ভারতবর্ষে গত কয়েক মাসের মধ্যে সবচেয়ে চর্চিত বিষয় হল ভোটের তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী বা সংক্ষেপে এস আই আর । ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়া সমগ্র বিশ্বে গণতন্ত্রের এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত বলে বিবেচিত হলেও বিহারে নির্বাচনের মাত্র চার মাস আগে তড়িঘড়ি সংশোধনী ভোটার তালিকা তৈরি করার প্রক্রিয়াটি সেই বিশ্বাসের ভিতেই প্রশ্ন তুলছে। নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্য কি সেটার বিতর্ক থাক কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় সাধারন মানুষের ভোগান্তি , হয়রানি চরমে উঠেছে এবং সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন মহিলারা। দ্য হিন্দু” র তথ্য অনুযায়ী বিহারে এস আই আর এ প্রায় ৪৭ লাখ ভোটারের নাম বাদ গেছে যাদের মধ্যে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশই মহিলা। “অসমের এনআরসিতেও অসমে বাদ পড়া ১৯ লক্ষ মানুষের ৭০ শতাংশই মহিলা। প্রথম দফায় বিহারে এস আই আর এর পর দ্বিতীয় দফায় চলছে পশ্চিমবঙ্গে সহ ৯টি রাজ্য ও ৩ টি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে । এবং পশ্চিমবঙ্গেও একই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন এক বিশাল শ্রেনীর মহিলারা। এর কারন খুবই স্বাভাবিক, অভিবাসী শ্রমিকদের মতো অধিকাংশ মেয়েরাই বিয়ের পর অন্যত্র চলে যায়, তাদের নামও পাল্টে যায়।তাদের পরিচয় মূলত স্বামীর পদবীর সাথে যুক্ত হয়। বিবাহজনিত কারণে নাম পরিবর্তন বা স্থানান্তর হওয়া স্বাভাবিক হলেও সেই স্বাভাবিকতাকে উপেক্ষা করেই সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে চলমান এসআইআর মহিলাদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার ভয় ও বিপন্নতা সৃষ্টি করছে যা ভারতীয় গণতন্ত্রে নাগরিক অধিকারের সুরক্ষাকেই নস্যাৎ করে দেয়। অন্যভাবে বলতে গেলে যা জাতীয় নাগরিক নিবন্ধক (এনআরসি) এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এর মতই একটি উদ্বেগের বিষয়।
বিষয়টি একটু গভীরে গিয়ে বোঝা যাক। সংশোধনী প্রক্রিয়া অনুযায়ী ২০০২ এবং ২০২৫ সালের ভোটার তালিকা মিলিয়ে দ্বৈত যাচাই করে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে, অর্থাৎ এই দুই সালের তালিকায় কারও নাম থাকলে তবেই তিনি বৈধ ভোটার হিসেবে পরিগনিত হবেন এবং এখানেই আসলে সমস্যা। ২০০৩ সালের পর যাঁদের সংসার নতুন জায়গায় গড়ে উঠেছে, তাঁদের একই বুথে নাম থাকা প্রায় অসম্ভব। যদি কোনও মেয়ের বিয়ে ২০০৪ সালের পরে হয়, তবে তিনি প্রাপ্তবয়সে বাবার বুথে নাম তোলেননি, কিন্তু শ্বশুরবাড়ির বুথে নাম উঠেছে। ফলত দু’টি তালিকায় কোথাও একই সঙ্গে তাঁর নাম নেই। সেক্ষেত্রে এই মহিলাদের স্থান কোথায় হবে? বা ধরা যাক অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ে হওয়া কোনও মেয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হলে ভোটার হয়েছে, এবং ২০০৭ সালে তিনি নাম তুলেছেন। স্বাভাবিকভাবে ২০০২-এর তালিকায় তাঁর নাম থাকবে না। কিন্তু পুরনো তালিকায় নাম না থাকলে সেক্ষেত্রে কি তিনি বৈধ ভোটারের স্বীকৃতি পাবেন না ? বলা হচ্ছে যে নির্বাচন কমিশনের উল্লিখিত এগারোটি নথি ( যেমন কেন্দ্রীয় / রাজ্য বা, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কোনও পরিচয় পত্র বা ০১.