পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

এবারের ভোটে তবে কি-‘মনশ্রী’প্রকল্প চালু!

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 206 view(s)
  • লিখেছেন : অশোক অধিকারী
১৯৫২র প্রথম সাধারণ নির্বাচনে জওহরলাল নেহেরু নির্বাচনে জেতার পর একটি ওজনদার বক্তব্যে তাঁর মত ব্যক্ত করেছিলেন যেখানে নির্বাচকমণ্ডলীকে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়ে তাঁদের চিন্তা ও বোধকে সম্মান না জানিয়ে তিনি থাকতে পারেন নি। "তথাকথিত নিরক্ষর ভোটাররা সম্ভবত অনেক শিক্ষিতদের চেয়েও এই নির্বাচনকে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। তাঁদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়েছে এবং ভারতে প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার নিয়ে আমার মনে যেটুকু সন্দেহ ছিল, তা পুরোপুরি দূর হয়ে গেছে।” সেই মানুষদের যদি ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে গণতন্ত্র অবশিষ্ট থাকে?

কথাসাহিত্যিক সতীনাথ ভাদুড়ী তাঁর ‘চরণদাস এম.এল.এ’গল্পে লিখছেন, “লটারির টিকিট না কিনলে যেমন লটারিতে টাকা পাওয়ার উপায় নেই, ভোটে না দাঁড়ালে এম.এল.এ হবার উপায় নেই।….. হাইকমান্ড নাকি বলেছেন যে আসল ভগবান হচ্ছেন ভোটার।…নারায়ণের চেয়েও বড় নরনারায়ণ। ভোটারদের সঙ্গে যাঁর সম্পর্ক কম তাকে নাকি আসছে বার আর এম.এল.এ করা হবে না।…তাই নকল ভগবান ছেড়ে আসল ভগবানের শরণে।” এস আই আর-র গেরো এখনো কাটেনি।ষাট লক্ষ বিবেচনাধীন ভোটারের ভোটাধিকার আইনের হাতে তুলে দিয়ে হাল্লা চলেছে ভোটে। সব দল এখনও তাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে উঠতে পারেনি।যে দল পেরেছে তারা এখন প্রচারে ব্যানারে বক্তৃতা পথসভা জনসংযোগে উঠে পড়ে লেগেছে। জনতা জনার্দনের মন পেতে প্রার্থীরা নানা উপায়ে প্রচারের কৌশলকে হাতিয়ার করে এখন ময়দানে। প্রার্থীর রঙবৈচিত্র্য, এ দল-ও দল করা এখন নির্বাচনে আকচার ঘটে।এবারের বিধানসভা নির্বাচন তার ব্যতিক্রম নয়। এই বেনিআসহকলা নির্বাচনে একটি একক নির্দিষ্ট, তা হল ভোটার। এই ভিন্ন সময়ের বুকে দাঁড়িয়ে মানুষ যখন তা নিজের নিজের কাছেই অজানা, তার নীরবতার ভাষা দুর্বোধ্য তখন নানা প্রলোভন, উপঢৌকনের কাছে নিমিত্তে যখন ভোটারের মন কোনো এক পক্ষের দিকে হেলে পড়ে তখন সংবিধান প্রদত্ত অধিকার কতোটা মান্যতা পায় তা আজ আর কোনো বিষয় হয়ে আমাদের মনকে নাড়া দেয় না। সতীনাথের ‘নকল ভগবান ছেড়ে আসল ভগবানের শরণে’র লাগি লড়াই তবু জারি থাকে।

