পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

সাঁওতাল দার্শনিক কলেয়ান মুর্মু দ্বিতীয় পর্ব

  • 03 July, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 516 view(s)
  • লিখেছেন : শামিম আহমেদ
“কলেয়ান” বা কল্যাণ-গুরু নামে একজন গ্রাচীন সাঁওতাল জ্ঞানবৃদ্ধকে ডেকে মিশনারি সাহেব তার মুখ থেকে সাঁওতালি পুরাণ-কথা এবং সামাজিক রীতি-নীতির কথা শুনে লিপিবদ্ধ করে নেন। বহু দিন ধরে এই বই ইংরেজিতে বা অশ্য কোনও ভাষায় অনূদিত হয়নি, কিন্তু সাঁওতাল ভাষা শিখে নিয়ে অনেকে এই বই ব্যবহার করে আসছেন। অবশেষে ১৯৪২ সালে বিখ্যাত সাঁওতালি-ভাষাবিদ বডিং-এর করা ইংরেজি অনুবাদ স্তেনকন সাহেবের সম্পাদনায় নরওয়ে-দেশের অস্লো শহর থেকে প্রকাশিত হয়েছে।


কলেয়ান গুরু ছিলেন মিত্র-দার্শনিক-পথপ্রদর্শক। তাঁর যে ধ্রুপদী গ্রন্থটি পাওয়া যায় সেটি ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে উত্তর-ঝাড়খণ্ডে সাঁওতাল-পরগণা জেলার দুমকার কাছে বেনাগড়িয়া গ্রামে স্কাণ্ডিনেভীয় লুখারান খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রতিষ্ঠিত ধর্মপ্রচার-কেন্দ্রের ছাপাখানা থেকে ‘স্কাণ্ডিনেভীয় মিশনারি হড়কোড়েন মারে হাপড়ামকো রেয়াঃ কথা অর্থাৎ “হড় বা সাঁওতাল জাতির পুর্ব-পুরুষদের ইতিকথা” এই নামে একখানি অতি মৃল্যবান গ্রন্থ রোমান লিপিতে ছাপিয়ে প্রকাশ করেন।এই বই থেকেই আধুনিক কালে সাঁওতালদের জাতীয় সাহিত্য, সংস্কৃতি ও দর্শনের পত্তন আরম্ভ হল বলা যায়।
“কলেয়ান” বা কল্যাণ-গুরু নামে একজন গ্রাচীন সাঁওতাল জ্ঞানবৃদ্ধকে ডেকে মিশনারি সাহেব তার মুখ থেকে সাঁওতালি পুরাণ-কথা এবং সামাজিক রীতি-নীতির কথা শুনে লিপিবদ্ধ করে নেন। বহু দিন ধরে এই বই ইংরেজিতে বা অশ্য কোনও ভাষায় অনূদিত হয়নি, কিন্তু সাঁওতাল ভাষা শিখে নিয়ে অনেকে এই বই ব্যবহার করে আসছেন।
অবশেষে ১৯৪২ সালে বিখ্যাত সাঁওতালি-ভাষাবিদ বডিং-এর করা ইংরেজি অনুবাদ স্তেনকন সাহেবের সম্পাদনায় নরওয়ে-দেশের অস্লো শহর থেকে প্রকাশিত হয়েছে। তার পরে এই বই ভারত-সরকারের জনগণনার সচিব শ্রীঅশোক মিত্র আই-সি-এস মহাশয়ের চেষ্টায় শ্রীযুক্ত বৈদ্যনাথ নামক একজন শিক্ষিত সাঁওতাল বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে ভারতীয় দর্শন ও সাহিত্যের এই মূল্যবান আকরগ্রন্থ, কোল-জাতির ধর্ম ও সমাজ বিষয়ক বেদ ও পুরাণ একাধারে যাকে বলা যায়, তার প্রকাশের কৃতিত্ব উত্তর ঝাড়খণ্ডের দুমকা অঞ্চলের কল্যাণ-গুরুর এবং নরওয়ে থেকে আগত পাদ্রি সাহেবের। কিন্তু এই গ্রন্থের প্রথম প্রকাশের প্রায় সতেরো কিংবা আঠারো বছর পরে, ধলভূম ও পশ্চিম-মেদিনীপুরের বাত্তগ্রাম অঞ্চলে, ব্রহ্মদাস টুডু মাঝি নামে এক জ্ঞানী সাঁওতাল পণ্ডিত, নিজের আগ্রহে, অনুরূপ আর একখানি পুস্তক সংগ্রহ ও রচনা করে কলকাতায় প্রকাশ করেন, আনুমানিক ১৯০৪ কিংবা ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে “খেরওয়াল বা সাঁওতাল বংশের বা জাতির ধর্ম-পুস্তক” এই নামে। এই বইয়ের একখানি মাত্র মুদ্রিত কপি ঘাটশিলায় ১৯৪৬ সালে শ্রীযুক্ত ঠাকুরপ্রসাদ ও শ্রীযুক্ত ডোমনচন্দ্র এই দুজন সাঁওতাল ছাত্রের কাছে ছিল। ধলভূমের রাজা শ্রীজগদীশ দেও ধবলদেব বাহাদুরের ম্যানেজার বঙ্কিমচন্দ্র চক্রবর্তী মহাশয়ের উৎসাহে এই প্রায়-অপ্রাপ্য বইয়ের একটি নুতন সংস্করণ ১৯৫১ সালে ঘাটশিলা থেকে প্রকাশিত হয়। বঙ্কিমবাবুর অতি শোচনীয় আকম্মিক অকাল-মৃত্যুর জন্য, এ বইয়ের প্রচার হয়নি। পরে শ্রীযুক্ত সুহৃদ ভৌমিকের আগ্রহে ও চেষ্টায় এর তৃতীয় সংস্করণ, ও তার বাংলা অনুবাদ প্রকাশের ব্যবস্থা হয় ওই ঝাড়গ্রাম থেকেই।