০৭.১৯৮৭ আগের ব্যাঙ্ক, পোস্ট অফিস, ভারতীয় জীবন বিমা নিগম, থেকে দেওয়া যে কোনও পরিচয়পত্র, শংসাপত্র বা নথি / বার্থ সার্টিফিকেট /পাসপোর্ট / ম্যাট্রিকুলেশন সার্টিফিকেট বা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া শিক্ষাগত যোগ্যতার শংসাপত্র অথবা রাজ্যের দেওয়া স্থায়ী বাসস্থানের শংসাপত্র বা সরকারের তরফে কোনও জমি, বাড়ি দলিল ইত্যাদির) মধ্যে যেকোন একটি দেখানো গেলে ওই ভোটারকে ডি- ভোটার বা সন্দেহজনক হিসেবে গন্য করা হবেনা , প্রশ্ন হল ১৯৮৭ সালের আগে কতজন মহিলার ব্যাঙ্ক, বীমা বা ডাকঘর অ্যাকাউন্ট ছিল, বা জমি বা বাড়ির মালিক ছিলেন? কতজন বিবাহিত মহিলা, বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের, তাদের বাবার বিবরণ, জন্মস্থান, জন্ম তারিখ, মায়ের স্থান বা জন্ম তারিখ বলতে পারেন?
সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের নারী শাখা অল-ইন্ডিয়া প্রগ্রেসিভ উইমেন’স অ্যাসোসিয়েশন (এআইপিডব্লিউএ) দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়া, যাদবপুর, বাঘাযতীন এলাকার বস্তিগুলোতে, এবং হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনায় নারীদের জন্য শিবিরের আয়োজন করেছে। অ্যাসোসিয়েশনের কলকাতা জেলা সম্পাদক চন্দ্রস্মিতা চৌধুরী বলেছেন যে বাংলার খসড়া তালিকা প্রকাশিত হলে দেখা যাবে বাদ পড়া মহিলাদের হার বিহারের চেয়েও বেশি,” এবং তার প্রতিফলন এখনই দেখা যাচ্ছে।
হুগলির বৈঁচি গ্রামে চল্লিশোর্ধ্ব এক মহিলা এআইপিডব্লিউএ-র স্বেচ্ছাসেবকদের বলেছেন যে, বিয়ের সময় তিনি নাবালিকা ছিলেন। তাঁর বাবা-মা মারা গেছেন এবং ভাইয়েরা মহিলাকে পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ দিতে চায় না বলে তাঁর সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, তিনি হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করেননি এবং দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনাও শেষ করেননি। তাই বার্থ সার্টিফিকেট বা পড়াশুনার কোন প্রমানপত্র দেখাতে অক্ষম। সেক্ষেত্রে তিনি কি ডি- ভোটার হয়ে যাবেন? কারণ ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় বাবার নাম থাকা সত্ত্বেও, বাবার সাথে তার সম্পর্ক প্রমাণ করার মতো কোনো কাগজপত্র তার কাছে নেই। অন্য একটি ঘটনায় ভিন্ন সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তিকে বিয়ে করার কারণে এক মহিলাকে তার বাবা-মা পরিত্যাগ করেছেন। সুতরাং তার কাছেও কোনও নথি নেই নাগরিকত্ব প্রমানের। এইসব মহিলাদের কাছে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক যাচাইকরণের জন্য নির্দিষ্ট করা বেশিরভাগ কাগজপত্রই