কলকাতার শিয়ালদা চত্বরে কারমাইকেল হস্টেলের বাঙালি ছাত্ররা ২০ আগস্ট ২০২৫ তারিখে হিন্দি-উর্দুভাষীদের হাতে আক্রান্ত হওয়ার মতো ঘটনা দেখলেই নাতিদূর থেকে সুদূর অতীত জুড়ে থাকা কিছু স্মৃতি ছবির মতো পরিস্কার হয়ে ভেসে ওঠে। এরকম বহু উদাহরণ বহু জায়গায় বহুবার আমার বিভিন্ন লেখায় প্রসঙ্গক্রমে এসেছে।
অবাঙালিরা যখন বাংলায় কথা বলার জন্য কাউকে বাংলাদেশি বলে, এমনকি তাঁকে নিগ্রহ পর্যন্ত করে, সেটা তাদের অজ্ঞতা-প্রসূত বিদ্বেষের কারণে হলেও হতে পারে, আবার শুধু বিদ্বেষ চরিতার্থ করতে গিয়ে সব জেনেশুনে ইচ্ছাকৃতও হতে পারে। কিন্তু খোদ কলকাতার কিছু বাংলাভাষী (এমন প্রাণীকে বাঙালি বলতে সত্যিই রুচিতে বাধছে) যে এমনটা বলতে পারেন তার প্রমাণ আমি বহুবার পেয়েছি। একটা উদাহরণ আমার আগের একটা লেখায় অন্যত্র দিয়েছিলাম, আজ প্রাসঙ্গিক বলে এখানে আরেকবার দিচ্ছি।
আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত কোনো এককালের একজন সহকর্মী কথা প্রসঙ্গে আমাকে একবার বলে বসেন, ‘তুমি তো বাংলাদেশি, তাই না?’ অর্থাৎ তাঁর অনুমান অনুযায়ী আমি যেহেতু বাংলায় কথা বলি অথচ নাম আজমল হুসেন, তাহলে নিশ্চয়ই আমি বাংলাদেশি। পেটের তাগিদে আমাকে একটা তথাকথিত ভদ্র-সভ্য মহলেই কাজ করে খেতে হয়। যথারীতি আমার পরিচিতি নিয়ে এরকম বিবেচনাহীন মন্তব্য কিংবা কৌতূহল এইসব জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি শুনি। জীবিকার বাইরে সমাজকর্মী হিসেবে যেহেতু মাটিতে পা রেখে চলা মানুষের সঙ্গে ওঠা-বসার সুযোগও জীবনে অনেক পেয়েছি, তফাৎটা আমার স্বল্প বুদ্ধিতেও বরাবর চোখে পড়ে। হলফ করে বলা যায়, তথাকথিত অশিক্ষিত বা স্বল্প-শিক্ষিত মানুষরা এঁদের মতো এতটা অবিবেচক নন, তাঁদের চিন্তার পরিধিও তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের বৃহদাংশের মতো এতটা সংকীর্ণ বা সংকুচিত নয়!
আমার সেই সহকর্মীকে আমি বলেছিলাম যে আমার স্মৃতিতে বা আমার কোনো জীবিত প্রজন্মের স্মৃতিতে বাংলাদেশ বলে কিছু নেই অথবা ছিল না। আগের বেশ কয়েকটা প্রজন্ম অবিভক্ত ভারতের বাসিন্দা, আর দেশটা দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভাগ হয়ে যাওয়ার পরও একাধিক প্রজন্ম পেরিয়ে গেছে, এখনও সেখান থেকে কেউ অন্য দেশে যাননি। পূর্ব-প্রজন্মের সেই আদি বাসস্থানেই আমারও জন্ম, এবং আমার আরও কিছু আত্মীয় স্বজনের মতো আমিও সেখান থেকেই এসে পেশাসূত্রে এখন কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছি। কলকাতার এক বনেদি পরিবারে আমার সেই সহকর্মীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা, শহরের নামী কনভেন্ট স্কুল থেকে পড়ে আসা একজন উচ্চশিক্ষিতা ‘ভদ্র’মহিলা! তাঁকে শুধুমাত্র ‘না আমি বাংলাদেশি নই’ বলে বোঝাতে পারব বলে মনে হচ্ছিল না। অগত্যা নিজের তথা পূর্ব-প্রজন্মের দেশ যে বাংলাদেশ নয়, তা নিয়ে এই দীর্ঘ ব্যাখ্যা। পাকচক্রে আমার সেই সহকর্মীর মায়ের জন্মস্থান বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুর।
একদিন অফিসে মধ্যাহ্ন-বিরতিতে আমি আমার প্রিয় রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনছিলাম - ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি, তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী।’ আমার সেই বিদুষী সহকর্মী বললেন, ‘আমি তাহলে তোমাকে সেদিন বাংলাদেশি বলে ভুল করিনি!’ এই শ্রেণির কিছু মানুষের মানসিকতার সঙ্গে খাপ খাওয়া রসিকতাটাও ঠিক ততটাই কুৎসিত, ঠিক ততটাই কদর্য। কর্মজীবনের দীর্ঘ সময়কালে এরকম উপলব্ধি অসংখ্যবার হয়েছে। প্রসঙ্গত, কর্মসূত্রে কলকাতায় বসবাসের এটা আমার তৃতীয় দশক।
এই খাস কলকাতার বাংলাভাষী সুশীল সমাজের একাংশ যখন বাঙালির একাংশকে অবলীলায় বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করতে পারেন, কেউ চোখে আঙুল দিয়ে তাঁদের এই ভ্রান্তির কথা ধরিয়ে দেওয়ার পরও তাঁদের কোনো আত্মসমীক্ষা যখন দেখা যায় না, শিয়ালদায় কারমাইকেল হস্টেলে বাঙালি ছাত্রদের নির্যাতনকারী হিন্দি-উর্দুভাষীদের কাছে আমরা আর কীই বা আশা করতে পারি!
