শুক ও সারি দুই পাখি। একজন তোতা আর এক পাখিটি সাধারণত আকারে ময়না। অনেক পৌরাণিক কাহিনীতে তাদের আবার দুই তোতাপাখি বা জোড়া টিয়া বলা হয়েছে। কথিত যে, দিনরাত তারা ঝগড়া করে। শুধু কি ঝগড়াই করে? দুই পাখি কিন্ত একে অপরকে ছেড়ে থাকতে পারে না। শুক(পুরুষ) ও সারি(স্ত্রী) রাধা-কৃষ্ণর লীলা নিয়ে দ্বন্ধ করে। শুক বলে কৃষ্ণের মাথায় ময়ূরের পালক আছে। সারি বলে এ আর এমন কি, তুমি দেখে এসো ওতে রাধার নাম লেখা আছে। শুক বলে কৃষ্ণের চূড়াটি বামদিকে হেলে আছে। সারি বলছে ওই মাথার চূড়া রাধার পা ছুঁতে চায় তাই বাঁকা। শুক বলে কৃষ্ণ হল মাতা যশোদার নয়নমণি।

উপরের ছবি পঙ্খ কাজের দুপাশে শুক সারি, শ্রীবাটি।
যশোদার প্রিয় গোপাল। সারি বলে রাধা হলো কৃষ্ণের প্রাণ। নাহলে তিনি প্রাণহীন হয়ে যেতো। শুক বলে কৃষ্ণ মধুর বাঁশি বাজায়। সারা ব্রজধাম সেই সুরে মোহিত থাকে। সারি বলে ওই সুরে যে কৃষ্ণ রাধার নাম গায়। বৃন্দাবন বিলাসিনী রাই আমাদের। ওগো, রাই আমাদের, রাই আমাদের। এভাবেই চলতে থাকে দাম্পত্য কলহ। তবু তারা নিজেদের একত্রে ধরে রাখে। কৃষ্ণ ও রাধারানীর কৃপা আছে তাদের ওপর। বলা হয়, রাধা-কৃষ্ণ ব্রজধামে গাছের নিচে বসে দুই পাখির এই ঝগড়া আনন্দ উপভোগ করেছিলেন।
নীচের ছবি মন্দিরের থামে পাখি যুগল, বর্ধমান।

“ব্রজের বিপিনে বাঁশরী বাজিবে
শুক সারি শিখি নাচিবে গাহিবে”
ব্রজধামে বসন্তে রাধা-কৃষ্ণর লীলা এক বিশেষ রূপ পায়। বসন্তের প্রকৃতি ও পুষ্পময় পরিবেশের সঙ্গে যেন মানবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন। বাংলা জুড়ে পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া, রক্তকাঞ্চন, মাধবীলতা, দোলনচাঁপা সহ নানা রকমের ফুলে ফুলে প্রকৃতি রঙিন হয়ে ওঠে। আর শুক সারি তুলে ধরে রাধা-কৃষ্ণের লীলা। দুই পাখির ঝগড়া যা আদতে রাধা-কৃষ্ণের মাহাত্ম্যকে জনপ্রিয় করে। কৃষ্ণদাস কবিরাজ কতৃক লিখিত চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে উল্লেখ আছে শ্রীচৈতন্য বৃন্দাবন ভ্রমণ করবার সময় বৃক্ষশাখে শুক ও সারির প্রেমের ঝগড়া শুনেছিলেন।
নীচের ছবি দালান রীতির মন্দিরে খিলানের ওপর কাজে দুই পাখি, বাঁকুড়া।

বাংলার প্রাচীন সব মন্দির অলঙ্করণ ও স্থাপত্য শিল্পে শুক সারি পাখিকে তুলে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন মন্দিরে জোড়া অবস্থায় অথবা নকশার দুইপাশে শুক সারি পাখিকে দেখা যায়। মন্দির স্থাপত্যতে খিলানের ওপর কাজে দুইটি পাখি থাকে। বিভিন্ন কুলুঙ্গির মধ্যেও দেখা যায়। সাধারণ ভাবে রাধা-শ্যাম, অনন্ত বাসুদেব, বিষ্ণু, গোকুলচাঁদ, শ্রীধর, দামোদর, মদনমোহন নামক শ্রীকৃষ্ণের অসংখ্য মন্দিরে এই দুই পাখি শিল্পকাজে ফুটে ওঠে। তপন সিংহের ‘গল্প হলেও সত্যি’ চলচ্চিত্রতে একটি চমৎকার গান রয়েছে,
“শুক বলে ওঠো সারি ঘুমায়োনা আর
এ জীবন গেলে ফিরে আসে না আবার”।
এ বিশ্ব শুধু বিষাদময় নয়। আছে প্রীতি, সুখ আর বিশ্বরচয়িতার পরম করুণা। সেই সমস্ত মহিমার প্রতীক শুক সারি। তারা প্রকৃতির মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার উপস্থিতি তুলে ধরে। বাংলা কীর্তন ও পালা গানে দুই পাখির দ্বন্দ্ব অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাঁকুড়া জেলার জয়পুরের নবরত্ন দামোদর মন্দিরে মাঝের খিলান বা ধনুকাকৃতি দরজার ওপরে এই দুটি পাখিকে দেখা যায়। তাদের ওপরেই আছে কৃষ্ণলীলার কাজ। পূর্বদিকেও তিনটি খিলানের ওপরে আছে শুক সারি পাখি। গর্ভগৃহে খিলানের ওপরেও শুক আর সারিকে দেখা যায়। জয়পুরে দে পাড়ার কাছেই একটি সমতল ছাদ বিশিষ্ট দালান রীতির মন্দির আছে। যার তিনটি ধনুকাকৃতি খিলানের ওপরে সূক্ষ্ম শিল্পকর্মে টেরাকোটায় পাখি দুটিকে তুলে ধরা হয়েছে। খুব সুন্দর ভাবে তাদের ফুটিয়ে তোলা হয়েছে জয়পুরের আটচালা বিষ্ণু মন্দিরে।

