পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি: লাভ কার ?

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 204 view(s)
  • লিখেছেন : দেবাশিস মিথিয়া
দীর্ঘ ১৮ বছরের টানাপোড়েন, শত দরাদরি আর জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে গত ২৭ জানুয়ারি সই হলো ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। দুই পক্ষই একে ‘Mother of all deals’ বা সব চুক্তির সেরা বলে অভিহিত করেছে। ২০০৭ সালে ব্রাসেলসে এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলেও, পরবর্তীতে শুল্ক কাঠামো ও বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে মতভেদের কারণে ২০১৩ সালে তা স্থগিত হয়ে যায়। তবে কোভিড-পরবর্তী বিশ্ব পরিস্থিতি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের কারণে ২০২২ সালে সেই আলোচনায় পুনরায় গতি আসে, যা ২০২৬-এ পূর্ণতা পেল।

বিনিয়োগ সুরক্ষা থেকে শুরু করে ভৌগোলিক স্বত্ব (জিআই)—সব মিলিয়ে এই চুক্তি যেন ভারতের জন্য এক বিশাল জানলা খুলে দিল। একদিকে যখন মার্কিন শুল্কের খাঁড়া ঝুলছে, তখন এই চুক্তির হাত ধরে ইউরোপের ১৭ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজার ভারতের সামনে উন্মুক্ত হবে যা দেশের অর্থনীতির একটি ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করবে। প্রশ্ন হল, এই বিশাল কর্মযজ্ঞের আসল সুফল ভোগ করবে কে? বড় শিল্পপতিদের পকেট ভারী হবে, নাকি সাধারণের জন্য তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান? বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের শৌখিন ক্রেতারাই কি শুধুই লাভবান হবেন, নাকি প্রান্তিক কৃষকও উপকৃত হবেন? এই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আমাদের এই চুক্তির খুঁটিনাটি বিষয়গুলো দেখে নিতে হবে।

 শুল্ক সংস্কার ও বাজার উন্মুক্তকরণ 

এই চুক্তির প্রধান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক হলো শুল্ক কাঠামোর ব্যাপক উদারীকরণ। অটোমোবাইল খাতে ভারত একটি বড় পরিবর্তন এনেছে; যেখানে আগে বিলাসবহুল গাড়ির ওপর ১১০% পর্যন্ত উচ্চহারে শুল্ক ছিল, এখন বার্ষিক ২,৫০,০০০ গাড়ির কোটার (অর্থাৎ বছরে এই নির্দিষ্ট সংখ্যক গাড়ি পর্যন্ত সুবিধাটি মিলবে) মধ্যে সেই শুল্ক কমিয়ে মাত্র ১০% করা হয়েছে। এটি মূলত মার্সিডিজ-বেঞ্জ ও বিএমডব্লিউ-এর মতো ইউরোপীয় বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলোর জন্য ভারতীয় বাজার উন্মুক্ত করবে। একইভাবে মেশিনারি, রাসায়নিক, লোহা ও ইস্পাতের ওপর থাকা ২২% থেকে ৪৪% পর্যন্ত শুল্ক অধিকাংশ ক্ষেত্রে শূন্যে নামিয়ে আনা হচ্ছে।

কৃষি ও পানীয় খাতেও বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে উচ্চমানের চিজ (Cheese) ও প্রক্রিয়াজাত দুগ্ধজাত পণ্যের ওপর শুল্ক ধাপে ধাপে কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। আপেল ও কিউই’র মতো আমদানিকৃত ফলের ওপর শুল্ক কমানোর ফলে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে। প্রিমিয়াম ওয়াইনের ১৫০% শুল্ক কমিয়ে ২০-৩০% করা হয়েছে এবং স্পিরিটের ক্ষেত্রে তা ৪০% হয়েছে। এছাড়াও অলিভ অয়েল, পাস্তা ও চকোলেটের মতো প্রক্রিয়াজাত খাদ্য থেকেও শুল্ক প্রত্যাহার করা হবে। অন্যদিকে, ভারতের রপ্তানি খাতের জন্য এই চুক্তি অত্যন্ত লাভজনক হবে। টেক্সটাইল, পোশাক, চামড়া ও জুতো শিল্পে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১০-১২% শুল্ক বিলুপ্ত হওয়ায় ভারত এখন বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আরও শক্তিশালী জায়গায় থাকবে। রত্ন, অলঙ্কার এবং সামুদ্রিক মাছ রপ্তানিও এই চুক্তির ফলে নতুন গতি পাবে।

