল্পটা লুকিয়ে ছিল।

ঘটনা-১: ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে রিলায়েন্স কমুনিকেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার মধ্যে অনাদায়ী ঋণ সংক্রান্ত মামলার সমাধান করল ন্যাশানাল কাউন্সিল অব ল ট্রাইবুনাল ( এনসিএলটি)। মোদ্দা কথাটা হল আরকমের কাছে স্টেট ব্যাঙ্কের পাওনা ছিল ৪৭,২৫১ কোটি টাকা।আর কম মাত্র ৪৫৫ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা দিয়ে ঋণ খেলাপীর দায় থেকে মুক্ত হল।অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্যি যে ৯৯% ঋণ মাফ হয়ে গেল।

ঘটনা-২: এবারের নায়ক একদা দেশী কর্পোরেট জগতের পোস্টার বয় বেনুগোপাল ধূত ও তার ভিডিওকন কোম্পানি। এই কোম্পানি যখন ডুবতে শুরু করে তখন বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ও ঋণ প্রদানকারী সংস্থার কাছে ভিডিওকনের ঋণ ছিল ৬৪,৯৩৮ কোটি টাকা।কুখ্যাত বেদান্ত গ্রুপের অধীনস্থ সংস্থা টুইন টার টেকনোলজি ২,৯৬২ কোটি টাকা দিয়ে ভিডিওকনের দখল নিল।ঋণ মাফ হল ৯৫.৮৫%!

ঘটনা-৩: আরেকটি পরিচিত সংস্থা হল রুচি সয়া।এই মাঝারি মাপের কোম্পানিটির বাজারে ঋণের পরিমাণ ১২,০০০ কোটি টাকা।টাকা ধার দিয়েছিল স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া, সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া, পাঞ্জাব ন্যাশানাল ব্যাঙ্ক,স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাঙ্কের মত ব্যাঙ্কিং জগতের কেষ্টবিষ্টুরা।পতঞ্জলি গ্রুপ মাত্র ৪,৩৫০ কোটি টাকা দিয়ে রুচি গ্রুপের বিশাল সম্পত্তির মালিকানা পেল।রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলো তাদের প্রাপ্য টাকার কণিকামাত্র নিয়ে সন্তুষ্ট থাকল

হ্যাঁ,এটাই কর্পোরেট শাসিত নরেন্দ্র মোদির 'বিকশিত ভারত' । এদেশের কৃষক চাষের জন্য, বেকার যুবক তার ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করতে চাইলে তাদের বার বার ব্যাঙ্ক থেকে প্রত্যাখ্যাত হতে হয়।একটা বা দুটো কিস্তি দিতে না পারলে গরীব ও মধ্যবিত্ত মানুষের ঘরে আইনি চিঠি বা মাস্তান( চলতি ভাষায় বাউন্সার) পাঠাতে সদা তৎপর ব্যাঙ্কগুলো এ ব্যাপারে চুপচাপ থাকাই শ্রেয় মনে করেছে।প্রথমে ব্যাঙ্কের কর্তাব্যক্তিদের প্রভাবিত করে সরকারের তরফে শিল্প ও ব্যবসার নামে যথেচ্ছ ঋণ নিতে বাধ্য করা।তারপর সেই টাকায় (যা আদতে এদেশের জনগণের) কর্পোরেটরা ব্যবসা করে মুনাফার পাহাড় বানাবে,জালিয়াতি করে ব্যাঙ্কের ঋণ মেটাবে না।তারপর অবস্থা সামলাতে ১০০ টাকা ঋণ পিছু ৫-৭ টাকা দিয়ে দায় মুক্ত হবে।ততদিনে সরকারি নিয়মেই নতুন ঋণের জমি প্রস্তুত হয়ে গেছে।

