পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

রাতের চেয়েও অন্ধকার

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 200 view(s)
  • লিখেছেন : সাত্যকি মজুমদার
বিগত কয়েক বছরের পরীক্ষার্থীরা, ছাত্রের পিঠোপিঠি দুএক বছর বড় যারা, তাঁদের মধ্যে অনেকেই আর জীবিত নেই। পরীক্ষা দিয়েছে, কিন্তু সরকারি সংস্থার জালিয়াতির জন্য পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। বছরের পর বছরের পরিশ্রম, না খাওয়া, আর্থিক টান, কাজ না পাওয়ার আশঙ্কা, অতিবড়লোকেদের একের পর এক পুকুরচুরি - সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ মানসিক স্মশানে পরিণত হয়েছে ভারতের শিক্ষাক্ষেত্র। তারপর যদি নতুন প্রজন্মের ছাত্ররা রাস্তায় নেমে এই পরীক্ষা ব্যবস্থা, এই শিক্ষা ব্যবস্থার বিরোধিতা করে, তখন তাঁরা দেশদ্রোহী হয় কী করে? আমাদেরই তো উচিৎ ওঁদের লড়াইতে শক্তি জোগানোর, আমরা না করলে অন্যায় করছি।

শহরের দক্ষিণ দিকের কোনও একটি পাড়ার কথা ভাবুন। চারিদিকে একের পর এক বহুতল। মাঝখানে হয়ত একটা কি দুটো পুরোনো বাড়ি এখনো রয়েছে, হয়ত একটা খেলার মাঠ, খুব ভাগ্যবান হলে। পুকুর নেই। গাছ রয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ গাছেরই বয়স ৫০ এর বেশি না। নতুন বহুতলের গায়ে তো গাছ নয়, শখের কিছু লতাপাতা। আম, জাম, পেয়ারা, কাঁঠাল, লিচু, অর্জুন, বকুল - এই গাছ নেই প্রায়। রয়েছে মানিপ্লান্ট আর অ্যালো ভেরার কুৎসিত আতিশয্য। এরমই একটি বহুতলের দিকে তাকিয়ে থাকবেন, কখনো সম্ভব হলে। অধিকাংশ মানুষের মনে হবে না, “এই তো আমার ঘর।” রাস্তার উলটো দিক থেকে তাকিয়ে থাকি, একটা অদ্ভুত অপরতা বোধ হয়। মনে হয়, সেই বহুতলে থাকতে গেলে বিশেষ কিছু ‘যোগ্যতা’ লাগে। তারপর মনে হয় না, এই চিন্তা কদর্য এবং কুৎসিত, সেই বহুতলে না থাকতে গেলে, বিশেষ যোগ্যতা অর্জন করতে হয়।

 

তরঙ্গ যদি চোখে দেখা যেত, প্রবাহমান ধারাগুলিকে যদি লাল নীল হলুদ সবুজ বিভিন্ন রঙ দিয়ে সর্বদা দেখা যেত, তাহলে এরম একটি বহুতলের দিকে তাকিয়ে কয়েকটি প্রবাহ দেখতে পেতাম। সোজা, লম্বা আকারে উঠে যাচ্ছে জলের নীল ধারা, মাটির নীচের বহু গভীরে থাকা এক পাথুরে ছাকনি ভেদ করে পৃথিবীর ভিতরের স্বচ্ছ জল টেনে নিয়ে জোর করে তিরিশ তলা উপরে তুলে দেওয়া হচ্ছে। সেখান থেকে নীল ধারাটি একটু একটু করে চুইয়ে প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি শরীরে প্রবেশ করছে, নীল রঙ কলুষিত হয়ে গাঢ় কালচে হলুদ রঙ ধারণ করে বাকি বর্জ্যের সাথে একটি নিম্নগামী ধারায় এসে বয়ে যাচ্ছে আমার পায়ের কাছেই, পাশের নর্দমার কালোর মধ্যে মিশে। বিদ্যুতের চোখ ধাঁধানো সাধা ধারাকে শিকল পড়িয়ে পাখির খাঁচার মতন ডোরাকাটা একটা আকারে বহুতলটাকে ঘিরে রাখা হয়েছে। তড়িৎ প্রবাহ যেন ঘিরে রেখেছে আবাসনটিকে। জানলাগুলি বেশীরভাগ কাঁচের, এবং বন্ধ। হাওয়া খেলে না, রোদ হাঁসে না। এক টুকরো মাটির জন্য নখদন্ত বের করে একে অপরকে খোবলানোর পর, রক্তাক্ত নখদন্ত প্রসারিত আকাশের দিকে। এক টুকরো আকাশ, বারো ফুট বাই হাজার স্কোয়ার ফুট, খুবলে বের করে নিতেই হবে আকাশ থেকে।  তার জন্য কাড়াকাড়ি, মারামারি, বিস্বাসঘাত, শঠতা, পিছনে ছুরি, কিছুই বাদ যায় না। এক টুকরো আকাশ কে আমরা ভরিয়ে দেব আমাদের রক্তাক্ত লড়াইএর ইতিহাসে।

