পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

অমর চিত্র কথার অমর বাণী কি সত্য ?

  • 20 September, 2019
  • 1 Comment(s)
  • 359 view(s)
  • লিখেছেন : সুমন সেনগুপ্ত
অমর চিত্র কথার প্রণেতা অনন্ত পাইয়ের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে ভারতরত্ন পুরস্কারপ্রাপক হিসেবে।কিন্তু কী তাঁর অবদান ? অমর চিত্র কথার মাধ্যমে পুরুষতন্ত্র, বর্ণপ্রথা, জাতিভেদ, অলৌকিকতা প্রচার এবং হিন্দুত্ববাদ আর ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে অভিন্ন ভাবে দেখানোর কাজ অক্লান্তভাবে তিনি করে চলেছেন। তারই কি পুরস্কার ?

‘অমর চিত্র কথা’, আমাদের দেশের প্রায় প্রতি মধ্যবিত্ত বাচ্চার শৈশব কেটেছে এই কমিকসগুলো পড়ে। কখনও বাবা মায়ের কাছে শুনে, কখনও নিজে নিজে পড়ে। তখন টিভি ছিল না বেশির ভাগ বাড়িতে, কিন্তু এই কমিকসের মাধ্যমে ‘ ভারতীয়’ সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য মধ্যবিত্ত হিন্দু বাচ্চাদের মধ্যে নিয়ে যাওয়ার এই পন্থাটি নিয়েছিলেন অনন্ত পাই, অমর চিত্র কথার জনক।

১৯৬৭ সালে তখন অনন্ত পাই টাইমস অফ ইন্ডিয়াতে চাকরি করতেন। তিনি একদিন টিভি দেখতে দেখতে খেয়াল করলেন একটি কুইজ অনুষ্ঠানে বাচ্চারা রামায়ণের সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছিল না। তখন আরও কিছু সঙ্গীকে নিয়ে ‘ ইন্ডিয়া বুক হাউস’ বলে এক প্রকাশকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং এই কমিকস শুরু করেন। প্রাথমিক ভাবে তিনি অন্য প্রকাশকের কাছে গেলেও তাঁরা বিষয়টিতে তেমন গুরুত্ব দেননি। কিন্তু ধীরে ধীরে দেখা যায় এই ‘অমর চিত্র কথা’ চূড়ান্ত সাফল্য লাভ করে। যারা ৭ এর দশক থেকে বড়ো হয়েছেন এবং আজ যারা প্রায় মধ্য চল্লিশের আশেপাশে তাঁদের বেশিরভাগের শৈশবের সঙ্গে এই কমিকস বইগুলো ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গেছে। এই মুহূর্তে যদি খোঁজ করা যায় তাহলে দেখা যাবে ভারতের জনসংখ্যার প্রায় সমান সংখ্যক ‘ অমর চিত্র কথা’ বিক্রি হয়েছে। মূলত হিন্দি এবং ইংরেজি হলেও ভারতের প্রায় ২০টি ভাষায় এর অনুবাদ হয়েছে এবং প্রায় ৪০০ টি টাইটেল আছে যা এই মুহূর্তে দেশের নানা প্রান্তে বিক্রি হয়। পরবর্তীতে রাজ কমিকস বা ডায়মণ্ড কমিকস এলেও কেউই কিন্তু ‘অমর চিত্র কথা’র জনপ্রিয়তাকে কমাতে পারেনি। অনন্ত পাই, ১৯৬৭ সাল থেকে খুব সচেতন ভাবে এবং ধীরে ভারতীয় ঐতিহ্য শেখানোর নাম করে কি হিন্দু ধর্মীয় ব্রাহ্মন্যবাদী শিক্ষা দেওয়ার কাজটি করে গেছেন? না হলে তার প্রতিটি টাইটেলেই কেন পুরুষালী আচরণ, উচ্চবর্ণ এবং হিন্দুত্ববাদের প্রভাব থেকেছে? কেন বারংবার বোঝানো হয়েছে যে এই গুণাবলি থাকলেই সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়া সহজ? আরও একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে যে ভারতের ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় বিষয়ের ওপর যে কমিকসগুলো ‘ অমর চিত্র কথা’তে এসেছে সেখানে সচেতন ভাবে অহিন্দু চরিত্রদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ধীরে ধীরে সাভারকারের মতো চরিত্র যিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কাছে মুচলেকা দিয়েছিলেন তাঁদেরকেও কমিকসের মাধ্যমে শিশুমনে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করে গেছেন এই অনন্ত পাই। কখনও আনন্দমঠ বা কখনও শিবাজি, এই টাইটেলগুলোতে মুসলমানদের সম্পর্কে যেভাবে বিরূপ কথা বলা হয়েছে তাকে শিশুমনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা বলাই যায়। বারবার দেখা গেছে দেবতারা ফর্সা এবং দৈত্যদের গায়ের রঙ দেবতাদের মতো নয়। মহিলারা ভোগ্যপণ্যের বস্তু, এরকম ছোট ছোট গল্প নিয়েই ‘অমর চিত্র কথা’র অমরত্ব, যা আসলে আমাদের অবচেতনেই আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে দিয়ে গেছি। কিংবা আমাদের মা বাবারা আমাদের মধ্যে দিয়েছেন।