নেই। আর বাবার বাড়িতে কিছু কাগজপত্র থাকলেও তারা সেগুলো সংগ্রহ করতে পারছেন না। এই নারীদের অনেকেই নিরক্ষর। আরও অনেকে স্কুলে গেলেও দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া শেষ করেননি। তাদের বেশিরভাগেরই জন্ম সনদ নেই। ডকুমেন্টেশনের এই সমস্যাগুলি, গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে প্রান্তিক মহিলাদের ক্ষেত্রে সংশোধন প্রক্রিয়ায় এক বিশাল জটিলতার সৃষ্টি করেছে। ব্যক্তিগত সনাক্তকরণ নথি, জন্ম শংসাপত্র বা স্বীকৃত বোর্ড থেকে শিক্ষাগত শংসাপত্রের অভাব তো রয়েছেই , উত্তর ২৪ পরগনার শিবদাসপুরের আরেকটি গ্রামে, যেখানে বেশ কয়েকটি আদিবাসী পরিবার বাস করে, সেখানে জমির পাট্টা এক ধরনের পরিচয়পত্র হিসেবে কাজ করে। কিন্তু কাগজপত্রগুলো পুরুষদের নামে রয়েছে। ভূমি পট্টা (দলিল) প্রায়শই পুরুষদের নামে হয়,সুতরাং সেখানেও নথি সরবরাহের অসুবিধা। ভোটাধিকার কেবল সাংবিধানিক সুযোগ নয়, নাগরিক মর্যাদার প্রতীক। এই অবস্থায় যদি নারীর এই অধিকারেই কুঠারাঘাত হয় করা হয় তবে তা কেবল অন্যায়ই নয়, গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী।
তা ছাড়াও এস আই আর বেশিরভাগ নিরক্ষর ও প্রান্তিক মহিলাদের জন্য দৈনন্দিন জীবনে রুজি রোজগারের ক্ষেত্রেও একটি অতিরিক্ত সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে কারন বছরের এই সময়টা ওই সব মহিলাদের মধ্যে অনেকেই ধান কাটার কাজে বা জীবিকার তাগিদে দক্ষিণ ভারতের দিকে যান। তাঁরা উভয় সংকটে পড়েছেন। যদি তাঁরা না যান, তবে তাঁদের আয়ের ক্ষতি হবে। কিন্তু ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার ভয়ও তাঁদের মধ্যে রয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার অনেক পরিবার যাদবপুর, বাঘাযতীন এবং ঢাকুরিয়ার বস্তি এলাকায় ভাড়া বাড়িতে থাকে তাদের অনেকেরই প্রাকৃতিক দুর্যোগ , ঘূর্ণিঝড়ে সরকারি কাগজপত্র হারিয়ে গেছে। কিন্তু ওইসব পরিবারের পুরুষরা নিজেদের জন্য নকল কাগজপত্র জোগাড় করতে সক্রিয় হলেও নারীদের ব্যাপারে তাদের উদাসীনতার জন্য অনেক মহিলারই কোন প্রমানপত্রই নেই এবং তারা নাম বাদ পড়ার ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন। বলা হছে বাধ্যতামূলক শুনানির সময়েও তাদের হাজিরা দিতে হবে, তাতেও এক বিশাল শ্রেনীর মানুষের রুজি রোজগারে টান পড়বে এই আতঙ্কেও অনেকই দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
এমনকি যে মতুয়াদের সমর্থনের ওপর সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিজেপি বহুলাংশে নির্ভরশীল তাদেরই মধ্যে ভোটদানের অধিকার হারানোর বিষয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ বাড়ছে । স্বয়ং মতুয়া সম্প্রদায়ের সদস্য এবং তৃণমূল সাংসদ মমতা বালা ঠাকুর বলেন, “এসআইআর প্রক্রিয়ার পর মতুয়ারা গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, কারণ এই সম্প্রদায়ের প্রায় ৯৫ শতাংশ সদস্যের কাছে ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ১১টি নথি নেই। তিনি