এবার আসি সুশীল সমাজের দেশব্যাপী বাঙালি নির্যাতন নিয়ে মতামত গঠনের অনুশীলন-সংক্রান্ত কিছু উদাহরণ নিয়ে। তবে সেই ব্যাকরণবিদ বা সেই বিখ্যাত লেখক-লেখিকা কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে একের পর এক রাজনৈতিক দলের করুণাধন্য সেই বাংলাভাষী প্রাক্তন বলিউড সুপারস্টারের কথা আর নতুন করে বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। অগত্যা সম্পূর্ণ অন্য উদাহরণ!
বয়সের নিরিখে আমার পিতৃস্থানীয় অত্যন্ত পরিচিত একজন বিশ্ববন্দিত বাংলাভাষী সাংবাদিক তথা সাংবাদিকতার শিক্ষক বর্তমানে কলকাতার এক বিলাসবহুল ভদ্রলোক পাড়ার বাসিন্দা। দীর্ঘ কর্মজীবনের গৌরবময় অধ্যায়ে পৃথিবীর বহু দেশ তিনি ঘুরেছেন। বহু দেশের বহু স্বনামধন্য নেতা-নেত্রীর উষ্ণ সহচর্য লাভ হয়েছে বলে গর্ববোধ করে জনসমক্ষে সেসব কথা প্রায়শই বলে থাকেন। কিছু সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আমিও কিছুদিনের জন্য তাঁর সান্নিধ্য লাভ করেছিলাম। সজ্জন মানুষ, এব্যাপারে কোনো সংশয় নেই। এই বয়সেও সাধ্যমত কিছু সমাজকল্যানমূলক কাজকর্মের নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আজকের দিনে বিশ্বব্যাপী দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তাঁর অগণন প্রতিষ্ঠিত ছাত্র-ছাত্রী। পুত্র-কন্যা উভয়েরই সাফল্যের চূড়ায় অবস্থান। পুত্র থাকেন ন্যাশনাল ক্যাপিটাল রিজিওনে। কন্যা থাকেন ভারতের সিলিকন ভ্যালি অর্থাৎ বেঙ্গালুরুতে। এঁদের কাছে নাকি তিনি জানতে চেয়েছিলেন বাঙালি হওয়ার জন্য ওসব জায়গায় কেউ আক্রান্ত হয়েছে এমন কোনো খবর তাঁরা দিতে পারবেন কিনা। প্রত্যাশিতভাবেই তাঁরা এই ব্যাপারে কিছু বলতে পারছিলেন না।
সামাজিক মাধ্যমে এর পরেও এই স্বনামধন্য বর্ষীয়ান সাংবাদিক ভদ্রলোকের অনুসন্ধান জারি থাকে। তাঁর দাবি - বাংলার বাইরে বাঙালিদের ওপর নির্মম অত্যাচার হচ্ছে শুনে তিনি নাকি সত্যি খুব উদ্বিগ্ন। পরিচিত মহলে তাই যেভাবে পারছেন সত্যটা জানার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কয়েকজনের কাছে সামাজিক মাধ্যমেও জানতে চাইলেন তাঁদের অভিমত। প্রায় সবাই জানালেন যে বাঙালি হওয়ার জন্য অত্যাচার হওয়ার ঘটনার খবর তাঁদের কাছে নেই। এঁদের কেউ কেউ বললেন এসব নাকি সম্পূর্ণ মিত্যাচার, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতেই নাকি এসব করা হচ্ছে। তাঁরা নিজেরাও নাকি যথেষ্ট ভাল আছেন।
তাঁদের এই ভাল থাকাটাও প্রত্যাশিত। কারণ মাটির সঙ্গে, বাইরের হাওয়া-বাতাসের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক হয় দীর্ঘদিন আগেই ছিন্ন হয়ে গেছে অথবা আশৈশব বৈভবের মধ্যে থেকেছেন বলে সেই সম্পর্ক আদৌ তৈরি হওয়ারই সুযোগ পায়নি। বর্তমানে তাঁদের কর্মস্থল বাতানুকূল। দিনের শেষে কাজ সেরে বাতানুকূল গাড়িতে করে বাড়ি ফেরেন। বাড়িতে এসে ভদ্রলোকদের জন্য নির্মিত টিভির সংবাদ কিংবা তাঁদের রুচিসম্মত সংবাদপত্র নিয়ে বাতানুকূল ঘরেই বসেন দেশের হাল হকিকত জানবেন বলে। বাইরে যতরকম তাপ-উত্তাপই থাকুক না কেন, তাঁদেরকে স্পর্শ করার জো নেই।
