পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

বাঙালিকে হাইকোর্ট দেখানো গেলেও, মাছের টোপ দিয়ে গেলা যাবে না

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 201 view(s)
  • লিখেছেন : সুমন সেনগুপ্ত
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে যে কয়েকটি বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হতে হবে মধ্যে সবচেয়ে বড়টি হলো, দলটি বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে অপরিচিত। শারদ্বত মুখার্জী, স্বপন দাশগুপ্ত, শমিক ভট্টাচার্য কিংবা শুভেন্দু অধিকারী এই ধারণাটির বিপরীতে অন্য ধারণা প্রচার করার জন্য এবিপি আনন্দ এবং অন্যান্য গোদী মিডিয়ার সহায়তায় তাই আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, কিন্তু তাতেও কি তাঁরা সফল হবেন? বাঙালিকে কি মাছের টোপ দিয়ে গেলা সম্ভব?

বাংলার নির্বাচন ঘোষণা হয়ে গেছে। প্রার্থীরাও নিজেদের প্রচারে বেরিয়ে পড়েছেন। কোথাও দেওয়াল লিখন, কোথাও জনসংযোগ এইভাবেই বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রচার চলছে। একদিকে নরেন্দ্র মোদীর ছবি সমেত, ‘পরিবর্তন দরকার, চাই বিজেপি সরকার’ বড় বড় হোর্ডিং এ সারা বাংলা ঢেকে গেছে, অন্যদিকে তৃণমূল তাঁদের সরকারি সহায়তার বিষয় নিয়ে প্রচার করছে। পাশাপাশি সিপিআইএম, তৃণমূল এবং বিজেপির নিজস্ব বোঝাপড়াকে সামনে রেখে পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছেন।  নানান ধরনের প্রচারের মাঝে হঠাৎ বিধাননগরের বিজেপি প্রার্থী শারদ্বত মুখার্জিকে একটি মাছ হাতে নিয়ে প্রচার চালা্তে দেখা গেল। এর মাধ্যমে তিনি জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে গেরুয়া শিবির আমিষ খাবারের ওপর কখনোই কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করবে না। শুধু তিনি নন, রাসবিহারী কেন্দ্রের যিনি প্রার্থী সেই স্বপন দাশগুপ্ত এবিপি আনন্দে দুপুরের খাওয়া চলাকালীন একটি সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময়ে বলেন, তাঁর মাছ ছাড়া চলে না। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্যও ঐ চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিছুদিন আগে বলেছিলেন, বাঙালির পাত থেকে মাছ মাংস কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। এখানেই বিষয়টা শেষ নয়, বাংলার বিধানসভার বিরোধী দলনেতার নন্দীগ্রাম কেন্দ্রের প্রচারে গিয়ে কলাপাতায় মাটিতে বসে মাছ-ভাত খাওয়ার দৃশ্যও দেখা গেল। 


“আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা ছড়ানো হচ্ছে। আমরা মাছ ও মাংস দুটোই খাব। এই অপপ্রচার বন্ধ করতেই আমি আজ মাছ নিয়ে বেরিয়েছি।” হাতে একটি বিশাল কাতলা মাছ ধরে বিধাননগরের বিজেপি প্রার্থী শ্রী মুখার্জি একথা বলেন। পেশায় চিকিৎসক এই প্রার্থী দাবি করেন যে, তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে এমন এক অর্থনৈতিক দুর্দশার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে যে, তাদের কাছে মাছ কেনারও টাকা নেই। শুধু শ্রী মুখার্জিই নন, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্যও একাধিকবার বলেছেন যে বাঙালিরা তাদের খাদ্যাভ্যাস ত্যাগ করতে পারে না এবং নিরামিষবাদ প্রচারের কোনো পরিকল্পনা দলের নেই। রাজ্য বিজেপি সভাপতি বলেছিলেন, “স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন যে মা কালী খাসির মাংস খাবেন। সমস্ত বাঙালি এবং বিহারীরা খাসির মাংস খাবে। যদি কেউ আমাকে থামাতে আসে, আমি তার মাথা ভেঙে চুরমার করে দেব।” আমিষ খাবারের বিক্রি সীমিত করার বিষয়ে বিহারের উপ-মুখ্যমন্ত্রী বিজয় কুমার সিনহার মন্তব্যের জবাবে তিনি এই মন্তব্য করেন। কিন্তু বিজেপি একটা কথা ভুলে গেছে, এই মূহুর্তে সমস্যাটা মাছ বা মাংস খাওয়ার থেকেও রান্নার গ্যাসের এবং তার নিয়মিত সরবরাহের এবং তার জন্য রাজ্য সরকার কোনওভাবেই দায়ী নয়। প্রধানমন্ত্রী যতই দেশবাসীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দিন না কেন, এই গ্যাসের দাম এবং তার  সমস্যা কিন্তু সহজে সমাধান হওয়ার নয়।  