বলেন, “মতুয়ারা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, এবং নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ)-এর অধীনে ঠিক কতজন নাগরিকত্বের নথি পেয়েছেন, তা এখনও অস্পষ্ট। বিজেপি দাবি করেছিল যে এসআইআর (স্টেট ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট) অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করবে, কিন্তু খসড়া তালিকা থেকে দেখা যাচ্ছে যে মতুয়ারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তার মতে ”এটা মতুয়াদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার একটি প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়,”
শুধু গ্রাম বা মফঃস্বলই নয় , প্রায় ১০০০০ যৌনকর্মীদের বাসস্থান এশিয়ার বৃহত্তম রেড-লাইট এলাকা সোনাগাছিতেও এস আই আর এর নথির অবর্তমানে ভোটার তালিকা থেকে সম্ভাব্য বাদ পড়ার বিষয়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে, অনেক যৌনকর্মীদের জন্যই এটি একটি বড় বাধা, তারা তাদের ভবিষ্যতের ভোটদানের অধিকার সম্পর্কে অনিশ্চিত।একজন প্রবীণ নির্বাচন কর্মকর্তা বলেছেন যে অনেক মহিলা ২০০২ সাল থেকে কোনও রেকর্ড খুঁজে পাচ্ছেন না, কারণ অনেকে কখনও তাদের বাবা-মায়ের সাথে থাকতেন না, পারিবারিক সংযোগে টানাপোড়েন ছিল বা তাদের শৈশবে বাড়ির সাথে সংযুক্ত নথির অভাব ছিল। কয়েকটি মানবাধিকার গোষ্ঠী ওই এলাকায় ক্যাম্প করে তাদের সাথে দেখা করে তাদের যথাযথ সহায়তা দেওার চেষ্টা করছেন, তারা বলছেন যে অনেক যৌনকর্মী কলঙ্কের কারণে পরিবারের কাছ থেকে তাদের পেশা লুকিয়ে রেখেছিলেন, যার ফলে শৈশবের নথি পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব । অন্যরা খুব অল্প বয়স থেকেই স্বাধীনভাবে বসবাস করে আসছে এবং তাদের পিতামাতার পরিচয় সম্পর্কে তাদের কোনও জ্ঞান নেই। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলির মতে অনেক যৌনকর্মী যারা ইতিমধ্যে লক্ষ্মী ভান্ডার এবং বিধবা পেনশন সহ রাজ্য প্রকল্পের সুবিধাভোগী, প্রশ্ন তুলেছে যে যখন সরকারী রেকর্ডে তাদের স্বীকৃতি আছে , তাদের আবার যোগ্যতা প্রমান করার প্রয়োজন কেন ? এই ব্যাপারেও কোনও স্পষ্ট নির্দেশ নেই কারও কাছে।
তাছাড়াও প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষদের কাছেও এস আই আর একটি বিরাট সমস্যা , এদের মধ্যে অনেকের ই কোনও কাগজপত্র নেই, অনেকেই লিঙ্গ পরিবর্তন করেছেন বা রূপান্তর করিয়েছেন ২০০২ সালের পরে, সে ক্ষেত্রে তাদের আগের ছবি বা অন্য পরিচয়পত্রের সাথে বর্তমান এর কোন সাদৃশ্যই নেই, এমনকি আগের নামও তারা এখন ব্যাবহার করেন না, সবাই নতুন নামে পরিচিত এবং অনেকে পরিবারের থেকে সম্পুর্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে বসবাস করছেন , সে ক্ষেত্রে তাদের পরিচয় বা নথিভুক্তি হবে কিসের ভিত্তিতে ? কারও BIRTH CERIFICATE এর সাথে নাম মিলবেনা , রূপান্তরিত সমাজকর্মী অনুপ্রভা দাস মজুমদার এর আশঙ্কা এস আই আর এর ফলে রূপান্তারকামীরা তাদের ভোটাধিকার হারাবেন না তো ? কারন অনেকেই