সত্যিই তো! সেইসব এলিট বাংলাভাষী কিংবা তাঁদের সমকক্ষ সকল মানুষ তো ভিনরাজ্যে ভালই আছেন, কারণ তাঁদের বাঙালি পরিচিতিই তো এখন গৌণ। যে সমাজে তাঁদের ওঠাবসা, সেখানে মানুষ তাঁদেরকে বাঙালি নয়, সফল প্রতিষ্ঠিত এলিট হিসেবেই চেনেন। পারফেক্টলি ডিসেন্ট লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান, নট জাস্ট বেঙ্গলিজ। নট জাস্ট ব্লা-ডি বেঙ্গলিজ!
বাঙালির দুর্দশা জানতে হলে তো সেই মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হবে, যাঁর প্রধান পরিচয় বাঙালি। কারণ তাঁকে দিনের প্রায় পুরো সময়টাই বাংলায় কথা বলতে হয়, হাসি-কান্না সবকিছুই বাংলায় পায়। তিনি তো আর প্রাসাদোপম বাড়ির বাতানুকূল শয়ণকক্ষে সুখনিদ্রা কাটিয়ে সকালবেলা ব্রেকফাস্ট সেরে বাতানুকুল গাড়িতে করে কর্মস্থলে গিয়ে বাতানুকূল ঘরে বসে কাজ করা সেইসব এলিট নন, যাঁদেরকে কর্মস্থলে একবারের জন্যও নিজের মাতৃভাষায় কথা বলতে হয় না, কিংবা তাঁদেরই হয়তো বাংলায় কথা বলতে ইচ্ছে করে না; তাঁদের সন্তানদেরও হয়তো ‘বাংলাটা ঠিক আসে না!’
সত্যি সত্যি ভিনরাজ্যে বাঙালি আক্রান্ত কি না জানতে হলে বীরভূম জেলার নলহাটির রাজমিস্ত্রি রাহুল সিং - মহারাষ্ট্রে কাজ করতে গিয়ে বাংলায় কথা বলার জন্য যাঁর কান কেটে নেওয়া হয়েছে - তাঁকে কি জিজ্ঞাসা করা যায় না? নাকি নির্যাতন হলেও কোনো এলিট বাংলাভাষীর ভ্যালিডেশন ছাড়া নির্যাতিতের কথা গ্রহণযোগ্য নয়? এমনকি তাঁর শরীর থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া একটা অঙ্গ সাক্ষী থাকা সত্ত্বেও কি তাঁকে নির্যাতিত বলে বিশ্বাস করা সম্ভব নয়?
কারমাইকেল হস্টেলের যে ক’জন বাঙালি ছাত্র আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে পৌঁছে গেলেন, তাঁদের কাছেও কি বাঙালির হাল হকিকত জানতে চাওয়া যায় না? তাঁদের কথা কি বিশ্বাসযোগ্য নয়? অথবা নয়ডাতে বুক করেও হোটেল না পাওয়া স্কেটিং চ্যাম্পিয়নশিপের প্রতিযোগী নীলাঞ্জনা রায় ও তৃষাণজিত দাস - এঁদের অভিভাবকদের কাছে কি জানতে চাওয়া যায় না? নাকি সেসব সুশীল এলিট বাংলাভাষীরা আশংকা করেন, পাছে সত্যিকারের নির্যাতিত কিংবা বৈষম্যের শিকার বাঙালির কাছে প্রাপ্ত তথ্য নিজেদের মস্তিস্কে বদ্ধমূল ন্যারেটিভকে চ্যালেঞ্জ না করে বসে! মস্তিস্কে বা মননে এই আভিজাত্যের বিষকে সময়ান্তরে দ্বিগুণ-চতুর্গুণ হওয়ার জন্য ফিক্সড ডিপোজিট রেখে আদৌ কি সত্যের সন্ধান করা সম্ভব? এই প্রশ্নেই থেমে গেলাম, অযথা তালিকা দীর্ঘায়িত করে কী লাভ!!