 মেধা ও পরিষেবার বাণিজ্য 

মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো পরিষেবার বাণিজ্য। ভারত ইইউ-এর মোট ১৪৪টি উপ-খাতে সরাসরি প্রবেশাধিকার পেয়েছে, যার মধ্যে আইটি, শিক্ষা, আর্থিক পরিষেবা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো অন্তর্ভুক্ত। এই চুক্তির অধীনে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের জন্য ইইউ-এর দেশগুলোতে ‘আনক্যাপড মোবিলিটি’ (সীমাহীন যাতায়াত) ও পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।এর ফলে ভারতীয় মেধাবী শিক্ষার্থীরা ইউরোপের ২৭টি সদস্য দেশে কোনো নির্দিষ্ট কোটা ছাড়াই উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পাবে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মর্যাদাপূর্ণ ‘হরাইজন ইউরোপ’ প্রোগ্রামে ভারতের অন্তর্ভুক্তি একটি বিশাল মাইলফলক।

পেশাদার কর্মীদের ক্ষেত্রেও এই চুক্তি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। ভারতীয় আইটি বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ পেশাদাররা এখন থেকে ইইউ দেশগুলোতে কাজ করার জন্য দ্রুত ও সহজতর অনুমতি পাবেন। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো ‘সামাজিক সুরক্ষা চুক্তি’ (Social Security Agreement) সম্পন্ন করার নির্দিষ্ট কাঠামো। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই কাঠামো চূড়ান্ত হলে ভারতীয় পেশাদাররা দ্বৈত করের বা ডুয়াল ট্যাক্সেশনের (একই আয়ের ওপর ভারত এবং ইউরোপ — উভয় দেশেই কর দেওয়ার বোঝা) হাত থেকে মুক্তি পাবেন, যা তাঁদের সঞ্চয় ও পেশাদার জীবনকে আরও সুরক্ষিত করবে।

 ভূ-রাজনীতি ও ভারতের কৌশলগত বর্ম 

ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটি এমন এক সময়ে স্বাক্ষরিত হয়েছে, যখন বিশ্ব বাণিজ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সংরক্ষণবাদী নীতির চাপে টালমাটাল। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন ভারতের ওপর যে শুল্ক আরোপ করেছে, তার বিপরীতে এই চুক্তিটি ভারতের জন্য একটি শক্তিশালী কৌশলগত রক্ষাকবচ। মার্কিন শুল্ক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভারত এখন ইউরোপের বিশাল বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার পাবে, যা মার্কিন বাজারের ওপর ভারতের অতিনির্ভরতা কমিয়ে বিশ্ববাজারে নিজের ‘মার্কেট শেয়ার’ রক্ষা করতে সাহায্য করবে।

এই চুক্তির অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (Strategic Autonomy)। সস্তায় রুশ তেল আমদানি নিয়ে মার্কিন রক্তচক্ষু আর রপ্তানি পণ্যে উচ্চ শুল্কের চাপ থাকা সত্ত্বেও ভারত তার স্বাধীন বিদেশনীতিতে ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। একদিকে রাশিয়া থেকে তেল কিনে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আর অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে এই বিশাল বাণিজ্যিক সমঝোতা — ভারতের এমন ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ বিশ্বমঞ্চে নয়াদিল্লির কূটনৈতিক পরিপক্কতার প্রমাণ হিসেবে ধরা যেতে পারে।

তবে এই সমীকরণে একটি সূক্ষ্ম কাঁটা রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন নীতিগতভাবে রুশ তেলের কড়া বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও ভারতের সাথে এই চুক্তিতে সই করেছে। তবে তারা শর্ত রেখেছে যে, ভারতীয় রিফাইনারিগুলোকে এখন প্রমাণ করতে হবে যে তাদের রপ্তানি করা পণ্যে রুশ তেলের সংমিশ্রণ নেই — যাকে বাণিজ্যিক পরিভাষায় বলা হয় ‘Rules of Origin’। অর্থাৎ, ভারত নিজের প্রয়োজনে রুশ তেল ব্যবহার করতে পারলেও, সেই তেল পরিশোধন করে ইউরোপের বাজারে পাঠাতে পারবে না। এই কড়া শর্ত পূরণ করা আগামী দিনে ভারতীয় তেল সংস্থাগুলোর জন্য এক বিশাল প্রযুক্তিগত ও লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

 ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি 

বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং বিভিন্ন শিল্প সংগঠনের মতে, এই চুক্তি ভারতের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ অভিযানকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। ভারতের টেক্সটাইল শিল্পে এর ফলে গ্রামীণ এলাকায়, বিশেষ করে মহিলাদের জন্য লক্ষ লক্ষ নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হবে। একইভাবে চামড়া এবং হস্তশিল্প খাতেও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ইউরোপীয় বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ পাবেন। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ইউরোর আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রতিশ্রুতি ভারতকে একটি ‘সবুজ উৎপাদন কেন্দ্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করবে।

তবে এই ব্যাপক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র সমালোচনার ঢেউ উঠেছে। বামপন্থী দল ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এই চুক্তিটি ভারতের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের এক প্রকার ‘ঢালাও আত্মসমর্পণ’। তাদের আশঙ্কা, জেনেরিক ওষুধ প্রস্তুতকারকরা সস্তায় ওষুধ তৈরি করতে বাধা পেলে ভারতের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা সংকটে পড়বে। কৃষি খাতের ক্ষেত্রে যদিও সরকার দাবি করছে যে দুগ্ধজাত পণ্য সুরক্ষার আওতায় রয়েছে, তবুও সমালোচকরা মনে করছেন প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর শুল্ক হ্রাস দুধের দেশীয় বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বামপন্থীদের মতে, বিলাসবহুল গাড়ি বা মদের দাম কমানোর সুবিধার বিনিময়ে সাধারণ শ্রমিক ও কৃষকদের জীবিকা বাজি রাখা হয়েছে। এছাড়া ইসরায়েলের হাইফা বন্দরকে প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করার বিষয়টিকেও তারা নীতিগতভাবে তীব্র সমালোচনা করেছেন।

 পরিশেষে 

ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটি কেবল কর কমানোর কোনো সাধারণ দলিল নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীতে ভারতের এক শক্তিশালী কৌশলগত অস্ত্র। তবে বামপন্থী দল বা শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি মেনে জনস্বাস্থ্য ও ক্ষুদ্র কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করা সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। তবে আমেরিকার একতরফা শুল্কের যুগে এই চুক্তি ভারতের জন্য একটি ‘সুরক্ষা বর্ম’ হিসেবে কাজ করবে।

কিন্তু, একটি কঠিন সত্য মনে রাখা প্রয়োজন — যেকোনো চুক্তির সাফল্য নির্ভর করে তা কতটুকু কাজে লাগানো গেল তার ওপর। আমাদের দেশের ভেতরের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বা পরিকাঠামোগত দুর্বলতা যদি দূর করা না যায়, তবে এই সুযোগ কেবল ‘খাতা-কলমেই সই’ হয়ে পড়ে থাকবে। আর, এই সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতার ওপরই নির্ভর করছে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে কী হবে না।


-------------
 এক নজরে 

 যেসব জিনিসের দাম কমবে: 

•    বিলাসবহুল গাড়ি: মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ বা অডি-র মতো ইউরোপীয় গাড়ির দাম বড় অঙ্কের শুল্ক হ্রাসের ফলে উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

•    আমদানিকৃত খাদ্য ও পানীয়: প্রিমিয়াম ওয়াইন, চিজ (Cheese), চকোলেট, পাস্তা, অলিভ অয়েল এবং আমদানিকৃত ফল (যেমন: আপেল, কিউই)।


•    ওষুধ: জীবনরক্ষাকারী জটিল ওষুধ এবং চিকিৎসার সরঞ্জাম।

•    শিল্প কাঁচামাল: লোহা, ইস্পাত, বিভিন্ন রাসায়নিক এবং কারখানার যন্ত্রপাতির দাম কমবে।

 যেসব জিনিসের ব্যবসা বাড়বে: 

•    টেক্সটাইল ও পোশাক: ইউরোপে রপ্তানি শুল্ক শূন্য হওয়ায় ভারতীয় তৈরি পোশাকের ব্যবসা ব্যাপক বাড়বে।

•    চামড়া ও জুতো শিল্প: আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় ভারতীয় চামড়াজাত পণ্য এগিয়ে যাবে।


•    ওষুধ শিল্প : ইউরোপীয় মানদণ্ড সহজ হওয়ায় ভারতের জেনেরিক ওষুধ ও কাঁচামাল রপ্তানি বাড়বে।

•    সামুদ্রিক খাদ্য ও গয়না: রত্ন, অলঙ্কার এবং সামুদ্রিক খাদ্য রপ্তানি ব্যবসায় নতুন গতি আসবে।


•    খুচরা বিক্রেতা: বিদেশি প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের পণ্য যারা বিক্রি করেন, তাদের ব্যবসার পরিধি বাড়বে।

0 Comments

Post Comment