রক্ত মাংসের ভগবানের মন পেতে প্রার্থীদের প্রচারের কৌশল এবারে বেশ চমকপ্রদ সন্দেহ নেই। কোথাও প্রার্থী চাষী হয়ে ভোটারের জমিতে নিড়ান দিচ্ছেন, কোথাও হেঁসেলে ঢুকে রান্না করে দিচ্ছেন কোথাও বা সেলুনে ঢুকে দাড়ি কামিয়ে দিচ্ছেন তো বাড়ীর ছোটদের হোমটাস্ক দেখিয়ে দিচ্ছেন। আবার চোখে এল প্রার্থী চপ ভাজছেন,বাটনা বেটে দিচ্ছেন, কুটনো কুটে দিচ্ছেন,রোদে শুকাতে দেওয়া ঘুঁটের অন্য পিঠ উল্টে দিচ্ছেন-ইত্যাদি ইত্যাদির বহর দেখে ভোটার মুচকি হাঁসছেন সন্দেহ নেই।হয়ত মনে মনে আওড়ে যাচ্ছেন, কই সেবার তো আসেন নি যখন বন্যায় ডুবছিলাম বা জলকষ্ট নিয়ে দিন কাটাচ্ছিলাম! জিতলে তো আর আসবে না-এখন যত আদিখ্যেতা। আসলে ভোটার ও প্রার্থীর মধ্যে যে ফারাক বিদ্যমান তাতে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ‘এখনও আমি জিতিনি’ আর ‘জিতলাম এবং তোমার মাথায় চড়ে বসলাম’-এবার আমাকে কে পায়; এই আপাত মান্যতার বহরে যখন ভারসাম্যের অভাব ঘটে তখন কে ভোটার আর কে নিছক একটি সংখ্যা তা নিয়ে ব্যক্তি হিসাবে সতীনাথের প্রার্থীরা খুব একটা ভেবে দেখার অবকাশ পান না। যদিও ‘চপশিল্প’স্থাপনের একটি আশকারা অতীতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর মুখ দিয়ে শোনা গিয়েছিল এবং তা নিয়ে বিস্তর কথা চালাচালি দুষ্ট লোকেরা করেছিলেন কিন্তু তা যে এমন প্রচারের দোকান খুলে বসবে তা কে জানত। প্রার্থী হোমটাস্ক দেখিয়ে দিচ্ছেন বা রুটি করে দিচ্ছেন তাতে প্রচারের সময়টুকুতে বাড়ির গৃহিনী কিছুটা সময় স্বস্তি অনুভব করলেও করতে পারেন তাই বলে সেলুনে ঢুকে ক্ষুর দিয়ে দাড়ি কামিয়ে দিচ্ছেন তাতে নরসুন্দর যে বেশ ভয়ে ভয়ে আছেন সন্দেহ নেই।কারন,যদি কোনোভাবে একটু কেটে কুটে যায় তাহলে যে তাঁকে একজন খদ্দের হারাতে হবে ভোটের লাগি তা নিয়েও বিস্তর কটুকাটব্য চলছে।আপাতত এই সব যাবতীয় দৃশ্যপট বেশ নাটকীয়তা আনলেও ভোটার কিন্তু স্বস্তি দিচ্ছেন না তাঁর নিকটতম প্রার্থীকে। বালাই ষাট একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া মানুষজন অনেক আগেই ঠিক করে বসে থাকেন এবারে কোন বোতামে তাঁর বহুমূল্য আঙ্গুলটি ছোঁয়াবেন!