যতই বিজেপির বাংলার নেতারা মুখে এই সমস্ত কথা বলুন না কেন, বাস্তব পরিস্থিতি কিন্তু অন্য কথা বলছে। যেখানে যেখানে বিজেপি ক্ষমতায় আছে, সেখানে সেখানে এই ধরনের মাছ খাওয়ার ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারির চেষ্টা করেছে। কয়েক বছর আগে  বলিউডের অভিনেতা পরেশ রাওয়াল একটি সভায় বলেছিলেন, যে বাঙালীরা যেহেতু মাছ খায়, তাই গ্যাসের দাম নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে খুব বেশী লাভ নেই, আসল সমস্যা, অবৈধ বাংলাদেশী এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে এবং যাঁরা মাছ খায়, তাঁদের নিয়ে। এই বক্তব্যের প্ররিপ্রেক্ষিতে, দেশের এবং বিশ্বের নানান প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালীরা একযোগে প্রতিবাদ জানান, নানান সামাজিক মাধ্যমে, যে এই বক্তব্য তো সরাসরি একটি নির্দিষ্ট ভাষাভাষী মানুষের খাদ্যাভাস নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা ছাড়া কিছু নয়। এই বক্তব্য তো তাঁদের যে ‘হিন্দি-হিন্দু- হিন্দুস্তানে’র মডেলকেই মান্যতা দেয়। একটাই ভাষা, হিন্দি, একটাই জাতি হিন্দু এবং তাঁদের একটাই দেশ হিন্দুস্তান, যেখানে হিন্দি ছাড়া অন্য কোনও ভাষায় কেউ কথা বলবে না, হিন্দু ছাড়া অন্য কোনও ধর্মালম্বী মানুষের স্থান নেই, খাদ্যাভ্যাসও হবে একইরকম, অর্থাৎ নিরামিষ। এই নিয়ে যখন বিতর্ক শুরু হয়, তখন পরেশ রাওয়াল দেখেন যে বিষয়টা অন্য দিকে যাচ্ছে, তাই তিনি আর দেরী না করে বলেন, বিতর্কটা মাছ খাওয়া নিয়ে নয়, অবৈধ বাংলাদেশী এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের যাতে চিহ্নিত করা যায়, তাই তিনি ওই কথাগুলো বলেছেন। কিন্তু প্রাথমিক ভাবে একটা কথা এসেই যায়, বাঙালীরা কিংবা সেই অর্থে যে কোনও মানুষ মাছ খাবে, কাঁটা বেছে খাবে না শুঁটকি খাবে, তা কি অন্য কেউ ঠিক করতে পারে? কোনো মানুষই কি খাবে, কি পরবে, তার অধিকার কি অন্য কোনও বহিরাগত মানুষের আছে? 


পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে যে কয়েকটি বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হতে হবে মধ্যে সবচেয়ে বড়টি হলো, দলটি বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে অপরিচিত। শারদ্বত মুখার্জী, স্বপন দাশগুপ্ত, শমিক ভট্টাচার্য কিংবা শুভেন্দু অধিকারী এই ধারণাটির বিপরীতে অন্য ধারণা প্রচার করার জন্য এবিপি আনন্দ এবং অন্যান্য গোদী মিডিয়ার সহায়তায় তাই আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, কিন্তু তাতেও কি তাঁরা সফল হবেন? বিজেপি নেতারা প্রায়শই দাবি করেন যে, বিজেপির পূর্বসূরি জন সংঘের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, একজন ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত বাঙালি, এবং অন্য রাজনৈতিক দল বিজেপিকে ‘বহিরাগতদের দল’ হিসেবে চিত্রিত করতে পারে না, কিন্তু সামগ্রিকভাবে তাঁরা যে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের ধারণাকে নস্যাৎ করতে পারে না, তা সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর উদাহরণ দেখলেই বোঝা যায়। এই বিজেপি দলটি যদি এতটাই আমিষ প্রেমী হয়, তাহলে কিছুদিন আগে এই কলকাতার ব্রিগ্রেড প্যারেড গ্রাউন্ডে এক সাধারণ প্যাটিস বিক্রেতাকে যাঁরা মেরেছিলেন, তাঁদের অন্যতম একজনকে মালা পরিয়ে কেন বরণ করেছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী? এই প্রসঙ্গে আরও বেশ কিছু কথাও আসে, যে কথাও বলা প্রয়োজন। শুধু বিজেপির মধ্যে নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যেও এই ধারণা যথেষ্ট ভালোই আছে। সেইজন্যেই নবদ্বীপ অঞ্চলে দোলের সময়ে একটি পৌরসভার তৃণমূলের চেয়ারম্যানের তরফ থেকে নিরামিষ খাওয়ার জন্য আবেদন করে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। তা নিয়ে বিতর্ক হওয়ার পরে অবশ্য বলা হয় এই বিষয়টি একান্তই আবেদন, কোনও জোর জবরদস্তির ব্যাপার নেই। কিন্তু বিজেপি এবং আরএসএস যে তাঁদের হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বাঙালির অন্তরে প্রবেশ করাতে ভালোই সফল হয়েছে তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।  

মোদ্দা কথা হল আসন্ন নির্বাচন উপলক্ষে ভারতীয় জনতা পার্টির পশ্চিমবঙ্গ শাখা বাংলার ভোটারদের বোঝানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে যে, দলটি নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসকে উৎসাহিত করে—এই প্রচলিত ধারণা ঠিক নয়। তারা মাছ খাওয়ার বিরোধী নয়, এটাই প্রচারের মূল উদ্দেশ্য। বিজেপির এই মৎস্যপ্রীতির প্রচার দেখে একটা কথা মনে হল, হাতির খাওয়ার দাঁত একটা আর দেখানোর দাঁত আর একটা। আরও একটা মজার কথা মনে হল, যতই ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনী করে, ৬০ লক্ষ বাঙালিকে বিজেপি হাইকোর্ট দেখাক না কেন, মাছের টোপ দেখিয়ে বাঙালিকে ভোলানো যাবে না। যে বিজেপি, সনাতনি হিন্দুত্বের প্রচার করে সারা দেশ জুড়ে সেই বিজেপি যখন প্রমাণ করার চেষ্টা করে, তাঁরা ক্ষমতায় এলেও বাঙালির মাছ কাড়বে না, তখন সেই পুরোনো কথাটাই মনে হয়, ‘বিড়াল বলে মাছ খাব না, কাশী যাব’ কথাটা বোধহয় বিজেপির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী প্রযোজ্য।

0 Comments

Post Comment