 

এরমই এক ছড়ানো ঘরে, আমার ছাত্র থাকে। অসঙ্খ্য সহপাঠীর মতন তারও মনপ্রাণধ্যান একটি পরীক্ষার দিকে। আমার কাজ তাকে সবকিছু বলে দেওয়া, পড়িয়ে দেওয়া, সে করতে পারছে কি না দেখা। ছাত্রের মায়ের সাথে আমার একটি বিষয়ে মতের অমিল। আমি বলেছি, এই বছর পেতেই হবে - এই চাপ থেকে নিজেকে মুক্ত করো। ছাত্রের মা বলেছে, না, এই বছরই পেতে হবে। এই অদৃশ্য টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে সময়ের ধারাটি এগিয়ে যাচ্ছে, ফেরার কোনও পথ না রেখে। পরীক্ষার মুখোমুখি এসে দাঁড়াচ্ছে ছাত্র। কিন্তু মনে সংশয় - ঠিক করে প্রস্তুত করতে পারলাম কি? শুধু তো পাঠ্যবইটির লাইন ধরে ধরে পড়ালেই হল না, সমস্ত জায়গা থেকে জানাবোঝার যা ধনসম্পদ রয়েছে সব হাতড়ে একটা বোধগম্য আকারে এনে দেওয়ার দায় থাকে প্রতিটি শিক্ষকের। কিন্তু শিক্ষার্থী সত্ত্বার পাশে যে অনুভূতিশীল সৃজনশীল মন পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাঁর কথা কি ভেবে উঠতে পারি আমরা?

 

বিগত কয়েক বছরের পরীক্ষার্থীরা, ছাত্রের পিঠোপিঠি দুএক বছর বড় যারা, তাঁদের মধ্যে অনেকেই আর জীবিত নেই। পরীক্ষা দিয়েছে, কিন্তু সরকারি সংস্থার জালিয়াতির জন্য পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। বছরের পর বছরের পরিশ্রম, না খাওয়া, আর্থিক টান, কাজ না পাওয়ার আশঙ্কা, অতিবড়লোকেদের একের পর এক পুকুরচুরি - সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ মানসিক স্মশানে পরিণত হয়েছে ভারতের শিক্ষাক্ষেত্র। গতকাল দিল্লি শহরে দেখা গেল, কীভাবে সেই স্মশানের মধ্যেও, যারা শোকজ্ঞাপন করতে এসেছিলেন, তাঁদের, এবং আমরা যারা শিক্ষাক্ষেত্রে চলমান শবদেহের মতন কাজ করে চলেছি - উভয়েই লাঠিপেটা খেলাম। মাথা ভাঙল আমাদের, রক্তাক্ত হলাম আমরা। হত্যা করা হল আমাদের। আমাদের ভাঙা হাত পায়ের উপর দিয়ে কেন্দ্রীয় সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনী তাঁদের বুটের দাগ সাম্মানিক হিসেবে রেখে গেল। আমাদের গায়ে কাঁদানে গ্যাসের ক্যানিস্টার ছুঁড়ে মারা হল। আমাদের ভিড় কে পাতলা করার জন্য আমাদের দিকে গুলি ছোঁড়া হল। তুবড়ির মতন কিছু ফাটতে থাকল আমাদের গায়ে। আমরা কেউ কেউ আহত হয়ে বাড়ি ফিরলাম। কেউ কেউ ফিরলাম না। আবার শবদেহের মতনই সেখানেই পড়ে থাকলাম। যন্তর মন্তরে রক্তের লালকালো ধারা বইতে থাকল।

 