'না খাউঙ্গা,না খানে দুঙ্গা' শ্লোগান তুলে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় এসেছিলেন। এই ঋণ খেলাপীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য বহু ঢাকঢোল পিটিয়ে ২০১৬ সালে "Insolvency and Banking proceeding for corporates and individuals "  সংশোধনী পাশ করেন। কিন্তু সেই আইনের মধ্যেই কর্পোরেট তোষণের গল্পটা লুকিয়ে ছিল। এই আইন মোতাবেক সমস্যা মেটানোর দায়িত্ব দেওয়া হয় এনসিএলটিকে। বলা হয়েছিল ব্যাঙ্কের টাকা উদ্ধারের জন্য ঋণের একটা অংশ ছাড়( ব্যাঙ্কের ভাষায় হেয়ারকাট) দেওয়া হবে। আর এটাকে কাজে লাগিয়ে কর্পোরেট বাস্তুঘুঘুরা গড়ে ১০০ টাকার মধ্যে ৯৫ টাকা ছাড় আদায় করে নিচ্ছে। ভন্ডামিটা আরো স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায় কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন নাটকীয় ভাবে বলেন এই ধরণের ছাড় আমরা মেনে নেব না: "Oh my god,look at the banks. They have taken this kind of a haircit....is that acceptable?  " ( ২০২২ সালে ১ অক্টোবর আইবিবিআই এর বার্ষিক সভায় অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য)।

মোদি সরকার ক্ষমতায় বসার দিন থেকে সরকারি পরিসংখ্যান ও তথ্যকে জনগণের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তথ্য সন্ত্রাসের এই যুগে তাই প্রত্যেকটা কর্পোরেট কোম্পানি কিভাবে ছাড়ের সুযোগ নিয়ে বেশিরভাগ ঋণটা মকুব করে নিয়েছে তার সম্পূর্ণ তথ্য হাতে আসা অসম্ভব। তবুও এর মধ্যে গত মাসে প্রকাশিত হয়েছে কর্পোরেট ঋণ খেলাপীদের নিয়ে পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডিং কোম্পানির ৬৭ তম রিপোর্ট। এই প্রতিবেদনে সমস্যা মেটানোর দায়িত্বে থাকা এনসিএলটির ব্যার্থতার ছবি স্পষ্ট। এখনো পর্যন্ত মোট বিবাদের মাত্র ২৫%-৩০% ফয়সালা হয়েছে। ফয়সালা অবশ্য কিভাবে হয়েছে তা এই নিবন্ধের শুরুতে উল্লেখিত উদাহরণগুলিতে স্পষ্ট। সংস্থার কর্মী সংখ্যা হওয়া উচিত ৬২ কিন্তু ৩৪টি পদ শূন্য রয়েছে।২০,০০০ টি কেসের নিস্পত্তি বাকি।ঋণ খেলাপীদের কাছ থেকে টাকা উদ্ধারের পরিমাণও এই বিকশিত ভারতে কমে গেছে। ২০১৯ সালের মার্চ থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে টাকা উদ্ধারের পরিমাণ ৪৩% থেকে কমে ৩২% হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে কোন কেসের সমাধান করতে সর্বোচ্চ ৩৩০ দিন লাগবে কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে গড়ে  ৬৫৩ দিন লাগছে যা এই সংস্থার প্রকৃত কার্যকারিতাকে সবার সামনে স্পষ্ট করে দেয়।

গোটা বিষয়টাকে যদি আমরা বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে স্থাপন করি তাহলে কর্পোরেট চক্রান্তের নকশাটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।আজকে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির প্রধান সমস্যা হল নন পারফর্মিং অ্যাসেটের ( এনপিএ) পরিমাণ বৃদ্ধি। জনগনের টাকা কর্পোরেটরা ঋণ নেওয়ার নাম করে আত্মসাৎ করছে,রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির আয় কমছে। সরকার আবার এর জন্য ব্যাঙ্কগুলিকে অযোগ্য প্রতিপন্ন করে তাদের বেসরকারি ক্ষেত্রে তুলে দেবার পরিকল্পনা করছে।বলা হয়েছিল এনপিএ সমস্যার সমাধানের জন্য এনসএলটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ফলাফল আমাদের সামনে রয়েছে।অন্যদিকে বিভিন্ন ঋণ খেলাপী সংস্থাগুলোকে অন্য কর্পোরেট সংস্থাগুলির হাতে জলের দরে তুলে দিতে এই সংস্থাটি এজেন্টের কাজ করছে। এই সরকার যেহেতু কর্পোরেট সংস্থাগুলির স্বার্থকে প্রাধান্য দেয় তাই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির ঋণ মকুবের নামে বিপুল পরিমাণ ক্ষতি সরকারের বিবেচনা মধ্যে নেই।ইলেকটোরাল বন্ড ও ইলেকটোরাল ট্রাস্টের অর্ধেকের বেশি কর্পোরেট চাঁদা কেন বিজেপির কোষাগারে জমা পড়ছে তা বোঝার জন্য কারোরই ফেলুদা হওয়ার দরকার নেই।

0 Comments

Post Comment