পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর এবং একটি সরকারি বিজ্ঞাপন

  • 01 June, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 465 view(s)
  • লিখেছেন : নীহারুল ইসলাম
বাঙালির প্রধান খাদ্যদ্রব্য চালের অভাব দেখা দেওয়ায় ভাতের জন্য সারা বাংলায় হাহাকার পড়ে যায়। গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে দুর্ভিক্ষ। পথে-প্রান্তরে লুটিয়ে পড়তে থাকে না খাওয়া মানুষের দল। এখানে-ওখানে পড়ে থাকতে দেখা যায় হাড্ডিসার লাশের সারি। ওই সময় জরুরি খাদ্য সরবরাহের জন্য চার্চিলের কাছে আবেদন করেও বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে ভারতের তৎকালীন ব্রিটিশ কর্মকর্তারা। বিভিন্ন গ্রাম থেকে তখন বুভুক্ষু হাজার হাজার মানুষ একমুঠো অন্নের আশায় স্রোতের মতো ছুটে আসছে কলকাতার দিকে। দেখা গেছে, ওইসব অভাগা মানুষেরা দলে দলে পথের ওপর পড়ে হয় ধুঁকছে না হয় আবর্জনার পাশে উচ্ছিষ্টে ভাগ বসাতে একে অপরের সঙ্গে লড়ছে। পাশাপাশি ওই একই সময়ে ব্রিটিশ কর্মকর্তা এবং তাদের তোষামুদে অবস্থাপন্ন ভারতীয় লোকজন বাড়িতে বসে ভূরিভোজ করছে।

।। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারত ।।

তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫। আমাদের ভারত ব্রিটিশদের অধীন। মানে ব্রিটিশ-ভারত। এই ব্রিটিশ-ভারত ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নাৎসি-জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ব্রিটিশ-রাজ মিত্রশক্তির অংশ হিসাবে অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে ব্রিটিশ কমান্ডের অধীনে যুদ্ধ করার জন্য দেড় লক্ষ ভারতীয় সৈন্য পাঠায়। যার অর্ধেক সেই যুদ্ধে মারা যায়।

মুসলিম লীগ ব্রিটিশদের এই যুদ্ধকে সমর্থন করলেও তৎকালীন ভারতের বৃহত্তম এবং সর্বাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ব্রিটিশদের সমর্থমন করার আগে স্বাধীনতা দাবি তোলে। ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে "ভারত ছাড়ো" আন্দোলন ছিল তার অন্যতম। সেই আন্দোলনের কারণে কয়েক হাজার নেতা কারাগারে বন্দি হয়।

অন্যদিকে ভারতীয় নেতা সুভাষ চন্দ্র বসুর নেতৃত্বে জাপানে ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনী গঠিত হয়, যারা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। সেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক সেনা ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিয়োজিত সেনাদের জন্য বিপুল পরিমাণ খাদ্য মজুদ করার ফলে ১৯৪৩ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।

।। পঞ্চাশের মন্বন্তর ।।

সময় ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৪। স্থান বাংলা। বিষয় দুর্ভিক্ষ। মৃত্যু প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ। আমরা যাকে পঞ্চাশের মন্বন্তর বলে জানি। এই দুর্ভিক্ষের সময় তৎকালীন ভারতবর্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে মারা যায়।

বাংলা ১৩৫০ বঙ্গাব্দে এই দুর্ভিক্ষ হয়েছিল বলে একে 'পঞ্চাশের মন্বন্তর' বলা হয়। বিশেষ করে অবিভক্ত বাংলায় সেই দুর্ভিক্ষের রূপ ছিল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর।

জাপানের প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার, তৎকালীন বার্মা, দখল করে নেওয়ার পর পঞ্চাশের মন্বন্তর শুরু হয়। ওই সময় বার্মা ছিল চাল আমদানির বড় উৎস। পরিসংখ্যান বলে, ওই মন্বন্তরে সারা বাংলা জুড়ে প্রায় ২০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক সেনা ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিয়োজিত সেনাদের জন্য বিপুল পরিমাণ খাদ্য মজুদ করার ফলে ১৯৪৩ সালে হু হু করে বেড়ে যায় চালের দাম। একই সঙ্গে বাজারে তা দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠে। জাপান ভারত দখল করলে খাদ্য যাতে শত্রুর হাতে না পৌঁছায়, সেই জন্য ব্রিটিশ সরকার আগাম কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বাংলা জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নৌকা ও গরুর গাড়ি বাজেয়াপ্ত করা হয় কিংবা ধ্বংস করে ফেলা হয়। এর ফলে চাল বা খাদ্য বিতরণ-ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়ে।

বাঙালির প্রধান খাদ্যদ্রব্য চালের অভাব দেখা দেওয়ায় ভাতের জন্য সারা বাংলায় হাহাকার পড়ে যায়। গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে দুর্ভিক্ষ। পথে-প্রান্তরে লুটিয়ে পড়তে থাকে না খাওয়া মানুষের দল। এখানে-ওখানে পড়ে থাকতে দেখা যায় হাড্ডিসার লাশের সারি। ওই সময় জরুরি খাদ্য সরবরাহের জন্য চার্চিলের কাছে আবেদন করেও বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে ভারতের তৎকালীন ব্রিটিশ কর্মকর্তারা। বিভিন্ন গ্রাম থেকে তখন বুভুক্ষু হাজার হাজার মানুষ একমুঠো অন্নের আশায় স্রোতের মতো ছুটে আসছে কলকাতার দিকে। দেখা গেছে, ওইসব অভাগা মানুষেরা দলে দলে পথের ওপর পড়ে হয় ধুঁকছে না হয় আবর্জনার পাশে উচ্ছিষ্টে ভাগ বসাতে একে অপরের সঙ্গে লড়ছে। পাশাপাশি ওই একই সময়ে ব্রিটিশ কর্মকর্তা এবং তাদের তোষামুদে অবস্থাপন্ন ভারতীয় লোকজন বাড়িতে বসে ভূরিভোজ করছে।

ইতিহাস সাক্ষী থাকে যে, ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া সহায়তার হাত বাড়াতে চেয়েছিল, কিন্তু চার্চিলের মন্ত্রিসভা তা মেনে নেয়নি। এমনকি এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজের জাহাজে করে খাদ্য পাঠাতে চেয়েছিল, ব্রিটিশ শাসক তাও গ্রহণ করেনি। জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী এই দুর্ভিক্ষের পেছনে প্রাকৃতিক কারণ খুঁজে পায়নি ভারতীয় ও মার্কিন গবেষকদের দল। অতএব একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, এই দুর্ভিক্ষের জন্য আবহাওয়া নয় বরং তৎকালীন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল সরকারের অমানবিক নীতিই দায়ী ছিল।

এমনই অমানবিক নীতি যে, এই দুর্ভিক্ষ নিয়ে যখন সারা বিশ্ব তোলপাড়, তৎকালীন সরকার নিজের দায় এড়ানোর চেষ্টা করবে তাতে আশ্চর্য কী?

হ্যাঁ, চেষ্টা করেছিল। পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। ‘দেশ’ পত্রিকায় (১৬ জুন ১৯৪৫) প্রকাশিত তেমন একটি বিজ্ঞাপন রইল এই লেখার সঙ্গে। ব্যাপারটা কতখানি হাস্যকর, বিজ্ঞাপনটি পড়লেই তা বোঝা যায়।

0 Comments

Post Comment