ঘুরে তাকাই, শহর থেকে দূরে। নদীর ধারের চিতাকাঠ সাজানো। গাছের ডাল থেকে গলায় পড়া ফাঁস ঝুলছে। চিতার উপর শুয়ে মুখ ঢাকা আমার দেশের মায়েরা। বেতোয়ার জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে এক হাঙর চওড়া রাস্তা বানাবে। এই হাঙরটাই কয়েক বসন্ত আগে আকাশ থেকে এক দানবীয় হাত নামিয়ে খুবলে তুলে নিয়েছিল হসদেওকে। দন্ডকীয় ভূগর্ভের কৃষ্ণরক্তের বন্যা দেখেছিল সেদিন ভারত। তবু প্রশ্ন থেকে যায়। যে ছাত্রকে শেখানো হয় নি, গাছের গায়ে হাত বোলাও, দেখো সেও তোমার মতই জীবিত। তোমার যেমন আঘাত লাগে, তারও লাগে - সে কীকরে বুঝবে, স্বাসকষ্ট কী জিনিস? কীকরে জানবে সে, যে তার ভবিষ্যতের দিকেও হাঙরটি বাড়িয়ে দিয়েছে তার দৈত্যাকার হাত? যে চুরি শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যত থেকেও চুরি, তাকে কীভাবে চিনবে সে? যে মা বাবা তার সন্তানকে বলছে, মুখ বুজে, মাথা নীচু করে বইটির দিকে তাকিয়ে থাকো, তার কাছে তো গাছ শব্দটা কয়েকটা অক্ষর হিসেবেই থেকে যাবে। সেই গাছের গন্ধ, আকার, স্বাদ, কখনোই পোঁছবে না ছাত্রের কাছে। সেই ছাত্র তো তিরিশের কোঠায়, দেশী বিদেশী হাঙরের জন্য গলদঘর্ম পরিশ্রম করতে করতে - শ্রম, চিন্তা লুঠ হতে হতে - শারিরীক ও মানসিক অত্যাচারে হৃদরোগে মারা যাবে, যেমন যাচ্ছে হাজারে হাজারে আমার সমবয়সীরা। কাজ করতে করতে, টাকা আনতে আনতে, আদর্শ যন্ত্রের মতন যন্ত্র না হতে পারার আক্ষেপে সে মরেই যাবে। তখন? হাহুতাশ করে সেই বাবা মা, বা এই ছাত্র - কিছু কি পাবে ফেরত? হিসেবের কিছুই কি মিলবে? কেন আমাদের পৃথিবী সম্পর্কে শিক্ষা পেতে গেলে সবসময়ে জীবনটাকেই মূল্য হিসেবে দিতে হবে? কে বা কারা বাধ্য করছে আমাদের এই কর দিতে?

 

একদল চল্লিশ থেকে পয়ষট্টি বছরের মধ্যে থাকা পুরুষের দল রয়েছে তাঁদের ঘরে, টেলিভিশনের সামনে, ফোনের সামনে, আন্তর্জালে ছড়িয়ে দিচ্ছে তাঁদের অনন্ত না পাওয়ার ক্ষোভ। স্বচ্ছ রাস্তা চাই, অতএব হকার ঠেঙাও। স্বচ্ছ নালা চাই, অতএব সাফাই কর্মচারীকে স্বাসরোধ করে মারো। স্বচ্ছ আকাশ চাই, তাই আরো গাছ কাটো। স্বচ্ছ জল চাই, তাই পুকুর বুজিয়ে বহুতল করো। এই যাদের বিশ্বাস, তাঁদের ফোনগুলির সার্চ হিস্ট্রি একবার খুলে দেখা গেলেই বোঝা যাবে তাঁদের আসল স্বরূপ। তার মধ্যেও, যাদের সার্চ হিস্ট্রি পাওয়া যাবে তারা বেশি সৎ এবং তুলনায় কম ধূর্ত। আর যারা ইঙ্কোগ্নিটো মোডের উপর নির্ভরশীল, তাঁদের নিয়ে যত কম বলা যায় তত ভালো। ঘোলাটে সাদা তরল ডোপামিনের ধারা মস্তিষ্ক থেকে মস্তিষ্কে তথ্যভাইরাসের মতন সংক্রমণ ছড়িয়ে দেয়। বিচার, বিবেচনা সমস্ত কিছ্য ত্যাগ করে তারা স্তাবকতা শুরু করে দেন। এদের মধ্যে আপনার আমার ঘরের লোকেরাও আছে। দুচোখ খুলে, দুকান খুলে দেখে যেতে হবে সাগ্নিকের মতন, যেমনটি বিরেন চাটুজ্যে বলেছিলেন।

 

পদার্থবিদ্যা পড়ার সময়ে আমরা একটি কথা ভাবি - ব্রহ্মান্ডের অন্তের কথা। যখন একে একে সব তারা নিভে যায়, এমনকি যখন সব কৃষ্ণগহ্বর উবে যাবে, তাদের অবশিষ্ট তাপের ভগ্নাংশও যখন ব্যাবহারযোগ্য থাকে না - একটি নিথর, ঠান্ডা শূন্যতা অপেক্ষা করে রয়েছে সেই অন্তিম লগ্নে। আমাদের সমাজের অবস্থা দেখেও তাই মনে হয় - একে একে উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলি নিভে যাচ্ছে, আর দানবীয় কৃষ্ণগহ্বরগুলি সবকিছুকে গ্রাস করে চলেছে। তবু এই আকালেও, লন্ঠনটি হাতে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। হাজারে হাজারে মানুষ পথে নেমে পড়েছেন, ঝড়, জল, বিপদ কে উপেক্ষা করে। রাষ্ট্রের হাতে রক্তাক্ত হবার পরেও, আবার জড় হচ্ছেন যন্তর মন্তরে।

 

“...থাক না হাজার অযুত বাধা, দীর্ঘ দূরযাত্রার কিসের ভয়?…”

0 Comments

Post Comment