আইনিভাবে তাদের স্বীকৃত অধিকার পুরোপুরি পাননি , অনেকেই সেটার পদ্ধতির মধ্যে আছেন, তাছাড়া আর একটি বড় বিষয় হল নির্বাচন কমিশনের লিপিবদ্ধ এগারোটি নথির মধ্যে এই রূপান্তরকামীদের TRANSGENDER IDENTITY CARD এর কথা কোথাও বলা নেই, অতএব যাদের অন্য কোন ডকুমেন্ট নেই , তারা এই পরিচয়পত্র দেখিয়ে যে নাম নথিভুক্ত করবেন সে উপায়ও নেই। অনুপ্রভার মতে, এখনও অনেক সরকারি দপ্তরে জানেই না যে এই Transgender Identity Card একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমানপত্র।
এস আই আর এর সমীক্ষায় আর ও বড় সমস্যায় পড়েছেন কোচবিহার ও দিনহাটার ছিটমহলের বাসিন্দারা। এই অঞ্চলে ২০১১ সালের আগেয় যে সব মেয়ের বাইরে বিয়ে হয়েছিল তাদের নাম ২০১১ বা ২০১৫ সালের লিস্টে নেই , তাদের পূর্বপুরুষ দের নামও ওই তালিকায় নেই সেই কারনে তারা খসড়া ভোটার তালিকায় নাম তলার আর্জি জানিয়েছিলেন, কিন্তু এখন তাদের কাছে যে সব নথি চাওয়া হছে তাদের অধিকাংশরই ওই সব প্রমানপত্র নেই । উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন মন্ত্রী উদয়ন গুহ বলেন অধিকাংশ ছিটমহলএর বাসিন্দাই ২০১৫ সালে বিনিময়ের মাধ্যমে ভারতের নাগরিক হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে কি হবে ? জনৈকা হাওয়া বিবি বলেন ২০ বছর আগে ছিটমহলের বাইরে কচুয়া গ্রামে বিয়ে হলেও এখন তারা নতুন গ্রাম গাউচুল্কা তে বাড়ি করে স্থানান্তরিত হয়েছেন, তিনি ছিটমহল এর বাসিন্দা হলেও তার শ্বশুরবাড়ির সবাই ভারতীয়, তাহলে তার পরিচয় কি হবে ?
ভারতের গণতন্ত্রে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ বরাবরই স্বীকৃত। সেক্ষেত্রে নারীর ভোটাধিকারকে যদি সন্দেহের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়, তবে সমগ্র নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি আস্থা নড়ে যাবে। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজনৈতিকভাবে সচেতন রাজ্যে এই বিভ্রান্তি তৈরি হলে তার অভিঘাত গোটা দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় পড়বে। এই বিভ্রান্তি দূর করার দায় একমাত্র নির্বাচন কমিশনের। প্রথমত, কমিশনকে স্বীকার করতে হবে যে নারীর ক্ষেত্রে বুথ পরিবর্তন স্বাভাবিক। ফলে শুধু বুথ-ভিত্তিক তালিকা মেলানো যথেষ্ট নয়। দ্বিতীয়ত, বিবাহ সনদ, ভোটার আইডি, আধার বা স্থানান্তরের নথিকে বিকল্প প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। সর্বশেষে, বিশেষ নির্দেশিকা জারি করে অবিলম্বে প্রকাশ্য ব্যাখ্যা দিতে হবে যা বিভ্রান্তি দূর করবে এবং গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখবে। যাতে নারীরা নিশ্চিত হতে পারেন, তাঁদের ভোটাধিকার কোনও অবস্থাতেই প্রশ্নবিদ্ধ হবে না।
গণতন্ত্রে কোনও প্রান্তিকতার জায়গা নেই, তাই আমাদের দাবি— এসআইআরের প্রক্রিয়ায় নারীদের সামাজিক বাস্তবতাকে মান্যতা দিন। নাহলে একবিংশ শতাব্দীর ভারতবর্ষের গণতন্ত্রে নারীরাই দেশের সবচেয়ে ‘ডাউটফুল’ নাগরিক বলে চিহ্নিত ( পড়ুন অদৃশ্য) হয়ে যাবেন।