হড়কোড়েন মারে হাপড়ামকো রেয়াঃ কথা নামক বইতে কলেয়ান হাড়াম বলছেন, খাবার আর জলের জন্য, নারীদের সম্মান রক্ষার জন্য আমরা বিস্মৃত কাল থেকে এক জায়গা হতে অন্য জায়গায় গুটিপোকা বা সিল্ক ওয়ার্মের মতো হিজরত (মাইগ্রেট) করেছি।
এই পর্যটনের চিত্র আমরা এখনও দেখি দাশাই পরবে যা হয় দুর্গাপূজার সময়, সাঁওতাল পুরুষরা বিভিন্ন গ্রামে নেচে নেচে তাঁদের হারিয়ে যাওয়া নারীদের খোঁজেন দিকুদের মধ্যে।
কলেয়ান হাড়ামের বয়ান সম্পাদনা করতে গিয়ে বডিং সাহেব লিখছেন, ‘it is in their blood to seek fresh fields; as they are often heard to say, they have a wish to “see” land.
কলেয়ানের বয়ান থেকে বোঝা যায় যে তাঁদের আখ্যান যাযাবরদের মতো নয়। তাঁদের এই যাত্রা আসলে চিরন্তন ও ট্রাজিক এক অনুসন্ধান—যেখানে তাঁরা নিজেদের দেশ খুঁজে বেড়াচ্ছেন যা সাঁওতালদের নামে হবে। তাঁদের পূর্বপুরুষরা পর্যটন করেছেন, খুঁজেছেন, এবং জঙ্গল সাফ করেছেন এবং চার দিকে তাঁদের আপন সত্তাকে স্থাপন করেছেন, এ সত্ত্বেও বার বার তাঁদের উৎখাত করা হয়েছে, তাঁরা নতুন জায়গায় উঠে গেছেন, সেই জমিকে উৎপাদনশীল ও বাসযোগ্য করেছেন, নিজেদের ঘাম ও রক্ত দিয়ে। এইভাবে তঁদের পূর্বপুরুষরা বিচরণ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।
কলেয়ান বলছেন, “শিখর থেকে তুণ্ডি এসেছেন আমাদের অনেক মানুষ। কোথায় থাকবো আমরা? কোনও জায়গায় আমাদের থাকতে দেওয়া হচ্ছে না। শেষ অব্দি আমরা এলাম সাঁওতাল পরগণায়। আমরা আসলে খাওয়াতে এসেছি আর নিজেরা বাঁচি রেশম পোকার মতো। একদিন আমরা আবার অন্য কোথাও চলে যাব, কোথায় তা জানি না। কিছু মানুষ গঙ্গার অন্য দিকে রাজমহলে গেছেন। কে জানে ঠাকুর আমাদের এই ভাবে শাস্তি দিচ্ছেন কেন?
শুধু নতুন বাসস্থান বা দেশের খোঁজ নয়, এই অনুসন্ধান ভবিষ্যতেরও--a quest not only for new lands but also for a future ‘elsewhere’. সাঁওতালদের ঘুরে বেড়ানো বা wandering এর নানান রকম— বনের মধ্যে ঘোরা, কাঠের খোঁজ করা যা দিয়ে চাষ করা হবে, শিকারের জন্য ঘোরা, গ্রামে ঘোরা পট আর ভেসেলের খোঁজে, মহাজন ও সাহেবদের হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া জন্য ঘোরা। নতুন জায়গায় যাত্রা মানে নতুন লোকদের সঙ্গে যোগাযোগ। এ সবই একাকী নয়, একটা কালেক্টিভ প্র্যাকটিস। কলেয়ান হাড়াম বলছেন, সাঁওতালরা নিজের জন্য বাড়ি বানায় না, তারা বানায় গ্রাম এবং সেখানে তারা একত্রে এক জায়গায় বাস করে।

যে সময় মুদ্রা ছিল না, তখন নাকি কিছু কেনা বা বেচাও ছিল না। প্রয়োজনীয় জিনিস নিজেদের অর্জন করতে হত বা বানাতে হত। ...এমনকি নুনও তৈরি করতে হত লবনাক্ত জল থেকে। বনের ফল থেকে পিষে তেল বের করা নিজেদের বস্ত্র নিজেরা বানাতো…
কলেয়ান হাড়াম এই রকম ভাবে বলছেন তাঁর পূর্ব মানুষদের কথা। বলছেন নরকের গল্প, দুষ্ট আত্মার আখ্যান। সাঁওতালদের আখ্যান ব্যক্তির রচনা নয়, তা হল গোষ্ঠীর নির্মাণ। যখন সাঁওতালদের শরে সূর্য ঢেকে যায়, তখন যুদ্ধ হয় সাঁওতালদের সঙ্গে অত্যাচারীদের।

প্রথম পর্ব পড়ুন ঃ https://www.sahomon.com/welcome/singlepost/a-santhal-philosopher-kaleyan-murmu-part-1

0 Comments

Post Comment