পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

তিনটি অণুগল্প

  • 02 July, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 281 view(s)
  • লিখেছেন : ব্রতী মুখোপাধ্যায়
এই সময় নিয়ে ৩ টি অণু গল্প লিখলেন ব্রতী মুখোপাধ্যায়।

 

 

 

 

এক

 

আঁধি

====

আঁধি।

এমন যে এপাড়া, সেপাড়া, দোকানবাজার, স্কুলকলেজ, হাসপাতাল, পার্ক, জলাধার, এমন কি খেজুর বন পর্যন্ত বালি ধুলোয় ঢেকে রয়েছে দিনের পর দিন। তারও পর কত ধরনের গর্জন, শব্দের প্রহার।

 

তারওপর

--- দেখেছিস আমার মামিন কে?

--- না। আমাদের তিপুরও বাড়ি ফেরেনি।

--- আমাদেরটাও।

--- আমাদেরটাও।

 

এইভাবে এর বাড়ি থেকে তার বাড়ি থেকে বাচ্চারা বে হদিশ। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে, স্কুল থেকে ফিরছে না, ছেলেমেয়েরা খেলতে যাচ্ছে, মাঠ থেকে ফিরছে না। এমনকি, মায়ের কোল থেকে, বাপের কোল থেকেও, এক একজন বেপাত্তা। প্রায় প্রত্যেকদিন।কাজেই কান্না। মায়েদের কান্না। বাপেদের কান্না। কে কাকে সান্ত্বনা দেবে কেউ জানে না। সমবেত কান্না বালি ধুলোর অসম্ভব আঁধির দেয়ালে দেয়ালে ঘা মারছে।

 

তখন সবাই বলল--- চলো, দেখি। রাজার কাছে যাই, তালাশ করি। কোথায় গেল আমাদের সব বুকের ধন দেখি।

 

খুঁজতে খুঁজতে খুঁজতে খুঁজতে মাঠ পেরিয়ে, নদী পেরিয়ে, একটার পর একটা পাহাড়, মরুভূমি আর মরূদ্যান পেরিয়ে, দূরে, অনেক দূরে সে এক লম্বা পাঁচিল, তার এদিক ওদিক দেখতে পায় না কেউ। আকাশ অব্দি উঁচু। উরিব্বাস! কী বিশাল ফটক! তার মুখে অস্ত্র হাতে শস্ত্র হাতে হাজার হাজার বাঘা বাঘা পাহারাদার।

 

পাহারাদারদের একজন একজনের বুকে রাইফেল তাক করে বলল--- এখানে কি? কাকে চাই?

সবাই বলল--- রাজার কাছে যাব।

বাঁ হাতটা সামনে মেলে পাহারাদার বলল--- দস্তুরি?

তার কথা শোনামাত্রই মায়েরা হাতের চুড়ি, কানের দুল, গলার হার, স-অ-ব খুলে দিল। বাপেরাও দিল যার কাছে যা রয়েছে স-অ-ব।

এক এক করে ভেতরে গেল, আর দেখল রাজামশায়ের খাওয়ার সময় তখন। রাজামশায় খেতে বসেছে। বড় বড় ডেকচি। বড় বড় থালা। খেজুর, কিসমিস, আপেল, কমলা, আরও কত কী। রাজামশায়ের চেয়ার-টেবিল সোনার। উজ্জ্বল হলুদ আলো ঠিকরে ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। আহা!

 

একজন জিগগেস করল--- কি খাচ্ছেন, মহারাজ?

রাজা বলল--- মাংস।

--- মাংস?

--- বাচ্চাদের মাংস। এই দেখো ছোট্ট এক টা পা, ওই দেখো ছোট্ট একটা মাথা, দেখো দেখো হৃদপিণ্ড, কচি বাচ্চা সব।

 

একজন বলল--- আমাদের বাচ্চা।

আর একজন বলল--- আমাদের বাচ্চা।

 

রাজা খেয়েই চলেছে। কচি বাচ্চার নাক, চোখ, হাতের আঙুল, পায়ের আঙুল, পা।

খেতে খেতেই রাজা বলল--- নরম। চিবুতে হয় না। খুব সুস্বাদু। খু-উ-ব।

 

তখন একজন জিগগেস করল--- কি নাম তোমার, রাজা?