আমাদের রাজ্যে সরকারের বদান্যতায় ‘শ্রী’যুক্ত ভাতার এখন ছড়াছড়ি।কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মানুষকে স্বস্তি দিতে যা প্রয়োজন। কিন্তু সেটাই সব নয়। তাই কখনও সাইকেল কখনও ট্যাব কেনার টাকা,কখনও মেয়েদের বিয়ের আগে কন্যাশ্রী বা বিয়ের সময় রূপশ্রীর মতো প্রকল্পগুলি যেমন জনমোহিনী তেমনই তা বড়াই করে বলতেও দ্বিধা করেন না এমএলএ-এমপি’রা যে, ’যারা আমাকে ভোট দেবে না, তারা এই সব প্রকল্প থেকে ঝেড়ে বাদ।’ বোঝো ঠ্যালা। মানুষতো বলতেও শুরু করেছেন,আমার টাকাই তো ঘুরিয়ে আমাকে দিচ্ছ বাবা,তা তোমার কী করে হয়?কিন্তু ভোটের সময় প্রার্থীদের যতটা বিনয়ী ও নম্র দেখা যায় তার একটা খন্ড অংশ জেতা পরবর্তী সময়ে পাওয়া গেলে আমাদের মতো মধ্য,নিম্ন বা প্রান্তিক অংশের মানুষের কিছুটা সুরাহা পাওয়া যেত।ব্যতিক্রম যেহেতু সর্বজনীন নয় তাই তা নিয়ে কারও মন খারাপ হলে তাঁকে আরও বেশি চপ ভাজা বা ঘুঁটে উল্টে দেওয়ার পরামর্শ দেব।কিন্তু ‘ভাতা’র রাজ্যে এই সব দেখে আরও একটি প্রকল্প-র কথা এসে যাওয়াটাও প্রাসঙ্গিক। তা হল ‘মনশ্রী’প্রকল্প। ভোটের সময় মানুষের মন পাওয়ার প্রকল্প। দুঃখ এটাই যে এই প্রকল্প শুধু ভোটের সময়ই চালু থাকবে, ভোট মিটে গে্লে পাঁচ বছরের অন্তর্জলি,আবার পাঁচ বছর পর তার উল্থান। পাঁচ-পাঁচ ব্যবধানে তার আসা যাওয়া।ভোটারের মন জয়ের আরও একটি প্রকল্প চালু আছে তা হল ‘কথাশিল্প’।কথায় সব সময় চিঁড়ে ভেজে না আমরা জানি।কিন্তু ভালো কথা বলার মানুষ যেহেতু এখন ক্রমশ কমছে তাই প্রার্থী যাঁরা হবেন তাঁদের ভালো কথা ও ব্যবহারের মানুষ হতে হবে।কেউ ভালো কথা বলেন কেউ ভালো কথা লেখেন। ভালো কথা বলা যেমন একটি শিল্পের পর্যায়ে পড়ে তাই মানুষের মন পেতে ভালো কথার তুল্য কোনো উপঢৌকন নেই।ভোটারের মন পেতে যার বিকল্প মেলা ভার। নির্বাচনের সময় এ দৃশ্যও খুব দুর্লভ নয়; যেখানে প্রার্থী নিজেই দেওয়াল চুন করছেন, লিখছেন, লিফলেট বিলি করছেন যা অবশ্যই জনসংযোগের একটি অংশ। তার বাইরে তিনি যখন মানুষের কাছে যাচ্ছেন, হাতে হাত মেলেচ্ছেন, পথসভা বা পাড়া বৈঠকে মানুষের সমস্যার কথা শুনছেন, আশ্বাস দিচ্ছেন, পথসভায় বক্তৃতা করছেন তখন এক অন্য মানুষ হিসাবে প্রার্থীকে পাচ্ছেন।তাই একজন প্রার্থীকে এই একটি মাত্র পরীক্ষায় অনেক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি পড়তে হয় এবং তার উপযুক্ত উত্তরও তাঁকে ঠান্ডা মাথায় দিতে হয়। প্রার্থী হয়ে তাঁকে এখন যেমন মানুষের কথা শুনতে হয়, জিতে যাওয়ার পর তাঁর কথা মানুষ শোনেন।যা আর অনুরোধ বা উপরোধ হয়ে আসে না; নির্দেশ হয়ে আসে, এবং তা তাঁর সমস্যা সমাধানে কাজে লাগতেও পারে না ও পারে। ১৯৫২র প্রথম সাধারণ নির্বাচনে জওহরলাল নেহেরু নির্বাচনে জেতার পর একটি ওজনদার বক্তব্যে তাঁর মত ব্যক্ত করেছিলেন যেখানে নির্বাচকমণ্ডলীকে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়ে তাঁদের চিন্তা ও বোধকে সম্মান না জানিয়ে তিনি থাকতে পারেন নি। তাঁর কথায়, “এই নির্বাচন (১৯৫২) আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে, এ বিষয়ে আগে কোনো সন্দেহ থেকে থাকলেও, যে সামগ্রিকভাবে আমাদের নির্বাচকমণ্ডলীর বুদ্ধি ও বিচারবুদ্ধি রয়েছে।….তথাকথিত নিরক্ষর ভোটাররা সম্ভবত অনেক শিক্ষিতদের চেয়েও এই নির্বাচনকে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। তাঁদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়েছে এবং ভারতে প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার নিয়ে আমার মনে যেটুকু সন্দেহ ছিল, তা পুরোপুরি দূর হয়ে গেছে।”

 ২০২৬র বিধানসভা নির্বাচনে তাই মানুষকে বোকা ভাবার কোনো কারণ নেই।তাঁদের সচেতনতার পাঠ অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক।এবারের নির্বাচন নানা কারণে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার মানুষকে ঠিক করতে হবে তাঁরা আসলে কী চান। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প সহ যাবতীয় পরিষেবা মূলক ক্ষেত্রে উচ্চ পরিকাঠামো সমৃদ্ধ একটি রাজ্য অথবা উন্নয়নের নামে শুধু অনুদান সর্বস্ব এমন একটি রাজ্য যেখানে মানুষের অনুগত সত্তারই জয়জয়কার!তাই কোনো ‘মনশ্রী’ প্রকল্প নয়-সুস্থ গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকারের ‘শ্রী’ফেরানোই এবারের নির্বাচনের লক্ষ্য হওয়া উচিত।          

 

 

 

 

 

 

 

0 Comments

Post Comment