ইতিহাস বলুন, পুরাণ বলুন এগুলোকেও দেখার একটা দৃষ্টিভঙ্গী থাকা উচিত। বাকনেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপিকা ম্যাকলেইন এই বিষয় নিয়ে বহুদিন ধরে গবেষণা করেছেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী যখন তিনি তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করেন তখন মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়। কারো কারো মতে এর পিছনে কোনও রাজনৈতিক প্রচারের উদ্দেশ্য ছিল না। আবার কেউ কেউ জোরের সঙ্গে বলেন এর পিছনে প্রচ্ছন্ন হিন্দুত্ববাদের প্রচার প্রথম দিন থেকে ছিল। ম্যাকলেইন বম্বের ফুটপাথের একটি পত্রিকার দোকানে ‘কৃষ্ণ’ বলে একটি পুরনো কমিকস হাতে পান, সেটা দেখে তিনি চমকে ওঠেন। বেশ কিছু পাতার সঙ্গে নতুন সংস্করণের তফাৎ আছে। অনন্ত পাই, নিজে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হবার সুবাদে প্রথমদিকের সংস্করণে কোনও অলৌকিক কর্মকাণ্ড রাখেননি, কিন্তু পরবর্তী সংস্করণে সেগুলোকে যোগ করেন, কারণ তাঁর মনে হয়েছে যে এই অলৌকিকতাই ভারতের বেশির ভাগ মানুষ পছন্দ করেন। দেখা গেছে যে ৪৪০টি গ্রন্থের মধ্যে প্রায় ৩৮০টি বইয়ে হিন্দু দেবদেবী, হিন্দু রাজাদের ত্যাগ, শৌর্যের প্রচার করা হয়েছে। ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ অবধি যে বইগুলো বেরিয়েছে সেগুলো দেখা গেছে মূলত হিন্দুত্ববাদ এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রচারের জন্য। এমন ভাবে এই প্রচার করা হয়েছে যাতে হিন্দুত্ববাদ এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে চট করে আলাদা না করা যায়। বিশেষ করে শিশুমন এই দুটোকে অভিন্ন বলেই চিনতে শিখবে।

প্রচার করার জন্যেও একটা অভিনব পন্থা নেওয়া হয়েছিল। প্রাথমিক ভাবে ১৯৭০ সালের সময়ে অভিভাবকদের বলা হয়েছিল যে এই কমিকসগুলোর সঙ্গে টিফিনবক্স এবং পার্লে বিস্কিটের প্যাকেট দেওয়া হবে। পরবর্তীতে ১৯৮০ সাল থেকে ‘ ইন্ডিয়া বুক হাউস’ অভিভাবক ছেড়ে শিক্ষকদের নিয়ে ছোট ছোট সেমিনার সংগঠিত করেন যার মুখ্য বিষয় ছিল ‘শিক্ষায় চিত্র কথার প্রভাব’। এই সেমিনারগুলোতে তাঁরা তথ্য হিসেবে তুলে ধরেন যে সাধারণ পাঠ্যপুস্তকের থেকে এই কমিকস শিক্ষিত বাচ্চারা ভারতের ইতিহাস সম্বন্ধে বেশী ভাল জানেন।

আজকে যখন কেউ কেউ প্রস্তাব দিচ্ছেন যে ‘অমর চিত্র কথা’ র সৃষ্টিকর্তা অনন্ত পাইকে ভারতরত্ন দেওয়া উচিত, তখন কি এই প্রশ্নটা করা উচিত নয় যে হিন্দুত্ববাদ এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রচারের জন্যই কি তাঁর নাম প্রস্তাবিত হয়েছে? নাকি নিজেদেরকে প্রশ্ন করা উচিত কেন আমরা পারিনি এর বিপরীতে সত্যি কথাগুলোকে প্রচার করতে? সংঘ পরিবারের ১০০ বছর হবে ২০২৫ এ, আমরা মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি কিন্তু ওরা নিজেদের এজেন্ডা নিয়ে খুব ধীরে ধীরে মানুষের মনে বা বলা ভালো শিশুমনে প্রবেশ করেছে। আমরা পারিনি ওরা কিন্তু ওদের কাজ করে গেছে আর আমরা ভেবেছি আমরা আমাদের বাচ্চাদের ইতিহাস, পুরাণ শিক্ষা দিচ্ছি। আজকে যারা হিন্দুত্ববাদের হয়ে, ভারতের জাতীয়তাবাদের হয়ে গলা ফাটাচ্ছেন যদি খেয়াল করা যায় এঁদের বেশীর ভাগটাই কিন্তু বড় হয়েছেন ওই কমিকস ‘অমর চিত্র কথা’ যবে থেকে তৈরি হয়েছে সেই সময়ে। আজকের হোয়াটসঅ্যাপ ফেসবুকের যুগে এই পত্রিকা কিন্তু ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজনের মধ্যে দিয়ে ঘরে ঘরে পৌঁছচ্ছে । যে বীজ অনন্ত পাই আজ থেকে ৫০ বছর আগে বপণ করেছিলেন, তা এখন মহীরুহে পরিণত হয়েছে। এর থেকে বেরোনোর বিকল্প রাস্তা কিন্তু আমরা বের করতে পারিনি । চেষ্টাও করেছি কি? আমাদের সংস্কৃতিতে কিন্তু যথেষ্ট বিপরীত উপাদান ছিল যা আমরাই নিজেরাও মনে রাখিনি, মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করিনি।

1 Comments

অশ্রুজিৎ

20 September, 2019

ভারতীয় সংস্কৃতি আর বাহরটিও জাতীয়তাবাদ। এক এবং অভিন্ন। তদুপরি নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করেছেন দেখে ভালো লাগলো, যাঁরা বাচ্চাদের কমিক্সের মধ্যে পলিটিক্স খোঁজে তাঁরা ব্যর্থ হবেন না তো কে হবে ? মারভেল বা ডিসির কমিক্সের অলৌকিকতা , পুরুষ সুপারহিরোদের কান্ডকারখানা নিয়ে লেখার কথাও কি ভেবেছেন কখনো ? চিতরে গনহত্যার নায়ক মুঘল সম্রাট আকবর আপনাদের বাচ্চাদের যোগ্য নায়ক তাই না ?

Post Comment