রাজা বলল--- আমার নাম? আমার নাম নেতানিয়াহু। নেতানিয়াহু। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।

 

-----------------------------------

 

 

দুই

যুদ্ধ মজুর

======

ইস্পাতের পাখি আকাশ থেকে আগুনের ডিম ছাড়ে। নিয়েলসম্যান জানে। সে এক টাকমান্ড দেয় শুধু, নিচে কিছু তেমন ভাবে দেখতে পায় না। ডিমগুলো প্রোগ্রাম মতো কারখানায় পড়ে, সেনা শিবিরে পড়ে, বিমানবন্দরে পড়ে, অথবা ছুটির দিনে সবাই যেখানে ভগবানের কাছে শান্তি আর নিরাপত্তা প্রার্থনা করতে জড়ো হয় সেই সব বড়সড় ভিড়ের মাথায় ঠিক ঠিক।

 

রোদ বেশ মধুর এখন ভোর পার হয়ে। নৌ জাহাজ থেকে ঢেউএর ওপর সেই রোদ দুলছে স্পষ্ট দেখা যায়, দুলতে দুলতে ছড়িয়ে দিচ্ছে সাত সতেরো রঙ। ডান্স ফ্লোরে বুবকিনের মার শরীর এই রকম দোলে, নিয়েলসম্যানের চোখে ভাসে হঠাৎ।

 

 

সেই সময় অপারেটিং স্টেশন থেকেই মারজেন্সিকল। তেমন কিছু না। বুবকিন, নিয়েলসম্যানের সাত বছরের ছেলে, আজ দুদিন হয়ে গেল স্কুল থেকে ঘরে ফিরে আসেনি। খোঁজাখুঁজি চলছে। উদ্বিগ্ন হবার কোনো কারণ নেই। সিস্টেম বীর সেনাদের সঙ্গে আছে সবসময়।

তক্ষুনি ইস্পাতের পাখি আবার সেজে নিয়েছে। প্রস্তুত। তক্ষুনি নিয়েলসম্যানের পরের ট্রিপ।

 

সিস্টেম দায়িত্ববান। হৃদয়বানও। নিয়েলসম্যান কি করবে জানতে চাইছে। সিস্টেম জানে যে খবর ভুলবশত পৌঁছে গেছে তার ধকল আছে। নিয়েলসম্যান কি রিলাক্স করবে ?

 

 (দিস ল্যান্ড ইস আ’র ল্যান্ড) এরজন্যে সঙ্গে সঙ্গেই পরের ট্রিপ, ইস্পাত পাখি ডাকছে।

পরের টার্গেট হাসপাতাল। একমাত্র শিশুদের হাসপাতাল।

 

--------------------------- 

 

তিন

 

স্বাগতম

=======

আপনার নাম?

খোকন ব্যানার্জি।

বাঙালি?

বাঙালি।

এক্ষুনি নাম চেঞ্জ করে নিন।

মানে?

মানে নাম করে নিন খোকন মিত্তাল।

 

আপনার নাম?

স্টুয়ার্ট অরবিন্দ দাশগুপ্ত।

বাঙালি?

বাঙালি।

নাম চেঞ্জ করে নিন।

মানে?

মানে স্টুয়ার্ট বাদ দিন।

স্টুয়ার্ট বাদ দেব কেন? আমি তো খ্রিস্টান।

বাদ দিন। বাদ দিতে হবে। পদবীও বাদ দিতে হবে। আপনার নাম অরবিন্দ গড়করি। ঠিক আছে?

 

আপনি?

ওসমান আলি।

পুরো নাম বাদ দিন।

কেন?

কারণ আপনি মুসলমান। আপনার ঠাকুরদার ঠাকুরদার ঠাকুরদা মুসলমান বাদশা ছিল।

তো?

অন্য নাম নিতে হবে। আপনার নাম জয় রাম উদয়বর্গীয়।

 

নৌকাটি ঘাটে ভিড়িতেছিল। কাণ্ডারী সকল যাত্রীর কল্যাণার্থে যথাসম্ভব সাহায্য করিতে বদ্ধ পরিকর।

নৌকাটি বড্ড বেশি দুলিতে ছিল। যাত্রীদের চোখ মুখে আতঙ্ক।

 

কান্ডারী জনে জনে বুঝাইয়া দিতেছেন খাদ্য পানীয় পোষাক ইত্যাদির কোনটি কোনটি অগ্রহণীয়।

নৌকা অবশেষে জেটি স্পর্শ করিয়াছে।

 

কাণ্ডারী বলিলেন--- আপনাদের জন্যে ভূখণ্ডের আধিকারিকগণ অপেক্ষা করিতেছে।

 

মাইক্রোফোনে গম্ভীর গলায় ঘোষণা শোনা গেল---

লিঞ্চিংস্তানে আপনাদের স্বাগত জানাই।

 

---------------------------------

0 Comments

Post Comment