উপরের ছবি মন্দিরে গর্ভগৃহের খিলানে গণেশ, কৃষ্ণ, বলরাম ও শুক সারি পাখি, বাঁকুড়া।
হুগলি জেলায় গুপ্তিপাড়ার বৃন্দাবনচন্দ্র ও কৃষ্ণচন্দ্র মন্দিরে ত্রিখিলান স্তম্ভের মধ্যে অঙ্গসজ্জায় দেখা যায় পাখি যুগলকে। পূর্ব বর্ধমান জেলায় অম্বিকা কালনাতে লালজী মন্দিরের নাট মণ্ডপ ও গর্ভগৃহতে পাখি যুগলকে দেখা যায়। বোলপুরের সুপুরে আটকোনা জোড়া শিব মন্দিরের প্রতিটি খিলানে ওপরের কাজে শুক ও সারি রয়েছে। নদীয়া জেলার শান্তিপুরে শ্যামচাঁদ মন্দির বিখ্যাত। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের পিতা মন্দির নির্মাণ কাজে বহু ব্যয় করেছিলেন। এই মন্দিরে শ্যামচাঁদ পূজিত হন। মন্দিরের পাঁচটি খিলানের ওপরে টেরাকোটার কাজে পাখি যুগল আছে। তাছাড়া মন্দিরের থামের মধ্যেও দেখা যায়। বাংলায় পূর্ব বর্ধমান, হুগলি, বাঁকুড়া, বীরভূম, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ জেলার বিভিন্ন মন্দিরে শিল্পকর্মে দুই পাখিকে পাওয়া যায়। যেন দুই পাখি ভক্তকে মনে করিয়ে দেয় পরমাত্মা সর্বদা আছেন। তাই তারা বেশিরভাগ সময়ই খিলানের ওপর থাকে। যা পার্থিব জীবন থেকে আধ্যাত্মিক জীবনে উত্তরণ।
স্থাপত্য নিদর্শনে অলংকরণ এর মধ্যে লক্ষ্য করা গেলেও তাদের নামে গোটা মন্দির রয়েছে এমন দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। কিন্ত উড়িষ্যায় কলিঙ্গ স্থাপত্যে দুইটি পাথরের মন্দির পাওয়া যায়। যার নাম শুক ও সারি মন্দির। ভুবনেশ্বরে বিন্দু সরোবরের কাছে এই মন্দির এক অদ্ভুত সুন্দর। পৌরাণিক অনুসারে তাদের নামে সম্পূর্ণ দুইটি মন্দির খুবই দুর্লভ। প্রধান মন্দিরটির নাম সারি মন্দির ও দক্ষিণ-পশ্চিমেরটি শুক মন্দির। ১৩ শতকে গঙ্গা রাজবংশের সময়ে নির্মিত। কৃষ্ণলীলা, দেব-দেবীর মূর্তি, পাখি, হাতি, ফুল, লতাপাতার মোটিফ দেওয়ালে স্থান পেয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মন্দিরের চারপাশে খনন চালিয়ে যাচ্ছেন। আরো কয়েক বছর খোঁড়া খুঁড়ি চলবে। কাছেই চারটি পাথরের মন্দির ও ভিত্তিপ্রস্তর মাটি খনন করে পাওয়া গেছে।

উপরের (প্রথম চিত্র) সারি মন্দির। (দ্বিতীয় চিত্র) শুক মন্দির, ভুবনেশ্বর।
রাধা-কৃষ্ণের মহিমা রূপ পেয়েছে শুক ও সারি দুই পাখির মাধ্যমে। অলংকরণ শিল্পের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ দুই পৌরাণিক পাখি। যা গ্রাম বাংলার স্থাপত্যর মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্ত স্থাপত্য সমন্ধে আমরা উদাসীন। বহু স্থাপত্য আজ উপেক্ষিত। ভারতের সমৃদ্ধ মন্দির স্থাপত্য। কিছু মানুষ শুধু ধর্ম ও জাত-পাত নিয়ে মাথা ঘামান। এদিকে সুনিপুণ কারুকার্যগুলো বিলুপ্তির পথে। সেখানেই আমাদের মনোবেদনা।
তথ্যসূত্র:
সুধীরকুমার মিত্র
আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI)
শ্রীসারদাপ্রসাদ ঠাকুর